Naya Diganta

সুলতান মেলার নৌকাবাইচ

এস আর শানু খান

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,শনিবার, ১৭:৫১


সুলতান মেলার নৌকাবাইচ

সুলতান মেলার নৌকাবাইচ

চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান স্মরণে প্রতিবছরের সপ্তাহব্যাপী সুলতান মেলায় বিভিন্ন রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এস এম সুলতান কমিটি নড়াইল। যার মধ্যে বৃহত্তর পরিসরে যেটা ঘটে সেটা হলো সুলতান মেলার নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। মেলার এক মাস আগে থেকেই পুরো নড়াইল শহর ছেপে যায় নানা রকম ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন ও নানা রকম প্রচারণায়।

সুলতান মেলাকে সামনে রেখে ঠিক যেমনটা সুলতান মেলার আয়োজক কমিটি প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তেমনি ব্যাপক তোলপাড়ের ভেতর দিয়ে চলছিল আমাদের নৌকা তৈরির কাজ। আমাদের নৌকাবাইচের জন্য ৮৫ হাত লম্বা নৌকা ছিল। প্রথমবারের মতো সুলতান মেলায় আমাদের মনোখালীর নৌকা নিয়ে যাবো আমার ছয় সাত গ্রামের মানুষ।

সুলতান মেলার আগের দিন রাতে সবাইকে ডাকা হলো। ফাইনাল একটা ডিভিশন নেয়ার জন্য। কিভাবে কী করা যায়, কিভাবে নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অগ্রসর হওয়া যায় সে বিষয়ে। অনেক রাত পর্যন্ত বৈঠক সেরে এই কথা হলো যে ভোর সকালে গ্রাম থেকে ৫০-৬০ জন নৌকা নিয়ে বেয়ে বেয়ে নড়াইল পৌঁছাবে। মেলা শুরু বিকেল সাড়ে ৪টায়।

পরের সকালে শেখবাড়ির সব ছেলে ও গ্রামের অনেক ছেলে সাথে বেশ কয়েকজন গ্রামের মুরব্বি নিয়ে দোয়া দরুদ আর হিন্দু মহিলাদের উলুধ্বনি নিয়ে নৌকা রওনা হলো নড়াইলের সুলতান মেলার উদ্দেশ্যে। আমি সেবার ছিলাম নৌকায়। নৌকার মালিক তিনজনই আমার কাকা। আমিও শেখ বংশেরই একজন। রওনা হলাম সকাল ৬টার দিকে। সারা দিন বৈঠা চালাতে চালাতে হয়রান হয়ে পড়লাম। সবার সাথে তাল মিলিয়ে কষ্টটা তেমন বুঝতে না পারলেও কষ্ট কিন্তু কম হয়েছিল না। হাত-পা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছিল। নৌকার বাইচেরা সবাই যাবে ওপর দিয়ে ট্রাকে। ট্রাক ভাড়া করা হয়েছিল। আর নৌকার মালিক তিন কাকাই সকালে গাড়িতে গিয়ে পৌঁছে ছিল নড়াইলে।

বেলা ২টা বাজতে না বাজতেই ফোনের পর ফোন আসতে শুরু করে নৌকার ওপর থাকা অনেকের কাছে। সুলতান মেলা থেকে কাকারা ফোন দিচ্ছেন। আর বেশি দেরি নেই সব নৌকাই এসে পৌঁছেছে। এ রকম নানা কথা। অবশেষে ৪টার দিকে নৌকা গিয়ে ভিড়ল নড়াইলের ফেরিঘাটে। কেউ কেউ নেমে গেল। তারপর ফোনে জানাল নৌকা নিয়ে থানার ঘাটে যেতে হবে আগে। থানার ঘাট থেকে আবার নেয়া হলো বান্ধাঘাটে। বান্ধাঘাটে সব নৌকাই এসে হাজির হলো। হৈ...হুল্লো আর হৈ...হুল্লো। বাড়ি থেকে খিচুড়ি রান্না করে নিয়ে গিয়েছিল করিমনে। ওখানে গিয়ে নৌকার আসল বাইচেরা সবাই খেয়ে দেয়ে উঠল নৌকায়। নোয়া কাকা মো: ইলিয়াচ শেখ নৌকার বাইচদের জন্য বাংলালিংকের তরফ থেকে দেয়া এক কালারের গেঞ্জি আর মাথায় বাঁধার জন্য রুমাল নিয়ে এলো। সবাই পরে নিলো। ওই দিকে চিত্রা নদী সে দিন রঙবেরঙের শত শত নৌকায় ভর্তি। বিরাট আকারের বাইচের নৌকার সংখ্যা তা প্রায় বিশ-বাইশ খানের মতো। দৈর্ঘ্যরে দিক থেকে আমরা ছিলাম দ্বিতীয়। সবচেয়ে বড় যে নৌকা ছিল সেটা ছিল ৮৭ হাত লম্বা আর আমাদেরটা ছিল ৮৫ হাত।

সুলতান মেলা একটা সরকারি স্বায়ত্তশাসিত মেলা। বিপুল প্রশাসনিক লোক নিযুক্ত হয়েছিল নদীপথে ও ওপরে। চিত্রা নদীতে সে দিন যেন মানুষের জোয়ার উঠেছিল। মানুষ আর মানুষ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা রঙের নানা ঢঙের নৌকা নিয়ে হাজির হলো। স্পিডবোটে করে হ্যান্ডমাইক নিয়ে প্রশাসনিক লোকেরা অনবরত বিভিন্ন রকম সচেতনতামূলক কথা বলেই চলছিল। হঠাৎ এক সময় কানে এলো মাইকে বলছেন সব নৌকা নিয়ে ফেরিঘাটে যেতে। ওখান থেকে নৌকা ছাড়া হবে। জোর করে সবাই নৌকায় উঠে পড়ল।

নৌকা রওনা হলো ফেরিঘাটের দিকে। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে থাকলাম বান্ধাঘাটে। তিন-চারটা স্পিডবোটে করে পুলিশ মাইকিং করতে লাগল সব ট্রলার, নৌকা ও মানুষের কূলে গিয়ে অবস্থান করতে। অজস্র মানুষ বড় বড় টিউবে পাওয়া ভর্তি করে ভেসে বেড়াচ্ছিল নদীর মধ্য দিয়ে। অবশেষে নদী পরিষ্কার হলো। খানেক বাদেই মাইকে ঘোষণা হলো নৌকা ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অনেক পথ। প্রায় তিন কিলোমিটারের মতো পানিপথ অতিক্রম করতে হবে। দর্শকের মাঝে দারুণ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। চেঁচামেচি করতে শুরু করল সবাই। কেউ বা খানিকটা পানিতে নেমে গিয়ে দাঁড়িয়ে নৌকা দেখার চেষ্টা করল। কেমন যেন মানুষের জ্ঞান নেই এমন অবস্থা বিরাজ করতে লাগল আমাদের অনেকের মধ্যে। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা নৌকা রকেটের মতো গতি নিয়ে চলে আসছে।

একটু এগিয়ে আসতেই মনিরুল ভাই- ওরে আমাদের নৌকা আগে!! বলে চিৎকার মেরে ঝাঁপিয়ে পড়ল পানিতে। বেশির ভাগ মানুষই এই ভুলটা করেছিলেন সে দিন। কেননা বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় নৌকার আগা মাথায় একটা লাল পতাকা ওড়ানো ছিল। সবাই প্রথমে নৌকার মাথার পতাকা দেখে মনে করেছিল এটাই বুঝি মুনোখালীদের নৌকা। কিন্তু নৌকা বাইচ শুরুর আগে সব নৌকার মাথায় একটা লাল পতাকা লাগিয়ে দিয়েছিল আর সেটাই এক, দুই, তিন, চার এ রকম নাম্বার দেয়া ছিল। মানুষ দেখে নৌকা চেনার কোনো উপায় ছিল না। কেননা সব নৌকার বাইচিদের গায়েই একই গেঞ্জি। বাংলালিংক থেকে দেয়া গেঞ্জি। মনিরুল ভাইয়ের দামি মোবাইল সেট, এক প্যাকেট সিগারেট ও অনেক টাকা ভিজে গেল।

অবশেষে একটা-দুইটা-তিনটা করে সব নৌকা আমাদের সামনে দিয়ে চলে যায় কিন্তু আমাদের নৌকা আর মেলাতে পারে না কেউই। সব নৌকা চলে যাওয়ার পরে সবাই যখন মনে করেছে আর বোধ হয় নৌকা নেই। সব নৌকাই বোধ হয় চলে গেছে। এমন সময় কেউ একজন চিৎকার করে বলে ওই যে আর একটা নৌকা আসছে। কাছাকাছি আসতেই দেখা যায় আমাদের নৌকা। নিয়ম অনুযায়ী নৌকা পৌঁছায় ফিরে আসে সবার পেছনের স্থান অধিকার করে। নৌকায় থাকা বাইচেরা অজুহাত হিসেবে জানায় নৌকা ছাড়ার সময়ই একটু পেছনে ছাড়া হয়েছিল আমাদের নৌকা। অনেকে বলে নৌকার হাল যে লোক ধরেছিলেন তিনি নৌকা ভুলভাবে হাল ধরে নৌকা প্রথমেই বাঁকে ফেলে দিয়েছিলেন। যা হোক সবাই মেনে নিলেন। কিছু বাইচে পরিবর্তন করা হলো।

দ্বিতীয় টার্মেও আমাদের শেষের নৌকার সামান্য আগে থাকার সম্মান অর্জন করল। তার মানে এক্কেবারে ফুটো খানের আগের খান আমাদেরটা। প্রথম টার্মেই নিচু অঞ্চল খুলনা ডুমুরিয়া থেকে আসা নৌকা প্রথম হলো। ও দ্বিতীয় টার্মে আমাদের জেলার আমাদের পাশের এলাকা কুচিয়ামোড়ার নৌকা প্রথম স্থান অধিকার করল। আমাদের সবার মুখের হাসি ম্লান হয়ে পড়ল। নৌকার প্রতি যে প্রবল আকর্ষণ মানুষের মধ্যে ছিল সেটা নেতিয়ে পড়ল নিমিষেই। আশার সাগরে ভাটার টান ধরল। চিত্রা নদী সে দিন পুরো উজ্জীবিত। চলছে নানা রকম বিনোদন। ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে বড় বড় বক্স ও মালিক বাজিয়ে নেচে নেচে দর্শককে আনন্দ দিয়ে বেড়াচ্ছেন সুন্দরীরা।

তৃতীয় টার্মেও কুচিয়ামোড়া নৌকা প্রথম স্থান অধিকার করল। আমাদের নৌকার স্থান বরাবরের মতোই। সবাই নৌকা এনে বান্ধাঘাটে ভিড়াল। আমাদের বাইচেরা লজ্জায় যার যার মতো মেলা থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল। অবশেষে নৌকার মালিক মো: ইদ্রিস শেখ পুরস্কার আনতে গেলেন। সুলতান মেলায় অংশগ্রহণকারী সব নৌকাকেই পুরস্কার দেয়া হয়।

শালিখা, মাগুরা।

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫