ঢাকা, সোমবার,০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

ইসলামবিহীন বিশ্ব

গ্রাহাম ই ফুলার

০২ জানুয়ারি ২০১৬,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বর্তমানে ইসলাম ও মুসলিম বহুল আলোচিত দু’টি শব্দ। মুসলমানদের নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় একের পর এক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সমাজতন্ত্র পতনের পর ইসলামকেই পাশ্চাত্যের সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের অনেকেই ইসলামকে বর্তমান সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে অভিহিত করছে। অনেকে তো ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের প্রতিশব্দ হিসেবেও উল্লেখ করছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুসলমানেরাই বরং সন্ত্রাসে সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি খোদ ইউরোপে মুসলমানেরাই সন্ত্রাস চালাচ্ছে বলে যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলোও সম্পূর্ণ একপেশে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, মুসলমানদের চালিত হিসেবে উল্লেখ করা সব সন্ত্রাস আমলে নিলেও তা মোট সহিংসতার বড়জোর ৩ শতাংশ। ইউরোপ ও আমেরিকার জাতিগত, গোষ্ঠীগত এবং নানা কারণে বাকি ৯৭ ভাগ সন্ত্রাস হয়ে থাকে। সেগুলো মিডিয়ার আড়ালেই থেকে যায়।
তা ছাড়া মুসলমানেরা কেন ুব্ধ, সেটা বিশ্লেষণেও দরকার হয়ে পড়েছে। সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান থেকে কোনোকালেই দলে দলে লোক বিপদসঙ্কুল পথ তো দূরের কথা, সহজ পথেও ইউরোপ বা আমেরিকায় পাড়ি দেয়নি। কিন্তু আমেরিকান নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য জোটের তেল এবং অন্যান্য সম্পদ কব্জা, ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের ল্েয যে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে এসব দেশের নিরীহ মানুষকে। পাশ্চাত্যের আগ্রাসন, ভুলনীতির কারণেই তারা ুব্ধ হচ্ছে।
এমন এক প্রোপটেই গ্রাহাম ই ফুলারের ‘এ ওয়ার্ল্ড উইথআউট ইসলাম’ বইটি অনুবাদের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। লেখক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, র‌্যান্ডের সাবেক সিনিয়র রাজনীতিবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে সাইমন ফ্রেসার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাজাঙ্কক্ট প্রফেসর। তিনি প্রায় দুই যুগ মুসলিম বিশ্বে বাস করেছেন, কাজ করেছেন। তার লেখা আরেকটি বিখ্যাত বই হচ্ছে The Future of Political Islam। এতে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে পাশ্চাত্য বর্তমানে যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তা অনেক পুরনো, আধুনিক ইতিহাসের অনেক অনেক আগে এর শুরু। এটা কেবল ধর্মীয় নয়, পাশ্চাত্যের আধিপত্য জারির প্রয়াস। আর আরবেরা যুগের পর যুগ এই আধিপত্য প্রতিরোধ করে আসছে। তারা একবারের জন্যও পাশ্চাত্যের আধিপত্যকে ভালোভাবে মেনে নেয়নি। এমনকি ইসলাম যদি নির্মূলও করে দেয়া হয় (যা কখনো সম্ভব নয়, তার পরও যদি যুক্তির খাতিরে ধরে নেয়া হয়) তবুও মধ্যপ্রাচ্য পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে লড়ে যাবে।
এ বইয়ের প্রতিটি বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। এখানে কেবল অনুবাদ করা হয়েছে। বইটির ভাষান্তর করছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ। আজ প্রকাশ হলো এর প্রথম পর্ব। এর পর ধারাবাহিকভাবে এটি প্রকাশ হবে।
ইসলাম এবং ইব্রাহিমি ধর্মবিশ্বাস
আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। কুরআন ১১২ : ৩
সপ্তম শতকের প্রথম ভাগে হজরত মুহাম্মাদ সা: আল্লাহর কাছ থেকে ওহি লাভ এবং তা বিশ্বের সামনে ঘোষণা করার আগে পর্যন্ত সত্যিই এমন একটা সময় ছিল যখন ইসলাম ছিল না। তবে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে মধ্যপ্রাচ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসূচক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা এক অর্থে ত্র“টিপূর্ণ। রাজনৈতিক বিবেচনায় এটা সন্ধিণ হতে পারে, তবে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ইসলামের আত্মপ্রকাশকে আরেকটি বহুমাত্রিক ধারণা, চলমান পথে (মধ্যপ্রাচ্যের একেশ্বরবাদী চিন্তাধারায় অব্যাহত বিবর্তনে) আরেকটি বাঁক হিসেবে সহজেই অভিহিত করা যায়। নবী হজরত ইব্রাহিম আ: এবং ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলামÑ এ তিন ধর্মসংবলিত একেশ্বরবাদী ত্রয়ী ঐতিহ্যকে বোঝাতে এখন প্রায়ই ‘ইব্রাহিমি ধর্মবিশ্বাসের’ কথা শুনে থাকি। সময়ের পরিক্রমায় তাদের মধ্যে যত রাজনৈতিক পার্থক্যই সৃষ্টি হয়ে থাকুক না কেন, এ তিন ধর্ম পরস্পরের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। আর এটা এ কথাই নির্দেশ করে : রাজনীতি ও মতার লড়াই প্রায়ই অভিন্ন ঐতিহ্যের ওপর জোর না দিয়ে বরং রাজনৈতিক চাহিদার আলোকে ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্যকে আরো বড় করে দেখায়। ইসলাম আগমনের আগে থেকে এ অঞ্চলে বিরাজমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার স্থায়ী কারণ রাজনীতি এমনকি ইসলাম আগমনের পরও প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। আমরা ধারাবাহিকতার অপোয় থাকি। ইসলামকে মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় ঐতিহ্যে নতুন কিছু হিসেবে বিবেচনা করার দৃষ্টিভঙ্গিটি স্রেফ ভুল। এ অঞ্চলের গভীরতর প্রেরণা ও সংস্কৃতির অনেক কিছু ইসলাম আত্মস্থ করেছে, প্রতিনিধিত্ব করছে, স্থায়িত্ব দিয়েছে।
ইসলাম-পূর্ব মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় মানচিত্রে ইস্টার্ন অর্থোডক্স আকারে খ্রিষ্টধর্মের প্রাধান্য দেখা যায়। তবে পারস্যে (সাসানীয় সাম্রাজ্যে) মোটামুটিভাবে একেশ্বরবাদী জরস্ত্রীয় ধর্ম এবং দু-একটি নগর এলাকায় ইহুদি ধর্মের জন্য কিছুটা জায়গা ছিল। আর ভারতীয় উপমহাদেশে ছিল বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মের প্রাধান্য। ইউরোপ নিজে ছিল কিছুটা খ্রিষ্টান, কিছুটা পৌত্তলিক। ধর্মীয় দিক থেকে ইসলামের আগমন ছিল বিলম্বে এবং সত্যি বলতে কী, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রভাব বিস্তার করতে সম ইতিহাসের শেষ নতুন ধর্ম। তবে ইসলাম দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে দেরিতে আসার ঘাটতি পুষিয়ে নেয়, মধ্যপ্রাচ্যে এক সময় খ্রিষ্টান ও জরস্ত্রীয় ধর্মের অধীনে থাকা বিশাল অঞ্চলে প্রাধান্যমূলক অবস্থান গ্রহণ করে। ইসলামের আত্মপ্রকাশ না ঘটলে খুবসম্ভব ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্ম এখনো মধ্যপ্রাচ্যের (সম্ভবত ব্যতিক্রম হিসেবে ইরানে থাকত জরাস্ত্রীয় ধর্ম) প্রধান ধর্ম হিসেবে বিরাজ করত।
ইসলামের পরিচিতি বিশ্বের বিশাল অংশে অব্যাহত সম্প্রসারণ ও বিজয় অন্য যেকোনো বিজয়ের মতোই বিপুল রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে প্রথম দশকগুলোতে স্থানীয় লোকজনের ওপর খুব কমই চড়াও হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিরাজমান ধর্মীয় পরিবেশে ইসলাম আসলে বিকশিত হয়েছে তুলনামূলক সহজাত ও অকৃত্রিম পন্থায়। বস্তুত যেটা বিস্ময়কর তা হলো, ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষায় ইসলামের বিরাজমান ধর্মীয় পরিবেশে বেশ সহজাতভাবে খাপ খাওয়ানো।
পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে উদ্ভট সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রত্যন্ত ও বিচ্ছিন্ন মরুভূমিতে ইসলামের জন্ম তেমন কোনো অপ্রাসঙ্গিক ঘটনা ছিল না। ইসলামের ধারণাগুলো দীর্ঘ দিন ধরে তীব্র ধর্মীয় বিনিময়, নানা উপাদানের সংযোগ এবং বিতর্ক প্রত্যকারী বৃহত্তর ভূমধ্যসাগরীয় পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাংস্কৃতিক মিলন ভূমিতে সরাসরি প্রবাহিত হতে থাকে। অন্য কোনো অঞ্চলই সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের মতো এত বিচিত্রমুখী ধর্মীয় দল-উপদল প্রত্য করেনি। ইসলাম আত্মপ্রকাশের সময় আমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের প্রাথমিক সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট থিম ও উদ্বেগের পুনরাবৃত্তি দেখি। খ্রিষ্টধর্মের (আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই সেটা দেখব) প্রথম ছয় শ’ বছরে ধর্মীয় ও মতাদর্শগত বিরোধ প্রত্য করার পর ইসলামের মোকাবেলা আমাদের বিস্মিত করে না; ইসলাম প্রচারিত যুক্তি ও বিশ্বাসগুলো বেশ পরিচিত বিতর্ক হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। এসব বিতর্কের মধ্যে রয়েছে : এক আল্লাহর প্রকৃতি কী? ইহুদি ধর্মের বার্তা কি মনোনীত জাতি হিসেবে ইহুদিদের জন্য, নাকি সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে পাঠানো হয়েছিল? যিশু কি আল্লাহর পুত্র ছিলেন নাকি আল্লাহর দেয়া রূহসমৃদ্ধ মানুষ ছিলেন? আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই এ ধরনের অনেক বিতর্কের বিস্ময়কর প্রকৃতি যাচাই করব, ল করব রাজনৈতিক শক্তির মদদপুষ্ট ধর্মীয় মতবাদগুলো বিজয়োল্লাস করছে, আর কম রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া মতবাদগুলো পথভ্রষ্ট হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে।
সর্বোপরি, আমরা দেখব, পরস্পরের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠযুক্ত এসব মতাদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিভাবে ছিল মহান সাম্রাজ্যগুলোর রাজনীতি। মতা প্রতিনিয়ত ধর্মকে আকৃষ্ট করেছে এবং ধর্ম আকৃষ্ট করেছে মতাকে। ধর্মতত্ত্ব নিছকই গৌণ বিষয়। অধিকন্তু, সংস্কৃতি, সময়, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও বিশ্বাসের স্থায়ী শক্তিগুলো মতাধর, সেগুলো নতুন ঘটনাবলিকে নিজের মতো করে গড়া পথে পরিচালিত করার বিপুল সামর্থ্য রাখে। নতুন ও অবিশ্বাস্য সভ্যতার দীপ্তি ছড়ানো ইসলাম ছিল অনেকটাই এর বৃহত্তর পরিবেশের নিজস্ব পণ্য।
(চলবে)

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫