ছলে বলে কলেকৌশলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার বছর

শফিক রেহমান

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীদের মুখে ২০১৫’র আগে দুটি সদম্ভ বাক্য প্রায়ই উচ্চারিত হতো, ‘‘আন্দোলন কিভাবে করতে হয় আওয়ামী লীগ সেটা জানে। বিএনপিকে সেটা আওয়ামী লীগের কাছেই শিখতে হবে।’’

৫ জানুয়ারি ২০১৪’র নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে কুকুর ছিল উপস্থিত কিন্তু ভোটার ছিল অনুপস্থিত। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরপর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হবার পর তাদের এই উক্তি বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। সম্ভবত তখন থেকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আন্দোলনের সহজ পাঠ নিতে শুরু করে। সেই কলংকিত এক তরফা নির্বাচনের এক বছর পূর্তি পালন উপলক্ষে ৫ জানুয়ারি ২০১৫-তে বিএনপি পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখতে চায় তাদের সেই পাঠে সুফল অর্জন সম্ভব কিনা।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নজিরবিহীন বাহিনী (প্রথমে পুলিশ ও পরে র‌্যাব) পরীক্ষার হলে গার্ড দেয়ার বদলে পরীক্ষার হলই বন্ধ করে দিতে চায়। ৫ জানুয়ারি ২০১৫-তে ঢাকায় বিএনপির সম্ভাব্য বড় সমাবেশের ৪৮ ঘণ্টা আগে ৩ জানুয়ারিতে নজিরবিহীন বাহিনীর সদস্যরা বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে গুলশানে তার অফিসে অবরুদ্ধ করে ফেলে। অবরুদ্ধ খালেদা সেখানে থেকে দেশব্যাপী আন্দোলন সূচনার ঘোষণা দেন। অবরুদ্ধ খালেদার ডাকে রাজধানী ঢাকা বাদে কার্যত: সারা দেশই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পরবর্তী তিন মাস।
আওয়ামী সরকারের বিদায় এবং সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধীদের এই দাবিতে ২০১৫-তে দেশ জুড়ে চলতে থাকে :

  • শুক্রবার ও আরো কয়েকটি দিন বাদে পুরো দিন এবং অর্ধেক দিন হরতাল।
  • রাজধানীর সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী সব হাইওয়েতে অবরোধ। ফলে আন্তঃ জেলা কোচ ও ট্রাক চলাচল হয় ব্যাহত ও অনিশ্চিত।
  • বিভিন্ন স্থানে রেল লাইন উপড়ে ফেলা। ফলে ট্রেন চলাচল হয় বিলম্বিত ও বিপজ্জনক।
  • কয়েক হাজার গাছ কেটে পথে ফেলে রাখা হয়। ফলে পরিবেশের ক্ষতি হয়।
  • মিনি জনসভা ও খণ্ড মিছিল।
  • যানবাহনে আগুন সংযোগ। ফলে বহু মানুষ হতাহত হয় এবং তাদের মর্মান্তিক ছবি আওয়ামী সরকারের প্রচার বস্তুতে রূপান্তরিত হয়।

এসব ঘটনা হয়ে পড়ে নৈমিত্তিক। সারা দেশে জনজীবন হয় বিপর্যস্ত। ব্যবসা-বাণিজ্য হয় স্থবির। এমন ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী একটানা আন্দোলন একাত্তরেও দেখা যায়নি। এই আন্দোলন পরিচালিত হয় ঢাকায় যুগপৎ গুলশানের নীরব রোড নাম্বার ছিয়াশিতে দলের চেয়ারপার্সনের অফিস এবং নয়া পল্টনের সরব ভিআইপি রোডে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে। সেই সময়ে দুটি ঘটনা দেশের মানুষকে বিচলিত করে :

আন্দোলনের দুটি উৎস
এক. চেয়ারপার্সনের অফিস প্রাঙ্গণে ৫ জানুয়ারি ২০১৫-তে খালেদা জিয়া যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন নজিরবিহীন বাহিনী তার প্রতি কয়েকবার পেপার স্প্রে (Pepper Spray, উচ্চারণটি পিপার নয় - পেপার) করে বা মরিচের গুড়া ছোড়ে। চোখ জ্বালা করা সত্ত্বেও খালেদা তার বক্তব্য চালিয়ে যান। তার চরিত্রের দুর্দমনীয় দিকটি আবারও প্রতিভাত হয়। খালেদা জিয়ার ভক্ত ও অনুগামীরা প্রতিদিন তার অফিসে টিফিন ক্যারিয়ারে খাওয়া নিয়ে যেতে থাকেন। এসব খাওয়া অফিসের গেইটে দিনরাত পাহারারত নজিরবিহীন বাহিনীর কাছে রেখে তাদের ফিরে যেতে হয়। পরে এদের অনেকেই বিপদে পড়েছেন। যেমন, ২১ ফেব্রুয়ারিতে বিমান বাহিনীর কিছু সাবেক কর্মচারি ও তাদের স্ত্রীদের একটি দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন রেজাউর রহমান। পরে মার্চ মাসের মধ্যেই তাকে দেশ ছাড়তে হয়। খালেদা জিয়ার অফিসে ৫,০০০ স্কোয়ার ফিটের দোতলা বাড়িতে আবদুল কাউয়ুম, সেলিমা রহমান, শিরীন সুলতানা, মারুফ কামাল খান ও শিমুল বিশ্বাস এবং শেষের দিকে নজরুল ইসলাম খানসহ প্রায় পঞ্চাশজন সহকর্মী ও স্টাফ আটক ছিলেন। সেখানে খালেদা ভক্তদের আগমন এবং খাবার ও পানি সরবরাহ যাতে বাধাগ্রস্ত হয় সেই লক্ষ্যে তার বাড়ির বাইরে কিছু বড় ট্রাক এনে আড়াআড়িভাবে রেখে পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকার পক্ষ থেকে দাবি করা হয় সেসব বাহন খালেদাই এনেছেন তার বাড়ি রিপেয়ার করার জন্য ! এসব কারণে খালেদার অফিস হয়ে পড়ে দেশি-বিদেশি খবরের কেন্দ্রবিন্দু।
দুই. ওদিকে নয়া পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিদিনের কর্মসূচির বিবৃতি দিচ্ছিলেন সেই বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা। যেমন, প্রথম দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং তিনি গ্রেফতার হবার পরে, রুহুল কবীর রিজভি এবং তিনিও গ্রেফতার হবার পরে অন্যান্যরা একজনের পর একজন দায়িত্বের শূন্যতা পূর্ণ করেন। এরা প্রত্যেকেই অসম সাহস দেখিয়েছেন। মির্জা আলমগীর ও রিজভিকে এরপর কয়েক মাস জেল খাটতে হয়েছে এবং সম্প্রতি তারা জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। রিজভির শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসা সালাউদ্দিন আহমদকে গুম করা হয়েছিল। পরে তিনি আসামে শিলংয়ে মুক্তি পান, খুব সম্ভবত ইনডিয়ান সরকারের সুমতির ফলে। তিনি এখনো সেখানেই নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছেন। সালাউদ্দিনের পরে আসেন বরকতউল্লাহ বুলু। তিনি আত্মগোপনে গেলে তার জায়গায় আসেন আসাদুজ্জামান রিপন।
বিএনপি নেত্রী ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতাদের এমন অভূতপূর্ব সিরিয়াল অবস্থানের ফলে তাদের নির্দেশ ও আবেদন মোবাইল ফোনের কল্যাণে চলে যায় দেশের বহুদূর পর্যন্ত। অন্যান্য বড় শহর ও মফস্বলের নেতাকর্মীরা নিজেরাই সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। বিশেষত চট্টগ্রামে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রাজশাহীতে মিজানুর রহমান মিনু, নরসিংদিতে খায়রুল কবির খোকন প্রমুখকে সংগ্রামী ভূমিকায় বারবার দেখা যায়। এদের একজনের পর একজন যখন আওয়ামী সরকারের নির্দেশে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিলেন তখন দেশবাসী উন্মুখ হয়ে দেখছিল আর ভাবছিল এরপরে শূন্য চেয়ার পূরণে কোন নেতা এগিয়ে আসবেন?
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫-তে বেপরোয়া আওয়ামী সরকার সিদ্ধান্ত নেয় খালেদা জিয়াকে তার অফিস থেকে গ্রেফতার করে থানায় আটক রাখতে। রাত দশটার দিকে টেলিভিশন স্ক্রলে দেখা যায়, খালেদাকে গুলশান থানায় নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিউ ইয়র্ক থেকে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান-কি মুন কড়া হুশিয়ারি দেন। ফলে গ্রেফতার নির্দেশ কার্যকর করা হয় না। আন্দোলনের সূচনাতেও বান-কি মুন বাংলাদেশে শান্তি বজায় রাখার জন্য বিবৃতি দিয়েছিলেন। ফেব্রয়ারির শেষ সপ্তাহে সারা দেশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেও রাজধানীতে সরকার দৃঢ় অবস্থানে ছিল। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর কর্মীরা মার্চে ঢাকায় সমবেত হতে থাকে সরকার পতনের লক্ষ্যে আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে।

ব্যালট থেকে বুলেট যুগে উত্তরণ
এই পর্যায়ে এটা তর্কাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়, হ্যা, আন্দোলন কিভাবে করতে হয় সেই বিদ্যা বিএনপি অর্জন করেছে। কিন্তু মার্চের শেষ দিক থেকে বোঝা যায় সেটা গুরুমারা বিদ্যা হয়নি। ফলে দেশ জুড়ে আন্দোলন হলেও রাজধানী ঢাকায় সরকারের পতন ঘটেনি। ঢাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে বিএনপি জোট ব্যর্থ হয়। এর প্রধান দুটি কারণ ছিল :
এক. ঢাকার কোনো স্থানেই কর্মী-সমর্থকদের পাশে কোনো নেতা উপস্থিত হননি। মামলায় জর্জরিত এসব নেতারা আরো মামলার দায় নিতে চাননি। এবং
দুই. নজিরবিহীন বাহিনী কর্তৃক নির্বিচারে গুলি চালানোর প্রচণ্ড ভীতি।
৬ মে ২০১৩’র প্রথম প্রহরে মতিঝিল শাপলা চত্বরে ঘুমন্ত হেফাজতিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের যে নির্দয় ইমেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল, বলা যায় সেই শুট টু কিল (shoot to kill) ইমেজই প্রধান সহায়ক হয় ২০১৫’র আন্দোলন দমন করতে। সকল বিরোধী নেতা-কর্মী-সমর্থকরা বুঝতে পেরেছেন পঞ্চাশের দশকে মুসলিম লীগ আমলে ভাষা আন্দোলনে চারজন নিহত (সালাম-রফিক-বরকত-জব্বার) এবং তারপর আশির দশকে জেনারেল এরশাদের আমলে ড. মিলন, নূর হোসেন, রাউফুল বাসুনিয়াসহ ডজন খানেক ব্যক্তির মৃত্যু থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন অনেক অনেক দূরে চলে গিয়েছে। এখন রাজনীতি হচ্ছে এক ডজন নয়, বহু ডজন মানুষের জীবন-মরণ নির্ধারক। লাঠি চার্জ ও টিয়ার গ্যাস প্রয়োগের যুগ শেষ হয়েছে। এখন সাজোয়া গাড়ি থেকে পেপার স্প্রে, জলকামান, রাবার বুলেট, বেনামি ওয়ারেন্ট, গুম, গ্রেফতার ও রিমান্ড, সুদীর্ঘ মামলা, সরকার তোয়াজের বিচার ব্যবস্থা এবং ৬ মে ২০১৩-র প্রথম প্রহরের মতো নিরস্ত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর যুগ শুরু হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বিবৃতি দেয়া, আন্দোলন করে জেলে যাওয়া, হেবিয়াস কর্পাস অ্যাক্টের মামলা করে জেল থেকে বেরিয়ে আসা এবং তারপর আবার জেলে গিয়ে সেখানে গাছের চারা রোপণ অথবা চিরকুট পাঠিয়ে বিরোধী নেতা হওয়া এখন রূপকথা। শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ক্ষমতাসীন হবার পর জেলবন্দী বিরোধী নেতাদের খোজখবর নেয়া এবং তাদের খাবার পাঠানো ও পরিশেষে তাদের মুক্তি দেয়া এখন ফেয়ারি টেইল! ৬ মে ২০১৩-র গণহত্যার প্রধান শিক্ষা হলো অহিংস রাজনীতি থেকে বাংলাদেশ এখন ঢুকেছে সহিংস রাজনীতিতে। অবাধ ব্যালট প্রয়োগ বন্ধ করতে অবাধ বুলেট প্রয়োগের যুগে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে।
আর তাই ৯২ দিন পরে বিএনপির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতি ঘটে ৫ এপৃল ২০১৫-এ। সমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী একটানা রাজনৈতিক আন্দোলনের। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক রেকর্ড - টানা ৯২ দিন অবরুদ্ধ থাকা প্রতিষ্ঠা করেন খালেদা জিয়া। কিন্তু তার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। গুলশান রোড নাম্বার ৮৬-তে অফিসের মাত্র কয়েক’শ গজ দূরে রোড নাম্বার ৭৯-তে বাসভবন ফিরোজা’য় ফিরে যান খালেদা জিয়া। পেছনে অফিসে পড়ে থাকে কিছু প্লাস্টিক ব্যাগে মিনারাল ওয়াটারের শূন্য সব বোতল, উচ্ছিষ্ট খাবার ও বিভিন্ন আবর্জনা। ওদিকে নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হয়ে যায় নিষ্ক্রিয়।

অবস্থান সুদৃঢ় করণে আওয়ামী লীগের পাচটি পদক্ষেপ
১. দেশব্যাপী ৯২ দিনের যুদ্ধে রাজধানী কামড়ে পড়ে থাকা আওয়ামী লীগ সরকার বিজয়ী হয়। এরপর বল প্রয়োগে বিশ্বাসী আওয়ামী সরকার তাদের অবস্থান দ্রুত সুদৃঢ় করণে মনোযোগী হয়। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরো মামলা দায়ের করা হয়। নজিরবিহীন বাহিনীর সদস্যরা মফস্বল ও গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাদাবাজির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। ২৬ আগস্টে সাথিয়াতে ব্যবসায়িক কলহে তিন ব্যক্তির মৃত্যুর পরে ৩,০০০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এটি একটি মাত্র দৃষ্টান্ত। এই ধরনের সব মামলা হয় নজিরবিহীন বাহিনীর সদস্যদের লাইসেন্স টু পৃন্ট মানি। তাদের কর্তাব্যক্তিরা অপ্রকাশ্যে দাবি করেন তাদের বাহিনীই আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় রেখেছে এবং সেটা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের ধারণাও তাই।
২. এই অপশক্তির ভিত্তিতে ২৮ এপৃল ২০১৫-তে ঢাকা সিটির উত্তর ও দক্ষিণে, দুই মেয়র এবং চট্টগ্রাম সিটির এক মেয়র নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়। প্রথমে বিএনপি এই তিনটি নির্বাচনে অংশ নেয় ও ব্যাপক ক্যামপেইন করে। বিশেষত ঢাকা দক্ষিণে, মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজার উদ্যমী ক্যামপেইন ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু নির্বাচনের দিনে ভোট কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। এতে আওয়ামী লীগের খুব বেশি কিছু এসে যায় না। পূর্ব নির্ধারিত প্ল্যান মোতাবেক তিনটি নির্বাচনেই তাদের তিন প্রার্থী ‘বিজয়ী’ হন। তিন ‘বিজয়ী’ মেয়রদের ২০১৫’র সিটি নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ফলাফল দেখার পর যারা এতদিন ৫ জানুয়ারি ২০১৪’র সাধারন নির্বাচন বয়কট করায় বিএনপি’র সমালোচনা করতেন তাদের ভুল ভাঙ্গে। তারা স্বীকার করেন, আওয়ামী লীগ আয়োজিত কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট তার টুইটারে বলেন, ‘উইনিং অ্যাট এনি কস্ট, ইজ নো ভিক্টরি এ্যাট অল।’ অর্থাৎ, যে কোনো মূল্যে জেতা আসলে কোনো জয় নয়। লন্ডনে ২৬ এপৃল ২০১৫-তে প্রভাবশালী দৈনিক ফিনানশিয়াল টাইমস “বাংলাদেশ আর্মি ফানডেড টু ফরগেট ইটস রোল অ্যাজ নিউট্রাল রেফারি” (নিরপেক্ষ ভূমিকা ভুলে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ আর্মিকে টাকা দেয়া হয়েছে) শীর্ষক সুদীর্ঘ এক রিপোর্ট করে।
বিজয়ী মেয়রদের মধ্যে ঢাকা সিটি উত্তরে বিজয়ী আনিসুল হক (যিনি বর্তমান সেনাপ্রধানের ভাই) তার স্বকীয়তার কিছুটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। তিনি তেজগাও শিল্প এলাকার বাস ট্রাকের অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন এবং এয়ারপোর্ট রোড, মহাখালি ফ্লাইওভার ও নিউ এয়ারপোর্ট রোড থেকে পীড়াদায়ক প্রাইভেট বিলবোর্ড সমূহ সরাতে পেরেছেন। থ্যাংকস মেয়র আনিসুল হক। তবে প্রধানমন্ত্রীর সহাস্য রঙিন ছবি সংবলিত সরকারি প্রচারণার বিলবোর্ডগুলো রয়ে গেছে।
ঢাকা সিটি দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন (প্রয়াত সজ্জন মেয়র মোহাম্মদ হানিফের পুত্র) ঢাকাকে ভালোবেসে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে পথ পরিষ্কার করার ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘প্রতি বছর রাজধানীবাসী ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস পালন করে থাকেন। এ দিবসে বাবা-মা, ভাই-বোন,স্বামী-স্ত্রী ও প্রেমিক-প্রেমিকাকে ভালোবাসা নিবেদন করে থাকেন। নগরবাসীর প্রতি আমার আহ্বান, এবারের ভালোবাসা দিবসে অন্য সব কিছুর মতো ‘নগরকেও’ যুক্ত করুন। ভালোবাসা দিবসে নগরীর পরিচ্ছন্নতার কাজ করে জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি করুন।’’
ঢাকা সিটি দক্ষিণকে পরিচ্ছন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করার জন্য মেয়র সাঈদ খোকনও থ্যাংকস পাবেন। তবে তিনি স্পেশাল থ্যাংকস পাবেন ভালোবাসা দিবসকে মেয়রাল স্বীকৃতি দেয়ার জন্য।
এই প্রসঙ্গে ঢাকার দুই মেয়রকেই ডাবল থ্যাংকস জানানো যাবে যদি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের (বর্তমানে জেলবন্দী) প্রতিশ্রুত কাজটি করেন। বাবর বলেছিলেন, তিনি ঢাকায় একটি ‘‘ভালোবাসা পার্ক’’ তৈরি করে দেবেন যেখানে পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, ও প্রেমিক-প্রেমিকা নিরাপদে ভালোবাসা বিনিময় করতে পারবেন। উত্তর বা দক্ষিণ ঢাকা সিটিতে এ রকম কোনো নিরাপদ পার্ক এখনো নেই। সুতরাং এই দুই স্থানে ২০১৬-তে দুটি ভালোবাসা পার্ক তৈরিতে দুই মেয়র মনোযোগী হতে পারেন। আর দক্ষিণ ও উত্তর ঢাকা সিটির মধ্যে ভালোবাসার মেলবন্ধন সৃষ্টির লক্ষ্যে পুরনো ঢাকা থেকে ভালোবাসার একটি মিছিল বের হয়ে সেটা শেষ হতে পারে বনানী, কামাল আতাতুর্ক এভিনিউতে প্রতি ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। এই এভিনিউতে অবস্থিত বহুতল ভবনগুলো থেকে রঙিন কনফেটি ছড়িয়ে মিছিলে সমবেতদের স্বাগত জানানো যেতে পারে। এই ধরনের মিছিল এখন বহু শহরেই হয়, যেমন, বৃটেন লন্ডনে নটিং হিল গেইটে ও ব্রাজিলে রিও-তে।
ঢাকার দুই মেয়র নিশ্চয়ই জেনেছেন, লন্ডনের প্রভাবশালী দি ইকনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট মে’তে তাদের বার্ষিক গ্লোবাল লিভেবিলিটি সার্ভেতে রিপোর্ট করে, বসবাসের জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম শহর রূপে ঢাকা সিটি ২০১৫-তে তার স্থান বজায় রেখেছে। বিশ্বের ১৪০ টি শহরের গুণগত ও সংখ্যাগত মানের ওপর জরিপ চালিয়ে এই রিপোর্ট হয় - এ সবের মধ্যে রয়েছে শহরের শান্তি ও স্থিতিশীলতা, চিকিৎসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা। ঢাকার চাইতে নিকৃষ্ট শহর হচ্ছে সিরিয়ার রাজধানী দামাসকাস। গত বছরও ঢাকা একই অবস্থানে ছিল।
৩. তিন মেয়র নির্বাচনের পর একাত্তরে যুদ্ধ অপরাধের দায়ে দণ্ডিত দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিকে আওয়ামী লীগ সরকার এগিয়ে যায়। একাত্তরে জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠনের নেতা আলী আহসান মুজাহিদ এবং একাত্তরে মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, উভয়ে তাদের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে রিভিউয়ের জন্য যে আপিল করেন সেটা নাকচ হয়ে যায়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল কথিত হত্যাকাণ্ডের সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ছিলেন না। তার পক্ষে ওকালতি করার জন্য বৃটিশ আইনজীবী টোবি ক্যাডম্যান এবং সাক্ষ্য দেয়ার জন্য পাকিস্তানের পাচ বিশিষ্ট ব্যক্তির ঢাকায় আসার অনুমতি দেয়া হয় না। তাদের দুজনের ফাসি হয়ে যায় ২২ নভেম্বর ২০১৫’র প্রথম প্রহরে একই সময়ে। ফাসির পর আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় তারা দুজনই শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে সরকার কোনো প্রমাণ দেখায়নি। ফলে সরকারি অভিযোগের সত্যতা ও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বিষয়ে মানুষের অবিশ্বাস আরো বদ্ধমূল হয়। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য নেতিবাচক হলেও, তাদের জন্য ইতিবাচক দিকটা হলো, তারা দেশবাসীর কাছে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যুদ্ধ অপরাধীদের ফাসি তারা দিতে পারে। এই ধরনের ফাসি দেয়ার যৌক্তিকতা স্বরূপ আওয়ামী লীগ সারা বছর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার কথা আউড়ে যায়।
৪. পাশাপাশি বছর জুড়ে আওয়ামী সরকার আরেকটি প্রপাগান্ডা স্ট্র্যাটেজি অবলম্বন করে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে তারা পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ ঘোষণা করে, যে যুদ্ধ অস্ত্রবিহীন, অসার ও অশরীরি। এই গায়েবানা যুদ্ধে বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানের কেউ হতাহত হবে না। তবুও পাকিস্তানকে শয়তান ঘোষণার বিরতিহীন প্রক্রিয়া চলেছে বছর জুড়ে। এই কলেকৌশলের উদ্দেশ্য একটাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার ছলে পোক্তভাবে আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় রাখা।
৫. ডিজিটাল বাংলাদেশের বুলি অতীতে কপচিয়ে এই বছরে আওয়ামী সরকার ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

টাইমলাইন :
১১ নভেম্বর ২০১৫ : সংসদে শেখ হাসিনা বলেন, সাইবার ক্রাইম বন্ধে কিছুদিনের জন্য ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধের প্ল্যান সরকারের রয়েছে।
১৭ নভেম্বর ২০১৫ : ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, ‘ফেসবুকের সাথে চুক্তি করতে চিঠি পাঠাব।’
১৮ নভেম্বর ২০১৫ : সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের রিভিউ আপিলের রায় ঘোষণার পর দেশের সব মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে বিটিআরসি নির্দেশনা দেয়। প্রথম নির্দেশনায় ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ রাখতে বলা হয়। দ্বিতীয় নির্দেশনায় লাইন, ট্যাংগো ও হ্যাংআউট বন্ধ রাখতে বলা হয়।
০৬ ডিসেম্বর ২০১৫ : কর্তৃপক্ষের দক্ষিণ এশিয়ান প্রতিনিধি দলের সাথে বাংলাদেশের তিন মন্ত্রীর বৈঠক হয়।
১০ ডিসেম্বর ২০১৫ : ২২ দিন পর ফেসবুক খুলে দেয়ার ঘোষণা সরকার দেয়।
১৩ ডিসেম্বর ২০১৫ : কিন্তু টুইটার, স্কাইপ ও ইমো বন্ধ করে দেয়।
১৪ ডিসেম্বর ২০১৫ : মেসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, লাইন, ট্যাংগো, হ্যাংআউট, টুইটার, স্কাইপ ও ইমো খুলে দেয়।
বিবিসি বাংলা জানায়, বাংলাদেশে ফেসবুক একাউন্ট আছে ১ কোটি ৭০ লক্ষ এবং এর অর্ধেক হচ্ছে ১৮-৩০ বছর বয়সী।
বাংলাদেশে এখন ফেসবুকের ওপর নির্ভর করেন অনেক ছোট ব্যবসায়ী। সরকারের কার্যক্রমে তাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে যায় এবং এক বৃহস্পতিবারে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেন। ফলে সেদিন দুপুর থেকে সারা ঢাকায় অসংখ্য নজিরবিহীন বাহিনী সদস্যদের টহলরত দেখা যায়। খবরটি বাংলাদেশের মিডিয়া এড়িয়ে যায়, যদিও বহু মিডিয়া ব্যক্তি এখন ফেসবুক নির্ভরশীল। ছোট ব্যবসায়ী ও অন্যান্যরা বিকল্প পদ্ধতি খুজে বের করে। ফেসবুক বন্ধ থাকা অবস্থায় তারা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কে (সংক্ষেপে ভিপিএন, (ঠচঘ) সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে যারা ফেসবুকে ঢোকেন তারা বাংলাদেশের আইপি (ওচ) অ্যাড্রেস দেখাননি। তারা দেখিয়েছেন অন্য কোনো দেশের আইপি অ্যাড্রেস।

মিডিয়ার ওপর অদৃশ্য চাপ
নিউজপেপার জগতে এই বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রচন্ড সংকটে পড়ে দেশের দুটি শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। বিশেষ মহলের চাপে এই দুটি পত্রিকায়, বিশেষত গ্রামীণ ফোন, বাংলালিংক জাতীয় মালটি ন্যাশনাল কম্পানিগুলো তাদের বিজ্ঞাপন কমিয়ে দেয় অথবা বন্ধ করে দেয়। পরিণতিতে এই দুটি পত্রিকাই সাম্প্রতিককালে আওয়ামী সরকারের মানভঞ্জন নীতিতে ঝুকে পড়ে। ইংরেজি ইনডিপেনডেন্ট, ঢাকা টৃবিউন ও সান পত্রিকা ডেইলি স্টারের অনেক পেছনে পড়ে থাকলেও নতুন আরেকটি পত্রিকা দি এশিয়ান এইজ এই বছরে প্রকাশিত হয়।
টেলিভিশনের ক্ষেত্রে নতুন আগন্তক দীপ্ত টিভি “সুলতান সুলেমান” নামে বাংলায় ডাব করা টার্কিশ সিরিয়াল দেখিয়ে দ্রুত দর্শকপ্রিয়তা পায়। অন্যদিকে এই বছরে একুশে টিভি’র মালিকানা বদলে যায়। নতুন মালিক হয় এস আলম গ্রুপ। জেলবন্দী আবদুস সালামের স্থানে নতুন চেয়ারম্যান হন সাইফুল ইসলাম এবং নতুন ম্যানেজিং ডিরেক্টর হন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপ, যিনি আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদকও বটে। অদৃশ্য চাপের ফলে এই বছরেই বন্ধ হয়ে যায় বাংলাভিশনের একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান মতিউর রহমান চৌধুরী উপস্থাপিত ফ্রন্ট লাইন। বছর জুড়ে ইনডিয়ান টেলিভিশন চ্যানেলের বাংলা অনুষ্ঠানগুলো এই দেশে জনপ্রিয় থেকেছে। বাংলাদেশিরা শিখেছে - আড়ি পেতে কথা শোনার অসভ্য ম্যানার্স, পারিবারিক চক্রান্ত এবং ড্যাব ড্যাব অথবা ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকা।

অখণ্ড ভারতের স্বপ্নদোষ
ইনডিয়া-বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কে এই বছরে কিছু নতুন দিক উম্মোচিত হয় - যদিও ঢাকায় সার্ক ফোয়ারার পানি বন্ধ রেখেছে আওয়ামী সরকার। কারণ, সার্ক ছিল বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের প্রতিবেশি সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নে প্রস্তাবের সফল পরিনতি।
ইনডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে ২৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ৬৬তম জন্মদিনে আচমকা আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের লাহোরে উপস্থিত হন। শুধু তাই নয়, এখন এটাও জানা গেছে কোনো এক সময়ে ইনডিয়ান মুভি টেরাস্টার দিলীপ কুমারকে (যার জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানে এবং যিনি একজন মুসলিম) তাকে বিজেপি সরকার একটি বিশেষ প্লেনে পাকিস্তানে পাঠিয়েছিল শান্তি স্থাপনে দূতিয়ালি করতে।
পাকিস্তানে নরেন্দ্র মোদির হ্যাপি বার্থডে টৃপের পর ‘অখন্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের কথা বলেন বিজেপি’র সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব যদিও তিনি দিল্লীতে হিন্দু উগ্রবাদিদের সৃষ্ট বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তুূপে এখন রামমন্দির বানানোর জন্য ইট-পাথর আনা বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। রাম মাধবের এই ‘অখন্ড ভারত’ স্বপ্ন বিষয়ে সোশাল নেটওয়ার্কে ঝড় চলছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের মধ্যেই নিহিত আছে সর্বনাশের মূল।’ এর বিপরীতে কেউ কেউ জানিয়ে দিয়েছেন ‘প্রটেস্টান্ট ধর্মের ভিত্তিতে রাজা অষ্টম হেনরি ইংল্যান্ডকে ক্যাথলিক ধর্মের আওতার বাইরে নিয়ে যান এবং এখনো ইংল্যান্ডের রাজা বা রানীকে অবশ্যই প্রটেস্টান্ট হতে হবে। ক্যাথলিকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে ইওরোপ থেকে পলাতক প্রটেস্টান্টরা প্রতিষ্ঠা করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। কৃশ্চিয়ান জার্মান দ্বারা নির্যাতিত হয়ে ইহুদিরা প্রতিষ্ঠা করে ইসরেল। এই তিনটি দেশে কোনো সর্বনাশ হয়নি। শোষিত মুসলিমদের জন্য ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে, বাংলাদেশও হতো না। এসব ক্ষেত্রে ধর্মের পেছনে প্রকৃত ইসু ছিল সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় কর্তৃক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নির্যাতন ও শোষণ।’
অখণ্ড ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নির্যাতন ও শোষণ বন্ধ করার কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি রাম মাধব। বরং এই বছরে অভিনেতা শাহ রুখ খান ও আমির খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার দাবি উঠেছে উভয়েরই স্ত্রী হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও। মিউজিক ডিরেক্টর এ আর রহমান বিপদে পড়েছেন। এই বছরেই বিএসএফ-এর গুলিতে ৪৫ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। এই বছরেই মুসলিম বাংলাদেশে ইনডিয়ান গরু রফতানি বন্ধের প্রক্রিয়া চলেছে যদিও ইনডিয়া গোমাংস রফতানিকারক দেশ হিসেবে ২০১৫-তে ছিল বিশ্বে দ্বিতীয়। আর তাই বাংলাদেশের মুভি নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী প্রশ্ন রেখেছেন, ‘অখণ্ড ভারতে গরুর সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা কি হবে?’ ইতিমধ্যে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হয়েছে।
এই বছরের জুনে ৪১ বছরের জট কাটিয়ে ঢাকায় মোদি-হাসিনার উপস্থিতিতে স্থল সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। স্বাক্ষরিত হয় ইনডিয়া-বাংলাদেশ ছিটমহল চুক্তি, যার ফলে ইনডিয়ার ১১১টি ছিটমহলের ৩৭,৩৬৯ জন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের ১৪,২১১ জন ইনডিয়ান নাগরিকত্বের সুবিধা পায়। তবে বিভিন্ন কারণে ইনডিয়া গমনেচ্ছু বাংলাদেশি নাগরিকদের ইনডিয়ান ভিসা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা ও বিড়ম্বনা রয়েই গেছে।
অন্যদিকে ডিসেম্বরে ঘটেছে খুব অপ্রত্যাশিত বিপরীতমুখি ঘোষণা এসেছে পাকিস্তানের কাছ থেকে। পাকিস্তান থেকে জানানো হয়েছে দিলীপ কুমার, রাজকাপুর, মনোজ কুমারসহ ইনডিয়ান হিন্দু-মুসলিম মুভি স্টাররা যারা আগে পাকিস্তানে ছিলেন তাদের বাড়ি মিউজিয়াম রূপে সংরক্ষণ করা হবে। ইনডিয়াতে গিয়ে দিলীপ কুমারকে তার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর সময়ে এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ মাহমুদ কাসুরি বলেছেন, গুজরাটে মোহামম্মদ আলী জিন্নাহ’র বাড়ি অযত্নে পড়ে আছে।

গুজব এবং বিতর্ক নিয়ে বিতর্ক
আন্দোলনকারী নেত্রী হিসেবে স্বাভাবিক কারণে খালেদা জিয়া বছর জুড়ে খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
এক. প্রথমে জানুয়ারি থেকে এপৃল পর্যন্ত একটানা ৯২ দিন গুলশানের অফিসে অবরুদ্ধ তিনি ছিলেন।
দুই. তারপর বছরের মাঝামাঝি সময়ে চোখের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে তিনি গুজবের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হন। আওয়ামী সরকার, দল ও প্রচারযন্ত্র বলতে থাকে তিনি লন্ডনে গিয়েছেন চক্রান্ত করার জন্য এবং তিনি লন্ডন থেকে আর ফিরে আসবেন না। তারা ভুলে যান ১/১১-তে ফখরু-মইনুর ক্যু’র পরে খালেদা জিয়া জেলবন্দী হন এবং তার ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করা সত্ত্বেও তিনি বিদেশে যেতে রাজি হননি। বরং আওয়ামী নেত্রী দুইবার বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। খালেদার দৃঢ়তার ফলেই ফখরু-মইনুর মাইনাস টু প্ল্যান ব্যর্থ হয় এবং তারই পরিনতিতে হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।
গত অক্টোবরে লন্ডনে মুরফিল্ডস আই হসপিটালে এক চোখ অপারেশনের পর খালেদা ঢাকায় ফেরেন নভেম্বরে। আট মাস পরে তার আরেক চোখে অপারেশনের জন্য মুরফিল্ডসে যেতে হবে। তখন আওয়ামী প্রচারযন্ত্র সেকেন্ড রাউন্ড চক্রান্তের গুজব ছড়াতে পারবে।
তিন. বছরের শেষ মাসে খালেদা একটি জনসভায় বলেন ‘মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।’ এই উক্তি তিনি আগেও করেছিলেন। ২০১১-তে লন্ডনে হার্স্ট অ্যান্ড কম্পানি প্রকাশিত শর্মিলা বোস-এর বই ডেড রেকনিং (Dead Reckoning)-এ মুক্তিযুদ্ধের নিহতের সংখ্যা বিষয়ে বিশদ গবেষণা হয় এবং বিতর্কটি নতুন আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। বইটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ না হলেও ঢাকায় দুষ্প্রাপ্য। খালেদার এই উক্তির পরে বিতর্কটি দেশে আবার উঠলো। তবে এর সমাধান হয়তো আদালতে হবে না। কারণ, এই বিতর্কের সমাধানের জন্য হাই কোর্টে একটি রিট খারিজ হয়ে যায় ডিসেম্বরে। বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাংলাদেশ প্রেমিক সজীব ওয়াজেদ জয়-এর ডাকে (বিদেশ থেকেই) গুলশানে খালেদার বাড়ি ঘেরাওয়ের চেষ্টা হয় ২৯ ডিসেম্বরে।

গুম কালচার
২০১৫ জুড়ে ছিল গুম ও উদ্ধারের ভীতিকর সব সংবাদ। এসব সংবাদ আওযামী লীগকে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করেছে।
৬ মার্চে গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন ও ছাত্রদল কর্মী মোহাম্মদ আলী ভূইয়া ও সোহাগ গাজীকে ১০০ দিন পরে পাওয়া যায়। এই তিন জনকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে র‌্যাব।
১০ মার্চে গুম হওয়া বিএনপি’র যুগ্ম-মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদকে ৬২ দিন পর শিলংয়ে পাওয়া যায়।
৯ ডিসেম্বরে রাজশাহীতে সাইফুজ্জামান সোহাগ নামে এক ছাত্রকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাবার পর তিনি ১৮ দিন নিখোজ ছিলেন।
এদের মতো সৌভাগ্যবান ছিলেন না তেজগাও কলেজ ছাত্রদল নেতা আমিনুল ইসলাম জাকির। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কিছু লোক তাকে তুলে নিয়ে যায় ৭ এপৃলে এবং এখন পর্যন্ত তিনি নিখোজ রয়েছেন।

বিদেশমুখি বাংলাদেশি
‘মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ’ এমন দাবি সরকার বারবার করা সত্ত্বেও বাংলাদেশে যাদের কোনো আয় নেই তাদের মধ্যে যারা দু:সাহসী এবং দালালকে টাকা দিতে সক্ষম, তারা বঙ্গোপসাগর ও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অন্য দেশে যাবার চেষ্টা করেছে। এদের অনেকে সাগরে ডুবে মারা গিয়েছে এবং সৌভাগ্যক্রমে যারা বেচে গিয়েছে তারা মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ যদি এতই অর্থনৈতিক উন্নতি করে থাকে তাহলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছে কেন এত মানুষ? আরও প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশে বেকারের সঠিক সংখ্যা কত? উন্নত দেশগুলোতে প্রতি মাসেই বেকারের সঠিক সংখ্যা সরকার প্রকাশ করে থাকে।
জীবিকা অর্জনের খোজেই শুধু নয়, রাজনৈতিক ও চিকিৎসার কারণে অনেক বাংলাদেশি বিদেশে আছেন। এই বছরে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কে। সেই শহরেই চিকিৎসার জন্য থাকছেন ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা এবং মিথ্যা মামলার কারণে থাকছেন কলাম লেখক ব্যারিস্টার ড. তুহিন মালিক।

তিনটি বই ও একই দিনে ২৯ মৃত্যুদণ্ড
চলতি বছরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছে।
এক. আইনজীবী ও বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ-এর লেখা “বাংলাদেশে গণতন্ত্র ঃ ১৯৯১ থেকে ২০০৬।” এটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন জগলুল আলম।
দুই. রিটায়ার্ড বৃগেডিয়ার জেনারেল ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াৎ হোসেন-এর লেখা “নির্বাচন কমিশনে পাচ বছর।” বইটির কিছু অংশ ধারাবাহিকভাবে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
তিন. শফিক রেহমান-এর লেখা “মৃত্যুদণ্ড ঃ দেশে বিদেশে যুগে যুগে।” ২০১৩-তে স্বদেশে শফিক রেহমানের লেখা বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান বিভিন্ন বাধা পেয়েছিল। এবার সেই বাধা অতিক্রমের লক্ষ্যে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান সেপ্টেম্বর ২০১৫-তে বিদেশের তিনটি শহরে, নিউ ইয়র্ক, টরন্টো ও লন্ডনে হয়। সম্ভবত এর আগে বাংলাভাষায় কোনো বই এই তিনটি শহরে একই মাসে প্রকাশিত হয়নি। বইটি প্রকাশ করেছে “সাপোর্টলাইফ” নামে একটি সংস্থা যেটি বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড বিরোধী আন্দোলন গড়তে কাজ করছে খুলনার জামিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ড. মামুন রহমানের পরিচালনায়। নভেম্বরে বাংলাদেশে ৬৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। এক দিনেই, ৩০ নভেম্বরে ২৯ জনের ফাসির দণ্ড হয়। এর মধ্যে গাজীপুরে একটি মামলায় ১১ জনকে ফাসির দণ্ড দেয়া হয়। ২০১৫-তে অন্তত ১৯৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, সব মৃত্যুদণ্ডের খবর মিডিয়ায় প্রকাশিত হয় না।
উল্লেখ্য, এখন বাংলাদেশে ৯১৮ জন ফাসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী জেলে আছেন। এদের মধ্যে ১৫২ জন দন্ডিত হয়েছেন বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় এবং এদের পূর্ণ বিবরণ “মৃত্যুদণ্ড” বইয়ের পরিশিষ্টতে সন্নিবেশিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর জুলাই ২০১৫ পর্যন্ত ৪৪ বছরে মোট ৪৭৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম
বছর জুড়ে ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। খেলাপি ঋণের ভয়াবহ পরিমান সম্পর্কিত খবর বের হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসহ জালনোট বিষয়ক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিও বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। বেচারা!
ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি খবর ছিল সরকারি বেসিক ব্যাংক সম্পর্কে। এই বছরে সেখানে বিভিন্ন তদন্ত, মূল হোতাদের ব্যাংক থেকে বাদ দেয়া ও ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর পদত্যাগ, এমডি ও ডিএমডিসহ প্রায় ৩০ কর্মচারির বহিষ্কৃত হবার খবরে ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর জনগণের আস্থা আরো কমেছে। নভেম্বরে সরকারি পাচ ব্যাংকে, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছিল। এর আগে বেসিক ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছিল। এছাড়া আইসিবি ইসলামী ব্যাংক (আগের ওরিয়েন্টাল ব্যাংক), বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও মার্কেনটাইল ব্যাংকেও বসানো হয় পর্যবেক্ষক। দেশের মোট ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি ব্যাংকে এখন পর্যবেক্ষক আছে। উল্লেখ্য, আওয়ামী সরকার “রাজনৈতিক বিবেচনায়” বহু বেসরকারি ব্যাংক খোলার অনুমতি দিয়েছিল। এদের মধ্যে একটি, ফারমার্স ব্যাংক নিয়ম লংঘন করে ঝুকিপূর্ণ ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে ঋন দিয়েছে। এই ব্যাংকের ছয়টি শাখায় ঋণ বিতরণে অনিয়মের প্রমান পাওয়া যায়। মতিঝিল শাখার ঋণ গ্রহীতা ২৫টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্বই

পাওয়া যায়নি। প্রকৃত পক্ষে “রাজনৈতিক বিবেচনায়” নয়, দলীয় স্বার্থ বিবেচনায় এসব ব্যাংক চলতে পেরেছে। আওয়ামী আমলে যারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে তাদের সমৃদ্ধির একটি বড় উৎস এসব ব্যাংক যারা “রাজনৈতিক বিবেচনায়” আওয়ামী লীগকে দিয়েছে পাল্টা সুবিধা। এত কিছুর পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান এশিয়ার সেরা ব্যাংকার উপাধি পেয়েছেন। সেটা ছিল আরেক চমক।
সম্মিলিতভাবে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা ২০১৫-তে কমে গেছে। কারণ, দেশে পূজি বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় ব্যাংক লোনের চাহিদা কমে গেছে। উপরন্ত ২০১২-১৩-তে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির পর ব্যাংকগুলো লোন দিতে সতর্ক হয়েছে।
২০১৫-তে স্টক এক্সচেঞ্জ-এর অবস্থাও খারাপ হয়েছে। এই বছরে বিভিন্ন শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি হয়েছে ৫ শতাংশ। দৈনিক লেনদেন
গত বছরের তুলনায় ১৬.৪ শতাংশ কমে গেছে।
হাউজিং খাতে দৃশ্যমান থেকেছে রাজধানীতে প্রায় ৩০,০০০ অবিক্রীত ফ্ল্যাট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রবাসীরা ফ্ল্যাট কিনতে অনিচ্ছুক থেকেছেন।
গার্মেন্টস ইন্ডাস্টৃতে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা বঞ্চিত হয়েছে।

মগের দেশে পদ্মা সেতু প্রকল্পের উদ্বোধন
অনেক জাকজমকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১২ ডিসেম্বর ২০১৫-তে পদ্মা সেতু প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তুলনামূলক ভাবে শস্তা ঋণের বদলে চায়নিজ সাহায্যে যে সেতু এখন বানানো শুরু হয়েছে তার ফলে এই দেশের মানুষকে কতো অতিরিক্ত সুদ দিতে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। রাজধানীতে নিউ ইস্কাটন, মগবাজার, মৌচাকবাসীরা প্রশ্ন তুলেছেন, যে সরকারের ভুলের খেসারতে তাদের এলাকার ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ বারবার বিলম্বিত হয়েছে এবং মগবাজারকে মগের মুল্লুকে রূপান্তরিত করেছে, সেই সরকার পারবে কি পদ্মা সেতু বিনা ভুলে যথা সময়ে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করতে? এর উত্তরে অবশ্য কেউ কেউ বলেছেন, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার যে তমসাচ্ছন্ন কনস্ট্রাকশন কম্পানি বানাচ্ছে তারা পদ্মা সেতু নির্মার্ণের দায়িত্বে নেই। তবে সে যাই হোক না কেন, বর্তমান যুগে ফ্লাইওভার নির্মাণ কমে গেছে। সাউথ কোরিয়ায় সিওল-এ কিছু ফ্লাইওভার ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এখন আন্ডারগ্রাউন্ড মাস ট্রানজিট সিসটেম-ই জনমানুষের চলাচলের জন্য বেশি গ্রহনযোগ্য ব্যবস্থা। ওভারগ্রাউন্ড মাস ট্রানজিটের জন্য ঢাকার সব জরাজীর্ণ বাস নিষিদ্ধ করে নতুন সিঙ্গল ডেকার বাস পর্যাপ্ত সংখ্যায় বিনা বিলম্বে আমদানি করতে হবে।

ভ্যাট আন্দোলনে ছাত্রদের সাফল্য
বাংলাদেশে ভ্যাট-এর জনক ছিলেন বিএনপির অর্থমন্ত্রী এম.সাইফুর রহমান। বহু বাধা সত্ত্বেও তিনি এই ট্যাক্স চালু করেছিলেন। এছাড়াও তিনি আরো কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার করেছিলেন। তার আমলে স্টক এক্সচেঞ্জ বিপর্যয় এবং ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউ, প্রভৃতির মতো এমএলএম কম্পানির গণপ্রতারণা হয়নি। তার মৃত্যুতে শেখ হাসিনা কোনো শোক প্রকাশ করেননি।
আওয়ামী সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মা’ল আবদুল মুহিত, বেসরকারি ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি-র ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেন। হাজার হাজার ছাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং রাজধানীতে উত্তরা, বনানী, ধানম-ি, পান্থপথ ও রামপুরাসহ অন্তত আটটি পয়েন্টে অবরোধ সৃষ্টি করে। অর্থমন্ত্রী তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। কিন্তু সেপ্টেম্বরে টানা ছয় দিনের আন্দোলনের পর এই ভ্যাট প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় আওয়ামী সরকার। আবুল মুহিতের এই দুর্গতি দেখে সম্ভবত পরলোক থেকে হেসেছেন তার পূর্বসুরি সাইফুর রহমান। শিক্ষা থেকে ভ্যাট উঠিয়ে কমপিউটারের ওপর ভ্যাট বসানোয় সেটা শিক্ষার্থীদের ওপর পরোক্ষভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে জানায় ছাত্রদল।
সেপ্টেম্বরেই শিক্ষা ক্ষেত্রে আরেকটি ঘটনা ঘটে। ১৮ সেপ্টেম্বরে দেশের মেডিকাল ও ডেন্টাল কলেজেগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা হয়। ওই পরীক্ষার পর প্রশ্নপত্র ফাসের অভিযোগে আন্দোলনে নামে ছাত্ররা। তারা বলে, ভর্তি পরীক্ষার আগের রাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশাল মিডিয়াতে প্রশ্নের যে অনুলিপি পাওয়া যায় তার সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের মিল ছিল।

ভিন্ন মতাবলম্বী হত্যা, বিদেশি হত্যা
সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত ও জঙ্গিবাদের উত্থান
চলতি বছরে চারজন ভিন্ন মতাবলম্বী ব্লগার খুন হন। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির বই মেলা থেকে ফেরার সময়ে আততায়ীর হামলায় নিহত হন আমেরিকা নিবাসী অভিজিৎ রায় ও গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদ। অভিজিৎ রায় বাংলাদেশে দ্বিতীয় ব্লগার যিনি ভিন্ন মত প্রকাশের জন্য খুন হন। এরপর মার্চে ওয়াশিকুর রহমান, মে-তে অনন্ত বিজয় দাস ও আগস্টে নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় খুন হন। অক্টোবরে অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশক দুটি সংস্থায় একযোগে হামলা হয়। জাগৃতি প্রকাশনার মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপন নিহত হন।

চলতি বছরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর প্রকাধিক হামলা হয়। ২৩ অক্টোবরে ঢাকায় শিয়া মতাবলম্বীদের পবিত্র দিন আশুরা উপলক্ষে একটি তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে ঘটনাস্থলে নিহত হয় একজন। আহত হয় অর্ধশতাধিক। পরের দিন হাজার হাজার শিয়া মতাবলম্বী তাজিয়া মিছিল করে যেখানে সুন্নিরাও যোগ দেয়। ২৬ নভেম্বরে বগুড়ায় শিবগঞ্জের শিয়াদের একটি মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর হামলাকারীদের গুলি চালনায় মুয়াজ্জিন হন নিহত এবং ইমামসহ তিনজন হন আহত। ৪ ডিসেম্বরে দিনাজপুরে কাহারোলে হিন্দুদের বিখ্যাত কান্তজি মন্দির প্রাঙ্গনে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এক মেলায় বোমা হামলা হয়। ১০ ডিসেম্বরে কাহারোলেই কৃষ্ণভক্ত হিন্দুদের আরেকটি মন্দিরে একযোগে বোমা ও গুলি হামলা হয়। ২৬ ডিসেম্বরে বাগমারা, রাজশাহীতে কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় একজন হামলাকারী নিহত হয় এবং আরেকজন পালিয়ে যায়।

বিদেশি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্থাপনার হামলাগুলোর দায় তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গি গোষ্ঠির নামে স্বীকার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আইএসসহ যে কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি অস্বীকার করেছে।

ভীতিকর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
সারা দেশে ভীতিকর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো স্পস্ট হয়ে ওঠে দুটি শিশুর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে। জুলাইতে সিলেটে শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যার দৃশ্য সোশাল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে মূল অভিযুক্ত কামরুল ইসলাম সৌদি আরবে পালালেও সেখানে ধরা পড়ে এবং বাংলাদেশে তার বিচার ও মৃত্যুদণ্ড হয়। আগস্টে খুলনায় শিশু রাকিবের মলদ্বারে মোটরগাড়ির চাকাতে হাওয়া দেয়ার নল ঢুকিয়ে বাতাস পাম্প করে তাকে হত্যা করা হয়। এক্ষেত্রেও আদালত দ্রুত বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়।

কৃকেটে উন্নতি ফুটবলে অবনতি
এই বছরে কৃকেটে বাংলাদেশের আরো উন্নতি হয়েছে। রিলায়ান্স আইসিসি ওডিআই র‌্যাংকিংসে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে উঠেছে। অতীতে কৃকেটের দুই পরাশক্তি পাকিস্তান থেকেছে অষ্টম এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকেছে নবম স্থানে। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ও ইনডিয়া দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
কিন্তু ফুটবলে বাংলাদেশের শোচনীয় অবনতি হয়েছে। ডিসেম্বরে সাফ ফুটবলে টানা পাচবারের মতো ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। আর ২০১৮-তে রাশিয়ায় যখন ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল হবে, যখন বাংলাদেশের সবার চোখ টিভির দিকে আটকে থাকবে তখন বাংলাদেশ কোথায় থাকবে সেই প্রশ্নটির মীমাংসা হয়ে গিয়েছে এই বছরে। জুন থেকে নভেম্বরে অনুষ্ঠিত কোয়ালিফাইং রাউন্ডে বাংলাদেশ হেরেছে কিরগিস্তানের কাছে (দুইবার), অস্ট্রেলিয়ার কাছে (দুইবার), জর্ডানের কাছে (একবার), তাজিকিস্তানের কাছে (একবার। আরেকটি খেলা ড্র করেছে)। বাকি রয়েছে নতুন বছরে মার্চে জর্ডানের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচ। অর্থাৎ, ২০১৫-তে বাংলাদেশ নাস্তানাবুদ হয়েছে চারটি দেশের কাছে যাদের সম্মিলিত জনসংখ্যা বাংলাদেশের চাইতে কম এবং বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৮ থেকে এ বছরেই বিদায় নিয়েছে। বাংলাদেশ আবারও ফুটবল টিভি দর্শকের দেশ হয়েছে।

যারা চলে গেলেন
এ বছরে যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে ছিলেন লন্ডনে বিবিসি খ্যাত কলাম লেখক সিরাজুর রহমান, ঢাকায় রাজনৈতিক নেতা কাজী জাফর আহমদ এবং কুয়ালালামপুরে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় ছেলে অরাজনৈতিক ব্যক্তি আরাফাত রহমান (কোকো)। ১৪ জানুয়ারিতে কোকোর অকালমৃত্যুর পর তার মরদেহ ঢাকায় আসে। সেই সময়ে খালেদা তার গুলশান অফিসে অবরুদ্ধ ছিলেন। কোকোর মরদেহ সেই অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কোকোর জানাজায় ঢাকায় তিন লক্ষেরও বেশি মানুষ শোক প্রকাশে সমবেত হয়। একই সময়ে সারা দেশ জুড়ে আন্দোলনরত মানুষ বিভিন্ন শহর ও গ্রামে অসংখ্য জানাজায় যোগ দেয়। কোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তির মৃত্যুর পর এত বড় এবং দেশ জুড়ে এত জানাজা বাংলাদেশে আর হয়নি। খালেদার প্রতি সহানুভূতিশীল এত মানুষের জানাজায় উপস্থিতি আওয়ামী সরকারকে গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল।
চলতি বছরে আরো যারা বিদায় নিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী, মুভি ডিরেক্টর চাষী নজরুল ইসলাম, ফটো জার্নালিস্ট মীর মহিউদ্দিন, অভিনেতা সিরাজুল ইসলাম, বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন পিন্টু (জেলে বন্দী থাকা অবস্থায়), ভাস্কর নভেরা আহমেদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হাসানউজ্জামান খান, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দাবাগুরু এ আর খান, প্রবীণ সাংবাদিক হাবিবুর রহমান মিলন, কৌতুক অভিনেতা পাপ্পু, প্রাণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিটায়ার্ড মেজর জেনারেল আমজাদ খান চৌধুরী, কণ্ঠশিল্পী ফরিদা ইয়াসমীন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী, গীতিকার নয়ীম গহর, বিচারপতি হাবিবুর রহমান খান, সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল ফারুক, পটচিত্রশিল্পী রঘুনাথ চক্রবর্তী, শব্দ সৈনিক রাশিদুল হাসান ও পাকিস্তান আমলে সাইক্লিং চ্যাম্পিয়ন আজিজ আহমেদ।

ছলে বলে কলেকৌশলে ক্ষমতায়
এই রচনাটি লেখার সময় দেশ জুড়ে যে পৌরসভা নির্বাচনগুলো হচ্ছে তাতে পরিস্ফুট হয়েছে বিরোধী ভোটাররা ভোট প্রয়োগে প্রচন্ড ভীত। সরকারি নির্যাতনের ভয়ে তারা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে চিহ্নিত হতে চান না।
২০১৫ জুড়ে বাংলাদেশে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করেছে। সবাই জানে প্রতিবেশি দেশের সমর্থনে একটি অনির্বাচিত সরকার দেশে ছলে বলে কলেকৌশলে ক্ষমতায় আছে।
টেলিভিশনে মন্ত্রীসভার বৈঠকের ছবি সম্প্রচারিত হলেও প্রকৃত সত্যটা হচ্ছে বাংলাদেশ বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশ থেকে প্রথমে একদলীয় এবং এখন এক ব্যক্তির শাসনের যুগে প্রবেশ করেছে। এর যৌক্তিকতাস্বরূপ গণতন্ত্রের বদলে এখন খোলাখুলিভাবে উন্নয়নের কথা তারস্বরে বলা হচ্ছে। কিন্তু একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ সাধারণ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ঝুলেই থাকবে। আর তার কুফল বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পকে বহন করতে হবে।

৩০ ডিসেম্বর ২০১৫

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.