আমেরিকার নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প টর্নেডো

শফিক রেহমান

ডোনাল্ড ট্রাম্প : ইমিগ্রান্ট ও মুসলিম বিদ্বেষী

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে বারাক ওবামা প্রথম নির্বাচিত হয়েছিলেন নভেম্বর ২০০৮-এ। ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন জানুয়ারি ২০০৯-এ। চার বছর পর ওবামা পুনঃনির্বাচিত হয়েছিলেন নভেম্বর ২০১২-তে। ক্ষমতা নবায়ন করেছিলেন জানুয়ারি ২০১৩-তে।

আমেরিকান সংবিধান অনুযায়ী ঠিক একই ধারায় চার বছর পর পরবর্তী প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী নভেম্বর ২০১৬-তে এবং নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণ করবেন জানুয়ারি ২০১৭-তে। আমেরিকার সিসটেমে নির্বাচন এবং ক্ষমতা গ্রহণের এসব দিনক্ষণ আগেই স্থির করা আছে। সেখানে ক্ষমতাসীন সরকারের নির্দেশে অথবা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চাপে কোনো মেরুদণ্ডবিহীন নির্বাচন কমিশনের কোনো সুযোগ নেই এসব পূর্বনির্ধারিত দিনক্ষণ নড়চড় করার। আরো বড় কথা, আমেরিকান সংবিধান মোতাবেক ওবামা তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। তাকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতেই হবে। সুতরাং আগামী বছরে নভেম্বরে হবেন আমেরিকার এক নতুন প্রেসিডেন্ট।
এই মুহূর্তে প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কে হবেন? ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট দলের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন মনোনয়ন প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন? অথবা বিরোধী রিপাবলিকান দলের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে মনোনয়ন প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প?

তিনি যে-ই হোন না কেন, এই মুহূর্তে উভয় দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝড় তুলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে প্রায় প্রতিদিনই ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব মন্তব্য করছেন সে সবের প্রতিক্রিয়া আমেরিকা তথা বিশ্ব জুড়ে হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প গোটা আমেরিকাকে বিভক্ত করে দিচ্ছেন। তাই শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকান পার্টি তাকে নমিনেশন না-ও দিতে পারে যদিও তার পার্টির মধ্যে জনপ্রিয়তার দৌড়ে তিনি অনেক এগিয়ে আছেন। সর্বশেষ জনমত জরিপের মতে ৪১% রিপাবলিকান ভোটার চায় তাদের পার্টি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নমিনেশন দেয়া হোক। অন্য দিকে অন্য রিপাবলিকানরা বলছেন, পার্টির নমিনেশন যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া এক কথা, আর প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনী যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া আরেক কথা। এই অংশটি মনে করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার পার্টির নমিনেশন পান এবং প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনী যুদ্ধে যান, তাহলে তিনি পরাজিত হবেন, কারণ শেষ পর্যন্ত আমেরিকান ভোটাররা একটি ঐক্যবদ্ধ আমেরিকাই চাইবে।

ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান : Make America Great Again

বিশ্লেষকদের ধারণা ট্রাম্প তার ক্যাম্পেইনে যে দুটি ইসু সামনে নিয়ে এসেছেন সে দুটিই আমেরিকান ভোটারকে তার প্রতি বিমুখ করবে। এই দুটি ইসু হচ্ছে এক. ইমিগ্রান্টদের এবং দুই. মুসলিমদের প্রতি ট্রাম্পের প্রচণ্ড বিদ্বেষ ও বিরোধিতা।

ইমিগ্রান্ট বিরোধী
১৬ জুন ২০১৫-তে ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থিতা ঘোষণা করেন। এই দিন তিনি তার নির্বাচনী স্লোগান প্রকাশ করেন। তার স্লোগান হলো মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (Make America Great Again)। অর্থাৎ, আমেরিকাকে আবার মহান করুন। এই স্লোগানের পক্ষে ট্রাম্প বলেন, আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছে এবং নিচু মানের দেশ হয়ে গিয়েছে। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো থেকে আগত ইমিগ্রান্টরা।
ট্রাম্প বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ক্ষমতার প্রথম দিনই আমেরিকায় অবৈধ ইমিগ্রান্টদের দ্রুত বের করে দেয়ার জন্য কাজ করবো। মেক্সিকান ইমিগ্রান্টরা আমেরিকায় ড্রাগস চোরাচালান করে, তারা বিভিন্ন অপরাধ করে, ধর্ষণ করে। ভালো মানুষ মেক্সিকো থেকে আসে না। যারা আসে তারা আনে হাজার সমস্যা।
এই ঢালাও অভিযোগের পর ট্রাম্প বলেন, এটা বন্ধ করতেই হবে। সেটার জন্য আমি একটা গ্রেট ওয়াল বানাবো। আমার চাইতে ভালো ওয়াল কেউ বানাতে আরে না। বিশ্বাস করুন, আমি খুব শস্তায় এই ওয়াল বানাবো। আমাদের দেশের দক্ষিণ সীমান্তে একটা গ্রেট, গ্রেট ওয়াল বানাবো এবং এই ওয়াল বানানোর খরচ মেক্সিকানদের দিতে বাধ্য করবো।
ট্রাম্প অবশ্য চায়নার গ্রেট ওয়াল বা চায়নার দেয়ালের সাথে তার স্বপ্নের এই আমেরিকার দেয়ালের তুলনা করেননি। তবে রসিক ব্যক্তিরা বলেন, ট্রাম্পের ‘গ্রেট, গ্রেট ওয়াল’ যদি হয়, তাহলে সেটি চায়নার গ্রেট ওয়ালের তুলনায় হবে ভেরি স্মল ওয়াল বা খুব ছোট দেয়াল।

নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের প্রথম দিনেই মেক্সিকানদের বিরুদ্ধে এমন বিষোদগারের ফলে মেক্সিকোতে এবং আমেরিকাতেও প্রতিবাদের টর্নেডো ওঠে। ট্রাম্প সুন্দরী নারীসঙ্গ পছন্দ করেন। তিনি এ পর্যন্ত তিনটি বিয়ে করেছেন। তার প্রথম স্ত্রী আইভানকা ছিলেন চেক ইমিগ্রান্ট। দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়া মোলেস ছিলেন অভিনেত্রী। তার তৃতীয় ও বর্তমান স্ত্রী ফ্যাশন মডেল মেলানিয়া লস একজন স্লোভেনিয়ান ইমিগ্রান্ট। ট্রাম্পের সন্তান সংখ্যা পাচ।
সহজাতভাবেই ট্রাম্প মিস ইউনিভার্স সুন্দরী প্রতিযোগিতা এবং মিস ইউএসএ সুন্দরী প্রতিযোগিতার বর্তমান আয়োজক। কিন্তু ট্রাম্পের মেক্সিকানবিরোধী উক্তির পরপরই মেক্সিকোর গ্রুপো টেলিভিশন এবং ওরা টিভি নামে দুটি টেলিভিশন চ্যানেল ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এই দুটি চ্যানেলে ওই দুটি সুন্দরী প্রতিযোগিতা দেখানোর কথা ছিল। একই সাথে আমেরিকার ইউনিভিশনও জানায়, তার ট্রাম্প আয়োজিত মিস ইউএসএ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে না। এই ঘোষণার পরপরই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি ইউনিভিশনের বিরুদ্ধে ৫০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করবেন। অন্য দিকে আমেরিকার বিখ্যাত শপিং চেইন মেসিজ (Macy's) ঘোষণা করেছে তারা ট্রাম্পের বিভিন্ন পণ্য ক্রমেই তাদের দোকানগুলো থেকে সরিয়ে ফেলবে।

ট্রাম্প টাওয়ার

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবন
মজার কথা এই যে ট্রাম্প ইমিগ্রান্ট বিরোধী হলেও রয়টার্সের মতে ট্রাম্পের বিভিন্ন কম্পানি গত ২০০০ সাল থেকে ১,১০০ বিদেশী শ্রমিক আমদানির জন্য আবেদন করেছে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবনে তার দুই স্ত্রী ইমিগ্রান্ট। ট্রাম্পের পূর্বপুরুষরাও ছিলেন ইমিগ্রান্ট। তার দাদা-দাদী ছিলেন জার্মান ইমিগ্রান্ট এবং মা ছিলেন স্কটল্যান্ড থেকে আগত ইমিগ্রান্ট। ট্রাম্প তার জার্মান কানেকশন আগে চেপে গিয়ে বলতেন তার দাদা-দাদী ছিলেন সুইডিশ ইমিগ্রান্ট। পরে তিনি সত্যটা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। নিয়তির পরিহাস এই যে, এখন ট্রাম্পকে আমেরিকান হিটলার টাইটেল দিয়েছে তার কিছু সমালোচক।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুরো নাম ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। তার জন্ম হয়েছিল নিউ ইয়র্ক সিটির কুইন্স এলাকায় ১৪ জুন ১৯৪৬-এ। তার পিতা ছিলেন নিউ ইয়র্কের প্রপার্টি ব্যবসায়ী। পেনসেলভেনিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সময় থেকে তিনি তার পিতার ব্যবসায়ে কাজ করতে থাকেন। রিয়াল এস্টেট বিজনেসে পড়াশোনা শেষে ট্রাম্প ইকনমিক্সে গ্র্যাজুয়েট হন। অভিযোগ আছে, যৌবনে মিলিটারি ট্রেনিং নিলেও ট্রাম্প দুই পায়ে প্রতিবন্ধকতার অজুহাতে আমেরিকার পক্ষে ভিয়েতনামে যুদ্ধ করতে যাননি। ট্রাম্প তার পিতার ব্যবসায়ে যোগ দেন এবং বিভিন্ন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে বিশাল সাফল্য অর্জন করতে থাকেন। যেমন, নিউ ইয়র্কের পুরনো পেন সেন্ট্রাল স্টেশনকে আধুনিক করা এবং এই শহরের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কমোডর হোটেলকে আধুনিক গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে রূপান্তরিত করা।
এছাড়া তিনি ২০০১-এ নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ ভবনের কাছে ৭২ তলা বিশিষ্ট ট্রাম্প ওয়ার্ল্ড টাওয়ার বানানোর কাজ শেষ করেন। এর পরে তিনি নিউ ইয়র্কে হাডসন নদীর তীরে বিশাল জায়গা জুড়ে হোটেল, কনভেনশন সেন্টার, কনডোমিনিয়াম ইত্যাদি নির্মাণ করেন এবং এলাকাটির নাম দেন : ট্রাম্প প্লেস। এখন নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে দামি এলাকা ম্যানহাটানে শীর্ষ প্রপার্টি মালিকদের অন্যতম ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৫-তে ট্রাম্পের ধন-সম্পত্তির নেট পরিমাণ ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার এবং তার বার্ষিক বেতন ছিল সাড়ে ২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ, দুই কোটি ডলারেরও বেশি ছিল তার মাসিক বেতন।
রাজনৈতিকভাবে তিনি আগে ছিলেন ডেমোক্র্যাটপন্থী। এখন রিপাবলিকানপন্থী এবং নভেম্বর ২০১৬’র আমেরিকান প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রার্থী।
ব্যবসায়িকভাবে ট্রাম্প সফল হলেও তিনি খুবই বিতর্কিত ব্যক্তি। বিভিন্ন ক্রাইম সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার যোগাযোগের অভিযোগ আছে। তার বহু কম্পানি ফেল করে অথবা দেউলিয়া হয়ে যায়, যাদের মধ্যে আছে আটলান্টিক সিটিতে ক্যাসিনো, ট্রাম্প তাজমহল, ট্রাম্প প্লাজা হোটেল, ইত্যাদি। সমালোচনা করা হয় বিভিন্ন কম্পানির নামে টাকা তুলে তিনি পরবর্তী সময়ে স্বেচ্ছায় এ সব দেউলিয়া ঘোষণা করে ব্যক্তিগত খাতে টাকা সরিয়ে নিয়েছেন। এর উত্তরে ট্রাম্প বলেন, আমি দেশের প্রচলিত আইনের সুযোগ নিয়েছি। এটা ব্যবসা। অন্য ব্যবসায়ীরাও এটা করেন।
বিভিন্ন ব্যবসায়ে দেউলিয়াত্বের কারণে এবং আইনের মারপ্যাচে লোক ঠকানোর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে পুজি বিনিয়োগকারীরা শত শত মামলা করেছেন। সেসব মামলা এখনো চলছে।
ধর্মীয়ভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রটেস্টান্ট কৃশ্চিয়ান। কিন্তু তিনি বলেন, তার এক কন্যা ইহুদি এবং তার কয়েকজন ইহুদি নাতি-নাতনী আছে।
ট্রাম্প বলেন, তার সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়টি তারই লেখা দি আর্ট অফ দি ডিল (The Art of the Deal), অর্থাৎ কিভাবে ব্যবসা করতে হয়। তিনি বলেন, তার সবচেয়ে প্রিয় বইটি হচ্ছে বাইবেল। তবে বাইবেলের কোন লাইনটি তার সবচেয়ে প্রিয় সেটা তিনি বলতে রাজি হননি। কেউ কেউ বলেন, তিনি আসলে বাইবেলও পড়েননি।

মুসলিম বিরোধী

ইমিগ্রেশন বিতর্কটি যখন ট্রাম্প শুরু করেন তখন তার মনে মুসলিম ইসুটা আসেনি। এটা আসে ২ ডিসেম্বর ২০১৫-তে ক্যালিফোর্নিয়ায় সান বারনারডিনো শহরে একটি উৎসবে মুসলিম দম্পতি, সৈয়দ রিজওয়ান ফারুক ও তাশফিন মালিকের অতর্কিত বন্দুক হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ২২ জন আহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাটির পর। ফারুকের জন্ম হয়েছিল আমেরিকায় একটি পাকিস্তানি বংশে। তার স্ত্রী তাশফিনের জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানে এবং তিনি ছিলেন আমেরিকান রেসিডেন্ট। তাদের ছয় মাস বয়সী শিশুকন্যাকে ফারুকের মা’র কাছে রেখে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে গুলি চালান এবং নিজেরাও পাল্টা গুলিতে নিহত হন।
এই দুর্ঘটনার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় ইসুটা আমেরিকানদের সামনে তুলে ধরেন। একটি লিখিত ভাষণ তিনি টিভিতে পড়ে শোনান, যার প্রথমেই ছিল নিচের লাইনগুলো :

আমি ডোনাল্ড জন ট্রাম্প আহ্বান জানাচ্ছি।
আমেরিকায় মুসলিমদের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে।
যত দিন না এ দেশের জনপ্রতিনিধিরা বুঝতে পারছেন, ওরা করছেটা কী?
আমাদের এর কোনো বিকল্প নেই।

একটি রিসার্চে দেখা গেছে, আমেরিকার প্রতি অধিকাংশ মুসলিমের চরম ঘৃণা রয়েছে।
শুধু তা-ই নয়। ট্রাম্প আরো বলেছেন, জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক হওয়ার বিধানটি তুলে দিতে হবে। এর ফলে আমেরিকায় কোনো মুসলিম ইমিগ্রান্ট বা মুসলিম টুরিস্টের আমেরিকায় জন্ম হওয়া সন্তানের আমেরিকান নাগরিকত্ব আর না-ও পেতে পারেন।
ট্রাম্পের মুসলিম বিরোধী উক্তির পর সমালোচনার দ্বিতীয় টর্নেডো বয়ে যেতে থাকে আমেরিকা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত মুসলিম দেশে। অবশ্য সাম্প্রতিককালে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে অতি উৎসাহী মিডিয়া অথবা সুশীলসমাজে কোনো প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। যদিও এই বিশেষ গোষ্ঠির প্রিয় নেত্রীর পুত্রসন্তান আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং তার সেখানে থাকাটা ভবিষ্যতে ঝুকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে- জন্মসূত্রে তিনি মুসলিম বলে তাকে আমেরিকায় আর ঢুকতে না-ও দেয়া হতে পারে।
কন্ট্রাক্ট বৃজ খেলায় একজন তাশ প্লেয়ার কোনো ‘কল’ না দিয়ে ‘পাস’ দিয়ে যেতে পারেন। খেলা চলাকালে কোনো প্লেয়ার ট্রাম্প করলে তাকে আরেক প্লেয়ার ওভারট্রাম্প করতে পারে। ট্রাম্পের ইমিগ্রান্ট ও মুসলিম কলে বাংলাদেশ পাস দিয়ে গেলেও, সারা বিশ্ব জুড়ে এখন তোলপাড় হচ্ছে। ট্রাম্প এখন ওভারট্রাম্পড হচ্ছেন।
কানাডাতে ভ্যাংকুভার ও টরন্টো শহরে দাবি উঠেছে, সেখানে ট্রাম্পের নামধারী সব হোটেল ও ভবন থেকে ট্রাম্পের নাম সরিয়ে ফেলতে হবে। টরন্টো শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তাদের সিটি কাউন্সিলের একটি মূল নীতি হচ্ছে, ইউনিটি ইন ডাইভারসিটি। অর্থাৎ, বৈচিত্রের মধ্যে একতা। ট্রাম্পের এই উক্তি এই নীতির পরিপন্থী।
লন্ডনে লেবার পার্টি নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, ট্রাম্পের প্ল্যান হচ্ছে সাধারণ মানবিক বোধের চরম অবমাননা। বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালিস, উভয়েই ট্রাম্পের বক্তব্যের নিন্দাসূচক বিবৃতি দিয়েছেন। স্কটল্যান্ডে ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে জানানো হয়েছে। ইংল্যান্ডেও সেটা হতে পারে। ই-পিটিশন ওয়েবসাইট (e-petition website)-এ ট্রাম্পের মুসলিম বিরোধী প্ল্যানের সমালোচনা করে বৃটিশ সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে তাকে যেন বৃটেনে নিষিদ্ধ ব্যক্তি ঘোষণা করা হয়। বিবিসি জানিয়েছে, এই ধরনের কোনো আবেদনে যদি ১০০,০০০-র বেশি সই পড়ে তাহলে সেটা বৃটিশ পার্লামেন্টে আলোচিত হতে বাধ্য। ১১ ডিসেম্বর ২০১৫-র বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই আবেদনে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ৫০০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে।
ট্রাম্প বলেছিলেন, লন্ডনে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে মুসলিম টেররিস্টরা ঘাপটি মেরে আছে এবং সেখানে পুলিশরাও যেতে ভয় পায়।
এই উক্তির তীব্র সমালোচনা করেছে লন্ডনের মেট্রপলিটন পুলিশ। আর লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন বলেছেন, নিউ ইয়র্কে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে আমি যাবো না শুধুমাত্র একটি কারণে- সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প থাকতে পারেন!
সবচেয়ে মজার সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকাল পার্টিরই অন্যতম নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ভাই জেব বুশ। তিনি বলেছেন, আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে নেমেছেন বিল ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটনের চর হিসেবে গোটা রিপাবলিকান পার্টিকে তছনছ করে দিতে। জেব বুশ জানিয়েছেন, ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ বন্ধুত্ব আছে এবং ট্রাম্প আসলে চান হিলারিই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হন।

ইতিমধ্যে লন্ডনের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি বড় রচনা প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে লিস্ট দেয়া হয়েছে আমেরিকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান বিষয়ে। যেমন :

আমেরিকার স্বাধীনতায়
উত্তর আফৃকান আরব ইউসুফ বেন আলী ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ তে জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটনের অধীনে বৃটিশদের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধে লড়াই করেন। একটি মুসলিম প্রধান দেশ মরক্কো সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেয় স্বাধীন আমেরিকাকে।

আমেরিকার শহর নির্মাণে
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিম ইনজিনিয়ার ড. এফ আর খানের টিউবুলার থিওরিতে বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। তাকে বলা হয় স্ট্রাকচারাল ইনজিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন। আমেরিকার সব শহরের চেহারা বদলে যেতে থাকে। শিকাগোতে ড. এফ আর খানের সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমানে উইলিস টাওয়ার) ও হ্যানকক টাওয়ার বিশ্বের অন্যতম দুটি নান্দনিক স্কাইস্ক্র্যাপার। এমনকি নিউ ইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারও ড. খানের থিওরিতে নির্মিত হয়েছে!

আমেরিকান স্বপ্ন পূরণে
মুসলিম ব্যবসায়ী শহিদ খান, যিনি মাত্র এক ডলার বাইশ সেন্টে আমেরিকায় প্রথম কাজ শুরু করেন, তিনি বিশ্বের ৩৬০তম ধনী ব্যক্তি হন। লন্ডনের ফুলহ্যাম ফুটবল ক্লাবের মালিকও তিনি।

আমেরিকান চিকিৎসায়
ব্যথা নিবারণে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন পাকিস্তানে জন্ম হওয়া ড. আইয়ুব ওমাইয়া।

আমেরিকান আইসকৃমে
সিরিয়ান মুসিলম আর্নেস্ট হাউই আবিষ্কার করেন কোন (Cone) আইসকৃম।

আমেরিকান স্পোর্টসে
কিংবদন্তী মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীসহ আরো অনেকে।

আমেরিকান বিজ্ঞানে
১৯৯৯-এ আহমেদ জেউইল নোবেল প্রাইজ পান কেমিস্টৃতে।

আমেরিকান কমপিউটারে
খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি মুসলিম বংশোদ্ভূত সালমান খান ক্যালিফোর্নিয়াতে অনলাইনের মাধ্যমে যে কোচিং ক্লাস শুরু করেন তা বিশ্বে জনপ্রিয়।
ইউটিউবের তিন প্রতিষ্ঠাতার অন্যতম হচ্ছেন বাংলাদেশি মুসলিম বংশোদ্ভূত জার্মান-আমেরিকান জাবেদ করিম। ২৩ এপৃল ২০০৫-এ তিনিই প্রথম ভিডিও ‘মি অ্যাট দি জু’ Me at the Zoo আপলোড করেন।

ইমিগ্রান্টদের দেশ
আমেরিকা ইমিগ্রান্টদের দেশ। ১২ অক্টোবর ১৪৯২-এ আমেরিকা মহাদেশে গুয়ানাহালি দ্বীপে কৃস্টফার কলম্বাস তার পা ফেলার পর ইওরোপ থেকে দলে দলে ইওরোপিয়ান ইমিগ্রান্টরা আসতে থাকে। তারা উত্তর আমেরিকার অধিবাসী রেড ইনডিয়ানদের নির্বিচারে হত্যা করে নিজেদের বসতি স্থাপন করে। এরপর তাদের ক্ষেত খামারে কাজ করার জন্য সবল মানুষের দরকার হয়। তখন আমেরিকা ক্রীতদাস ব্যবসা শুরু করে। আফৃকা থেকে বন্দুকের ডগায় কালো নরনারী আমেরিকায় ধরে এনে তাদের আজীবন শ্রম দিতে বাধ্য করে। এরা ছিল অনিচ্ছুক আফৃকান ইমিগ্রান্ট। বিংশ শতাব্দীতে এশিয়ায় বিশেষত জাপান, ফিলিপিন্স, ইনডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে অনেক ইমিগ্রান্ট যায় আমেরিকাতে। মাঝখানে, ইওরোপে জার্মানদের হাতে ইহুদিরা নির্যাতিত হবার পর অনেক ইওরোপিয়ান ইহুদি ইমিগ্রান্ট যায় আমেরিকাতে। বলা যায়, সকল ধর্ম, বর্ণ ও জাতির সংমিশ্রণ ঘটেছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। তাই তারা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করে চলেছে। মাইক্রোসফট, গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক, অ্যাপল কমপিউটার ও আইফোন আমেরিকাতেই শুরু হয়েছে। আমেরিকার উদ্ভাবনী শক্তি হয়েছে অসাধারণ। অন্যান্য দেশে কমপিউটার থাকলেও এসব উদ্ভাবন তারা করতে পারেনি। অ্যাপলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও সিইও স্টিভ জবসের পিতা ছিলেন সিরিয়ান মুসলিম আবদুল ফাত্তাহ। তবে স্টিভ জবস কৃশ্চিয়ান পরিবেশে বড় হন এবং পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম অবলম্বী হন।

ট্রাম্পকে পরিহার করার পাচটি উপায়
আমেরিকায় মিজ সামান্থা গৃভস তার ব্লগে লিখেছেন, নিউ ইয়র্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এড়িয়ে চলার পাচটি উপায়। সেই উপায়গুলো কি?
এক. যে কোনো মেক্সিকান রেস্টুরেন্টে যাবেন। ট্রাম্প মেক্সিকানদের খুব গালমন্দ করেছেন। সুতরাং তিনি কখনই কোনো মেক্সিকান রেস্টুরেন্টে খেতে যাবেন না।
দুই. নিউ ইয়র্কে ব্রায়ান্ট পার্কে নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে আপনি যান। এখানে ট্রাম্প কখনই যাবেন না। কারণ, লাইব্রেরি থাকে নীরব। কিন্তু ট্রাম্প সব সময়ই সরব থাকতে চান।
তিন. এই ব্রায়ান্ট পার্কেই শীতকালে যে আইস রিংক হয় সেখানে আইস স্কোটিং করতে যাবেন। সেখানে ট্রাম্প কখনোই যাবেন না। কারণ, আইস স্কেটিং করতে গেলে প্রায়ই অনেকে পড়ে যান। ট্রাম্প পতন পছন্দ করেন না। সুতরাং তিনি আইস স্কোটিং করবেন না।
চার. সব শস্তা দোকানে যাবেন যেমন, বাফেলো এক্সচেঞ্জ, যেখানে প্রায়ই ডিসকাউন্টে জিনিসপত্র বিক্রি হয়। ট্রাম্প তার ধন-দৌলতের বড়াই করতে ভালোবাসেন। সুতরাং এসব দোকানে গিয়ে তিনি ধরা খেতে চাইবেন না।
পাচ. নিউ ইয়র্ক সিটিতে জাহাজ ঢোকার মুখে একটি দ্বীপে অবস্থিত স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যাবেন। এই মূর্তিটি এখন সারা বিশ্বে স্বাধীনতার প্রতীক তো বটেই, তা ছাড়া এই মূর্তির গায়ে খোদাই করা আছে আমেরিকান কবি এমা লাজারাসের কবিতা যেখানে ইমিগ্রান্টদের স্বাগত জানানো হয়েছে। ইমিগ্রান্ট বিদ্বেষী ট্রাম্প নিশ্চয়ই সেখানে যাবেন না।

এমা লাজারাসের সেই কবিতাটির একটি অংশের ভাষান্তর নিচে দেয়া হলো :

তোমার ক্লান্ত গরিব মানুষগুলোকে এনে দাও।
তারা জড়োসড়ো হয়ে আছে
তারা মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চায়।
নদীর তীরের আবর্জনার মতোই যারা নিরাশ্রয়,
যারা ঝড় বাদলে ভেসে বেড়াচ্ছে,
তাদেরকে আমার কাছে এনে দাও।
সোনালি ভবিষ্যতের পাশে,
আমি আমার বাতি তাদের জন্য তুলে ধরেছি।

বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দুর্ঘটনা ছাড়া আমেরিকাতে ইমিগ্রান্টরা শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করেছে এবং করছে। তাই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অশুভ চিন্তা বাস্তবায়িত হবে না। আমেরিকায় আগের ধারাতেই ইমিগ্রান্টদের জীবন চলবে। তবে, নতুন ইমিগ্রান্টদের সংখ্যা কমে যাবে।
ইতিমধ্যে সবাই আগ্রহভরে লক্ষ করবেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প পরবর্তী কোন ইসু সামনে নিয়ে আসেন।

১৭ ডিসেম্বর ২০১৫

বাংলাভিশন চ্যানেলে শফিক রেহমান উপস্থাপিত লাল গোলাপ অনুষ্ঠানে শনিবার ১৯ ডিসেম্বর রাত ১১-২৫ মিনিটে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ শীর্ষক পর্বটি টেলিকাস্ট হবে। এটি পুনঃসম্প্রচারিত হবে বাংলাভিশনে রবিবার সকাল ১০-১০-এ এবং আগামী ২৫ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুর ১২-১০-এ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.