ঢাকা, সোমবার,২২ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

রোমান্টিক সমাজকর্মী

শফিক রেহমান

০৩ ডিসেম্বর ২০১৫,বৃহস্পতিবার, ১৮:১৬


শফিক রেহমান

শফিক রেহমান

প্রিন্ট

সময়টা ছিল ১৯৪৬-এর প্রথম দিক।
আমার বয়স তখন ছিল এগারো।
আমরা থাকতাম কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় ৩৯ দিলখুশা স্টৃটে। পার্ক সার্কাস ছিল কলকাতার নতুনতম এবং কসমোপলিটান এরিয়া। বহু ধর্ম, জাতি ও বর্ণের মানুষ সেখানে থাকত। মুসলিম, হিন্দু, অ্যাংলো ইনডিয়ান কৃশ্চিয়ান, বার্মিজ, চায়নিজ, সব সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে ছিল। তবে প্রতাপ বেশি ছিল বৃটিশ সাহেবদের যারা তখন গোটা ইনডিয়া শাসন করছিল। কিন্তু ১৯৪৫-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পরে বৃটিশ শাসন শেষ হবার সীমান্তে ছিল।
তখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি ছিল মি. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে দাবি মুসলিম লীগ তুলেছিল, সেটা মোহনদাস করমচাদ গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস পার্টি মেনে নেবে কি না। কংগ্রেস চাইছিল বৃটিশরা যে একটি অখণ্ড ভারতের ম্যাপ তৈরি করেছিল সেটা ধরে রাখতে। মুসলিম লীগ বনাম কংগ্রেসের এই তীব্র বিরোধী অবস্থানের ফলে বৃটিশরা স্বদেশে ফিরে নিজেদের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে দ্রুত ফিরে যেতে পারছিল না। কলকাতা তথা পুরো ইনডিয়া তখন গভীর অনিশ্চয়তায় ছিল। আরেকটি প্রশ্ন তখন অনেকের মনে ছিল। হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে সুভাষ চন্দ্র বসু, যিনি মুসলিম ও শিখদের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে এবং জাপানিজদের সাহায্যে ইনডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (সংক্ষেপে আইএনএ) গড়েছিলেন এবং যে আর্মি ১৯৪৫-এ ইনডিয়ার পূর্বাঞ্চলে ইমফল পর্যন্ত চলে এসেছিল, সেই দুঃসাহসী নেতা ফরমোজায় একটি প্লেন ক্র্যাশে সত্যিই কি মারা গিয়েছিলেন?
১৯৪৫-এ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও পার্ক সার্কাসে সেই যুদ্ধের অনেক চিহ্ন তখনো ছিল। বিভিন্ন পার্কে কাটা ট্রেঞ্চ, গোলাগুলিতে বাড়ির কাচ ভেঙে যেন অধিবাসীরা হতাহত না হয় সেজন্য অনেক জানালার কাচে আঠা দিয়ে লাগানো খবরের কাগজের ফালি এবং কিছু দোকানে কর্নড বিফ (corned beef), ক্রাফট পনিরের টিন, ক্যাডবেরিজ ও নেসলের চকলেট প্রভৃতি। যুদ্ধে রেশনের অংশ হিসেবে এসব দেয়া হয়েছিল গোরা সৈন্যদের। তাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেবার পর বৃটিশ আর্মি এসব সাধারণ বাজারে বিক্রি করে দিয়েছিল এবং আমরা, বিশেষত ছোটরা, এসব মাংস, পনির ও চকলেট খেতে উন্মুখ থাকতাম।
সেই সময়ে একজন বৃটিশ মুভি ডিরেক্টর আলফ্রেড হিচককের নাম শুনেছিলাম। তিনি অবশ্য আগেই আমেরিকায় স্থায়ীভাবে থাকতে চলে গেয়েছিলেন। ১৯৪৫ ছিল তার এবং গোটা হলিউড মুভি ইনডাস্টৃর জন্য একটি স্মরণীয় বছর। সেই বছরে ২৮ ডিসেম্বর আমেরিকায় মুক্তি পেয়েছিল হিচককের সাইকোলজিক্যাল থৃলার স্পেলবাউন্ড (Spellbound)। বাংলায় যার মানে হতে পারে মন্ত্রমুগ্ধ। এই মুভিতে স্প্যানিশ সাররিয়াল আর্টিস্ট সালভাডর ডালি (Salvador Dali)’র সৃষ্ট একটি ডৃম সিকোয়েন্স ছিল। স্পেলবাউন্ডের নায়িকা ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে সুন্দরী অভিনেত্রী ইনগৃড বার্গম্যান এবং নায়ক ছিলেন সবচেয়ে সুদর্শন অভিনেতা গ্রেগরি পেক। ইনগৃড বার্গম্যান অভিনয় করেছিলেন একজন ডাক্তারের ভূমিকায় যিনি মনস্তত্ত্বে কৌতূহলী ছিলেন। স্মৃতিশক্তি আংশিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডাক্তারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন গ্রেগরি পেক।
দিলখুশা স্টৃট থেকে কিছু দূরে ছিল ঝাউতলা রোড, যদিও সেখানে কোনো ঝাউগাছ ছিল বলে মনে পড়ে না। ২৮ ঝাউতলা রোডে থাকতেন আমার বড় খালা মিসেস জোবেদা ফারুক। তার ডাক নাম ছিল জবা। তিনি খুব অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিলেন। ঝাউতলা রোডের সেই ছোট একতলা বাড়িতে প্রয়াত ম্যাজিস্ট্রেট ফারুকের ঔরসজাত দুই ছেলে, বেবি ও রুবিকে নিয়ে মিসেস ফারুক থাকতেন। জীবনযুদ্ধে খুব লড়াই করে তিনি গ্র্যাজুয়েট হবার পর টিচার্স ট্রেইনিংয়ে কোর্স করেছিলেন এবং সেই সময়ে স্কুল ইন্সপেকট্রেস হয়েছিলেন। তার এই বাড়িটি ছিল আমাদের পরিবারের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তাধারার অন্যতম বিকাশস্থল।
এই বাড়ির ছাদে প্রায় সন্ধ্যাতে লতু খালা দেশের সব খবর থেকে শুরু করে সদ্যদেখা মুভিগুলোর গল্প বলতেন। লতু খালা অর্থাৎ লতিফা খাতুন ছিলেন তার আট ভাইবোনের মধ্যে ষষ্ঠ। তার ডাক নাম ছিল লতু। আমি তাকে লতু খালা নামে ডাকতাম।
আমার নানা খান সাহেব আলহাজ ফজলুর রহমান খান ছিলেন ডাক্তার এবং ইনডিয়ার পূর্বাঞ্চলের মুসলিমদের মধ্যে প্রথম সিভিল সার্জন। ১৯১১তে বৃটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লিতে যে দরবার করেছিলেন তাতে তিনি আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি খুব বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। শেষ কন্যাসন্তান বাদে আর সবাইকে তিনি উচ্চশিক্ষিত করতে পেরেছিলেন। তার ষষ্ঠ সন্তান লতিফা খাতুন ১৯৪৬-এ ছিলেন কলকাতার লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে ইতিহাসের ছাত্রী।


তাই তিনি ইতিহাসের প্রশ্নের উত্তরগুলো সহজে দিতে পারতেন। ঝাউতলা রোডের সেই বাড়ির ছাদে রাতে পাটি বিছিয়ে আমরা বসতাম। তারা ভরা আকাশের নিচে আমার কিশোরমনের প্রশ্নগুলোর উত্তর তিনি দিতেন খুব ধৈর্যের সাথে।
কেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল?
রাশিয়া বাদে গোটা কনটিনেন্টাল ইওরোপে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও কেন জার্মানি সেই যুদ্ধে হেরে গিয়েছিল?
এশিয়া-প্যাসিফিকে জার্মানির মিত্রশক্তি জাপান তদানীন্তন বৃটিশ উপনিবেশ ইনডিয়ার দোরগোড়ায় পৌছে যাওয়া সত্ত্বেও কেন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল?
এটম বোমা কী এবং কেন বৃটেনের মিত্রশক্তি আমেরিকা দুটো এটম বোমা ফেলেছিল হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে?
কেন সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেস পার্টি ছেড়ে সামরিক বাহিনী গঠন করেছিলেন?
কেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কংগ্রেস ছেড়ে দিয়ে মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন?
গান্ধী-নেহরুর সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতাই কি এই দুজনের ভিন্নমতাবলম্বী হয়ে যাবার কারণ ছিল?
স্পেলবাউন্ড ছাড়া হিচককের অন্য মুভিগুলো কী?
সালভাডর ডালি-র সাররিয়ালিজম কী?
আমার এসব প্রশ্নের আংশিক অথবা পূর্ণ উত্তর দিতেন লতু খালা।
স্পেলবাউন্ড হয়ে শুনতাম।
মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ভাবতাম একদিন আমিও যদি তার মতো ভালো কথক হতে পারতাম!
পরবর্তী সময়ে আমি যে একনিষ্ঠ মুভি দর্শক ও মুভি সংগ্রাহক এবং লাল গোলাপসহ বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানের কথক ও উপস্থাপক হতে পেরেছি তার মূলে আছে লতু খালার বিরাট অবদান।
লতিফা খাতুনের জন্ম হয়েছিল নেত্রকোনায় ১ নভেম্বর ১৯২৫-এ। পিতা ফজলুর রহমান খান যিনি ডা. এফ আর খান নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তখন তিনি নেত্রকোনায় পোস্টেড ছিলেন। মা হাসিনা খাতুন ছিলেন ঢাকার নবাবগঞ্জের জাদরেল জমিদার ধলা মিয়ার একমাত্র কন্যাসন্তান। ফজলুর রহমান খানের আদি নিবাস ছিল টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার জাঙ্গালিয়া গ্রামে। তাই রিটায়ার করার পর ফজলুর রহমান খান টাঙ্গাইল শহরে বসবাস করেন। টাঙ্গাইলে তার বানানো দোতলা বাড়ি ‘খান মনজিল’ আজো আছে।
লতিফা খাতুনকে তিনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতায় বড় মেয়ে জোবেদার কাছে। সেখানে সাখাওয়াত মেমরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে ১৯৪০-এ ম্যাটৃক পরীক্ষা পাসের পর লতিফা ভর্তি হন বিখ্যাত লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে (Lady Brabourne College, সংক্ষেপে যেটি LBC বা এলবিসি নামে পরিচিত)।
সেই সময়ে এটি ছিল কলকাতায় নবনির্মিত, আধুনিক ও মুসলিম নারীদের জন্য প্রথম কলেজ। কলেজটির নামকরণ হয়েছিল লেডি ব্র্যাবোর্ন-এর নামে যিনি ছিলেন বাংলার গভর্নর পঞ্চম ব্যারন ব্র্যাবোর্ন লর্ড মাইকেল ন্যাচবুল (Lord Michael Knatchbull, 5th Baron Brabourne)-এর স্ত্রী। ব্যারন ব্র্যাবোর্ন ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ পর্যন্ত বাংলার গভর্নর ছিলেন। আগস্ট ১৯৩৯তে এই কলেজ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন স্যার জে উডহেড (Sir J Woodhead) এবং লেডি ব্র্যাবোর্নের নামটি তিনি দিয়েছিলেন।
লেডি ব্র্যাবোর্ন বাংলায় পশ্চাদপদ মুসলিম নারীদের দুর্গতি দেখে ব্যথিত হয়েছিলেন। মুসলিমদের প্রতি প্রচলিত বিদ্বেষ, তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষা দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে যেন তারা সাখাওয়াত মেমরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাটৃক পরীক্ষা (এখন যাকে এসএসসি বলা হয়) পাস করার পর কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারে। কলকাতায় বেথুন কলেজ (Bethune College) ছিল ইনডিয়ায় নারীদের প্রথম কলেজ। কিন্তু সেখানে কোনো মুসলিম নারী ভর্তি হওয়া সম্ভব ছিল না। লেডি ব্র্যাবোর্ন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের সমতা আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তারই প্রেরণায় মাত্র ৩৫ জন মুসলিম ছাত্রী নিয়ে লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ যাত্রা শুরু করে। প্রথমে সেখানে মাত্র নয়টি বিষয়ে পড়ানো হতো যার অন্যতম ছিল ইতিহাস। লতিফা ছিলেন এই কলেজের প্রথম ব্যাচগুলোর ছাত্রী। ব্র্যাবোর্ন কলেজ থেকে ১৯৪২-এ তিনি আইএ (এখনকার এইচএসসি) এবং ১৯৪৪-এ বিএ পাস করেন। তারপর ১৯৪৭-এ কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ পাস করেন।
লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে আজকের প্রজন্ম বুঝতে পারবে সেই সময়ে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মতো শিক্ষা ক্ষেত্রেও মুসলিমরা কেমন ঘোর বৈষম্যের শিকার হতো। যার পরিণতিতে ইনডিয়া ১৯৪৭-এ হয় বিভক্ত এবং জন্ম হয় পাকিস্তানের এবং যার পরিণতিতে ১৯৭১-এ জন্ম হয় বাংলাদেশের। আজ যখন এইচএসসির রেজাল্ট প্রকাশিত হবার পর ইডেন কলেজ থেকে শুরু করে ভিকারুননিসা কলেজের ছাত্রীদের উল্লাসমুখর ছবিগুলো পত্রিকায় প্রকাশিত এবং টিভিতে প্রদর্শিত হয় তখন সবার মনে রাখতে হবে মাত্র ৭৬ বছর আগে বাংলাদেশের মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ ছিল। এই দরজা যেন আবার বন্ধ না হয়ে যায় সেই কারণে বেগম রোকেয়া-লেডি ব্র্যাবোর্নের অবদান প্রচার করতে হবে এবং এই কষ্টার্জিত সুবিধা ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে।
লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে অবশ্য এখন সকল ধর্ম ও জাতির ছাত্রীরা পড়াশোনা করতে পারে। ১৯৯৯-এ কলেজটির ডায়মন্ড জুবিলি উপলক্ষে অনুষ্ঠান হয় এবং এটি এখন পশ্চিম বাংলার অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
১৯৪৭-এ ইনডিয়া বিভক্তির পর ১৯৪৮-এ লতিফা ও তার স্বামী জামিনউদ্দীন আকন্দ পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকায় চলে আসেন। জামিনউদ্দীন ছিলেন বগুড়ার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। তাদের বিয়ের সময়ে আমি গিয়েছিলাম বগুড়ায়। সেই সময়ে ওই পরিবার পালিত হাতির পিঠে চড়ার প্রথম (এবং শেষ) অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। জামিনউদ্দীন শিক্ষিত হয়েছিলেন কেমিস্টৃতে আলিগড় ইউনিভার্সিটি থেকে। পূর্ব পাকিস্তানে তিনি স্টিল অ্যান্ড ইনজিনিয়ারিং কর্পরেশনে চাকরি করতেন। লতিফা চাকরি শুরু করেছিলেন ইডেন গার্লস কলেজে।
এর কিছুকাল পরে লতিফা লন্ডনে পড়াশোনার স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। কিন্তু লন্ডন যাত্রার আগের রাতে স্বামীর বিষণ্ন চেহারা দেখে তিনি বিলেত যাত্রা বাতিল করে দেন। শুনেছিলাম সারা রাত স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে খুব কেদেছিলেন। তারা তখন থাকতেন একটি মাটির দেয়াল ও টিনের ছাদের বাড়িতে পুরানা পল্টনে, পরবর্তীকালে যেটি চারতলার ইট-সিমেন্টের ভবন হয়। আমি সেই সময়ে ঢাকা কলেজে পড়ছিলাম এবং লন্ডন যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। অবাক হয়েছিলাম স্বামীর প্রতি লতু খালার এই অসাধারণ প্রেম ও ভালোবাসা দেখে। বিলেতে যাওয়ার সুযোগ এভাবে তিনি হারালেন? লতু খালা ছিলেন খুবই রোমান্টিক মনের অধিকারী। তাই তিনি গ্রেগরি পেকের প্রতি ইনগৃড বার্গম্যানের প্রেমকাহিনী আবেগী ভাষায় শোনাতে পারতেন।
লতু খালার প্রেম দেখে হয়তো বিধাতাও বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি বেশি দেরি না করে আবারও তাকে একটি স্কলারশিপ দেন। এবার লন্ডনে ১৯৫৩-তে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চলে যান এবং দুজনই লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। তারা তাদের প্রথম পুত্রসন্তান স্বপনকে সাথে নিয়ে যান। পেছনে মার কাছে রেখে যান কন্যাসন্তান স্বাতীকে, কারণ সে ছিল খুবই ছোট। আকন্দ দম্পতি পশ্চিম লন্ডনে ল্যাডব্রোক গ্রোভ-এ ১৮৮ ল্যাংকাস্টার রোডের দোতলায় একটি ফ্ল্যাটে ওঠেন। কয়েক মাস পরে স্বাতীকে লন্ডনে নিয়ে আসা হয়। এই বাড়ির তেতলার ফ্ল্যাটে আমি ও আমার স্ত্রী তালেয়া বছর চারেক ছিলাম লত ুখালা ও জামিন খালুর সান্নিধ্যে।
১৯৫৫-তে লন্ডন ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফৃকান স্টাডিজ (সংক্ষেপে SOAS, সোয়াস) থেকে মডার্ন ইনডিয়ান হিস্টৃতে এমএ ডিগৃ অর্জনের পর লতু খালা পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যান। ১৯৬২-তে তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে যোগ দেন এবং দীর্ঘ পচিশ বছর সেখানে অধ্যাপনা করেন। এই সময়ে তিনি সোশাল হিস্টৃ অফ মডার্ন বেঙ্গল (Social History of Modern Bengal, আধুনিক বাংলার সামাজিক ইতিহাস) এবং উইমেন অ্যান্ড ভায়োলেন্স (Women and Violence, নারী ও সহিংসতা) নামে দুটি বই লেখেন।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে রিটায়ার করার পরে তিনি সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটিতে হিস্টৃ অফ দি মুসলিম ওয়ার্ল্ড বিভাগের অবৈতনিক প্রধান হিসেবে কিছু দিন কাজ করেন। তিনি পুরানা পল্টন উইমেন্স কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-পৃন্সিপাল ছিলেন।
ক্রমেই লতিফা আকন্দ জড়িয়ে পড়ছিলেন সমাজ সেবামূলক কাজে। তিনি বাংলাদেশের শিশু প্রতিপালন ও পুনর্বাসন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারপার্সন হন। উইমেন ফর উইমেন (Women For Women) সংস্থার রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি গ্রুপের সঙ্গে তিনি শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ডেমক্রেসিওয়াচ (Democracywatch, এনজিও)-এর চেয়ারপার্সন ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ইউনিটি ফর সোশ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান একশন (Unity For Social and Human Action, সংক্ষেপে উষা নামে পরিচিত) স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার চেয়ারপার্সন, সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজ (Centre for Women and Children Studies, সংক্ষেপে CWS)-এর উপদেষ্টা ছিলেন। শেষোক্ত পদে থেকে তিনি নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধ বিষয়ে কাজ করেন। জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সহসভাপতি পদে থেকে কন্যাশিশুর উন্নয়নে অবদান রাখেন। এছাড়া তিনি ‘নারী মৈত্রী’ ও ‘নিজেরা করি’ সংগঠনে কাজ করেন।
নারী শিক্ষা ও উন্নয়নে অক্লান্তভাবে কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ লতিফা আকন্দ ২০০৭-এ রোকেয়া পদক পান। এসব এনজিওর কাজে তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেন।
সমাজকে তিনি ভালোবাসতেন। তাই সমাজের জন্য কোনো কাজ তার কাছে কষ্টকর মনে হতো না। বিশেষত সমাজের বঞ্চিত নারী ও শিশুদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল একধরনের রোমান্স। তাদের তিনি ভালোবাসতেন।
লতিফা আকন্দের তৃতীয় সন্তান (শিশু) লন্ডনে এবং বাকি তিন সন্তান (স্বপন, স্বাতী ও শাবন) আমেরিকায় সপরিবারে বাস করছেন। তিনি মাঝেমাঝে লন্ডন, নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কাটালেও শেষ জীবনে একাই থাকতেন তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতি বিজড়িত পুরানা পল্টনের বাড়িতে। তিনি বরাবরই হালকা পাতলা ছিলেন এবং হাটতে ভালোবাসতেন। বাড়ি থেকে তিনি হেটে প্রতি সকালে যেতেন রমনা পার্কে মর্নিং ওয়াক করতে। তার কোনো গাড়ি ছিল না।
২ ডিসেম্বর ২০১৪’র সকালে তিনি মর্নিং ওয়াক থেকে বাড়ি ফেরার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে সকাল আটটার দিকে বারডেম হসপিটালে তাকে নিয়ে যাই আমি। তালেয়া রেহমান ছুটে আসেন হসপিটালে। ৩ ডিসেম্বর রাত একটায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯।
নিরহংকারী, নিরলস, নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী প্রফেসর লতিফা আকন্দ বেচে থাকবেন তার দ্বারা প্রভাবিত অসংখ্য সমাজসেবীদের মাধ্যমে।
আর আমার লতু খালা বেচে থাকবেন প্রেম, ভালোবাসা, ওয়ার্ল্ড মুভি ও বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের ইতিহাসের মধ্যে।
গুডবাই লতু খালা।
২৫ অক্টোবর ২০১৫

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫