ঢাকা, সোমবার,১৭ জুন ২০১৯

নগর মহানগর

দেশে দক্ষ দাইয়ের হাতে প্রসবের হার ৩২ শতাংশ

১০০ জনে এএনসি নেয় ৫৫ জন

হামিম উল কবির

০৭ নভেম্বর ২০১৫,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
অপুষ্টির শিকার তাহমিনা

অপুষ্টির শিকার তাহমিনা

দেশে প্রতি ১০০ জনে ৫৫ জন গর্ভবতী প্রসব পূর্ববর্তী সেবা নিলেও সন্তান জন্ম দানে স্কিল্ড বার্থ অ্যাটেন্ডেড (এসবিএ) বা দক্ষ দাইয়ের হাতে আসেন মাত্র ৩২ শতাংশ। প্রসবের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হলেও বাংলাদেশে বেশির ভাগ মহিলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন না। এ হার বাংলাদেশের দুর্গম অঞ্চলে আরো বেশি।
বাংলাদেশে ৭১ শতাংশ সন্তান প্রসব হয়ে থাকে বাড়িতে অদক্ষ দাইয়ের হাতে। অপর দিকে দক্ষ দাইয়ের (এসবিএ) হাতে সন্তান হয়ে থাকে মাত্র ৩২ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে প্রতি এক লাখে ১৯৪ জন মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। অপর দিকে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বছরে ছয় হাজার ৮৪৮ জন মারা যান। প্রসব পূর্ববর্তী সেবা (এএনসি) নেন মাত্র ৫৫ শতাংশ মা। এখানে সন্তান জন্ম দেয়ার সময়তো বটেই গর্ভাবস্থায় ও প্রসব পরবর্তী ছয় সপ্তাহের মধ্যেও মায়েরা বিভিন্ন জটিলতায় মারা যান। আর মা মারা যাওয়ার পরপরই সন্তানও মারা যায়। বাংলাদেশ ম্যাটার্নাল মর্টালিটি সার্ভে ২০১০ অনুযায়ী, মাতৃত্বজনিত কারণে মৃত্যুর মধ্যে ৭ শতাংশ মারা যায় দীর্ঘ প্রসব জটিলতায়, ২০ শতাংশ মারা যায় একলাম্পশিয়ায়, রক্তক্ষরণে মারা যায় ৩১ শতাংশ, গর্ভপাতে মারা যায় ১ শতাংশ। অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু হয় গর্ভজনিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে। এক শতাংশ মৃত্যু কেন হয় তা নির্ণীত হয় না।
নোয়াখালী জেলার দুর্গম অঞ্চল হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গর্ভবতী মহিলাদের প্রসবের উদ্দেশ্যে আসার হার আরো কম। এ উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্যারামেডিক হাফিজা আক্তার জানিয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করার পরও গর্ভবতী মায়েরা প্রসবের উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে চান না। তিনি জানান, সোনাদিয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আওতায় গত সেপ্টেম্বর মাসে ৭৬ জন মা ছিলেন যাদের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ডেলিভারি হবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে মাত্র ১১ জন মা এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছেন ডেলিভারি করাতে। এ সময়ের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ জন গর্ভবতীর আসার সময় নির্ধারণ ছিল। হাফিজা জানান, এদের সবাই স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে এএনসি নিয়েছিলেন। কেন আসবেন না জানতে চাইলে হাফিজা আক্তার জানিয়েছেন, এখানকার মানুষের মধ্যে বেশ কুসংস্কার রয়েছে। তারা মনে করেন বাড়িতে পরিচিত দাইয়ের হাতেই করানো উচিত। ভদ্র ঘরের মেয়েরা হাসপাতালে যায় না। এখানে একটু ধর্মীয় গোঁড়ামি রয়েছে। হাফিজা আক্তার জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খুব সহজে প্রসবের ব্যবস্থা রয়েছে। সম্ভাব্য জটিলতাও এড়ানোর প্রশিক্ষণ আমাদের রয়েছে। প্রসবে দেরি হলে প্রশিক্ষণ না থাকায় দাই কিছু করতে পারেন না অপেক্ষা করা ছাড়া। এ ছাড়া নানা অবৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করে। ফলে মা ও সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি এমনকি মৃত্যু ঘটতে পারে। হাফিজা বলেন, কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমরা খুব অল্প সময়ে প্রসব করিয়ে থাকি। এতে মা ও শিশুর কোনো ক্ষতি হয় না। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো সিজার করানো হয় না। এখানে প্রসব করানো হলে টাকাও দিতে হয় না। তা সত্ত্বেও সবাই এখানে আসেন না।
হাতিয়ার অন্যতম দুর্গম এলাকা নিঝুম দ্বীপ। এ দ্বীপে একটি মাত্র পাকা রাস্তা রয়েছে। এখানে সরকারিভাবে কোনো উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই। একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নিঝুমদ্বীপের শেষ প্রান্তে অবস্থিত ফজলুল করিম বুখারি কমিউনিটি কিনিক। এ দ্বীপে গর্ভবতী মহিলাদের একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী হলেন মামনির নিয়োগপ্রাপ্ত প্যারামেডিক মিতু আক্তার। এখানে বেশির ভাগ সন্তান ঘরেই হয়ে থাকে। গত সেপ্টেম্বর মাসে নিঝুম দ্বীপে ২৫০ জনের সন্তান হওয়ার তারিখ রয়েছে। সন্তান হওয়ার পর থেকে পরবর্তী ৪২ দিন এখানকার মায়েদের নিজ ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষিদ্ধ। এ কারণে এখানে প্রসব পরবর্তী কোনো সেবা (পিএনসি) মায়েরা পান না। পরিবারের সদস্যরা মনে করেন এ সময়ে ঘর হতে বের হলে জিন অথবা ভূতের আসর লাগতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবায় আগ্রহী কম বলে নিঝুম দ্বীপে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অন্যান্য এলাকার চেয়ে এখানে বেশি। এখানে প্রতিটি মহিলার দুইয়ের অধিক সন্তান রয়েছে। বাতায়ন গুচ্ছ গ্রামের আবুল কালামের স্ত্রী তাহমিনার (২২) দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও আবারো চার মাসের গর্ভবতী হয়েছেন। চার মাসের গর্ভবতী তাহমিনা ভুগছিলেন চরম অপুষ্টিতে। কমিউনিটি কিনিকে এলে তাহমিনার ওজন মেপে মিতু জানালেন, ‘মাত্র ৪০ কেজি।’
ইউএসএআইডির অর্থায়ানে মামনি হেলথ স্ট্রেংদেনিং প্রকল্প হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী নেই এমন ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মামনি প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে সহায়তা করছে। তবে হাতিয়ায় মামনির প্রকল্প শেষ হয়ে যাবে ২০১৭ সালে। এরপর কী হবে, হাতিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষ কিভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাবেনÑ প্রশ্নের উত্তরে হাতিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মো: মাহবুব মোর্শেদ জানান, ‘হাতিয়ায় মামনির প্রকল্প শেষ হয়ে যাবে ২০১৭ সালে, আমরা তা জানি। এর মধ্যেই আমরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে পারব বলে আশা করছি। এটা নিয়ে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘হাতিয়াতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়নকে আমরা প্রথম দিকে রেখেছি। এরপরই নদী ভাঙন ঠেকানোকে প্রাধান্য দিচ্ছি।’
এখানে গর্ভবতীরা কেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে চান না বলে মনে করেন ? এ প্রশ্নের উত্তরে মো: মাহবুব মোর্শেদ বলেন, পরিবারের ঐতিহ্য ও বিশ্বাস, বিশ্বাস থেকে আসে বিভিন্ন রকমের বাধা, দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র দূরে থাকায় ওষুধ ও যাতায়াতের খরচ দিতে পারেন না এবং পরিবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা না থাকায় গর্ভবতীরা স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে আসতে পারেন না নিরাপদ প্রসবের জন্য।’ তিনি বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি করে আমরা এ ধরনের বাধাগুলো দূর করার পরিকল্পনা নিয়েছি।’

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫