ঢাকা, সোমবার,১৭ জুন ২০১৯

নগর মহানগর

হাতিয়ায় রক্ষণশীল মহিলারাও আসছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে

হামিম উল কবির হাতিয়া (নোয়াখালী) থেকে ফিরে

১৭ অক্টোবর ২০১৫,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
হাতিয়ার সোনাদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভূমিষ্ঠ সদ্যোজাতকে নিয়ে রুমের বাইরে এসেছেন নিকটাত্মীয়  : নয়া দিগন্ত

হাতিয়ার সোনাদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভূমিষ্ঠ সদ্যোজাতকে নিয়ে রুমের বাইরে এসেছেন নিকটাত্মীয় : নয়া দিগন্ত

রক্ষণশীল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি সমাজে কাজ করতে হয় নোয়াখালীর হাতিয়ার স্বাস্থ্যকর্মীদের। হাতিয়ার চরকিং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্যারামেডিক রুমানা আক্তার জানান, একটি সময় ছিল এখানকার মহিলারা কোনোভাবেই স্বামী বা নিকটজন ছাড়া কখনোই ঘর থেকে বের হতেন না। সন্তান প্রসবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা ডাক্তারের কাছে আসতে পারতেন না। এখন মেয়েদের একটি অংশ চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের অনেকে সন্তান প্রসবের সময় নিজেই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চলে আসেন। তাদের অনেকেই প্রসব-পূর্ববর্তী (এএনসি) ও প্রসব-পরবর্তী (পিএনসি) সেবা নিতে আসেন। রক্ষণশীল মানসিকতার মানুষের মধ্যে যে আমরা কাজ করতে পারছি এটি কোনো অংশে কম কিসে?
ইউএস এআইডির অর্থায়নে মামণি হেলথ স্ট্রেনদেনিং প্রকল্পের বাস্তবায়ন সংস্থা রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টারের (রিক) তত্ত্বাবধানে হাতিয়ায় দেয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। যেখানে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী নেই অথবা অপর্যাপ্ত সরকারি সুবিধা, সেখানে সরকারি স্থাপনাতেই মামণি স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। চরকিং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরকারি কোনো ডাক্তার নেই। এখানে রুমানা আক্তার কাজ করছেন প্যারামেডিক হিসেবে। রুমানা বললেন, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি থেকে এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৯৭টি ডেলিভারি করানো হয়েছে। কোনো মায়ের মৃত্যু হয়নি, তবে দাইয়ের হাতে পড়ে দেরিতে আসায় তিনটি মৃত শিশুর জন্ম হয়েছে। চরকিংয়ের ফিল্ড সুপারভাইজার জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, এত প্রতিকূলতার মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে ইউনিয়নের ৬৬ জন গর্ভবতী নারীর সবাই কমপক্ষে একটি করে এএনসি নিয়েছেন। সর্বোচ্চ তিনটি এএনসি নিয়েছেন ৩৫ নারী।
চরকিং ইউনিয়নের দক্ষিণ গামছাখালী গ্রামের নাজমুলের স্ত্রী রোজিনা গ্রামীণ কুসংস্কারের শিকার হয়ে অযথাই প্রসব বেদনায় ভুগেছেন অনেকক্ষণ। শ্বশুর-শাশুড়ি, এলাকার দাই ডেকে নিয়ে আসেন। ডেলিভারিতে সহযোগিতা করার জন্য ওই দাইয়ের কোনো আধুনিক জ্ঞান ছিল না। চরকিং ইউনিয়নের প্যারামেডিক রুমানা আক্তার জানালেন, অনেকক্ষণ ভোগার পর মরণাপন্ন অবস্থায় রোজিনাকে আমাদের কাছে আনা হয়। পরীক্ষা করে দেখলাম, ‘শিশুটির মাথা সামান্য বড়। বিলম্ব না করে প্রসবের রাস্তা সামান্য একটু কেটে দিতেই ডেলিভারি হয়ে যায়। বেঁচে যায় নবজাতক ও মা।
প্যারামেডিক রুমানা আরো জানান, সপ্তাহের দিনগুলোকে ভাগ করে একটি সময় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকি। অবশিষ্ট সময় স্যাটেলাইট কিনিক করি বিভিন্ন স্থানে। গর্ভবতী ও নববিবাহিতাদের স্যাটেলাইটে এনে গর্ভধারণ ও প্রসব জটিলতা সম্পর্কে বুঝিয়ে থাকি। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলে সন্তান প্রসব নিরাপদ হবে এলাকার মা ও শ্বশুর-শাশুড়িদের বুঝিয়ে থাকি। আমরা তাদের বলি, ‘প্রসবকাল উদ্ভূত সমস্যাগুলো দূর করার প্রশিক্ষণ আমাদের আছে’। তবু এরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে চান না শাশুড়ি অথবা বাড়ির অন্যদের কারণে। রুমানা জানান, হাতিয়ায় একটি কুসংস্কার আছে। তা হলো কোনো ভদ্র ঘরের বউয়ের সন্তান হাসপাতালে হয় না। এ ধরনেরই কুসংস্কারের গামছাখালী গ্রামের নাজমুলের স্ত্রী রোজিনাকে ভুগতে হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে চরকিং ইউনিয়নের হাসনা (হাসিনা) বেগমের মরণাপন্ন অবস্থা হয়েছিল প্রসব জটিলতায়। সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মকর্তাদের হাতিয়া উপজেলা ভিজিটের সময় ঘটনাটি তাদের সামনে চলে আসে। তারা হাসনা বেগমকে নিয়ে আসেন অর্ধসমাপ্ত হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিজারিয়ান সেকশনে। দীর্ঘ দিন এখানে সিজারের ব্যবস্থা ছিল না। হাসনা বেগমের জন্যই চলতি বছরের ৬ এপ্রিল তড়িঘড়ি করে সিজারিয়ান সেকশনটি প্রস্তুত করা হয় রাতের মধ্যে এবং সিজার করা হয়। মধ্য রাতে মৃত সন্তান হয় হাসনা বেগমের।
১৫ সেপ্টেম্বর চরকিং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র আবারো পরির্দশনে গেলে স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, সিজারের তিন মাস যেতে না যেতেই হাসনা বেগম আবারো দুই মাসের গর্ভবতী হয়েছেন। প্যারামেডিক রুমানা বেগম জানান, দরিদ্র হাসনার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তার রিকশাওয়ালা স্বামী। হাসনা তার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। হাসনার দ্রুত আরেকবার গর্ভবতী হওয়ার আরেকটি কারণ তিনি তালাকপ্রাপ্ত হতে চান না।
সুখচর ইউনিয়নের চর আমানুল্লাহ গ্রামের দিলদারের স্ত্রী রোকসানা বুক সমান জোয়ারের পানি ভেঙে স্যাটেলাইট কিনিকে অ্যান্টিনেটাল কেয়ার (এএনসি) নিয়েছেন। কিন্তু প্রসবের সময় রোকসানা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে পারেননি। ‘ভদ্র ঘরের মেয়ে বাড়ির বাইরে গিয়ে ডাক্তারের কাছে বাচ্চা প্রসব করে না’ শ্বশুর-শাশুড়ির এ ধরনের সাফ কথায় রোকসানাকে শেষে গ্রাম্য দাইয়ের পাল্লায় পড়েই কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। রোকসানা ডেলিভারির সময় হয়েছে বুঝতে পেরে আবারো জোয়ারে বুক সমান পানি ভেঙে চলেই এসেছিলেন প্যারামেডিকের কাছে। কিন্তু পানি বেড়ে যেতে থাকলে তাকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বাড়ি নিয়ে যান। পরে জানা গেছে, সেই দিন মধ্য রাতে দাইয়ের হাতেই রোকসানার সন্তান হয়েছে। রুমানা জানালেন, সন্তানের পজিশন ঠিক থাকলে এক-দুই ঘণ্টার মধ্যে আমরা প্রসব করিয়ে দিতে পারতাম। তিনি জানান, প্রসব বেদনা কত কষ্টের, তা ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারবেন।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫