ঢাকা, শুক্রবার,২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বাংলার দিগন্ত

ঐতিহাসিক নিদর্শন মির্জাপুর শাহী মসজিদ

আসাদুজ্জামান আসাদ পঞ্চগড়

২১ জুন ২০১৫,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মোগল আমলের প্রাচীন নির্দশন, মির্জাপুর শাহী মসজিদ। এ দেশে যত পুরনো কীর্তি রয়েছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম। সঠিক তথ্য জানা না থাকলেও আনুমানিকভাবে ধারণা করা হয় শাহী মসজিদের বয়স প্রায় ৩৭০ বছর।
তিন গম্বুজবিশিষ্ট মির্জাপুর শাহী মসজিদটি জেলার আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ২৫ ফুট প্রস্থের এই মসজিদটি মোগল স্থাপত্য রীতির বৈশিষ্ট্যে ভরা। সুসজ্জিত গম্বুজের শীর্ষবিন্দু ক্রমহ্রাসমান বেল্ট দ্বারা যুক্ত। গম্বুুজের চার কোণায় চারটি মিনার রয়েছে। সামনের দেয়ালে দরজার দু’পাশে গম্বুজের সাথে মিল রেখে দু’টি মিনার দৃশ্যমান। এর চার দেয়ালে ইসলামি টেরাকোটা ফুল ও লতাপাতার নকশায় পরিপূর্ণ। মসজিদের দেয়ালে ব্যবহার করা ইটগুলো চিক্কন, রক্তবর্ণ ও বিভিন্নভাবে অলঙ্কৃত। দেয়ালের মধ্যবর্তী দরজায় ফারসি লিপি খচিত ুদ্র কালো ফলক সংস্থাপিত রয়েছে। ফলকের ভাষা ও লিপি অনুযায়ী বুঝা যায়, এই মসজিদটি মোগল সম্রাট শাহ আলমের শাসনকালে নির্মিত। মসজিদের সামনে তিনটি বড় দরজা আছে। উত্তর ও দণি দেয়ালে কারুকার্য ও বর্ণিল নকশা করা। মসজিদদের ভেতরে খোদাই করা ফুল, লতাপাতা, কুরআনের আয়াত সংবলিত ক্যালিগ্রাফি তুলির ছোঁয়ায় সুসজ্জিত। এসব খোদাই করা কারুকার্য বিভিন্ন রঙে বিভিন্ন ভাবে সাজানো। সেসব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে মুমিন বান্দার হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। শাহী মসজিদের অভ্যন্তরে মুমিন বান্দা যখন ইবাদতে মশগুল থাকে, তখন তার কান্ত মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। এ ধরনের কারুকার্য মণ্ডিত নকশা ইরানের মসজিদ ও প্রাচীন অট্টালিকার মাঝে বিদ্যমান রয়েছে।
মির্জাপুর শাহী মসজিদের সামনে একটি উন্মুক্ত খোলা জায়গা রয়েছে। খোলা জায়গার এক পাশে রয়েছে সুসজ্জিত পাকা তোরণ। তোরণের উভয় পাশে আকর্ষণীয় নকশা ও খাজ করা স্তম্ভ রয়েছে। স্তম্ভের মাঝে চ্যাপ্টা গম্বুজ, তোরণকে অনিন্দ্য সুন্দর করে তুলেছে। সুসজ্জিত গম্বুজের ওপরে ুদ্র আকৃতির চূড়া সব মানুষকে একান্ত ভাবে কাছে টানে। মির্জাপুর শাহী মসজিদ যে কারিগর ও শ্রমিকেরা নির্মাণ করেছেন তাদের গভীর আন্তরিকতার ছাপ রয়েছে এতে। যে কারণে অনেক বছর পরেও মসজিদের গাঁথুনি, দেয়াল, প্লাস্টার, নকশা ও কারুকাজ শক্ত ও মজবুতভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নির্মাণের সুদীর্ঘ ৩৭০ বছর পার হলেও কোথাও কোনো প্রকার ফাটল বা ত্র“টি ধরা পড়েনি। মির্জাপুর গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, কোনো এক সময় প্রবল ভূমিকম্পে মসজিদটির বেশ কিছু অংশ ভেঙে যায়। তখন মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা মালিক উদ্দীন মসজিদটি পুনঃসংস্কারের জন্য সুদূর ইরান থেকে কারিগর নিয়ে আসেন। সেই কারিগর তখন শাহী মসজিদটি সংস্কার করেন। তখন থেকে আর কোনো প্রকার সংস্কারের কাজ করা হয়নি।
মির্জাপুর শাহী মসজিদ নির্মাতা কে? এ প্রশ্নটির সঠিক জবাব এখন পর্যন্ত অজানা। তবে শাহী মসজিদের দেয়াল থেকে উদ্ধারকৃত শিলালিপি প্রমাণ করে যে, এটি ১৬৫৬ সালে নির্মাণ করা হয়েছে। ভারত সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার শাসনামলে শাহী মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। তবে স্থানীয় অধিবাসীরা মনে করেন, মির্জাপুর গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা মালিক উদ্দীন শাহী মসজিদ নির্মাণের এই মহান কাজটি করেছেন। তবে দোস্ত মোহাম্মদ শাহী মসজিদ নির্মাণের শেষ কাজটি সমাপ্ত করেন বলে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে। শাহী মসজিদের নকশা খচিত কারুপণ্য, মনোরম দৃশ্য, ঐতিহ্য, দেখার জন্য দেশী-বিদেশী পর্যটক, এ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক পরিদর্শন করে যাচ্ছেন। তবে স্থানীয় জনগণের দেখাশুনার পাশাপাশি যদি সরকারের দৃষ্টি থাকত, তাহলে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মসজিদটির সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি পেত।
মির্জাপুর শাহী মসজিদ পরিদর্শনে আসার জন্য দেশের যেকোনো জেলা থেকে বাস, কোচ বা ট্রেনে আসা যায়। পঞ্চগড় থেকে শাহী মসজিদের দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার। রয়েছে পাকা রাস্তা। এখান থেকে মাইক্রো, কার, মোটরসাইকেল অথবা অল্প খরচে রিকশা-ভ্যানে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। মির্জাপুর শাহী মসজিদের আশপাশে যদিও থাকার ব্যবস্থা নেই, তবে পঞ্চগড় শহরে এসি, নন-এসি আবাসিক হোটেলে থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। আছে রুচিসম্মত খাওয়ার ব্যবস্থা। প্রতি বছর পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত শাহী মসজিদ এলাকা। ঐতিহ্যবাহী মির্জাপুর শাহী মসজিদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরো দর্শনীয় হিসেবে কালের সাী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকুকÑ এই হোক সবার কাম্য।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫