সৌদি আরব ফুটবল দল
সৌদি আরব ফুটবল দল

ফুটবল বিশ্বকাপে এশিয়া কেন পিছিয়ে?

মু. ওমর ফারুক আকন্দ

বিশ্ব জনসংখ্যার ৬০ শতাংশই বসবাস করে এশিয়ায়। চীনেকে আদি ফুটবলের জন্মভূমি বলা হয়। এই অঞ্চলের মানুষের রয়েছে ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা। এখানে রয়েছে ফুটবল নিয়ে নানা উন্মাদনা। এশিয়ান দেশগুলোর এতসব গুণ থাকার পরেও বিশ্বকাপ ফুটবলে পিছিয়ে আছে তারা। এ পর্যন্ত যতগুলো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে এশিয়ান দেশগুলো কেবল খেলার জন্যই খেলছে বলে মনে করা হয়।

এই সমস্যার পিছনের কারণ কী? কেন এশিয়ানরা পিছিয়ে আছে বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে? ১৯৩০ সাল থেকে ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত শিরোপা ঘরে তোলার মতো স্বপ্ন দেখাতে পারেনি এশিয়ার কোন দেশ। এ বৃত্ত থেকে এশিয়ান দেশগুলো কবে বের হবে তার জানে না কেউ।

এবার শুরু হতে যাওয়া রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপে এশিয়া অঞ্চল থেকে রেকর্ড সংখ্যক ৫টি দেশ খেলার সুযোগ পেয়েছে। এশিয়ার দেশগুলো হলো: ইরান, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সৌদি আরব। পয়েন্ট তালিকায় সবচেয়ে উপরে আছে ইরান (৩৬) আর সর্বনিম্ন পয়েন্ট নিয়ে তালিকায় আছে সৌদি আরব (৭০)।

বিশ্বকাপ ফুটবলে এশিয়ার সেরা দেশের নাম বললে প্রথমেই আসবে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম। এবছর দেশটি দশমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। এশিয়ার এই দেশটি ২০০২ সালের বিশ্বকাপে সেমি ফাইনাল পর্যন্ত খেলেছিল। এশিয়া থেকে বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার রেকর্ড বলতে এই সেমিফাইনাল।

দক্ষিণ কোরিয়া
এশিয়া থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বকাপ চূড়ান্ত পর্বে খেলা নিয়মিত ঘটনাই বলা যায়। খুব সহজেই তারা দশমবারের মতো চূড়ান্তপর্ব নিশ্চিত করেছে। ২০০২ সালে স্বাগতিক হয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল এশিয়ার এই ফুটবল পরাশক্তি। এবারের বিশ্বকাপে দলটি খেলবে ‘এফ’ গ্রুপে। এই গ্রুপের অন্যান্য দলগুলো হলো : জার্মানি, মেক্সিকো ও সুইডেন। এবার দক্ষিণ কোরিয়ার দিকেই তাকিয়ে থাকবে এশিয়ার দেশগুলো। যদিও জার্মানি, সুইডেন ও মেক্সিকোর মতো দল টপকে পরবর্তী রাউন্ডে উঠতে পারাটা কষ্ট সাধ্য ।

ইরান
টানা ১২ ম্যাচে কোনো গোল না খেয়ে এশিয়া অঞ্চল থেকে রেকর্ড করে চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত করেছে দলটি। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ম্যাচে সিরিয়ার সাথে ড্র (২-২) ম্যাচেই শুধু গোল খেয়েছে দলটি।ইরান পয়েন্ট টেবিলেও অন্যান্য এশিয়ান দেশগুলোর চেয়ে বেশ এগিয়ে। এবারের বিশ্বকাপে ইরান ‘বি’ গ্রুপে খেলবে। গ্রুপের অন্য দলগুলো হলো : পর্তুগাল, স্পেন ও মরক্কো। শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে উদিয়মান এশিয়ান দেশটি কেমন খেলে তাই দেখার বিষয়।

জাপান
এশিয়া অঞ্চলে থেকে জাপান ৬ষ্ঠ বারের মতো বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করছে। বাছাইপর্বে গ্রুপ বি থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে উঠেছে জাপান। ফুটবল প্রেমিদের কাছে ‘ব্লু সামরাই’ হিসেবে পরিচিত জাপান এবার ‘এইচ’ গ্রুপের হয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। গ্রুপের অন্য দলগুলো হলো : পোল্যান্ড, সেনেগাল ও কলম্বিয়া। জাপানের সুযোগ রয়েছে এসব দলগুলোকে টপকে পরবর্তী রাউন্ডে খেলার।

সৌদি আরব
এবারের বিশ্বকাপে সৌদি আরব পঞ্চমবারের মতো অংশ নিচ্ছে। জাপানকে ১-০ গোলে হারিয়ে এশিয়া অঞ্চল থেকে চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত করে সৌদি আরব। রাশিয়ার আসরে দেশটি ‘এ’ গ্রুপে খেলবে। গ্রুপের অন্য দলগুলো হলো : রাশিয়া, মিসর ও উরুগুয়ে।তুলনামূলক সহজ দল পেয়েছে দেশটি। দ্বিতীয় রাউন্ড খেলতে পারে কিনা সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে ফুটবল প্রেমিরা।

অস্ট্রেলিয়া
ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে বের হয়ে এশিয়ান অঞ্চলে যোগ দেয়ার পর অস্ট্রেলিয়া এবার টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। নিশ্চিত করেছে চূড়ান্ত পর্ব। যদিও এর পূর্বের রেকর্ড অনুযায়ী দেশটি ১৯৩০ থেকে ২০০২-এর মধ্যে মাত্র একবার বিশ্বকাপ খেলেছিল। বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া খেলবে ‘সি’ গ্রুপের হয়ে। গ্রুপের অন্য দলগুলো হচ্ছে ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও পেরু। এই গ্রুপের বাকী দলগুলোর সাথে প্রতিযোগীতা করে কতদূর যেতে পারে ‘সকারুরা’ সময় আসলেই বলা যাবে।

ফুটবলে এশিয়ার পিছিয়ে থাকার কারণ : এশিয়া ফুটবলে পিছিয়ে থাকার অনেক কারণ রয়েছে। এখানকার ফুটবলে নানা সমস্যায় জর্জরিত। এসব সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো :

অঞ্চলগত সমস্যা: এশিয়ার ফুটবলে পিছিয়ে থাকার জন্য আঞ্চলিক সমস্যাকে দায়ী করা হয় অনেকাংশে। এশীয়দের শারীরিক গঠন ল্যাটিন, আফ্রিকা বা ইউরোপীয় অঞ্চলের মানুষ থেকে অনেকটা আলাদা গড়নের। যার ফলে ইউরোপীয়রা বা অন্যান্যরা দৃঢ়ভাবে মনে করে এশীয়রা পিছিয়ে আছে। এটা ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায়। সেখানে আফ্রিকান অঞ্চলের খেলোয়াড়দের আধিক্য থাকলেও এশীয়দের দেখা মিলে না। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ইরান এসব বাধা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।

ফুটবল ক্লাবের অভাব : এশিয়ান অঞ্চলে ফুটবল ক্লাবের সংখ্যা তুলনামূলক কম। আরো কম জুনিয়র ক্লাবের সংখ্যা। ফুটবলার গড়ার কারিগর বলা যায় এসব জুনিয়র ক্লাবগুলোকে। বড় বড় নামী ক্লাবগুলোর জুনিয়র লেভেল থেকেই ভবিষ্যতের প্লেয়ার বের হয়ে আসে। সেটা যে এশিয়ার দেশগুলোতে কম তা বিভিন্ন পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়। এর ফলে এশিয়ান অঞ্চলগুলোতে দক্ষ ফুটবলার তৈরি হচ্ছে না। আর যেসব ক্লাব রয়েছে সেগুলোর ব্যবসায়িক চিন্তার কারণে বিদেশি খেলোয়াড়দের প্রতি ঝোঁক থাকে বেশি। ফলে এশীয় অঞ্চলের খেলোয়াড়রা পিছিয়ে পড়ছে।

দুর্নীতি : এশীয় দেশগুলো ফুটবলে পিছিয়ে থাকার যেসব কারণ চিহ্নিত করা হয় তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো দুর্নীতি। এই অঞ্চলের ফুটবলের সাথে দুর্নীতি একাকার হয়ে গেছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ক্লাব বা লীগ পর্যায়ের খেলাগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায় ফুটবলে দুর্নীতি কোন পর্যায়ে ঠেকেছে।

অদক্ষতা : এশিয়ার খেলোয়াড়েরা দক্ষতায় পিছিয়ে। স্ট্যামিনা আছে, সমানতালে দৌড়াতেও পারে। কিন্তু ফুটবল একটা বুদ্ধির-ও খেলা। সেই জায়গায় মাথা খাটিয়ে খেলতে পারছে না- এমনটাই বলেন ফুটবল বোদ্ধারা।

রাজনীতি ও সংস্কৃতি : এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দাঙ্গা হাঙ্গামা লেগেই থাকে। যার প্রভাব থেকে ফুটবলও মুক্ত নয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বা দূর প্রাচ্যের দেশগুলোর বর্তমান অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখলেই বুঝা যায়। এসবের প্রভাব পড়ে খেলোয়াড়দের উপরও। তাদের মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়ে যায় এর ফলে।

আর্থিক সমস্যা : এশিয়ান দেশগুলোতে আর্থিক সমস্যা কারণে ফুটবল অনেক পিছিয়ে আছে। এখানে খেলোয়াড়রা স্থানীয় ক্লাবে খেলে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারে ইউরোপীয় ক্লাবগুলোতে গিয়ে সেই অবস্থান ও ধরে রাখতে পারেন না। ফলে সমপরিমাণ উপার্জন করাও সম্ভব হয় না।

ফুটবলের প্রতি আগ্রহ : এশিয়ার দেশগুলোর ভারত, পাকিস্থান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মতো দেশগুলো ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেটের প্রতি ঝুঁকেছে। এছাড়া আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোরও ফুটবলের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। এসব দিক থেকে এশিয়ার বড় একটা অংশ ফুটবল থেকে পিছিয়ে গেছে। চীনের জনগনের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও সেখানে ফুটবলের সাংগঠনিক অবস্থানের কারণে তারা পিছিয়ে আছে।

দীর্ঘমেয়োদি পরিকল্পনা : ফুটবলে দল বা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার। কিন্তু এশিয়ার দেশগুলোতে এমনটা খুব একটা দেখা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিলেও বিভিন্ন কারণে এসব পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখে না। ব্যক্তি, দল-মত, রাজনীতি বিভিন্ন কারণ এসব পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত হতে দেয় না।

ফুটবলের প্রতি ভালবাসা : ফুটবলের প্রতি এশিয়ানদের ভালবাসা অন্যান্য মহাদেশেগুলোর দেশের তুলনায় অনেক কম। এ ভালবাসা চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসলে চোখে পড়ে। বাকী চার বছর ফুটবলের কথা মনে থাকে না। ফুটবলের প্রতি ভালবাসা না থাকলে কীভাবে ফুটবলে এগিয়ে যাবে?

সঠিক প্রশিক্ষণ : ফুটবল একটি প্রশিক্ষণ নির্ভর খেলা। যথাযথ প্রশিক্ষণ না করলে নামীদামি খেলোয়াড়রাও বিশ্ব মঞ্চ থেকে হারিয়ে যাওয়ার মতো নজির আছে। কিন্তু এশিয়ার দেশগুলোতে লাতিন বা ইউরোপীয় দেশগুলোর ন্যায় প্রশিক্ষণই দেয়া হয় না। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে ভালো খেলোয়াড়ও হারিয়ে যাচ্ছে।

কার্যকরী সংগঠন : এশিয়ার দেশগুলোর ফুটবল সংগঠন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এখনো কার্যকরী সংগঠন হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এএফসি সাফল্য দেখানোর মত কিছু করতে পারেনি। এশিয়াকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও দেখাতে পারেনি এ সংগঠনটি।

বিশ্বকাপ ফুটবলে এশিয়ানরা যে শুধু শোভাবর্ধন করে যাচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একটা বিশ্বকাপ এশিয়ার ঘরে আসবে এ স্বপ্ন পূরণের রাস্তা আর কত দূর! অপেক্ষার প্রহর কখন শেষ হয় সেটাই এখন দেখার বিয়ষ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.