ব্রণের জীবাণুর নাম প্রোপাইনো ‘ব্যাকটেরিয়াম অ্যাকনে’
ব্রণের জীবাণুর নাম প্রোপাইনো ‘ব্যাকটেরিয়াম অ্যাকনে’

বিব্রতকর সমস্যা 'ব্রণ'

ডা. ওয়ানাইজা রহমান

বয়ঃসন্ধির সময় হরমনের ক্ষরণ মাত্রার ভারসাম্যের অভাবে ত্বকের তেলগ্রন্থি ও সেবাম ক্ষরণ বেড়ে যায়। এতে রোমকুপগুলো বন্ধ হয়ে যায় ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হয়। এভাবে জীবাণুর বিষক্রিয়ায় ত্বকে ব্রণের সৃষ্টি হয়। ব্রণের জীবাণুর নাম প্রোপাইনো ‘ব্যাকটেরিয়াম অ্যাকনে’।

কখন ও কোথায় ব্রণ হয়

বয়ঃসন্ধির সময় প্রথম ব্র্রণ দেখা যায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৬-১৯ বছর বয়সের মাঝে এবং মেয়েদের ১৪-১৬ বছর বয়সে ব্রণ হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে ২০ বছর বয়সের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্রণ হওয়ার হার কমে যেতে থাকে। তবে অনেকের ৩০-৪০ বছর বয়স পর্যন্ত ব্রণ হওয়ার প্রবণতা থেকেই যায়। ব্রণ সাধারণত মুখেই দেখা যায়, তবে পিঠে, ঘাড়ে ও বুকেও হতে পারে।

কী কারণ ব্রণ বেড়ে যায়

গরমকালে ব্রণ হওয়ার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। বেশি ঘামলে সেবেশাস ও তৈলগ্রন্থির নালী বন্ধ হয়ে ব্রণ হতে পারে। এ ছাড়া নানারকম কসমেটিকসের কারণে ব্রণ হতে পারে। তেল তেলে চুল ও মাথার খুশকি থেকে ব্রণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত ঘুম না হলেও ব্রণ হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তা ছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মহিলাদের মাসিক ঋতুস্রাবের সাথেও ব্রণের সম্পর্ক রয়েছে।

ব্রণ হলে কী করবেন

- দিনে তিন-চারবার হালকা সাবান বা ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুবেন।
- ব্রণে হাত লাগাবেন না।
- তেল ছাড়া অর্থাৎ ওয়াটার বেসড মেকআপ ব্যবহার করবেন।
- মাথা খুশকিমুক্ত রাখার চেষ্টা করুন।
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন এবং নিজের আলাদা তোয়ালে রাখুন।
- রাতে ঠিকমতো ঘুমানোর চেষ্টা করবেন।
- মানসিক চাপ পরিহার করুন।
- প্রচুর পরিমাণে ফল, সবজি খান ও প্রচুর পানি পান করুন।

ব্রণ হলে কী করবেন না

- রোদে যাবেন না, রোদ এড়িয়ে চলুন।
- তেলযুক্ত ক্রিম বা ফাউন্ডেশন ব্যবহার করবেন না।
- ব্রণে হাত লাগাবেন না। ব্রণ খুঁটবেন না।
- চুলে এমনভাবে তেল দেবন না যাতে মুখটাও তেল তেলে হয়ে যায়।
- অতিরিক্ত তেল, ঘি, মাসলা খাবেন না।

কেন ব্রণের চিকিৎসা করাবেন

ব্রণ হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত। কারণ চিকিৎসা না করালে অনেক সময় ব্রণ ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। ত্বকে গভীর প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। আর ব্রণ হলে চেহারা খারাপ দেখানোর কারণে হীনম্মন্যতা ও অন্যান্য সমস্যা হতে পারে। শুরুতেই তাই এর সঠিক চিকিৎসা দরকার।

ব্রণের চিকিৎসা

ব্রণের চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ বা ডার্মাটোলজিস্টের শরণাপন্ন হলে ভালো হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্রণে অন্যের কথা শুনে বা নিজের পছন্দসই কোনো ওষুধ লাগাবেন না। কতটা বেশি ব্রণ হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে খাবার ও লাগানোর জন্য এন্টিবায়োটিক ওষুধ দেয়া হয়। তবে ব্রণের চিকিৎসা সময় সাপেক্ষ। তাই ধৈর্য ধরতে হবে আপনাকে। হঠাৎ চিকিৎসাপদ্ধতি বা ডাক্তার বদলাবেন না।

ব্রণ ও খাওয়া দাওয়া

মানুষের খাদ্যাভাস ব্রণকে প্রভাবিত করে কি না সে বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে। দেখা গেছে ব্রণ হওয়ার উপাদানগুলোর মাঝে খাওয়া-দাওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রথমতো, শরীরে ট্রক্সিক উপাদান যাতে বেরিয়ে যায় এজন্য প্রচুর পানি পান করতে হবে। নিয়মিত খাদ্য তালিকায় আঁশযুক্ত খাবার রেখে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে হবে। হজম যাতে ঠিকমতো হয় সেজন্য অতি মসলাযুক্ত ও তেল-চর্বি জাতীয় খাবার এড়াতে হবে। পালংশাক ও লেটুসপাতা ব্রণ বাড়িয়ে দেয় বলে জানা গেছে। ক্লোরাইড ও ব্রোমাইডযুক্ত ওষুধ, সামুদ্রিক মাছ, মাখন, পনির এগুলো ব্রণ বাড়িয়ে তোলে। চা-কফিও দুই কাপের বেশি দিনে পান করা যাবে না। প্রচুর ফল ও সবজি খেতে হবে। ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। গাজর, কুমড়া, পেঁপে, পুঁইশাক ও যেকোনো রঙিন ফল ও সবজিতে ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে আর ‘সি’ রয়েছে কাঁচা ফল ও যেকোনো টক ফলে।

তবে এমন ধারণা ঠিক নয় যে, এ ধরনের খাদ্যাভাস করলে ব্রণ একেবারেই হবে না। বলা যেতে পারে, ব্রণ হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পাবে। তবে যাদের ব্রণ হচ্ছে তাদের বলছি, নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। সঠিক চিকিৎসার কিছু নিয়ম মেনে চলা আর খাদ্যাভাসের মাধ্যমে ব্রণ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

লেখিকা : অধ্যাপিকা, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ।

 

ব্রণের আধুনিক চিকিৎসা

ডা: দিদারুল আহসান

যৌবনের একটি অবাঞ্ছিত সমস্যার নাম ব্রণ। সুন্দর মুখশ্রীর ওপর ব্রণ যদি জাপটে ধরে, তাহলে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, কারোরই মনে যন্ত্রণার কমতি থাকে না। লিখেছেন ডা: দিদারুল আহসান

১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সে এটি বেশি হয়। তবে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত এটি হতে দেখা যায়। টিনএজারদের মধ্যে শতকরা ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রেই কম অথবা বেশি এটি হয়ে থাকে। ২০ বছর বয়সের পর থেকে এটি কমতে থাকে।

শরীরের কোথায় হয় : সাধারণত মুখে; যেমন- গাল, নাক, থুতনি ও কপালে হতে দেখা যায়। তবে শরীরের ওপরের অংশে ও হাতের ওপরের অংশেও হরহামেশাই হতে দেখা যায়।

ব্রণ হওয়ার কারণ : বংশগত প্রভাব এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। স্বাভাবিকভাবেই লোমের গোড়ায় একটি ব্যাকটেরিয়া থাকে, যার নাম প্রোপাওনি ব্যাকটেরিয়াম একনি। বয়ঃসন্ধিকালে এড্রোজেন হরমোনের প্রভাবে সেবাসিয়াস গ্রন্থি থেকে সেবামের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এই সেবাম থেকে ফ্রি ফ্যাটি এসিড তৈরি করে লোমের গোড়ার উপস্থিত ব্যাকটেরিয়া। ফলে লোমের গোড়ায় প্রদাহের সৃষ্টি হয় এই ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এর পাশাপাশি জমা হয় লোমের গোড়ায় কেরাটিন নামক পদার্থ। ফলে সেবাসিয়াস গ্রন্থিপথ বন্ধ হতে থাকে এই কেরাটিন, লিপিড আর মেলানিন পদার্থ দিয়ে যা ব্ল্যাক হেড বা ‘হোয়াইট হেড’ হিসেবে দেখা দিয়ে থাকে।

ব্রণের সাথে খাওয়ার সম্পর্ক : অনেকের ধারণা তৈলাক্ত খাবার খেলে বুঝি ব্রণ হয়। সত্যিকার অর্থে কথাটি সত্য নয়। খাওয়ার সাথে ব্রণের কোনো সম্পর্ক আছে বলে জানা যায় না।

ব্রণ ও ক্রিম : যেসব ক্রিমে তৈলাক্ত উপাদান থাকে সেসব ক্রিম যাদের মুখে বেশি ব্রণ হয় তাদের ব্যবহার করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে ক্রিম যদি তৈলাক্ত হয় তবে তা ব্রণের রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না।

চিকিৎসাপদ্ধতি : রোগীর আক্রান্তের গুরুত্ব বিবেচনা করে চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করতে হয়। তা হতে পারে মলম থেকে শুরু করে খাওয়ার জন্য নির্ধারিত অ্যান্টিবায়োটিক অথবা রেটিনয়েড জাতীয় ওষুধ।

ব্যাকটেরিয়া নাশক : অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে টেট্রাসাইক্লিন ১৯৫১ সাল থেকেই ব্রণ চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। টেট্রাসাইক্লিন দামে সস্তা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম এবং অত্যন্ত কার্যকর। এই অ্যান্টিবায়োটিক ব্রণ সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াকে দমন করে। তবে সমস্যা হচ্ছে এ ক্ষেত্রে কয়েক মাস ধরে এই অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে যেতে হয়। এর দ্রুত কোনো উন্নতি লক্ষ করা যায় না। সাধারণভাবে এই ওষুধ খাওয়ার এক থেকে দেড় মাস পর উন্নতি লক্ষ করা যায়। আর একটি ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক হচ্ছে মিনোসাইক্লিন। মিনোসাইক্লিন টেট্রাসাইক্লি¬নের চেয়েও অধিক কার্যকর। দেখা গেছে, ৫০০ মিলিগ্রাম টেট্রাসাইক্লিনের চেয়ে ১০০ মিলিগ্রাম মিনোসাইক্লিন আরো বেশি কার্যকর।
ডক্সিসাইক্লিন : ব্রণ চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত ডক্সিসাইক্লিন একটি চমৎকার ওষুধ। এরিথ্রোমাইসিন খেয়ে যদি ব্যাকটেরিয়া রেজিস্ট্যান্ট হয় সে থেকে ডক্সিসাইক্লিন একটি অত্যন্ত কার্যকর ওষুধ।

এরিথ্রোমাইসিন বা ক্লিনডামাইসিন : গর্ভবতী মহিলারা যখন টেট্রাসাইক্লিন খেতে পারে না তখন এরিথ্রোমাইসিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ক্লিনডামাইসিনও অন্য ওষুধের মতো একটি কার্যকর ওষুধ।
হরমোন থেরাপি : মহিলাদের ক্ষেত্রে সেবামের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যদি ওভারি থেকে এন্ডোজেন হরমোন তৈরি হয়। সে ক্ষেত্রে কম ডোজের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি মুখে খাওয়া যাবে যাতে থাকতে হবে নন-এন্ডোজেন প্রজেসটিন যা খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ধরনের হরমোন চিকিৎসাপদ্ধতি কোনো অবস্থায়ই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নেয়া যাবে না।

স্লাইরোনোল্যাকটন : এন্টি-এন্ডোজেনিক উপাদান; যেমন- স্লাইরোনোল্যাকটন সেবাম উৎপাদন কমিয়ে দিতে সক্ষম। ফলে এটি মহিলাদের ব্রণের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ওষুধ। তবে এটিও কোনো অবস্থায়ই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া উচিত নয়।

আইসোট্রিটিনয়েন : আইসোট্রিটিনয়েন আবিষ্কারের ফলে ব্রণ চিকিৎসায় ভিটামিন ‘এ’-এর ব্যবহার এখন একটি ঐতিহাসিক সফলতার দাবিদার। যেকোনো ধরনের ব্রণের ক্ষেত্রেই এর ব্যবহারে সফলতা আসে। তবে দাম বেশি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার করা হয় না। মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারে দারুণ সতর্কতার প্রয়োজন। কেননা শিশুর ওপর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এটি একদমই ব্যবহার করা যাবে না।

অপারেশনপদ্ধতি : ব্রণের কমিডোন (কালো দাগ) পাকা ব্রণ ও সিস্ট-জাতীয় ব্রণের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কার্যকর। স্কালপেল দুই নম্বর ব্লেডের সাহায্যে এই ছোট অপারেশনটি করতে হয় এবং কমিডো এক্সট্রাক্টরের সাহায্যে ব্রণ বা কমিডোনের উপাদান বের করে দেয়া হয় এবং এতে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যায়।

লেখক : চর্ম, অ্যালার্জি ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ

চেম্বার : আলরাজী হাসপাতাল, ১২ ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন : ০১৮১৯২১৮৩৭৮

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.