কান উৎসবে বাংলাদেশের ছবি
কান উৎসবে বাংলাদেশের ছবি

কান উৎসবে বাংলাদেশের ছবি

আলমগীর কবির, কান, ফ্রান্স থেকে

রোববার ঝুম বৃষ্টির ঘণ্টাখানেক পর কানের আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। আর সোমবার সকাল ১০টা থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি ঝরছে, অনেকটা আষাঢ়ের বাদলার মতো। এতে অবশ্য চলচ্চিত্র উৎসবের সূচীর কোনো পরিবর্তন হয়নি। উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনে সব কিছুই চলছে নিয়ম মেনে, শুধু প্রেস রুমের ভিড়টা অন্যদিনের চেয়ে বেশি। বিশ্ব চলচ্চিত্রাঙ্গনের বাঘা-বাঘা তারকাদের উপস্থিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শন, সংবাদ সম্মেলন, রেড কার্পেটে হাঁটাসহ সবই আগের দিনের মতো। তবে আসরের সপ্তম দিনটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ। কারণ এই দিন থেকেই শুরু হয়েছে শর্ট ফিল্ম বিভাগে ছবি প্রদর্শনী। যেখানে বাংলাদেশের ৪টি ছবি দেখানো হবে।

যেহেতু কানে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলাদেশি ছবির অফিশিয়াল সিলেকশন এখনো সম্ভব হয়নি তাই স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগের ছবি গুলোই বাংলাদেশকে চেনাবার একমাত্র উপায়। বাংলাদেশ থেকে এবার এ উৎসবের শর্টফিল্ম কর্নারে প্রদর্শনীর জন্য মনোনীত হয়েছে চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছবিগুলো হলো— জসিম আহমেদ নির্মিত ‘এ পেয়ার অব স্যান্ডাল’, নোমান রবিন নির্মিত ‘এ কোয়ার্টার মাইল কাউন্ট্রি’, ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর ‘রোয়াই’ ও মঞ্জুরুল আলমের ‘মেঘে ঢাকা’ (লাইফ উইদাউট সান)।

এ বিভাগে সারা বিশ্ব থেকে মোট ১ হাজার ৬৭২টি ছবি প্রদর্শিত হবে। উল্লেখ করতে হয়, কানের শর্টফিল্ম কর্নারে গতবার প্রথমবারের মতো দুটি ছবি নিয়ে হাজির হয়েছিল বাংলাদেশ। ছবি দুটো ছিল ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর নিরীক্ষামূলক থ্রিলার ঘরানার ছবি ‘ঢাকা ২.০০’ ও জসিম আহমেদের ‘দাগ’।

কোয়ার্টার মাই কান্ট্রি
‘অ্যা কোয়ার্টার মাইল কান্ট্রি’ ছবির দৈর্ঘ্য ৩৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের এ তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন নোমান রবিন। ছবিটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে বেঙ্গল মাল্টিমিডিয়া ও তানভীর সেজান ফিল্মস। উখিয়ার থ্যাংখালী, বালুখালীতে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত ক্যাম্পে, ক্যাম্প থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একজন প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে এবং কক্সবাজারের হিমছড়ির পুলিশ ফাঁড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় এ তথ্যচিত্রটির দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। তবে এই দৃশ্য ধারণ খুব সহজ ছিল না। এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে পুরো ‘অ্যা কোয়ার্টার মাইল কান্ট্রি’ টিমকে। রিফিউজি ক্যাম্পজুড়ে ছিল শুধু মানুষ আর মানুষ। প্রত্যেকের উৎসাহী ও কৌতূহলী দৃষ্টি ভেদ করে চিত্র ধারণ সহজ হলেও, ফিকশন নির্মাণ করা ছিল অকল্পনীয়। এ কঠিন কাজটিই করে দেখিয়েছেন রবিন এবং তার পুরো টিম।

১১ মিনিটের ‘মেঘে ঢাকা’
নির্মাতা মনজুরুল আলম নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা’ (LIFE WITHOUT SUN) অংশ নিচ্ছে ৭১তম কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শর্ট ফিল্ম কর্নারে। এ ছবির মূল চরিত্রটির নাম সুবিধাবঞ্চিত শিশু হাবু। সে গ্রামের তাঁতশ্রমিক। পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবাকে নিয়েই তার পৃথিবী। হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ে তাঁতশিল্প এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গ্রামে বেঁচে থাকার অবলম্বন না দেখে বাবাকে নিয়ে হাবু কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসে। সেখানেও বাবাকে নিয়ে এক নতুন ঝড়ের মুখে পড়ে সে।
ছবিটি নিয়ে নির্মাতা বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, একে একটি মানবিক গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছি।’

ছবিটির শুটিং হয়েছে পাবনার আটঘরিয়া, রাজধানীর হাতিরঝিল, তেজগাঁও রেলস্টেশন, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন স্থানে।

মুঠোফোনে নির্মিত ‘আ পেয়ার অব স্যান্ডাল’
ছবিটির দৈর্ঘ্য মাত্র চার মিনিট। রোহিঙ্গা শিশুকে নিয়ে এগিয়েছে এ ছবির গল্প। তবে সেই ছবির মূল বিষয়বস্তু একজোড়া স্যান্ডেল। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে নিজের আইফোনে তোলা এই একটি শট পরিচালক জসীম আহমেদকে আলোড়িত করেছিল। সেই দৃশ্যটিই হয়ে গেল পুরো চলচ্চিত্রের মূল বিষয়বস্তু।

জসীম আহমেদ বলেন, ‘আ পেয়ার অব স্যান্ডাল’ ছবিটি পুরোটাই ধারণ করা হয়েছে আইফোনে, এমনকি এর এডিটিং পর্যন্ত করা হয়েছে আইফোনের আই-মুভিস অ্যাপ দিয়ে। পুরো ছবিতে কেবল শরণার্থীদের ঢল, তাদের দুর্ভোগের ছবি তুলে ধরা হয়েছে। কোনো সংলাপ নেই। ইংরেজি সাবটাইটেলে বর্ণনা করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের কাহিনি। ছবিটি কান উৎসবের শর্ট ফিল্ম কর্নারে জায়গা করে নিয়েছে এ বছর।

ব্রেক্সিট নিয়ে ছবি ‘রোয়াই’
ব্রেক্সিট-পরবর্তী লন্ডন। সেখানে ঘটনাচক্রে আটকে পড়েছেন এক রোহিঙ্গা। কী লেখা আছে তাঁর ভাগ্যে? এ রকম গল্প নিয়ে ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর লেখা ও পরিচালিত ১৪ মিনিট ব্যাপ্তির স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি রোয়াই। ছবিটি এবার প্রদর্শিত হবে কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শর্ট ফিল্ম কর্নারে। ইকবাল হোসাইন চৌধুরী বলেছেন, ‘অভিবাসন সংকট সারা পৃথিবীতেই সব সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। রোয়াই আসলে অভিবাসী মানুষের দ্বন্দ্ব ও সংকটের গল্প।’ কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দো ফাস্তিভালে ১৬ মে সন্ধ্যায় প্রদর্শনী হবে বলে জানিয়েছেন এর পরিচালক। ছবিতে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশ, স্পেন, রোমানিয়াসহ নানা দেশের কলাকুশলীরা।
ছবির সাউন্ড ডিজাইন করেছেন ইংল্যান্ডের মাইকেল বটরাইট। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনায় ছিলেন নিশান পাশা।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.