ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ : ফলাফল অস্পষ্ট
ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ : ফলাফল অস্পষ্ট

ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ : ফলাফল অস্পষ্ট

পিটার বিউমন্ট

আসল প্র্রশ্ন হলো- যেসব বদ্ধমূল ধারণার ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ শাসন চলছে তা কি বদলে গেল? সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার বৈরিতা যদি চমকে দেয়ার মতো হয়, তবে ভাবনার বিষয় হলো ঘটনা যতটুকু ঘটেছে তা আসলে খুব কমই। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে, ইসরাইলি কর্মকর্তারা ইরানি হুমকি এবং ‘উত্তরাঞ্চলে’ একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন।

ইসরাইলের কর্মকর্তারা উত্তরের সীমান্ত পরিস্থিতির বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের টমাস ফ্রিডম্যানও অন্যান্য শীর্ষপর্যায়ের সাংবাদিকদের অবহিত করেছেন। সেই সাথে ইসরাইলের চিন্তকরাও ইরানের সাথে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে চলেছেন।

ইসরাইলের সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবিগুলোকে ইরানের ‘নতুন প্রযুক্তিগত দিক’ হিসেবে তুলে ধরছে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো। আর এভাবেই শুধু এক পক্ষের বাজানো যুদ্ধের দামামা বিগত এক সপ্তাহের উত্তেজনার প্রেক্ষাপট তৈরি করতে বাধ্য করেছে।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে নমনীয় করার এই যে বাস্তবতা, এর সাথে কাকতালীয়ভাবে যোগ হয়েছে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা সীমিত করে রাখতে যৌথ সমন্বিত পরিকল্পনা কার্যক্রম থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। এটি সহায়ক হয়েছে ইসরাইলের পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে। এর অর্থ হলো, এই চরম উত্তেজনার জন্য কে দায়ী, তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা একেবারেই সংশয়পূর্ণ এবং বদ্ধমূল ধারণার বাইরে। সহিংসতা ও সঙ্কট ছড়িয়ে পড়ার জন্য কে দায়ী, এই চিন্তা করলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় দেখতে হবে যে, ইসরাইল বহু বছর ধরে বিনা কারণে সিরিয়ায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছর ইসরাইলের আকাশসীমায় একটি ইরানি ড্রোন অনুপ্রবেশ করার আগে পর্যন্ত এই হামলার সংখ্যা সম্ভবত কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

ওই সব হামলার সময় প্রথম প্রথম বলা হতো, হিজবুল্লাহ কাছে অস্ত্রভাণ্ডার ও মিসাইল সরবরাহের জন্য মজুদ করা হয়েছে, এমন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। বর্তমানে এমন অভিযোগের সংখ্যা আরো বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। কয়েক সপ্তাহে দেখা যাচ্ছে, ইরানকে একের পর এক উসকানি দিচ্ছে ইসরাইল। এমনকি সিরিয়া যুদ্ধে হতাহত হওয়া ইরানিদের রক্ষায় নিয়োজিত পরামর্শকদেরও লক্ষ্য বানাচ্ছে তারা। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর তৎপরতা, বিশেষ করে গত কয়েক সপ্তাহের কার্যক্রম দেখে সহজেই বোঝা যায়, এসবই করা হচ্ছে পেছনের কারো সঙ্কেত পেয়ে এবং নিতান্তই উদ্দেশ্যমূলকভাবে।

উত্তরাঞ্চলীয় সীমানায় শত্রুপক্ষের যেকোনো পদক্ষেপ রুখে দিতে আগেই আক্রমণ চালানোসহ ইসরাইলের যে প্রতিরক্ষা কৌশল তা নির্ভর করে এমন একটি নীতির ওপর, যা ইসরাইলি জনগণের ওপর আক্রমণ চালায় এমন যেকোনো উল্লেখযোগ্য হুমকি প্রতিরোধ করে। কিন্তু ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কাজের স্বাধীনতা সীমিত করে দেয়- এমন যেকোনো বিষয়ও একইভাবে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক এসব অভিযানে অংশ নেয়া সেনাদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণে এসব কথা বলেছেন ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগদর লিবারম্যান। তিনি বলেন, আমরা এক নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছি। হিজবুল্লাহর সহযোগিতায় লেবাননের সেনাবাহিনী, সিরীয় সেনাবাহিনী, সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া এবং সর্বোপরি ইরান এরা সবাই মিলে ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আর এসব কারণেই সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রভাবে উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা কেমন? প্রশ্নের অবকাশ নেই যে, সিরিয়ায় খুব দ্রুতগতিতে প্রভাব বাড়াচ্ছে ইরান। লেবাননের হিজবুল্লাহর জন্য ইরানের বিভিন্ন সহযোগিতা ইসরাইলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তেহরানের যুদ্ধ পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি, উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং এ কার্যক্রম ক্রমেই বাড়ছে।

বেশ কয়েক দফা ইসরাইলি হামলার পরও প্রথমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ইরান পাল্টা কোনো জবাব দেয়নি। বিশেষ করে ইরাক-ইরান যুদ্ধের পর থেকে তারা এমন নীতি নিয়েছে এবং যতটা সম্ভব, সম্মুখযুদ্ধ এড়িয়ে চলছে। তারপরও ইরান প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়েছে এবং পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে এই কৌশলে, যেন তা ইরাক ও ইয়েমেন থেকে লেবানন ও সিরিয়া পর্যন্ত আরো ভালো ফল বয়ে নিয়ে আসে। ইরান এসব দেশে শিয়া স্বার্থ হাসিল করার জন্য এরই মধ্যে ব্যাপক হস্তক্ষেপও করেছে। এর বাইরেও, ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে ইরানের কার্যক্রম ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে এবং চরম সাহসিকতা দেখানোর মতো সবই তারা করছে।

এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে এমন, সিরিয়া যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি দেখে ইসরাইল সত্যি সত্যিই নিজে যেমন ভুল হিসাব-নিকাশ করেছে একইভাবে তেহরানও তা বুঝতে সক্ষম হয়নি। ধরেই নেয়া হয়েছে যে, দেশটির এই গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার কারণে হিজবুল্লাহ চরমভাবে মার খাবে এবং দুর্বল হয়ে পড়বে।

হিজবুল্লাহ ও ইরান সমর্থিত বাশার আল আসাদের সেনাবাহিনীর তৎপরতা এবং রাশিয়ার হস্তক্ষেপে এই যুদ্ধের ফলাফল আসাদের পক্ষেই যাচ্ছে। আর এটা এই অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতির সময়সীমা বাড়াতে এবং একই সাথে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়া ইসরাইলকে দীর্ঘমেয়াদে মোকাবেলা করার আরেক সুযোগ হিসেবে নিয়েছে ইরান, যেখানে সীমান্তের ঠিক ওপাশেই এক দীর্ঘ লক্ষ্য নিয়ে অবস্থান নিয়ে আছে ইরানি পরামর্শকেরা।

এখন আসল প্রশ্ন হলো, সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে, যেসব বদ্ধমূল ধারণার ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার শাসন চলছে তার ধরন কি বদলে গেল? রাশিয়া শান্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। তেহরানও সাবধান হয়ে যাবে এ কারণে যে, ইসরাইলের সাথে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হলে অনিশ্চিত একজন নেতার নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের তেলআবিবের পক্ষ নেয়ার ঝুঁকি বাড়বে। কেননা এই নেতার চার পাশের প্রভাবশালী প্রায় সবাই চরম ইরানবিরোধী হিসেবে পরিচিত। সম্ভবত এমন হিসাবের মারপ্যাঁচের খেলা ইসরাইলও খেলছে।

যখনই এমন পরিস্থিতি সামনে চলে আসে, দীর্ঘ দিন ধরে প্রস্তুত হয়ে থাকা, ইসরাইলি সেনাবাহিনী তখন চাইবে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ বাধুক। ২০০৬ সালের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পর ইসরাইলের পরিকল্পিত সময়ে তাদের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে হিজবুল্লাহ অবশ্যই এখন বেশ সতর্ক। তবে এর কোনো কিছুই পরিস্থিতির ভয়াবহতা কমাতে পারবে না, তা সে দীর্ঘ মেয়াদেই হোক আর স্বল্প মেয়াদেই হোক।

লেখক : দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্টার। আফ্রিকা, বলকান ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহিংসতাপূর্ণ এলাকায় গিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন। ইরাকের সহিংসতার খবর প্রকাশ করে তিনি জর্জ অরওয়েল পুরস্কারে ভূষিত।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর করেছেন
মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.