শিয়া বোউ
শিয়া বোউ

দুই পা নেই, তবুও অদম্য শক্তি নিয়ে এভারেস্ট জয়

বিবিসি

চল্লিশ বছর আগে এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে গিয়ে ফ্রস্ট বাইটে অর্থাৎ প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে দুটো পা-ই হারাতে হয়েছিলো শিয়া বোউকে। তার পরও স্বপ্ন পূরণে পেছ পা হননি তিনি। আজ সোমবার সকালে ৬৯ বছরের এই চীনা নাগরিক ২৯,০২৯ ফুট উচ্চতা অতিক্রম করে এভারেস্টর চূড়ায় পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছেন।

রেকর্ড গড়েছেন তিনি, কারণ এর আগে দুই পা নেই এমন কেউ নেপালের দিক থেকে এভারেস্টর চূড়ায় উঠতে পারেনি।

২০০৬ সালে দুই পা হারানো আরেক পর্বতারোহী নিউজিল্যান্ডের মার্ক ইঙ্গলিস। এভারেস্টে উঠেছিলেন তিব্বতের দিক থেকে, যেটাকে অপেক্ষাকৃত সহজ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

১৯৭৫ সাল থেকে শিয়া বোউ এভারেস্টে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। গত বছর নেপালের সরকার যখন দুই-পা কাটা এবং অন্ধদের জন্য এভারেস্টে ওঠা নিষিদ্ধ করে দেয়, চরম হতাশায় পড়ে গিয়েছিলেন তিনি।

বেস ক্যাম্পে শিয়া বোউ

 

তবে এ বছর মার্চ মাসে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট সরকারের ওই নিষেধাজ্ঞা বেআইনি ঘোষণা করলে, এপ্রিল মাসে তিনি পঞ্চমবারের মত এভারেস্ট অভিযান শুরু করেন।

অভিযান শুরুর আগে তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছিলেন, "এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা আমার স্বপ্ন। আমাকে এই স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে। ব্যক্তিগতভাবে এটা আমার জন্য এটা চ্যালেঞ্জ, আমার দুর্ভাগ্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ।"

শেষ পর্যন্ত সোমবার সকালে তিনি তার স্বপ্ন পূরণে সক্ষম হন।

শিয়া বোউ ১৯৭৫ সালে তার প্রথম অভিযানে এভারেস্টর চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে ফ্রস্ট-বাইটে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেই অসুস্থতার জেরে পায়ে ক্যান্সার হওয়ায় ১৯৯৬ সালে হাঁটুর নীচ থেকে তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়।

এরপর ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে তিনি আবার অভিযানের জন্য নেপালে আসেন, কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ অবহাওয়া এবং দুর্ঘটনার জন্য নেপাল সরকার দুইবারই পর্বতারোহন বন্ধ রেখেছিল।

২০১৬ সালেও মাত্র ২০০ মিটার ওঠার পর খারাপ আবহাওয়ার কারণে তাকে ফিরে আসতে হয়েছিল। এক বছর বাদে আবার তিনি আসেন এবং এভারেস্ট জয় করেন।

 

বাবা-মেয়ের হৃদয়ছোঁয়া গল্প

যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। যুদ্ধ কেড়ে নেয় অনেক কিছুই। কেবল নেয় না, দেয়ও কিছু। হাজারো ধ্বংসের মধ্যেও যুদ্ধে কখনো বা সৃষ্টি করে র। কোরিয়ার ছোট্ট এক অনাথ বালিকা ও এক তুর্কি সেনার জীবনে এমনই এক কাহিনীর অবতারণা হয়েছে। ৬০ বছর আগে কোরীয় যুদ্ধের সময় এ ঘটনা ঘটে।

পুরো দেশ যখন যুদ্ধে লিপ্ত, মানুষের পেছনে ফিরে তাকানোর সময় ছিল না, তখন পাঁচ বছরের ছোট্ট একটি মেয়ে শীতে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, ভীত চাহনিতে দেখছিল চার দিক। ১৯৫০ সালের সেই শীতে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ৩৫ ডিগ্রিতে। মেয়েটির গায়ে তখন ছেড়া জামা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ছিন্ন বস্ত্র গায়ে। মেয়েটি কাঁদছিল গলা ফাটিয়ে। কিন্তু তার প্রতি নজর দেয়ার মতো কেউই ছিল না। ছোট্ট মেয়েটির ক্ষুদ্র জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সে সময়ে তাকে আশ্রয় দেন তুরস্কের এক সৈন্য। রণক্ষেত্রে একটি সামরিক দুর্গ, যেখানে হাজারো সৈন্যের অবস্থান, সে জায়গাটি নিশ্চিতভাবেই কোনো মেয়েশিশুর বড় হয়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত জায়গা নয়, তারপরও সুলায়মান সে স্থানটিতে মেয়েটির বাড়ির মতো অনুভূতি সৃষ্টির সব চেষ্টাই করেছেন। সেই সাথে তাকে দিয়েছেন বাবার স্নেহ। সেই ছোট্ট মেয়ে আইলা-পরবর্তীতে সুলায়মানের কাছ থেকে হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় ৬০ বছরের জন্য।

কোরীয় যুদ্ধ : ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সময়ে কোরীয় উপদ্বীপে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উত্তর কোরিয়ার ৭৫ হাজার সৈন্য সীমান্ত অতিক্রম করলে ১৯৫০ সালের ২৫ জুন সোভিয়েত সমর্থিত উত্তর কোরিয়ার সাথে পাশ্চাত্য সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পরে কোরীয় উপদ্বীপ উভয় পরাশক্তির ঠাণ্ডা যুদ্ধের একটি ক্ষেত্রে পরিণত হয়। যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহের শেষেই জাতিসঙ্ঘ দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সামরিক সহায়তার আহ্বান জানায়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের পরই এ আহ্বানে সাড়া দেয় তুরস্ক। তুরস্কের সেই ব্রিগেডে যুক্ত হয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী তরুণ যোদ্ধা সার্জেন্ট সুলায়মানও। সম্ভবত তিনি ভাবতেও পারেননি, সেখানে তার জীবনের কতটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হতে যাছে।

ভাগ্যের মোড় যখন ঘুরে : সেই দিনটিতে সুলায়মানের ব্যাটেলিয়নটি শত্রুর সাথে লড়াই করছিল। রাতের শেষভাগে যুদ্ধের তেজ তখন কমছে। তখনই তাদের পেছনের দিকে একটি ঝোপ নড়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই তুর্কি সৈন্যরা মনে করে সেখানে হয়তো কোনো শত্রুসৈন্য লুকিয়ে আছে। সবাই তাদের অস্ত্র তাক করে সেদিকে। সুলায়মান তখন অন্যদের পেরিয়ে একটু সামনে চলে যান শত্রুর মুখোমুখি হতে। কিন্তু শত্রুর জায়গায় তিনি দেখতে পান ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকা একটি ছোট্ট মেয়েকে। অঝোরে কাঁদছিল সে। তখন সুলায়মান তাকে তুলে নিয়ে আসেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরেন। মেয়েটি নিরাপদ অনুভব করার আগ পর্যন্ত এভাবেই থাকেন সুলায়মান। ওই মেয়েটির তখন কোনো পরিচয় ছিল না, কোনো বাড়ি ছিল না, জীবিত ছিল না পরিবারের কোনো সদস্যও। এ অবস্থা দেখে সুলায়মান তাকে ছেড়ে আসতে পারেননি। কোনো উপায় ছিল না, তারপরও সুলায়মান তাকে সাথেই রাখেন। তার দেখাদেখি অন্য তুর্কি সেনারাও তাকে গ্রহণ করে। তার দেখাশোনা করে। পুরো বাহিনীতে মেয়েটি হয়ে উঠেছিল আনন্দ ও সৌভাগ্যের প্রতীক। তখন কেবল সুলায়মানই তার বাবার মতো ছিলেন না, বরং পুরো ক্যাম্পটিই হয়ে ওঠেছিল তার পরিবার। সে সময় সুলায়মান তার নাম দেন ‘আইলা’।

মেধাবী ও বুদ্ধিমতি আইলা স্বল্প সময়ের মধ্যে তুর্কি ভাষা শিখে নেয়। ফলে সে সৈন্যদের জন্য দোভাষীর কাজও করতে পারত। দেড় বছর এভাবেই আইলা সুলায়মানের সাথে ছিল। কিন্তু প্রতিটি গল্পের যেমন শেষ আছে, তেমনি তাদের এ অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটে।

হৃদয়বিদারক বিদায় : যখন তুর্কি সেনাদের কোরিয়া ত্যাগ করে দেশে ফেরার সময় হয়, সুলায়মান আইলাকে তার সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আইনত এটি ছিল অসম্ভব। ফলে সুলায়মান দেশে ফিরে আসেন, আর আইলা চলে যায় আঙ্কারা স্কুল নামের এক অনাথ আশ্রমে। কোরিয়ার অনাথ শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য তুরস্ক সরকারের সহযোগিতায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর পর থেকে সুলায়মান সবসময়ই আইলার খোঁজে থাকতেন। ১৯৯৯ সালে যখন তুরস্কে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়, তখন দক্ষিণ কোরিয়া একটি উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছিল। সুলায়মান মনে করেছিলেন, সে দলের সাথে আইলাও থাকবে এবং তাকে খুঁজে বের করবে। তার সে আশা বাস্তবতা পায়নি। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা দেখানোর সময় একনজরে টিভির পর্দায় তাকিয়ে থাকতেন, যদি এক মুহূর্তের জন্য আইলাকে দেখা যায়। কিন্তু তার সে আশাও পূর্ণ হয়নি।

৮৫ বছর বয়সে কোরীয় যুদ্ধের ৬০ বছর পূর্তিতে সার্জেন্ট সুলায়মান দিলব্লিগি এক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তার এ ঘটনা অন্যান্য সহযোদ্ধা এবং তুর্কি ও কোরীয় কর্মকর্তাদের জানান। তার এ ঘটনা শোনার পর দক্ষিণ কোরিয়ার একজন সাংবাদিক আইলার সন্ধানে নামেন। তিনি সরকারি সব আর্কাইভেও আইলার খোঁজ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আঙ্কারা স্কুলের পুরাতন ভবন ভেঙে ফেলার সময় সেখানকার পুরাতন সব নথিও ধ্বংস হয়ে যায়। তার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। কোরিয়ার একটি টিভিও আঙ্কারা স্কুলের সাবেক সব শিক্ষার্থীর খোঁজখবর নিয়েছিল, কিন্তু তাতেও ইতিবাচক কোনো কিছু পাওয়া যায়নি।

আইলার সন্ধান লাভ : আইলার সন্ধানে যখন সব আশার বাতি নিভে যায়, তখনই এক ব্যক্তি দাবি করে, তার বোনের সাথে আইলার পরিচয় ছিল এবং তার অফিসিয়াল নাম কিম ইউনজা। ওই ব্যক্তির বোন যখন আইলার বাড়িতে গিয়েছিল, তখন আইলা তাকে পুরাতন সব ছবি দেখিয়েছিল। সে সময় সুলাইমানকে দেখিয়ে সে অশ্রুসজল চোখে বলেছিল, এই ব্যক্তিই আমার বাবার মতো। বিষয়টি আবিষ্কারের পর কোরিয়ান সরকার আইলার সাথে সাক্ষাতের জন্য সুলাইমানকে আমন্ত্রণ জানায়। ২০১০ সালে কোরিয়ার সেই আঙ্কারা স্কুলের পার্কে তাদের সাক্ষাৎ হয়, যেখানে ৬০ বছর আগে সুলাইমান আইলাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন। এরপর তারা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। চিঠিতে আইলা সুলাইমান দিলব্লিগিকে ‘বাবা’ এবং তার স্ত্রীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন।

আইলা : দ্য ডটার অব ওয়ার : তাদের এ কাহিনী নিয়ে ২০১৭ সালে নির্মিত হয়েছিল চলচ্চিত্র ‘আইলা : দ্য ডটার অব ওয়ার’। ছবিটি অস্কারের বিদেশী ভাষা ক্যাটাগরিতে তুরস্কের অফিসিয়াল মনোনয়নও পেয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত এটি পুরস্কার জিততে ব্যর্থ হয়, কিন্তু বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল ছবিটি। ছবিটির প্রমোশনের সময় আইলা ও সুলায়মানের মধ্যে বেশ কয়েকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়। তাদের শেষ সাক্ষাৎটি হয়েছিল ইস্তাম্বুলের এক হাসপাতালে যেখানে সাবেক সেনাকর্মকর্তা সুলায়মান শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সে সময় সুলায়মান তার হাত নাড়ানো ছাড়া আর কোনো নড়াচড়া করতে পারেননি। আইলা তখন তাকে অশ্রুসজল চোখে শেষবারের মতো ‘বাবা’ বলে ডেকেছিলেন। ৯১ বছর বয়সী বাবা সুলায়মান এবং ৭১ বছর বয়সী কন্যা আইলা সে সময়ই শেষবারের মতো বিদায় জানিয়েছিলেন একে অপরকে। শরীর বিভিন্ন অঙ্গ অকার্যকর হয়ে পড়ায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর মারা যান সুলায়মান।

তুরস্কের চোখের মণি : আইলা যদিও তার পালক বাবা সুলায়মানকে হারিয়েছেন, কিন্তু তিনি তুর্কি ও তুর্কি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। বরং তিনি নিজেই তুর্কির একটি অংশ হয়ে গিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়া সফরের শেষ দিনে আইলার সাথে দেখা করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। আইলা এখন দক্ষিণ কোরিয়ার তার সন্তান ও নাতি-নাতনির সাথে বসবাস করেন। সময় অনেক পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনো আইলা তুর্কি জনগণের চোখের মণি, সুইটহার্ট।

সূত্র : ডেইলি সাবাহ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.