জর্জ বেস্ট
জর্জ বেস্ট

বিস্ময়কর প্রতিভাধর হওয়ার পরও বিশ্বকাপ খেলা হয়নি এই তারকাদের

নয়া দিগন্ত অনলাইন

ফুটবলের শৈলী যার প্রশ্নাতীত, সে বিশ্বকাপে খেলুক আর নাই খেলুক, বিশ্ব ফুটবলে তার নাম স্থায়ী। কাজটা অত্যন্ত কঠিন কারণ মিডিয়াও বিশ্বকাপকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। তবে বিশেষ এই প্রতিভারা ক্লাব ফুটবলের অবদান।

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলার আলফ্রাড ডি স্টেফানোকে বলা হয় একজন ‘কমপ্লিট’ ফুটবলার। পঞ্চাশের দশকে ইউরোপে ফুটবলের ধারণাকে তিনি বদলে দিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগে (তদানীন্তন ইউরোপিয়ান কাপ) শুরু হলে ইউরোপকে স্তম্ভিত করে ডি স্টেফানোর নেতৃত্বে রিয়াল মাদ্রিদ প্রথম পাঁচ বছর একটানা শিরোপা জেতে। আর্জেন্টিনা, স্পেন ও কলম্বিয়া- এই তিন দেশের হয়েই তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলেন। ফুটবল বিশ্বে একমাত্র তিনিই এই নজির সৃষ্টি করেন। বিস্ময়কর প্রাচুর্য ছিল তার স্কিলের। নেতা হিসেবেও ছিলেন অদ্বিতীয়। ১৯২৬ সালে বুয়েনস আয়ার্সে তার জন্ম। ১৭ বছর বয়সে রিভার প্লেটে নাম লেখান। স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদে খেলেন ১১ বছর। লিগে পাঁচবার সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মান পান। পুসকাস ও ব্রাজিলের ভাভা ছিলেন তার সতীর্থ। ১৯৬২’র বিশ্বকাপ খেলার জন্য তিনি প্রস্তুত থাকলেও হঠাৎ আঘাতজনিত কারণে স্পেনের হয়ে তার আর বিশ্বকাপ খেলা হয়ে ওঠেনি। অনেকের কাছেই থেকে গেলেন অদেখা।

ব্রিটিশ ফুটবলের ইতিহাসে জর্জ বেস্টের মতো আলোড়ন সৃষ্টিকারী জনপ্রিয় ফুটবলার খুব বেশি আসেনি। ৬০-এর দশকে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলার সময় তিনি একজন ‘কাল্ট ফিগার’-এর সম্মান পান। তিনিই বিশ্বের প্রথম ফুটবলার, যার ‘পপ স্টার ইমেজ’ ছিল। বিখ্যাত বিটলসদের সাথেও তিনি পাল্লা দিতেন। একবার দুধ-সাদা প্লাইমাউথ গাড়ি একটি নাইট ক্লাবের বাইরে রেখে বান্ধবী নিয়ে তিনি যখন ঢুকছিলেন, অপেক্ষারত অসংখ্য যুবতী দেখামাত্র তাকে ধরে টানাটানি করতে শুরু করলে তিনি গাড়িতে ঢুকে পড়েন। তারপর ঘটল অবিশ্বাস্য কাণ্ড! তার গাড়িটাকে চুমু দিয়ে লালে লাল করে দিলো তরুণীরা। এক তিল জায়গা তারা খালি রাখেনি। বেস্টের এই জনপ্রিয়তার কারণ ছিল তার ফুটবল প্রতিভা। খ্যাতি শীর্ষে তিনি ছিলেন ইউরোপের সেরা ‘ক্রাউড পুলার’। চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল জীবন ছিল বেস্টের। অসংযম জীবন তার ফুটবল প্রতিভার ধার অনেকটাই নষ্ট করে দেয়। যেহেতু জাতিতে তিনি ছিলেন (নর্দার্ন) আইরিশ এবং তার সময়কালে উত্তর আয়ারল্যান্ড বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে টিকিনি পায়নি, তাই এই ‘এরাটিক জিনিয়াস’-এর কোনো দিনই বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। ১৯৮৩ সালে তার ফুটবল জীবন শেষ হয়ে যায়।

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ট্র্যাজেডির শিকার হলেন ব্রিটিশ ফুটবলার ডানকান এডওয়ার্ডস। ১৯৫৮ সালের মর্মান্তিক মিউনিখ বিমান দুর্ঘটনা ম্যানউই’র এক ঝাক তারকার সাথে ছিনিয়ে নেয় তাকেও। দুর্ঘটনার স্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্জীবিত হয়ে ফিরে আসেন একমাত্র ববি চার্লটন। বিশ্ব ফুটবলে ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে এ রকম স্টাইলিস্ট ফুটবলার খুব কমই দেখা গিয়েছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ম্যানউইর বিখ্যাত কোচ ম্যাট বুশবি তাকে ম্যানউইর পক্ষে সই করান। ওই বয়সেই দুই পায়ে দুর্দান্ত শট নিতে পারতেন। বাড়াতেন অবিশ্বাস্য সব থ্রু। ১৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলের উইং-পজিশনে তার সহজাত প্রতিভা দেখে বিশেষজ্ঞরা সবাই একবাক্যে ঘাড় নেড়ে বলতেন- ‘এ তো দেখছি স্ট্যানলি ম্যাথুজকেও ছাড়িয়ে যাবে’। মাত্র ২১ বছর বয়সে তার অকাল মৃত্যু না ঘটলে তিনি কি হতে পারতেন তা নিয়ে এখনও ওল্ড ট্রাফোর্ডের সান্ধ্য আড্ডায় তর্ক-বিতর্ক হয়। এই নির্মম মৃত্যু ইংল্যান্ড ফুটবলের অন্যতম সেরা রত্নটিকে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে দেয়নি।

৬০-এর দশকে ম্যাট বুশরির ম্যানউই ছিল স্বপ্নের দল। সেই দলের অন্যতম ছিলেন স্কটল্যান্ডের ডেনিস ল। ১৯৫৬ সালে হাডারসফিল্ড ক্লাবে ১৬ বছরের এক কিশোর ঢুকে ম্যানেজার শ্যাঙ্কলির কাছে দাবি জানান, তাকে একবার মাঠে ট্রায়ালের সুযোগ দিতে হবে। শ্যাঙ্কলি তাকে সুযোগ দিলেন। ল’-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি সেদিন কোচের চোখ এড়ায়নি। সুযোগ এলো হডারসফিল্ডের হয়ে খেলার। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ডেনিস ল স্কটল্যান্ডের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন। এরপর ১৯৬০ সালে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়ে ১৫ মাস পরে যোগ দেন ইতালির তুরিনো ক্লাবে। ব্রিটিশ ফুটবল ইতিহাসে প্রথম ৬ অঙ্কের পেমেন্ট গুণে ১ লাখ ১৬ হাজার পাউন্ডে তুরিনো থেকে ম্যানউই ফিরিয়ে আনে ল’কে। সেখানে প্রতাপের সাথে তিনি ৩০৯টি ম্যাচ খেলেছিলেন। তার সময়কালে স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপে উঠতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষুরধার এই ইনসাইড ফুটবলারের বিশ্বকাপ খেলা হয়ে ওঠেনি।

’৮০-র দশকে লিভারপুলের সাফল্যের অন্যতম কারিগর ছিলেন ‘গোলমেশিন’ ইয়ান রাশ। মূলত তার গোল ক্ষমতাই ’৮২, ’৮৩, ’৮৪ ও ’৮৬ সালে লিগ ও ’৮৬ এবং ’৮৯ সালে এফ এ কাপ জিততে লিভারপুলকে সাহায্য করে। ১৯৮০ সালে তার দেশ ওয়েলশ-এর হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন রাশ। তার সময়ে ওয়েলশ বিশ্বকাপে উত্তীর্ণ না হওয়ায় বিশ্বকাপে কোনও দিন তার গোল করার অসীম ক্ষমতা দেখায়।

আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম সেরা ফুটবল-প্রতিভা হলেন আবিদিন পেলে। ঘানার এই ফুটবলের জাদুকরটিকে আফ্রিকানরা অনেক সম্মান করতেন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খেলায় হেরে যাওয়ায় ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নভঙ্গ হয় তার ও তার দেশের দর্শকরাও বঞ্চিত হন এক উঁচুদরের ফুটবলারের শৈলী দেখা থেকে।

জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠা এরকমই আর এক আফ্রিকান ফুটবলার ছিলেন জর্জ ওইয়াহ। বার্সিলোনা, এসি মিলানের মতো ইউরোর বাঘা বাঘা ক্লাবে খেলা এই ব্যক্তি বিশ্বের সেরা ফুটবলার হওয়ার খেতাবও একবার জেতেন। নিজের দেশ লাইবেরিয়াকে বিশ্বকাপো মূল পর্বে তুলতে ব্যর্থ হলেও, বিশ্বকাপ না খেলেও নিজ প্রতিভার গুণেই তিনি জনপ্রিয়।

১৯৮৬-র মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর ’৯৮তেই ফ্রান্স প্রথম খেলে। মাঝের এই বারোটা বছর ইউরোপ মাতিয়ে রেখেছিলেন দুই ফরাসি ফুটবলার এরিক ক্যাতোয়া ও জ্যাঁ পিয়েরে পাপাঁ। ’৯১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিয়ে টানা সাতটি মওসুম কাটান এরিক। তার মাঝে পাঁচ বার তার ক্লাবকে লিগ জিতিয়ে ইংল্যান্ডের সেরা ক্লাব রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। ক্ষুরধার খেলা, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং ও নিখূঁত পাস তাকে বিখ্যাত করে তুলেছিল। পরে তাকে ম্যানউইর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ফুটবলার রূপে ভূষিত করা হয়।

ফ্রান্স, ইটালি ও স্পেনের বড় ক্লাবে খেলা পাপাঁর প্রতিভা নিয়ে কারো মনই সন্দেহ ছিল না। ১৯৯৬ সাল থেকেই ফরাসি লিগে জার্সির পেছনের নাম ও নম্বর লেখার প্রচলন ঘটে। সবার নাম লেখা থাকলেও তার জার্সিতে লেখা থাকত ‘জেপিপি’। নামের আধ্যক্ষরেই তিনি বহুল পরিচিত ছিলেন। আঘাতের সমস্যা ও অসম্ভব অসহিষ্ণু স্বভাব তার প্রতিভা বিকাশের প্রধান বাধা ছিল।

আধুনিক জাপানি ফুটবলের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার যিনি তার নাম কাজিইউমি মিউরা। তিনিই প্রথম এশিয়ান যিনি ইউরোপের সেরা লিগ হিসেবে পরিচিত সিরিএতে খেলেন জেনোয়া ক্লাবে। ’৮০-র দশকের শেষ থেকে ’৯০-র দশকের প্রায় শেষ পর্যন্ত তার ফুটবল জীবনের ব্যাপ্তি ঘটে। ’৯৮-র বিশ্বকাপে তার দেশ উত্তীর্ণ হলেও ‘বুড়িয়ে গেছেন’- এই অভিযোগে তাকে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়া হয়নি।

রায়ান গিগস ও মার্ক বেলামি হলেন ওয়েলসের সবচেয়ে প্রতিভাবন ফুটবলার অতি দুর্বল ফুটবল দেশ হওয়ায় উজ্জ্বল এই দুই ওয়েলসেদের বিশ্বকাপে দেখা হলো না। ফিনল্যান্ডও যদি খুব দুর্বল ফুটবল দেশ না হতো তবে তাদের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ দুই ফুটবলার জারি লিটম্যানেন ও সামি হইপিয়াকে দেখার সৌভাগ্য দর্শকদের ঘটত।

বর্তমান বিশ্বে এ রকম বহু প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার আছেন বিশ্বকাপের মাটিতে আজও যাদের খেলার সৌভাগ্য হয়নি। এ সব ফুটবলার যদি বিশ্বকাপ খেলতেন তবে এদের বিস্ময়কর প্রতিভা সম্পর্কে অবশ্যই অনেক বেশি জানা যেত। কিন্তু তাই বলে তাদের প্রতিভা আটকে থাকেনি। তার বিচ্ছুরণ ঘটেছেই।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.