সোহরাওয়ার্দী কি উর্দুর সমর্থক ছিলেন?
সোহরাওয়ার্দী কি উর্দুর সমর্থক ছিলেন?

সোহরাওয়ার্দী কি উর্দুর সমর্থক ছিলেন?

মো: ইখতিয়ার উদ্দিন রিবা

কিছু দিন আগে নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক কলমে প্রবীণ কলামিস্ট অধ্যাপক এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন, ‘১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের হায়দরাবাদে এক জনসভায় দেয়া ভাষণে সোহরাওয়ার্দী বলেছেন, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তদনুসারে উর্দুই হতে হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ বক্তব্যটির সংশ্লিষ্ট রেফারেন্স বইয়ের নাম লেখকের কাছে জানতে চেয়ে গত ২৮ এপ্রিল একই দৈনিকের চিঠিপত্র কলামে জনৈক আইনজীবীর অনুরোধ আমার নজরে এসেছে। এ বিষয়ে কিছু ঐতিহাসিক তথ্যের উল্লেখ করা গেল।

১৮৬৭ সালে ঠাকুর (রবীন্দ্রনাথ) পরিবারের সম্পৃক্ততায় কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় ‘হিন্দু মেলা’, যার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু জাতির পুনঃঅভ্যুদয়। ওই বছরই স্যার সৈয়দ আহমদ খান বদলি হন বেনারসে, যেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই মেলা। উত্তর প্রদেশের গাজীপুর ও মুরাদাবাদ তার Scientific Society থেকে ইংরেজি ও উর্দুতে অনুবাদ হিসেবে প্রকাশিত শিক্ষার বইসহ দ্বিভাষিক পত্রিকায় মুসলমানের ব্যবহৃত উর্দুর পরিবর্তে হিন্দি ব্যবহারের দাবিতে তখন বেনারসে বিশিষ্ট হিন্দুদের আন্দোলন শুরু হয়। ফলে মর্মাহত হয়ে স্যার সৈয়দ খান ১৮৬৯-৭০ সালে লন্ডন সফরকালে মুসলিম ক্যামব্রিজের বাসনা বাস্তবায়িত করেন আলিগড়ে মুসলিম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
বম্বে হাইকোর্টের জজ বদরুদ্দিন তায়েবজি ১৮৮৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি হয়ে দলের প্রতি সমর্থন লাভের প্রত্যাশায় সৈয়দ আহমদ খানের কাছে লেখা চিঠির মাধ্যমে অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। নরেশ কুমার জৈনের Muslims Biographical Dictionary, vol-11, Page-176 মতে, ১৮৮৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ওই চিঠির উত্তরে অ্যালান অকটোভিয়ান হিউমকে (কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) উদ্দেশ করে সৈয়দ আহমদের লেখার বিশেষ দুটি লাইন ছিল, 'I obiect to every Congress, in any shape or form whatever, which regards India as one nation.' যা হোক্, সর্বপ্রথম তারই উত্থাপিত দ্বিজাতি তত্ত্বটি অঙ্কুরিত হওয়ার মূলে ছিল উর্দুর পরিবর্তে হিন্দি প্রতিষ্ঠার দাবি।

এবার গঠিত হলো ‘উর্দু রক্ষা সঙ্ঘ’। ১৯০০ সালের ১৮ আগস্ট লক্ষেèৗতে অনুষ্ঠিত এক সভার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্মের ছয় বছর আগের কথা। ড. রফিউদ্দিন আহমদের The Bengal Muslims, 1871-1906, নামক বইয়ের ১৩১ পৃষ্ঠার তথ্য মতে, ১৯১০ সালেই মুসলিম লীগ এক সভায়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে ‘ধর্মের পরে উর্দুই প্রধান বন্ধন’ বলে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। ড. ধুর্জটি প্রসাদ দে তার Bengal Muslims in Search of Social Identity, 1905-47 নামক বইয়ের ১৩১ পৃষ্ঠায় বলেছেন, ১৯২৬ সালের ২৬ জুলাই কলকাতায় মুসলিম ইনস্টিটিউটে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সর্ববাংলা উর্দু সঙ্ঘ।’ ১২৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ১৯৩৮ সালের ৩ এপ্রিল বর্ধমানের আসানসোলে মুসলিম লীগ সম্মেলনে শেরেবাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ঐক্য রক্ষার প্রয়োজনে উর্দুর ওপরে জোর দিয়ে সব মুসলমান বালকের জন্য উর্দুকে বাধ্যতামূলক দ্বিতীয় ভাষা করার অনুরোধ জানান। এর কয়েক মাস পরেই ১৯৩৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষাসংক্রান্ত ৫২তম সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেন, ' 'I am firmly of the opinion that urdu should be made compulsory for those muslim students who take Bengali as their vernacular. Besides, Mrs. Hasina Murshed and H. S. Suharawardy opined that the name of urdu and persian script of urdu were like the two iron-walls of defence of our cultural independence.'

বস্তুত ওই যুগে খ্যাতিমানদের কেউ উর্দু ভাষা, কেউ উদ্র্ু ও বাংলা উভয়কে, আবার কেউ বা শুধু বাংলা ভাষাকে সমর্থন করার তথ্য পাওয়া যায়। তবে স্বীকৃত তথ্য মতে, পুঁথির ভাষা তথা, বাঙালি মুসলমানের বাংলা যতটা উর্দুর ঘনিষ্ঠ, ততটাই বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা হিন্দি আবার ঘনিষ্ঠ। তাই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ব্যবহৃত বহু শব্দের মধ্যকার পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলায় বলতে ও লিখতে কি আমরা পুঁথির বাংলা পরিহার করব? ডা: দীনেশচন্দ্র সেনের লেখা, ১৯৪০ সালে প্রথম প্রকাশিত ‘প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান’ বই-এর ৬০ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত করা গেল। ‘বর্তমানকালে গোঁড়া হিন্দুরা দিবারাত্র যেসব উর্দু কি ফারসি শব্দ জিহ্বাগ্রে ব্যবহার করিয়া থাকেন, লেখনী মুখে তাহা বদলাইয়া তৎস্থলে সংস্কৃতি শব্দে প্রয়োগ করেন, এইরূপে- ‘হজম’ স্থলে পরিপাক বা জীর্ণ, ‘খাজনা’ স্থলে রাজস্ব, ‘ইজ্জৎ’ স্থলে সম্মান, ‘কবর’ স্থলে সমাধি, ‘কবুল’ স্থলে স্বীকার, ‘আমদানি’ স্থলে আনয়ন বা সংগ্রহ করিয়া আনা, ‘খেসারৎ’ স্থলে ক্ষতিপূরণ, ‘জমিন’ স্থলে ভূমি, ‘খানদান’ স্থলে পদ-প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি কথার প্রয়োগ করেন।’

বাংলা বলতে না পারা, ভারত ভাগের আগে উর্দু-হিন্দির বিরোধ, উর্দুর প্রতি সমর্থন এবং ১৯১০ সালে উর্র্দুকে মুসলমানের দ্বিতীয় বন্ধন বলে মুসলিম লীগের গৃহীত প্রস্তাব, ইত্যাদির নিরিখে উর্দুর পক্ষে বক্তব্য সোহরাওয়ার্দী দিয়ে থাকলেও তার বিবেচনায়, হয়তো বা সেটা তখন ছিল সঙ্গত ও স্বাভাবিক।
লেখক : ইতিহাস গবেষক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.