আট বছর ধরে চলছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ
আট বছর ধরে চলছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ

সিরিয়া প্রশ্নে একটি অপরিণামদর্শী প্রস্তাব

জো ম্যাকরন

এই দশকে ইয়েমেনেই কেবল সৌদি আরবের একমাত্র অসমাপ্ত যুদ্ধ নয়। ইয়েমেনে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সামরিক হস্তক্ষেপের আগে সৌদি আরবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান প্রিন্স বন্দর বিন সুলতান সিরিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে ২০১২ এবং ২০১৪ সালের মধ্যে গোপন অগ্রভাগে ছিলেন। এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য রিয়াদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে ইসলামিক স্টেটের পরাজয়ের পর একটি স্থিতিশীল বাহিনী হিসেবে কাজ করার জন্য আরব কোয়ালিশন গঠনের লক্ষ্যে হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পাম্পেও আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। আলোচনায় মিসর, বাহরাইন, জর্দান, কাতার, সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত সম্পৃক্ত রয়েছে। শান্তিরক্ষী বাহিনী এবং তহবিল বরাদ্দ নিয়ে এগিয়ে এসে এসব প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র রিয়াদকে একটি ‘প্রধান নন-ন্যাটো’ মিত্রের মর্যাদা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। কেন এই প্রস্তাব দেয়া হলো? যেকোনো সময় এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে সিরিয়ার পরিস্থিতির খুব সম্ভবত আরো মারাত্মক অবনতি ঘটবে।

হোয়াইট হাউজের হিসাব-নিকাশ : এবার সৌদি আরব সিরীয় সরকারের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য বিমান হামলায় অংশ নেয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছিল; হোয়াইট হাউজ তাতে সম্পৃক্ত হয়নি। অধিকন্তু, গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প সৌদি আরবের প্রতি ৪০০ কোটি ডলার সরবরাহ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন সিরিয়ার পুনর্গঠনের জন্য। সৌদি আরব অবশ্য ওই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। অপর দিকে, আমেরিকা আশা করেছিল, সৌদি আরব জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে গৃহীত মার্কিন সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। রিয়াদে একটি ধারণা জন্মেছে যে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে কোনো বিনিময় ছাড়াই ট্রাম্প সৌদি আবরণ দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। সৌদি আরব আমেরিকার কাছ থেকে যা চাচ্ছে তা হলো- মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে বাধা দানের প্রতিশ্রুতি। কেবল এ মাসেই ট্রাম্প ওপেকের তেলের দাম বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিবাদ করেছেন। অথচ সৌদি আরবের বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তেলের দাম বাড়ানো খুবই প্রয়োজন। রিয়াদকে সিরিয়ায় তাদের বোঝা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য যখন আমেরিকা আহ্বান জানাচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি সম্পর্কে হয়তো এখনকার মতো উষ্ণ নাও থাকতে পারে ভবিষ্যতে।

২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত সিরিয়ায় সৈন্য পাঠানোর জন্য রিয়াদ আমেরিকাকে অনেকবার উৎসাহিত করেছে। কিন্তু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রশাসন এই মিশনের দায়িত্বভার গ্রহণ এবং এর সাফল্যে সৌদি অভিপ্রায়ের ব্যাপারে সতর্ক ছিল। বর্তমানেও এসব চ্যালেঞ্জ বজায় রয়েছে। আঞ্চলিকপর্যায়ে সাময়িকভাবে আরব জোটকে নেয়া যায়। তবে এই কোয়ালিশনের নেতৃত্বে সৈন্য মোতায়েন করা হলে এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে কোনো ম্যান্ডেট পাওয়া যাবে না।

আরব লিগ এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বর্তমানে অকার্যকর। ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএলের মোকাবেলা করার জন্য রিয়াদে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ৩৪টি সদস্য দেশের জোট বা কোয়ালিশন ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ওই জোট সত্যিকারের স্থলবাহিনীর তুলনায়, পাবলিক রিলেশন রক্ষার একটি স্ট্যান্টবাজি ছাড়া যেন আর কিছুই নয়।

আগের আরব শান্তিরক্ষা উদ্যোগে তেমন কোনো কার্যকারিতা পায়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৭৬ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধের সময় গঠিত আরব ডিটারেন্ট ফোর্সেস সম্পূর্ণরূপে একটি সর্বনাশা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। এই ফোর্সটি সিরীয় সরকারের দখলদারিত্ব আড়াল করার কাজে ব্যবহৃত হয়। অধিকন্তু, এই প্রস্তাবের সাথে জড়িত কুশীলবেরা লক্ষ্যের বিষয়টি জানায়নি। যুক্তরাষ্ট্র আইএসকে পরাজিত করে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে স্থিতিশীল করার ব্যাপারে আলোকপাত করেছে। অপর দিকে, জোটের কয়েকটি আরব অংশীদার এই প্লাটফর্মকে সিরীয় সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে অথবা ইরানকে বাধা দিতে যে ব্যবহার করবে না সেটা স্পষ্ট নয়।

জিসিসি সঙ্কটের সমাধান ব্যতীত আমিরাতি এবং কাতারি সৈন্যদের সিরিয়ার যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়ে গেলে সেটা হবে ত্রুটিপূর্ণ মিশন। ইয়েমেনি মডেলে দেখা গেছে যে, এমনকি সৌদি এবং আমিরাতিদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকতে পারে। গত জানুয়ারিতে এডেনে যে অভ্যুত্থানের প্রয়াস চালানো হয়েছিল সেটা এর একটি উদাহরণ।

দামেস্কের সাথে ন্যূনতম সম্পর্ককে বিপন্ন করতে মিসর খুব সম্ভবত সৈন্য প্রেরণ করবে না। আম্মান এটা দীর্ঘ দিন ধরে স্পষ্ট করেছে যে, দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে জর্দানের কোনো সৈন্য সিরিয়ায় সরাসরি প্রবেশ করবে না। সেখানে আম্মান সামরিক বাহিনী পাঠাবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।
অন্য যেসব ধারণা দেয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- অখ্যাত মার্কিন সামরিক ঠিকাদার ব্ল্যাক ওয়াটার অথবা আঞ্চলিক বেসরকারি যোদ্ধাদের চাকরি আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রদান করা।
তুরস্ক রাশিয়া এবং এসডিএফ সম্পর্ক

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, শুধু আরব অংশীদারদের সাথে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করাটা একটা ব্যর্থ প্রয়াস। লাইসেন্সদাতারা সম্মতি ছাড়া সিরিয়ায় মার্কিন উপস্থিতি হস্তান্তরের অযোগ্য লাইসেন্স। সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাহিনী সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সের (এসডিএফ) সাথে ওয়াশিংটনকে আলোচনা করতে হবে। তুরস্ক এবং রাশিয়ার সাথে নীরবে কোনো সমঝোতা না হলে আরব কোয়ালিশন একটি ল্যান্ড মাইন ফিল্ডে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এসব সৈন্যকে রক্ষা করার জন্য অব্যাহতভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। আরব জোটের প্রধান মিত্র জর্দান ও ইসরাইল দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে রয়েছে এবং তাদের সাথে কোনো ভৌগোলিক সম্পর্ক নেই।

এই আরব কোয়ালিশনকে সিরীয় সরকার, ইরান, রাশিয়া, এসডিএফ এবং তুরস্ক দ্বারা ঘেরাও হয়ে একটি বৈরী পরিবেশে কাজ করতে হবে। আলোচনায় সম্পৃক্ত জোটের বেশির ভাগ আরব অংশীদার। তাদের সাথে উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী তুরস্কের সুসম্পর্ক নেই। কুর্দিবাহিনী যেখানে যুদ্ধ বা চুক্তি ছাড়া তাদের অবস্থান ত্যাগ করবে না, সেখানে সিরিয়ার বিরোধী পক্ষকে এসডিএফের সাথে একটি চুক্তি বা বোঝাপড়ায় আসতে সম্মত করাতে হবে সৌদি আরবকে।

এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সাথে রিয়াদকে কুর্দি গ্রুপের সাথে তার নিজের চুক্তির ওপর নিজেই আঘাত হানতে হবে। অন্যথায় সঙ্ঘাত বা যুদ্ধ বেধে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। আর যুদ্ধে সৌদি সৈন্যদের রেকর্ড ভালো নয়। মার্কিন সৈন্যরা বর্তমানে সিরিয়ায় তুরস্ক এবং এসডিএফের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে। আরব কোয়ালিশনও সিরিয়ায় একইভাবে উভয় সঙ্কটে পড়বে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছেÑ আরব কোয়ালিশনকে যে টার্গেট করা হবে না অথবা বিদ্রোহীদের নতুন করে অস্ত্র দেয়া হবে না, সেটা কে গ্যারান্টি দেবে?

ট্রাম্প মনে হয় কোনো সুস্পষ্ট আঞ্চলিক নীতি ছাড়াই মার্কিন সৈন্যদের সিরিয়া থেকে প্রত্যাহার করতে চান। আরব কোয়ালিশন পরিকল্পনা থেকে মনে হচ্ছে, তার উপদেষ্টারা সিরিয়া থেকে পুরোপুরি সৈন্য প্রত্যাহারকে বিলম্বিত করতে সময় ব্যয় করছেন। সৌদি আরব এই চুক্তি থেকে যা পাবে, তা হচ্ছে তাকে একটি বড় নন ন্যাটো মিত্রের মর্যাদা দেয়া হবে। এটা হবে একটি খারাপ চুক্তি। জর্দান ১৯৯৬ সালে এই মর্যাদা বা স্ট্যাটাস অর্জন করেছে। একটি প্রতীকী মর্যাদা ছাড়া এর কোনো মূল্য নেই। কারণ আমেরিকা জানে, ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আগেই তারা নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিয়েছে।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.