সুখের অসুখ

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

রাতেই মাকে জরুরি ভিত্তিতে শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। প্রেসারটা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। ঘেমে নেয়ে একাকার। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মায়ের কিছু হলে আমাদের পরিবারের কারোর কোনো হুঁশ থাকে না। চার দিকে রীতিমতো হুলস্থুল পড়ে যায়। আজো ব্যতিক্রম হয়নি। কথায় আছে, ‘মা নেই গৃহে যার, সংসার অরণ্য তার।’ সত্যি তাই, এক লহমা মা গৃহে না থাকলে এলোমেলো হয়ে যায় সব কিছু। ঘুম নিদ্রা সবার হারাম হয়ে যায়। আজো এমনটি হয়েছে। গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও সংশয় সবার চোখেমুখে। হতাশা ভর করছে ছোটবড় সবার মুখে। ছোট বোনটি রাতদুপুরেই রাজ্যের বিলোপ শুরু করে দিয়েছে। বাবা ডায়াবেটিস রোগী। কড়া নিয়মের মধ্য দিয়ে তাকেও চলতে হয়। বছরের প্রায় পুরোটা সময় ডাক্তার-বদ্যির কাছে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। অথচ আজ মায়ের সাথে অসুস্থ বাবাও চলে এসেছে। চুপটি মেরে বসে রয়েছে মায়ের হাত ধরে। ওই দিকে আমার বড় ভাই রাজ্যের টেনশন নিয়ে হাসপাতালের এমাথা-ওমাথা ছোটাছুটি করছে। ইতোমধ্যে হাসপাতালে আমার বড় আপা ও দুলাভাইও এসে উপস্থিত হয়েছে। দায়িত্বরত চিকিৎসক মাকে অনেকণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। আশ্বস্ত করেছেন সবাইকে। এখনই দুশ্চিন্তা হওয়ার মতো তেমন কিছু ঘটেনি। প্রেসারটাই একটু বেড়েছে এই যা। আর কিছু নয়। শরীরে আর কোনো রোগের আপাতত লণ নেই। কিছু পরীা-নিরীা ও চেকআপও ইতোমধ্যে করানো হয়েছে। বলার মতো কিছুই চোখে পড়েনি। মুহূর্তে স্বস্তি ফিরে আসে সবার চোখেমুখে। টানা সুখেও অসুখের প্রকোপ বাড়ে। কথাটা একদম সত্যি। মায়ের অসুখটা মনস্তাত্ত্বিক, শরীরী নয়। মায়ের সংসারে কোনো কিছুতে কমতি নেই। নেই কোনো অভাব-অনটন ও দুঃখ-কষ্ট। সর্বত্র সুখ-শান্তি উপচে উপচে পড়ছে। তবুও এক অজানা কারণে তিনি অসুখে ভুগছেন। দুশ্চিন্তা করছেন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নিয়ে।
।।২।।
নিবিড় তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে মাকে আরও আটচল্লিশ ঘণ্টা রাখতে হবে। ডাক্তারের এমনি নির্দেশনা। একটু বাড়তি সতর্কতা ও সাবধানতা নিতেই হচ্ছে। মাকে নিয়ে কোনো প্রকার রিস্ক নেয়া যাবে না। মা-ই আমাদের সংসারে একমাত্র মধ্যমণি। ছায়াদানকারী বটবৃ। যে বৃরে সুশীতল ছায়াতলে আমরা বরাবরই বেড়ে উঠছি। প্রতিনিয়ত পরিবারের সব সদস্যকে স্নেহ-মায়া ও মমতা দিয়ে আগলে রেখেছেন। নিবিড় বাঁধনে এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে রেখেছেন পুরো পরিবারটাকে। মায়ের দুই ছেলে হিসেবে সমাজে আমরা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। একমাত্র ছোট্ট বোনটিও উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করছে। রূপেগুণে ও মেধায় অতুলনীয়। কোনো অংশে কমতি নেই। বড় বোনটিকে দুই বছর আগে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেয়া হয়েছে। আপাও দুলাভাইকে নিয়ে বেশ সুখেই আছে। আমাদের ছোট্ট সংসার। সুখের কোনো কমতি নেই। তবুও মায়ের মনে ‘কু’ ডাক ডাকে। মায়ের মন বলে কথা। সবসময় ভীত তটস্থ থাকেন। অজানা আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তায় দানা বাঁধে। হাসপাতালে মাকে ঘিরে আমরা বসে রয়েছি। কারো মুখে কোনো সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ চোখের ইশারায় মা আমাকে কাছে ডাকে। আমি এগিয়ে যাই। মায়ের শিয়রে গিয়ে বসি।
‘খোকা ভয় পেয়েছিস’?
আমি নতমস্তকে মাথা নাড়ি। অস্ফুটস্বরে বলি।
‘হুঁ’
প্রগাঢ় মমতায় মা আমাকে কাছে টেনে নেয়। চুলে বিলি কাটে। চুমু খায়। আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে।
‘আমার কিচ্ছু হবে নারে খোকা। দুশ্চিন্তা করিস না। আমি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাব।’
‘মাগো, তোমার কিসের এত দুশ্চিন্তা? কিসের এত ভয়? আমাকে বল?’
মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসে। তারপর বলে,
‘খোকা তোরা এসব বুঝবি নারে, এই সংসারটাকে রক্ত পানি করে একটু একটু করে গড়িয়েছি। মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছি...।’
মা আর কথা বলতে পারে না। আবেগে গলা বসে যায়। দলা বেঁধে গলায় আটকে যায়। মাঝখানে বাবা ফোড়ন কাটে। মাকে উদ্দেশ করে বলে,
‘জেবু, এখন তোমার কিসের এত দুশ্চিন্তা? কিসের এত অসুখ?’
‘ওগো বুঝলে না তুমিও? আমার কোনো অসুখ নেই। এসব সুখের অসুখ। জীবনে এত সুখ একসাথে কখনও দেখিনি তো তাই।’
বাবা আর কথা বাড়ায় না। আমিও চুপটি মেরে রই। মা নীরবে চোখ মোছে। বেশি কথা বলা মায়ের পে বারণ আছে। আমার মায়ের নাম জেবুন্নেসা। বাবা জেবু বলেই মাকে ডাকে। সংসারের সব কিছু মা-ই দুই হাতে সামলান। পরিবারের ছোট্ট মানুষটি থেকে শুরু করে বাবার দেখাশোনাও মা-ই করে থাকে।
ছোটশরীফপুর, লালমাই, কুমিল্লা

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.