অবদান

জোবায়ের রাজু

গোপনে বিয়ে করে দুই মাস পর এক পড়ন্ত বিকেলে যখন সোনিয়াকে নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াই, মা তখন বাড়ি কাঁপিয়ে কাঁদলেন। মা চেয়েছেন এই ঘরের পুত্রবধূ হয়ে তার বোনের মেয়ে রিনা আসুক। কিন্তু রিনাকে আমর পছন্দ নয়। তা ছাড়া রিনা যে মোহন নামে একজনকে ভালোবাসে, তা আমি জানি।
চোখের জলকে বিসর্জন দিয়ে মা সোনিয়াকে মেনে নিয়ে সংসারের সব দায়িত্ব সোনিয়ার হাতে তুলে দিলেন। সংসারের বহমান নদী বইতে থাকার ছয় মাস যেতে-না-যেতেই উল্টো ¯্রােত। মায়ের সাথে সোনিয়ার বনিবনা হয়নি। কারণে-অকারণে দু’জনের বিবাদ। রাতে বাড়ি ফিরলে মায়ের নামে সোনিয়ার কত নালিশ শুনে শুনে আমার কান ভারী হয়।
‘আমি এখানে আর এক ঘণ্টাও থাকব না, আমার সাথে সংসার করতে হলে এখান থেকে আলাদা হতে হবে’Ñ সোনিয়ার এমন আবদারে আমি দিশা হারাই। শেষে উপায় না পেয়ে সোনিয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নিলাম। মায়ের বয়স হয়েছে, কাল বাদে পরশু মা মারা যাবেন, তখন তো সোনিয়াই আমার জীবনের সুখ-দুঃখের সাথী।
সেদিনই সন্ধ্যায় যখন সোনিয়াকে নিয়ে আলাদা সংসার পাততে শহরে চলে আসি, মায়ের গলা ফাটানো কান্নায় পুরো পাড়া কেঁপে উঠল। ‘বাপধন, আমাকে একলা রেখে চলে যাবি! এ জন্য তোকে বড় করেছি?’ না, মায়ের এসব আকুতি আমার কানে পৌঁছেনি।
২.
আমি এখন সোনিয়াকে নিয়ে শহরে। চারতলায় থাকি। এখানে আসার তিন মাস পর সোনিয়া সুখবর জানায়। আমি বাবা হবো। কিসের এক অজানা আনন্দে আমি সোনিয়াকে ধরে কাঁদলাম।
মাসের পর মাস পার হয়। সোনিয়া মা হওয়ার দায়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তিনবেলা করে আয়রন ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেতে হয়। কখনও কখনও বমি করে সারাঘর ভাসিয়ে দেয়। ডাক্তার বলেছেন, এ সময়ে ভারী কাজ করা যাবে না। তিনবেলা যেন মেডিসিন সেবন করে। মুঠো মুঠো ওষুধবড়ি গিলতে গিলতে সোনিয়া অস্থির হয়ে পড়ে।
সোনিয়ার সে অস্থিরতায় মাকে বড় মনে পড়ে। আচ্ছা আমার মা-ও কি গর্ভবতী হওয়ার পর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন! বমি করে সারা ঘর ভাসিয়ে দিয়েছিলেন!
৩.
এখন মধ্যরাত। হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছি। ভেতরে সোনিয়ার গলা ফাটানো চিৎকার। আমার সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে কঠিন যুদ্ধ চলছে সোনিয়ার। প্রসবের তীব্র ব্যথা আর চিৎকারে যেন পুরো হাসপাতাল দুলছে।
সোনিয়ার সে চিৎকারে মনে পড়ল আমার মাকে। আমাকে পৃথিবীতে আনার সময়ও মা কি এমন প্রসব বেদনায় চিৎকার করে আকাশ কাঁপিয়েছেন!
নবজাতকের কচি কণ্ঠের পবিত্র কান্নার শব্দ কানে বাজল। হ্যাঁ, আমার সন্তান পৃথিবীতে এসেছে। নার্স এসে জানাল, আপনার ছেলে হয়েছে। খুশিতে চোখে পানি চলে এলো।
৪.
ছেলের নাম রেখেছি আরাফ। ওর বয়স এখন চার মাস। ভারী সুন্দর রূপ নিয়ে জন্মালেও সে জন্ম থেকে রোগাটে। আজ জ্বর তো কাল কাশি। সন্তানের রোগমুক্তি লাভে সোনিয়া দিন-রাত নিবেদিত। কোনো কোনো মাঝরাতে অসুস্থ আরাফের বিকট কান্নায় আমার যখন রাতের ঘুম নষ্ট হয়, তখন সোনিয়া ছেলেকে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে আকাশের চাঁদ দেখায় আর ঘুমপাড়ানি গান শোনায়।
সোনিয়ার সেই ঘুমপাড়ানির গানের মধ্য দিয়ে আমার মাকে মনে পড়ে। শুনেছি জন্মলগ্ন থেকে আমিও রোগাটে ছিলাম। মধ্যরাতে অসুস্থ আমিও যখন এভাবে অন্যদের ঘুম নষ্ট করেছি, তখন কি আমার মা আমাকে এভাবে চাঁদ দেখিয়ে ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়েছেন? এটা ভাবতে গিয়ে বুকটা হু হু করে উঠল।
৫.
আরাফ দিন দিন বড় হচ্ছে। ওর সুন্দরভাবে বড় হওয়ার পেছনে আমার থেকে সোনিয়ার অবদান বেশি। ১০ মাস ১০ দিন পর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে সন্তানকে নিয়ে বেঁচে আসা সোনিয়া এখনো আমার সন্তান আরাফের আদর যতেœ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এ অবদানটুকু সোনিয়ার।
আমার আজ মাকে খুব মনে পড়ছে। দূরের গাঁয়ের কুঁড়েঘরে পড়ে থাকা মা এখন কেমন আছেন জানি না। একবারও তার খবর নেইনি। অথচ আমি এখন বড় সুখী মানুষ। এ সব কিছুর অবদান আমার মায়ের। একটি সন্তানকে ছোট থেকে বড় করার পেছনে তার মায়ের অবদান কতখানি, তা তো এখন সোনিয়াকে দেখে বুঝি। দিন-রাত সে আরাফের লালনপালনে বেশ দায়িত্বশীল। সব মায়েরা যে এমন দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন সন্তানদের বেলায়। না, আমি মায়ের কাছে যাব। তার কাছে ক্ষমা চাইব।
৬.
মনের কথাগুলো সোনিয়াকে ব্যক্ত করলাম, ‘চলো, মায়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাই। মা হয়ে তুমি যে কষ্ট করছ, আমার মা-ও তো একদিন আমাকে নিয়ে সে কষ্ট করেছে।’ আশ্চর্য, সোনিয়া টুঁ শব্দ না করে রাজি হয়ে গেল।
গ্রামের বাড়ি এসে শুনি মা নেই। চলে গেছেন কোনো এক বৃদ্ধাশ্রমে। গ্রামবাসী তাকে দূরের কোনো এক বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার বুকটা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। সোনিয়ার কোলে আরাফ কাঁদছে। আচ্ছা আরাফও কি একদিন এভাবে বেড়ে ওঠার পেছনে ওর মায়ের সব অবদানকে তুচ্ছ করে বউ নিয়ে অন্যত্র চলে যাবে! যেমনটি চলে গেছি আমি সোনিয়াকে নিয়ে।
আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.