আমার মায়ের স্মৃতি বড়ই বেদনার

সাইফুল ইসলাম তানভীর

আমার মনের মধ্যে দৃঢ়বিশ্বাস জন্মেছে যে, আমার মা জান্নাতের শ্রেষ্ঠস্থান জান্নাতুল ফেরদাউসে যেতে সক্ষম হবেন। (মহান আল্লাহ কবুল করুন) আমার নিজের মা, এ জন্য অতি আবেগপ্রবণ হয়ে এমনটা বলছি না। এ জীবনে আমার মা বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বহু কষ্ট করেছেন। পৃথিবীর জীবনে আমার মা সুখ-শান্তির মধ্যে কোন সময় ছিলেন না। আমার মা যেমনভাবে বাবার সম্পত্তি এবং বাবার পরিবার থেকে যথাযথ সম্মান পাননি। তেমনি আমার মা তার স্বামীর থেকেও যথাযথ হক পাননি। আমার শ্রদ্ধেয় বাবাকে এ কথা বললে তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। আমরা দুই ভাইও মায়ের যথাযথ যতœ নিতে পারিনি। মা আমাদের দুই ভাইকে নামাজ পড়তে বলতেন। ছোটবেলা থেকে আমি নামাজ আদায় করলেও বড় ভাই নামাজ পড়েন না। এটা বড়ই দুঃখজনক। কারণ আমরা এখন সরাসরি মায়ের সেবা করতে পারছি না। কিন্তু নামাজি না হয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার শেখানো শক্তিশালী একটি দোয়া আছেÑ সেটাও যদি না পড়তে পারি তাহলে আমাদের থেকে দুর্ভাগা আর কে হতে পারে? এখন (রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানিস সগিরা) এই দোয়া পড়ে সান্ত্বনা নিচ্ছি। ঠিকই সঠিক সময়ে খাওয়াদাওয়া করছি। পত্রপত্রিকা পড়ছি। অফিস করছি। কিন্তু মায়ের জন্য আমার কষ্ট কমে না। আমার মা নেই পৃথিবীতে। একসময় ভাবতাম (যখন মা পৃথিবীতে ছিলেন) আমার মা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে আমি কী করে পৃথিবীতে বেঁচে থাকব। কিন্তু তার পরও জান-প্রাণ নিয়ে বেঁচে আছি। দিন রাতের বেশির ভাগ সময় মায়ের কথা মনে পড়ছে। মাঝে মধ্যে আমার স্ত্রী আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে, কিন্তু আমি উত্তর দিতে ভুলে যাই। কারণ ওরকম অনেক সময় মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সকালে আমার শ্রদ্ধেয় দুঃখী, অভিমানী মা লুৎফুন নিসা পৃথিবীর জীবন থেকে বিদায় নেন। মায়ের ইন্তেকালের কয়েক বছর আগে থেকেই তিনি মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন। মা উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস রোগী ছিলেন। সবচেয়ে বড় যে রোগটা মায়ের ছিল, সেটা হচ্ছে মনের ব্যথা। মা নানান ট্র্যাজেডিতে মনে খুব আঘাত পেয়েছেন। মায়ের বুকটা ব্যথায় ভরা ছিল। মা ইন্তেকালের আগে কয়েকবার ব্রেন স্ট্রোক করেন। স্ট্রোকের পর মায়ের স্বাভাবিক জ্ঞান ছিল না। তবে আমাদের চিনতে পারতেন। এমন অবস্থায়ও মা কুরআনের বিভিন্ন সুরা মুখস্থ পড়তেন। কালেমা পড়তেন। আমাকে প্রতিদিন বিভিন্ন দোয়া পড়ে ‘ফুঁ’ দিতেন। রাতে আমি অফিস থেকে বাসায় ফিরলে মা খুশি হতেন। মা সুস্থ অবস্থায় নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন আজানের সামান্য পরেই। ফজরের আজানের সাথে সাথে মায়ের ঘুম ভেঙে যেত। মা ফজরের নামাজের পর দীর্ঘ সময় কুরআন তিলাওয়াত করতেন। ছোটবেলা মাকে অনেক বিরক্ত করতাম। আমার মনে আছেÑ একবার মা সকালে নানাবাড়িতে একটি কক্ষে বসে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। এমন সময় আমি মায়ের কাছে গিয়ে নাশতা চাই। মা তখন কুরআন পড়া ছেড়ে দুটি ডিম পোচ ও মুড়ি মাখিয়ে আমাকে নাশতা তৈরি করে দেন। খাওয়াদাওয়া নিয়ে মাকে মহা বিরক্ত করেছি। মা প্রচণ্ড ধৈর্যসহকারে আমাদের দুই ভাইকে ভালো ভালো খাবার খাইয়েছেন। আমার ছোট এক শিশুভাই ছিল। তার অকালমৃত্যু হয়। এতেও মা প্রচণ্ড আঘাত পান। মায়ের হাজারো স্মৃতি চোখের সামনে ভাসছে। কিন্তু মা নেই। এসব কিছু মহান আল্লাহর ইচ্ছা। আমার শাশুড়িও পৃথিবীতে নেই। আমার বিয়ের সাত বছর আগে তিনি ইন্তেকাল করেন। আমি যখন জেনেছি, এই কনের মা জীবিত নেই, তখন এ বিষয়ে খুব প্রাধান্য দিয়ে তাকে বিয়ে করেছি। আমার স্ত্রী আমার মায়ের অনেক যতœ করেছেন। এখন আমাদের দু’জনেরই মা নেই। হঠাৎ রাতে মায়ের কথা মনে করে আমরা দু’জনই কেঁদে উঠি। মাকে জীবিত অবস্থায় দেখতাম নানির কথা মনে করে মা প্রায়ই কেঁদে উঠতেন। তখন এর গুরুত্ব বেশি বুঝিনি। এখন বুঝতে পারছি।
বারিধারা, গুলশান, ঢাকা

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.