লিওনেল মেসি
লিওনেল মেসি

বিশ্বকাপ জিততে ভাগ্য লাগে

নয়া দিগন্ত অনলাইন

বিশ্বকাপ ফুটবলে সেরা দল সব সময় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, এ রকমটি খুব একটা দেখা যায়নি। অনেকবার অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে গেছে। যে দলের অনায়াসে জয়ী হওয়ার কথা, হেসে খেলে, আনন্দ সাগরের মন পবনের নাওয়ে ভেসে যেতে যেতে নিয়ে যাওয়ার কথা বিশ্বকাপের শিরোপা, তাদের অবাক করে দিয়ে এ রকম বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে বিশ্বকাপ নিয়ে গেছে এমন দল যাদের কথা হিসাবের মধ্যেই রাখা হয়নি। আপামর ক্রীড়ানুরাগীসহ বড় বড় ফুটবল বোদ্ধা, বিশেষজ্ঞরা আর পণ্ডিতরা তাদের ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন। তাহলে এসব ব্যাপার স্যাপার থেকেই বোঝা যায়, প্রতিভা, যোগ্যতা, স্বপ্ন, আশা আকাঙ্ক্ষা থাকলেই সব সময় চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় না। এ জন্য ভাগ্যও লাগে। সৌভাগ্যের পরশ না থাকলে সফল হওয়া যায় না। এটা ভাগ্যের কৌতুক। ভাগ্যই মাঝে মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে অঘটন ঘটিয়ে মনে করিয়ে দেয়, যতই থাকুক যোগ্যতা বা সাধ সাধনা আর প্রস্তুতি, অপ্রত্যাশিতভাবে চলে আসতে পারে পরাজয়।

বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে ফেভারিট দলগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, একবার বা দু’বার নয়, বেশ অনেকবার এরকম ঘটনা ঘটেছে। প্রথমেই ধরা যাক রেকর্ড পাঁচবার বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিলের কথা। কারণ, এই অঘটনগুলোর শিকার বেশিরভাগ সময়ই হয়েছে ব্রাজিল। আর ফুটবল বিশ্বে জনপ্রিয়তার নিরিখে ব্রাজিলই রয়েছে অন্যান্য দলের তুলনায় অনেক উঁচুতে। তাছাড়া ব্রাজিল দল ফুটবল সম্রাট পেলের মতো সেরা খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে। শুধু পেলেই নয়, ফুটবলের ব্যাকরণ প্রকরণেও ব্রাজিলের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৫৮ সালে ৪-২-৪ প্রথার প্রথম প্রচলন হয় এবং ব্রাজিলই তার প্রবর্তক। সেটা পরিবর্তন করে পরবর্তীতে আবার ৪-৩-৩ ছকটিও প্রবর্তন করে তারা।

ফুটবল বিশ্বের সেরা ফুটবলার পেলে ছাড়াও ব্রাজিলে জন্ম নিয়েছেন অনেক নামিদামি খেলোয়াড়। যার মধ্যে ডিডি, স্যান্টোস ভ্রাতৃদ্বয়, আমেমির, গ্যারিঞ্চা, ভাভা, জিটো, আলবার্তো, জোয়ারজিনহো, টোস্টাও, রিভোমিনো, জিকো, সক্রেটিস, নেলিনিও, কারেকা, রোমারিও, রোনালডোসহ অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্র আছেন। ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল সেরা দল হিসেবে মাঠে নামলেও শেষ পর্যন্ত ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। অবশ্য ১৯৫০ সালে যে বিশ্বকাপ ব্রাজিলের অনুষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু তারা ছিল চ্যাম্পিয়নের তালিকায় সবার উপরে। দেশবাসীরও ধারণা ছিল ব্রাজিল এবার কিছু একটা করে দেখাবে। অধিনায়ক অন্ডস্টো, আক্রমণে আদেমির এবং অন্য যারা সেই দলে ছিলেন, তারা কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই খুব একটা প্রচার পাননি সে সময়। তবে তাদের দলগত সংহতি ছিল দারুণ। আদেমির ছিলেন সেরা স্কোয়ার, সাতটি গোলও করেছিলেন তিনি সেই আসরে। ফুটবলপাগল ব্রাজিলবাসীর আশাও ছিল তুঙ্গে। কারণ প্রথম দিকে ব্রাজিল যে খেলা উপহার দিল, তাতে স্বপ্ন দেখাটাই ছিল বাস্তব সত্য। মেক্সিকোকে হারালো ৪-০ গোলে, যুগোস্লাভিয়াকে ২-০ গোলে এবং সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে মোকাবিলায় ২-২ গোলে খেলা অমীমাংসিত রেখে ব্রাজিল উঠল ফাইনাল পর্বে।

নিজের মাটিতে খেলা, সেই সাথে চেনা পরিবেশ, চেনা সমর্থক এসব তাদের যে বাড়তি প্রেরণা জুগিয়েছে সেটা তো বলাই বাহুল্য। গ্যালারিতে দর্শকদের সাম্বা নাচের তালে তাল রেখে মাঠে খেলোয়াড়রাও তাদের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখলেন। পরবর্তী পর্বে ব্রাজিল সুইডেনের বিরুদ্ধে ৭-১ এবং স্পেনের বিরুদ্ধে ৬-১ গোলের বিরাট ব্যবধানে জয় পেলো। অর্থাৎ পাঁচ খেলায় তারা মোট ২১টি গোল দিল। আনন্দের জোয়ারে সারা দেশ উত্তাল।

এবারে ফাইনাল খেলা। প্রতিদ্বন্দ্বি হলো উরুগুয়ে। যাদের সংগ্রহে রয়েছে ২ খেলায় ৩ পয়েন্ট এবং ব্রাজিলের ২ খেলায় ৪ পয়েন্ট। অর্থাৎ শেষ খেলায় উরুগুয়ের সাথে ড্র করলেই ব্রাজিল প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হচ্ছে। কিন্তু তারা ড্রয়ের চিন্তা নিয়ে মাঠে নামলো না। পরে দেখা গেছে, একটু স্ট্র্যাটেজির পরিবর্তন করলেই যেখানে জয়ের সম্ভাবনা, সেখানে তারা খেলেছে গতি, স্কিল আর মন ভুলানো ছন্দময় ফুটবল। আত্মরক্ষা নয়, আক্রমণই ছিল মূল লক্ষ্য। পৃথিবীর বৃহত্তম স্টেডিয়ামে দুলাখ দর্শক উপস্থিত হয়েছে ব্রাজিলের হয়ে আনন্দ ফুর্তি করার জন্য। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে তারা হেরে গেল ১-২ গোলের ব্যবধানে। উরুগুয়ের হলো চ্যাম্পিয়ন।

১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ। যাকে হাঙ্গেরিয়া স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার পুসকাস দলের অধিনায়ক। একাই যিনি খেলার চেহারা বদলে দিতে পারেন, সেই পুসকাস ছাড়াও দলের নিজের বোজিক, জিবর, ককসিস, হিদেকুটির মতো খেলোয়াড়। এদের নিয়ে গড়া মারাত্মক শক্তিশালী দল গঠন করেছে হাঙ্গেরি। বিশেষজ্ঞরাই শুধু নন, সাধারণ দর্শকরাও জানেন বিশ্বকাপ এবার হাঙ্গেরির। প্রথম খেলায় দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯-০ গোলে হারালো। যার মধ্যে ককসিস ৩ ও পুসকাস ২টি গোল করেন।

পরের ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ৮-৩ গোলে জিতল। যাতে ককসিস ৪টি, হিদেকুটি ২টি, পুসকাস ১টি করে গোল করেন। হাঙ্গেরির অপ্রতিরোধ্য মেজাজি খেলায় জার্মানরা পাত্তাই পেল না। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল হাঙ্গেরির বিপক্ষে দারুণ লড়াই করে ২-৪ গোলের ব্যবধানে পর্যুদস্ত হলো। সেমিফাইনালেও হাঙ্গেরি আগেরবারের কাপজয়ী উরুগুয়েকেও ৪-২ গোলে নাস্তানাবুদ করল। ফাইনালে দেখা হলো পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে। যে দলকে তারা গ্র“প পর্যায়ের খেলায় বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে। যে বাধা ডিঙানো কোনো ব্যাপারই না।
বার্নে অনুষ্ঠিত ফাইনালে দেখা গেল অন্য দৃশ্য। তখনকার এবং এখানকার বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্বের সেরা তারকাদের নিয়ে হাঙ্গেরি ছিল তখন একটি দুর্ভেদ্য দল। কিন্তু প্রথম মোকাবিলায় এ দুর্ভেদ্য দলটি জার্মানদের হেলায় হারিয়েছিল, তারাই খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো ঘুরে দাঁড়ালো। মরণপণ লড়াই চালিয়ে হাঙ্গেরির বিশ্বকাপ জয়ের আশা ধূলিসাৎ করে দিল। সেরা এ দলটিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে দিয়ে সবাইকে হতবাক করে দিল। অবশ্য পুসকাসের করা একটি গোল ইংরেজ রেফারি অফসাইডের অজুহাতে নাকট করলেন। তবে কাপ কিন্তু যাদের জয়ের কথা ছিল না, তারাই পেয়ে গেল। আর যাদের পাওয়ার কথা ছিল, তারা পেল দুঃখ, কষ্ট, হতাশা।

১৯৫৮ ও ১৯৬২’র বিশ্বকাপে ব্রাজিল সেরা দল হিসেবেই গণ্য হয়েছিল এবং চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। পশ্চিম জার্মানি কারো কাছে সেরা দলের স্বীকৃতি পেলেও কাজের কাজ করে দেখাতে পারেনি। তবে ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপে ব্রাজিলই ছিল ফেভারিট। যেহেতু পরপর দুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আর এবারে চ্যাম্পিয়ন হলেই হ্যাটট্রিক। বিশ্বসেরাদের নিয়ে দলও গড়েছিল চ্যাম্পিয়নশীপের হ্যাটট্টিক করার আশায়। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। ফুটবল অনুরাগীদের হতাশা করে দিয়ে প্রথম পর্বেই তাদের বিদায় হলেও ’৭০’র বিশ্বকাপে আবারও চমক দেখায়।

’৭৪-এর আসরের হিসাবটা হলো আবার অন্যরকম। ষাটের দশক পর্যন্ত হল্যান্ডের ফুটবলকে কেউ গণনার মধ্যেই নিত না। ফুটবলশক্তি হিসেবে তাদের তেমন নাম-ডাকও ছিল না। কিন্তু ১৯৭৪-এর বিশ্বকাপে হল্যান্ড বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে চমক দেখালো। তারা খেলল টোটাল ফুটবল। কোনো খেলোয়াড় তাদের নিজেদের পজিশনে দাঁড়িয়ে খেললেন না। প্রয়োজনমত সবাই কখনো রক্ষণভাগে, কখনো মধ্যমাঠে, আবার কখনোবা বিপক্ষের দুর্গে হানা দেবার জন্য আক্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নেসকিনস, রেবসেনব্রিঙ্ক, জনি রেপ, রুডিক্রসের সাথে আছেন দুনিয়াজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন তারকা জোহান ক্রুয়েফ। ক্রুয়েফ তখন বল নিয়ে এগিয়ে যান, বিপক্ষের খেলোয়াড়রা তখন অনুমান করার চেষ্টা করেন তিনি কোনদিকে ঘুরবেন আর সেই অনুযায়ী গার্ড নেয়ার ব্যবস্থা করতে না করতেই ক্রুয়েফ তখন সবাইকে ১০ গজ পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছেন। এরকম অবিশ্বাস্য ফুটবল কারিশমা যখন তিনি দেখাচ্ছেন, তখন তার সতীর্থরাও কম যান না। এরকম চমক জাগানো খেলা উপহার দিয়ে তারা একে একে উরুগুয়ে, বুলগেরিয়া, আর্জেন্টিনা, পূর্ব জার্মানি এবং গতবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকেও বিধ্বস্ত করেন। বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা বুঝতে পারছেন না, কাকে ছেড়ে কাকে আটকাবে? ধ্বংসাত্মক ফুটবল খেলে ফাইনালে উঠা পর্যন্ত ১৪টি গোল দিল তারা।

মিউনিখে অনুষ্ঠিত ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির সাথে মোকাবিলা। যেহেতু নিজের দেশেই খেলা, সেদিক থেকে জার্মানরা একটু বেশিই অনুপ্রাণিত। কিন্তু ভয় আছে। কারণ হল্যান্ডের বিপক্ষে জেতা তো সহজ কথা নয়। যে খেলা তারা এবারে দেখিয়েছে, তাতে জয়টা তাদেরই পাওয়ার কথা। আর এটাও হল্যান্ড প্রমাণ করল খেলা শুরুর প্রথম মিনিটেই গোল দিয়ে। গ্যারারির ৮০ হাজার দর্শকের হৈ চৈ, ইচ্ছ্বাস-উন্মাদনা সব থেমে গেল। প্রথম মিনিটে সেন্টার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রুয়ে বল নিয়ে জার্মানির পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়লেন। নিশ্চিত গোল। নিরুপায় হয়ে বার্তি ফোকস তাকে পেছন থেকে ট্যাকল করে বক্সের ভেতরে ফেলে দিলেন। ফলে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দিলেন নিসকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হল্যান্ড খেলা ধরে রাখতে পারল না। গুলি খাওয়া আহত বাঘের মতো তারা ঘুড়ে দাঁড়াল। ’৫৪ সালের বিশ্বকাপে ফাইনালে সেরা দল হাঙ্গেরিকে যেভাবে হারিয়েছিল, এখানেও তার পুনরাবৃত্তি করে ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল। সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের তারা ২-১ গোলে হারিয়ে দিল। ফলে জাহান ক্রুয়েফের দল হল্যান্ড নিশ্চিত শিরোপা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলো।

১৯৭৮-এ আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলো স্বাগতিকরা অথচ প্রতিযোগিতা শুরুর আগে যদিও সেবারে আর্জেন্টিনা দলটি ছিল বেশ ভালো। কেউ তাদের চ্যাম্পিয়নশিপের দাবিদার বলে ভাবেনি। তারপরও ব্রাজিলের মতো টপ ফেভারিট দলকে ডিঙিয়ে তারাই বিশ্বকাপ জয় করল। এখানেও অংক মিলল না। যেমন মেলেনি স্পেনে ১৯৮২’র বিশ্বকাপে। এ আসরেও ব্রাজিল ফেভারিটদের তালিকার সবার উপরে থাকলেও আর্জেন্টিনা, পশ্চিম জার্মানি ইত্যাদি ছিল দ্বিতীয় সারিতে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ১ নম্বর দলটি দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নিল। বিশ্বকাপ জিতল ইটালি।

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপেও উজ্জ্বল সব নক্ষত্রকে নিয়ে গড়া ব্রাজিল দলই ছিল ফেভারিট। তাদের দলে সবাই ছিলেন সুপারস্টার খেলোয়াড়। দলটির পারফরম্যান্সও ছিল তখন ঈর্ষা জাগানো। এতসব সুপার স্টারদের নিয়ে সাজানো যে দলটি সেটাকেই তো সবাই সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মনে করবে। অতএব ফেভারিট তারাই। তবে দ্বিতীয় ফেভারিট হিসেবে ছিল ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। কিন্তু দর্শকদের হতাশ করে ব্রাজিলের বিদায় ঘটল কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে ফ্রান্সের কাছে হেরে। আর আর্জেন্টিনা ফুটবলের মহাতারকা ম্যারাডোনার একক কৃতিত্বেই বলতে গেলে চমৎকার ফুটবলশৈলী উপহার দিয়ে অপ্রতিরোধ্য দল হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয় করল।

ইটালিতে অনুষ্ঠিত ’৯০-এর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পাশাপাশি স্বাগতিকরা ছিল ফেভারিট। গতবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনাকেও কেউ কেউ সেরা বলে ভাবলো। তবে পশ্চিম জার্মানি এখানে ছিল পিছয়ে। কিন্তু ব্রাজিল দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়ে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হলো। একদিকে তারকাসমৃদ্ধ ব্রাজিল দল যথেষ্ট শক্তিশালী, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কাছে অধিনায়ক ম্যারাডোনা। যিনি একাই খেলার ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা খেলার আগে সবাই ব্রাজিলকেই এগিয়ে রাখল। কিন্তু ব্রাজিলের সাবেক তারকারা ভাবলেন অন্য কথা। জুনিয়র তো ভবিষ্যদ্বাণী করে বসলেন যে, ব্রাজিল যত শক্তিশালী দলই হোক না কেন ম্যারাডোনা একাই ব্রাজিলের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দিতে পারে।’ হ্যাঁ, জুনিয়রের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যে হয়নি। ব্রাজিল সারাক্ষণ আর্জেন্টিনার সীমানায় বল নিয়ে ঘোরাঘুরি করলেও কিন্তু কাজের কাজ কিছুই আদায় করতে পারেনি। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা রক্ষণাত্মক ভূমিকায় ছিল। এ অবস্থা থাকতে থাকতেই ম্যারাডোনা হঠাৎ একটি দল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে ব্রাজিলের সীমানায় থ্রু ফেললেন। ব্যাস, ওই একটি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্যানিজিয়া গোল করে ব্রাজিলের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দিল।

তবে হঠাৎ করে ফাইনালে উঠে আসা পশ্চিম জার্মানির সাথে মোকাবিলায় ম্যারাডোনার দল পারল না। শেষের দিকে নিজেদের সীমানায় একজন জার্মান খেলোয়াড়কে ফাউল করার অপরাধে মেক্সিকান রেফারি দাঁতের ডাক্তার কোডেসাল বিতর্কিত পেনাল্টির নির্দেশ দিলেন। লঘু পাপে গুরু দণ্ড। পেনাল্টি দেয়ার মত ফাউল এটি ছিল না। যা হোক, ভাগ্যের সহায়তা পাওয়া পশ্চিম জার্মানির কাছে আর্জেন্টিনা সেই পেনাল্টিতে হেরে গেল। রেফারি বিতর্কিত এই সিদ্ধান্তটি না দিলে হয়তো খেলার ফলাফল অন্যরকম হতো। ৯ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে খেলে আর্জেন্টিনা জিতলে একটা রেকর্ড হতো।

১৯৯৪ সালে আমেরিকা বিশ্বকাপে ইটালি, ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে থাকলেও শেষ অবধি ব্রাজিল টাইব্রেকারে ইটালিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু ১৯৯৮ -এ ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের আসরে হিসাবটা উল্টে যায়। ব্রাজিল ইটালি ফেভারিট থাকলেও ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন হয় ফাইনালে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে। এরপর প্রথমবারের মতো এশিয়ার জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০০২ সালের বিশ্বকাপের আসর বসে। এখানেও ব্রাজিল, ইটালি, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, জার্মানির পাশাপাশি গত আসরের চ্যাম্পিয়ন দল ফ্রান্সও ফেভারিট ছিল। কিন্তু সবাইকে টপকে ব্রাজিল ফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হয়। আর রোনালডো ম্যাজিকে জার্মানিকে পরাস্ত করে ব্রাজিল পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে।

এখানে একটা ব্যাপার পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, বিশ্বকাপ ফুটবলে ১৯৫০ সালের পর থেকে দু’চারটি বাদে প্রায় সব আসরেই ব্রাজিল ফেভারিট ছিল। অন্যান্য ফেভারিট দলগুলো যখন ফেভারিট হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, তেমনি ব্রাজিলও সবসময় ভাগ্যের সহায়তা পায়নি। এবারের জার্মানি বিশ্বকাপেও কিন্তু ব্রাজিল অন্যতম ফেভারিট দিল। অবশ্য স্বাগতিক জার্মানি, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনাকেও কেউ কেউ ফেভারিট হিসেবে গণ্য করছেন। এখন দেখা যাক এবারের আসরে কে চ্যাম্পিয়ন হয়। কেননা বিশ্বকাপে তো যোগ্য দল হলেই শিরোপা মেলে না। নিয়তিও এ ক্ষেত্রে বড় একটা ফ্যাক্টর। কাজেই সবকিছুর সাথে সৌভাগ্যও থাকতে হবে। এর আগের বিশ্বকাপের আসরগুলোতে যেটা পরিষ্কার বোঝা গেছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.