ভালোবাসার উল্টো পিঠ

আল ফাতাহ মামুন

টিএসসির মোড়ে হাত ধরাধরি করে যে দু’জন বসে আছে, তাদের নাম রবি আর রুনু। সম্পর্কে রবি আমার আত্মীয়। তবে আত্মীয়ের চেয়ে বন্ধুত্বের জোরটাই আমাদের মধ্যে বেশি। রবির সাথে রুনুর সম্পর্ক চার বছরের। এক বছর হলো ওরা বিয়ে করেছে। অবশ্য এখনো ওদের পরিবারে জানাজানি হয়নি। রবির ইচ্ছা, ভালো একটা চাকরি পেলেই পারিবারিকভাবে রুনুকে ঘরে তুলবে।
অনার্স শেষ করে রেজাল্টের অপেক্ষায় রবি। আর রুনু এবার সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল দেবে। ইংরেজিতে ‘সুইট কাপল’ বলতে যা বোঝায়, বাস্তবে ওরা দু’জন ঠিক তা-ই। প্রথম প্রথম যখন রবির কাছে রুনুর গল্প শুনতাম, ভালোবাসা-ভালো লাগার খুুনসুটি দেখতাম, তখন খুব হিংসে হতো আমার। ইশ! আমাকেও যদি কেউ এভাবে ভালোবাসত? আমিও যদি কারো হাতে হাত রেখে, কোলে মাথা পেতে টিএসসি কিংবা রমনার সবুজে ডুবে যেতে পারতাম! এসব কল্পনা করতেও তো ভালো লাগে। তবে ভালো লাগে না রুনুকে। আজকাল আর রবির প্রতিও হিংসে হয় না। যা হয় তা হলো করুণা। হায়রে রবি! তুই যাকে চোখ বন্ধ করে ভালোবাসিস, কখনো কি ভেবে দেখেছিস সে তোকে ভালোবাসে কি না? চোখ বন্ধ করে না হোক অন্তত চোখ খুলেও বাসে কি না? বিয়ের আগে একদিন এই প্রশ্নটাই করেছিলাম রবিকে। রবি হাসতে হাসতে বলল, ‘ধ্যাত! ও যদি আমাকে ভালো না-ই বাসে তাহলে যখন-তখন বিছানায় আসে কেন?’
রবি ভেবেছে, শরীরের সাথে মনটাও রুনু তাকে দিয়েছে। এখানে এসে আমার চিন্তা থেমে যায়। ভাবনার রাস্তায় জট লাগে। নিজের মনেই বলি উঠি, রুনু কি সত্যিই রবিকে ভালোবাসে? বিয়ের এক বছর পরেও ভাবনাটা আমার একই রকম আছে। হয়তো দশ বছর পরেও একই থাকবে। কারণ, আমি রুনুর যে চেহারা দেখেছি, রবি তা দেখেনি।
২.
রুনু রবিকে ভালোবাসে কি না এ প্রশ্নের উত্তরে সেদিনও আমি চোখ বন্ধ করে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারতাম। কিন্তু যেদিন সন্ধ্যায় রবি চোখ-মুখ লাল করে আমার মেসে এসে বলল, ‘দোস্ত! ব্রেক-আপ হয়ে গেছে’, ওই দিন থেকে রুনুর বিষয়ে আমার ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। ‘ব্রেক-আপ হয়ে গেছে’Ñ এ বাক্যটিই রুনুর সম্পর্কে আমার ধারণা বদলানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। রবি যা বলেছে তা শুনলে আপনাদের ধারণাও রুনুর সম্পর্কে ঠিক থাকবে নাÑ এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
রবির চোখ-মুখ দেখে ব্রেকআপের কথাটা অবিশ্বাস করতে পারলাম না। আবার বিশ^াসই বা করি কিভাবে? রবি তো কখনো রুনুর ব্যাপারে নেগেটিভ কিছু বলেনি। প্রায় সময়ই বলত, ‘দোস্ত! রুনুর মতো মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আগের জনমে মহা পুণ্য না করলে আল্লাহ মানুষের ভাগ্যে এমন রতœ মিলান না।’
অর্ধেক খাওয়া সিগারেটটা রবির দিকে বাড়িয়ে বললাম, ‘কী হয়েছে খুলে বল। হঠাৎ ব্রেকআপ? আগে তো কিছু বলিসনি।’
সিগারেট মুখে পুড়ে অস্পষ্টভাবে বলল, ‘হঠাৎ নয়। অনেক দিন থেকেই আমাদের মধ্যে ঝামেলা হচ্ছে। তোকে বলিনি নিজের ভালোবাসার অপমান হবে তাই।’
‘তাহলে আজ বলতে এলি কেন’?
‘আর পারছিলাম না ভাই। একজন মানুষ কত দিন আর সহ্য করতে পারে? কতটাই বা পারে বল?’
তারপর গড়গড় করে রুনুর সব কথা বলে যায় রবি। সম্পর্কের শুরু থেকেই রুনু যা যা করেছে সব। তবে একটা বিষয় আমার কাছে খটকা লাগে। রবির কথা অনুযায়ী রুনুর তেমন কোনো চাহিদা নেই। নেই অর্থলোভও। কিন্তু হঠাৎ করেই রুনু বলছে, তার বাড়ি-গাড়ি চাই। এমন ‘ফকিন্নি মার্কা’ ছেলের সঙ্গে বাকি জীবন কাটানো রুনুর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই রুনু রবিকে না করে দিয়েছে। যে মেয়েটা সম্পর্কের আড়াই বছরেও অর্থবিত্ত নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ দেখায়নি, সে হঠাৎ এ কারণেই ব্রেকআপ করে দেবেÑ এটা ঠিক আমার মাথায় ঢুকছে না। অবশ্য দুই কারণে এরকম হতে পারে। হয়তো কোনো বিত্তবান ছেলের ফাঁদে সে পা দিয়েছে। নয়তো রবির অর্থবিত্ত সম্পর্কে রুনু পরিষ্কারভাবে জেনে ফেলেছে। তাই রবির প্রতি মায়া থাকলেও তা কাটানোই ভালো মনে করছে রুনু।
‘ও কী অন্য কারো সঙ্গে রিলেশনে জড়িয়ে পড়েছে’? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
রবি সাত নম্বর সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘আমার সে রকম মনে হচ্ছে না। তবে মাস তিনেক আগে ও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমার ফিউচার প্ল্যান কী? আমি বললাম, টাকা থাকলে ব্যবসার কথা ভাবতে পারতাম। এখন তো আমি শূন্যপ্রায়। ও চোখ বড় বড় করে বলল, ‘শূন্য মানে? ব্যাংকে না তোমার চার লাখ টাকা ছিল?’ আমি বললাম, ওটা এখন আর নেই। একটা ব্যবসা করতে গিয়ে পুরো টাকাটা মার গেছে। ওই দিনের পর থেকেই রুনুর আচরণ বদলে যায়। ঠিকমতো কথা বলে না। ফোন ধরে না। আগের মতো সাড়াও দেয় না। আর আজ ব্রেকআপ।
আমি দীর্ঘনিশ^াস ফেলে বললাম, ‘দেখ তোরও কোনো ভুল হতে পারে। রুনুকে দেখে কিন্তু সে রকম মনে হয় না।’
টোকা দিয়ে সিগারেটের ছাই ফেলে রবি বলল, ‘টাকার প্রশ্নে ছেলেরাও বদলে যায়। ও তো মানবী। ও বদলাবে আরো আগে।’
আমি আবারো দীর্ঘনিঃশ^াস ফেলে ওর দুঃখে দুঃখী হওয়ার চেষ্টা করলাম। ও বলতে লাগল, ‘গত পরশু দিন রুনু আমায় না করে দেয়। আমি কাকুতি মিনতি করে ওকে অনুরোধ করলাম, আর যাই করো তুমি আমায় এ শাস্তি দিয়ো না। আমি ভেবেছি, আমার কোনো ভুল হয়েছে তাই সবসময়ের মতো ও অভিমানের খেলা খেলছে। কিন্তু না, শত অনুরোধেও ওর মন গলেনি। লজ্জা-অপমানে বাসায় ফিরে আসি। ভাবি, এত অনুরোধের পরও সে আমাকে ফিরিয়ে দিলো, এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে। যতক্ষণ না রুনু নিজে ফোন করে ‘স্যরি’ না বলবে আমি আর ওকে ফোন করব না। কিন্তু বন্ধু, দু’ ঘণ্টা না যেতেই আমার সঙ্কল্প ভুলে গেলাম। ভেতরটা কষ্টে হু হু করে উঠল। ফোন করে রুনুকে বললাম, ‘আমার কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দাও। তারপরও তুমি ব্রেকআপের কথা বলো না।’ নাহ! মানবীর মনে দয়া হয়নি। তখন মনে হলো অপমানের ঘায়ে কে যেন লবণ ছিটিয়ে দিলো। এক গ্লাস পানি দে তো। গলাটা শুকিয়ে এসেছে।
পানি খেয়ে রবি আবার বলতে শুরু করল। যা বলল তার সংক্ষেপ হলো, পরদিন আবার রুনুর সঙ্গে দেখা করে রবি। অনুরোধ-উপরোধে কোনো কাজ হয়নি। সবশেষ আজ রুনু বলে দিয়েছে, ‘তুই যদি মানুষের বাচ্চা হয়ে থাকিস তবে আমাকে আর ফোন করবি না। আমি তোকে ভালোবাসি না। না, না, না’Ñ বলেই হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল রবি। এই অবস্থায় কী বলে সান্ত্বনা দেব বুঝতে পারছিলাম না। শুধু পরম যতেœ বন্ধুর বুকে বন্ধুকে জড়িয়ে নিলাম। অনেকক্ষণ কাঁদার পর ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল রবি। ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আমি বারান্দায় গিয়ে পায়চারি করতে লাগলাম।
৩.
রবির কান্না দেখে মনে পড়ে গেল, পাঁচ বছর আগে একদিন আমিও এভাবে কেঁদেছিলাম। জগতের নিয়মই এমন খাপছাড়া যে, যাকেই তুমি ভালোবাসবে সেই তোমাকে কষ্ট দেবে। তাই মহাপুরুষেরা বলেন, ভালোবাসা কখনো প্রকাশ করতে নেই। হঠাৎ মনে হলো রবির জন্য কিছু করা দরকার। কিন্তু কী করব? যে নারীর কাছে ভালোবাসার চেয়ে অর্থের মূল্য বেশি তাকে ফেরাব কী দিয়ে? আর অর্থ ছাড়া ভালোবাসাই বা জগতে জয়ী হয়েছে কোন কালে? ভাবতে ভাবতে রুনুর নাম্বারে ফোন দিলাম। রিং হচ্ছে...
‘হ্যালো’!
রুনুর বিষণœ কণ্ঠ আমাকে তীব্রভাবে স্পর্শ করল। বললাম, ‘রুনু, রবির সঙ্গে কী হয়েছে তোমার?’
‘ভাইয়া, কিছু হয়নি। এ রিলেশনটা রাখা আর আমার পক্ষে পসিবল না।’
‘কেন না’?
‘আপনিই বলেন, এ রিলেশনের কোনো ভবিষ্যৎ আছে? আড়াই বছর হয়ে গেল প্রেম করছি, বিয়ের কোনো নাম-গন্ধ নেই। আশা ছিল ও কোনো ব্যবসা ধরবে, জমানো টাকাটাও এখন খেয়ে বসে আছে। আপনিই বলেন...’
আরো কী কী যেন বলে যায় রুনু। আমি ঠিক শুনতে পাইনি। আমার মস্তিষ্কে তখন একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরছে, টাকার কাছে কী সম্পর্ক এতটাই অসহায়? এখন মনে হচ্ছে, ব্রেকআপের পেছনে ষোলআনা দোষ রুনুর নয়। জগৎস্রষ্টা ভালোবাসা সৃষ্টি করেছেন, ভালোবাসার পিঠে স্বার্থের মোহরও এঁকে দিয়েছেন। তাই স্বার্থ ছাড়া ভালোবাসা কল্পনা করাও জগতে পাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাঁচ বছর আগে পাঁচটি টাকারও মালিক ছিলাম না বলেই সাদিয়াকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে জনমের মতো কেঁদে-কেটে বিদায় দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, সুখী হও! আসলে কি সাদিয়া সুখী হয়েছে? এখনো তো আমার জন্মদিনে অপরিচিত নাম্বার থেকে ঠিকই মেসেজে আসে। শেষে লেখা থাকে ইংরেজি বর্ণমালার ১৯ নম্বর অক্ষরটি।
আমার গল্পের মতোই রুনু-রবির গল্পও এভাবে শেষ হতে পারত। কিন্তু আমি যে আগুনে পুড়ছি, ওদের সেই আগুনে পুড়তে দেবো না। রুনুকে বললাম, ‘রবি তোমার সঙ্গে মিথ্যে বলেছে। টাকাটা ও লস খায়নি। একটা ক্ষুদ্র ব্যবসায় ও দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। মাসে মাসে ভালোই সুদ পায়। বাকি দুই লাখ ওর অ্যাকাউন্টেই আছে। বিশ^াস না হলে কাল গিয়ে চেক করে এসো। উত্তরা ব্যংক, নিউ মার্কেট শাখা। অ্যাকাউন্ট নাম্বার ২০৬৪।’
৪.
আমার ফোন কেটে রুনু রবিকে ফোন করে। তার আগে ‘স্যরি’ লিখে ছোট্ট একটা মেসেজও দেয়। ঘুম থেকে জাগা রবির কাছে সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। ফিরে আসার আনন্দ রবির চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে পূর্ণিমা রাতের জোছনার মতো।
আমি ‘কাজ আছে বলে’ বেরিয়ে পড়ি। আনন্দের আতিশয্যে রবি জিজ্ঞেস করতেও ভুলে গেছে, রাত সাড়ে ১১টায় আবার কোন কাজ? সে রাতে আর বাসায় ফিরিনি। নাহিদা খালার বাসায় থেকে যাই। সকালে খালা থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে রবির অ্যাকাউন্টে জমা করি। ব্যাংক থেকে বেরোনোর সময় দেখলাম রুনু ব্যাংকে ঢুকছে।
রুনু নিশ্চিত হয়, রবি সব টাকা জলে ফেলে দেয়নি। কাজেই লাগিয়েছে। শুরু হয় আবার সেই ভালোবাসা-ভালো লাগার খুনসুটি। ছ’মাস পরে কোর্ট ম্যারেজ। এ গল্প পড়েনি এমন কেউ দেখামাত্রই ভাববে, রবির জন্য রুনুর হৃদয়ে কত ভালোবাসা জমা। কিন্তু ভালোবাসার উল্টোপিঠ দেখা আমাকেও কি বিশ^াস করতে হবে, রুনু রবিকে সত্যিই ভালোবাসে? কে জানে? হয়তো বাসে। অথবা বাসে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.