প্রত্যাখ্যান

মো: মাঈন উদ্দিন

মেয়েটার অনেক দেমাগ ছিল। সে নিজেকে রাজকন্যা ভাবত। যদিও তার বাবা ছিল সামান্য মুদির দোকানি। তবু তার পা মাটিতে পড়ত না। সব সময় একটা দেমাক নিয়ে চলাফেরা করত। আসলে মেয়েটা তেমন ফর্সাও ছিল না, ছিল না তেমন লম্বাচওড়াও; কিন্তু মেয়েটার চেহারাটা ছিল চিত্তাকর্ষক। তার চলন-বলন মন হরণ করার মতো ছিল। তার হাসিটা ছিল ভুবনমোহিনী। ঘনকালো দু’টি আঁখি পানে চেয়ে যে কেউ নিজেকে হারিয়ে ফেলত ঘোর অমানিশায়। অনেকটা চঞ্চলপ্রকৃতির ছিল মেয়েটি। জড়তা বলতে কিছু ছিল না তার মানসপটে। সমবয়সী মেয়েদের সাথে হাসি-তামাশা করে আঙিনা মাতিয়ে রাখত কিন্তু কোনো ছেলেকে পাত্তাই দিত না।
তোতা মিয়ার বস্তিতে থাকত। বস্তির পশ্চিম পাশেই দু’তলায় একটি ব্যাচেলর মেসে থাকত ফারহান। বিবিএ পড়ত সে। প্রতিদিন সকালে দাঁত ব্রাশ করার সময় সে পুব পাশের জানালার ধারে এসে দাঁড়াত। মেয়েটার চঞ্চল দৌড়ঝাঁপ তার খুব ভালো লাগত। ফারহান কখনো ওই মেয়েটার সাথে সামনাসামনি কথা বলেনি। যদিও বা মেয়েটির চোখে চোখ পড়ত, ফারহান চোখ নামিয়ে নিত। লজ্জায় সে লাজুক লতার মতো চুপসে যেত। ওই মেয়েটা এক অদ্ভুত ভালো লাগা হয়ে তার অন্তরে বিঁধে গেল। ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা। ওই চঞ্চল মেয়েটার প্রতি অদম্য এক ভালোবাসার টান সে প্রতিনিয়ত অনুভূব করত। ওই মেয়েটার বুকে লুকায়িত হাজার পাওয়ারি কোনো ম্যাগনেটের তীব্র আকর্ষণে সে শেষ বিকেলের ঝিরঝির হাওয়ায় জানালার ধারে না এসে পারত না। শেষ বিকেলের সূর্যের রক্তিম আভায় ওই মেয়েটিকে মনে হতো অনন্ত যৌবনা। মেয়েটার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন তাকে গোপন ইশারায় ডাকত। আহ্বান করত কোনো ঢেউ-খেলা সাগরে সাঁতার কাটতে।
অবশেষে ঋণাত্মক আকর্ষণের কাছে পরাজিত হয় ফারহান। দুর্নিবার আকর্ষণে সে একদিন মেয়েটির সামনে দাঁড়ায়। তার মনের গহিনে লুকানো ভালো লাগা, ভালোবাসার কথা সে মেয়েটিকে বলে। কিন্তু মেয়েটি তার আবেগের কোনো মূল্যই দিলো না। তাচ্ছিল্যের সাথে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলো। তাকে জানিয়ে দিলোÑ তোমার মতো কত স্মার্ট ছেলে আমার পেছনে চব্বিশ ঘণ্টা ঘুরঘুর করে, গুনে সংখ্যা বললে তুমিও চোখ বড় বড় করবে। জীবনে প্রথমবারের মতো ভীষণ ধাক্কা খায় ফারহান, যে ধাক্কার টাল সামলানো ছিল তার জন্য এক বিভীষিকাময় পরীক্ষা। এ যেন জীবন-বীণার তার ছিঁড়ে যাওয়ার অবস্থা।
তারপর চলে গেছে জীবন-বৃক্ষ থেকে একে একে বিশটি বছর। কিন্তু ফারহান সেই প্রথম জীবনের প্রত্যাখ্যানের কথা ভুলতে পারেনি আজো। আজ ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা নিয়ে পেপারে চোখ বুলায় ফারহান। সকাল বেলায় এক অপরিচিত মহিলার অযাচিত উদয়।
আসসালামু আলাইকুম, সাব, আমারে করিমের মায়ে পাঠাইছে। আপনাগো নাকি কাজের লোক লাগবো? আমি কাজ করতাম চাই।
পেপার থেকে চোখ তুলে থ বনে যায় ফারহান। সে চোখ থেকে চশমা খুলে তোয়ালে দিয়ে মুছে আবার চোখে দেয়। এই মহিলা যে সেই মেয়ে, যে একদিন তার মুখের ওপর থু থু নিক্ষেপ করে তার আবেগঘন প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল।
আচ্ছা, তুমি তোতা মিয়ার বস্তিতে থাকতে না?
হ সাব, এক সময় আমরা তোতা মিয়ার বস্তিতেই থাকতাম।
এতদিন পর মেয়েটিকে এভাবে দেখে এক হাহাকারময় পরিবেশের সৃষ্টি হয় ফারহানের হৃদয় আঙিনাজুড়ে।
তোমার স্বামী কী করে?
হে তো পাঁচ বছর অইল মইর্যা গেছে।
ও আচ্ছা! তা তোমার ছেলেমেয়ে কয়জন?
না সাব, আল্লাহ আমারে সস্তান দেয় নাই। সাব, একটা কাজ আমার খুবই দরকার। দুই দিন ধইর্যা খাইয়্যা না খাইয়্যা পথে পথে ঘুরতাছি।
সেদিনের ওই দেমাগি মেয়েটিকে আজকে তার অন্দরমহলে এভাবে দেখতে হবে তা কখনো ভাবেনি ফারহান। কিন্তু তার স্ত্রী এসে যদি এই মহিলাকে কাজের লোক হিসেবে রেখে দেয়, তাহলে তা হবে ফারহানের জন্য অস্বস্তিকর এক ব্যাপার। তাই এই মহিলাকে এখন আপদ বলেই মনে হচ্ছে তার কাছে, অথচ যার একটু নির্মল হাসি, দু’একটি মিষ্টি কথা, হৃদয় কাঁপানো একটু ছোঁয়া পেতে ফারহান একসময় তৃষ্ণার্ত পাখির মতো ডানা ঝাপটাত। সে একটি এক হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বলেÑ এই টাকাটা রাখো। তুমি কিছু কিনে নিও। আর হ্যাঁ, আমাদের বাসায় কাজের লোকের দরকার নেই। মহিলা টাকার নোট হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে বাইরে চলে গেল। ফারহান উঠে দাঁড়িয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ভাবছেÑ আসলেই কি এই মহিলা আমাকে চিনতে পারেনি নাকি চিনেও না চেনার ভান করেছে!
প্রিয়জন-১৬৩৮

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.