শামসুল ইসলাম
শামসুল ইসলাম
শামসুল ইসলাম স্মরণে

গণতন্ত্র তার কাছে ছিল গ্রহণযোগ্য সরকারব্যবস্থা

এহসানুল কবির

বিক্রমপুরের শামসুল ইসলাম বলতেন, আমার পূর্বপুরুষেরা সবাই তেজারতির সাথে জড়িত ছিলেন। আমার পিতা ঢাকা শহরে একজন নামকরা ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কিন্তু ব্যবসার সাথে যুক্ত নই আমি ও আমার পিতামহ। পিতামহ একজন বুজুর্গ আলেম হিসেবে তখনকার বৃহত্তর ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল অঞ্চলে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। তিনি তার পারিবারিক জীবনধারার এই ব্যত্যয়টিকে উল্লেখ করে কৌতূহলের সাথে বলতেন, আমার ছেলেরা কিন্তু তাদের পিতামহের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তারা সবাই ব্যবসায়ী। শামসুল ইসলাম ৯০-এর দশকে একই সাথে বাণিজ্য ও তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে Export promotion Bureau-চেয়ারম্যান বলেছিলেন, আমার মন্ত্রীর ছেলেদের যে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি আছে এটা জানলাম যখন তিনি আর আমার মন্ত্রী ছিলেন না। শামসুল ইসলাম জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলের সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। জনগণের ধ্বনি দিয়ে, গণতন্ত্রের কথা বলে অবশেষে আপন সৌভাগ্য গড়ার এই দেশে মরহুম শামসুল ইসলাম ছিলেন জিয়ার মতো আরেকজন ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব। মওলানা ভাসানী বলতেন, কোনো মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী যদি ঘুষ না খায়, তা হলে ওই মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি শতকরা পঞ্চাশ ভাগ কমে যায়।
খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে শামসুল ইসলাম একজন প্রতিশ্রুতিশীল ব্যক্তিকে মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পেয়েছিলেন। নাম তার এরশাদুল হক। দু’জন মিলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে, যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি, সেই দুর্নীতির আখড়ার এক বিরাট পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন, শীর্ষ পদে যারা অধিষ্ঠিত তারা যদি লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেন, তাহলে প্রশাসনের নিম্নস্তরেও দুর্নীতির করাল স্রোত হ্রাস পায়।

রাজনীতিবিদদের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্প্রীতির আজ বড় অভাব। হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ নিজ নিজ দলের নেতা ও কর্মীদের মধ্যেও হ্রাস পেয়েছে। বিভিন্ন দলের শীর্ষপদে যারা অধিষ্ঠিত তাদের মধ্যে এই গুণের ঘাটতি থাকায় তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করতেন। বলতেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মানুষকে ধরে এনে উপকার করতে চেষ্টা করতেন। তিনি একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলতেন, একদিন আমাদের বিক্রমপুর ভবনে অবস্থান করছি। হঠাৎ শুনতে পেলাম নিচ থেকে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করছে। নিচে নেমে দেখলাম, যিনি আমাকে ডাকছেন তিনি সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিঞা। নান্না ভাই আমাকে বললেন, চল মুজিবুরের জন্য একটা বাসা খোঁজা দরকার। আমরা এরপর হাটখোলা ও টিকাটুলির দিকে বাসা খুঁজতে থাকি। আর যে মুজিবুরের জন্য আমরা বাসা খুঁজছিলাম, তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭২ সালের শেষের দিকে একদিন তেজগাঁও থানার পুলিশ নান্না ভাইয়ের খোঁজে তারা বাসা ঘেরাও করে। এ খবর পেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে গর্জন করে বলতে থাকেন; নান্না ভাইয়ের বাসায় হামলা করেছে কে সেই পুলিশ? বিশাল হৃদয়ের শেখ মুজিব তখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এ ব্যাপারে একদিন এই লেখকের সাথে বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কথা হলে তিনি বলেছিলেন; অনেক কথা আছে, অনেক কাহিনী আছে। তোমার এত জানার কথা নয়। শামসুল ইসলাম বলতেন, মৌলভী তমিজউদ্দিন খানের বিপরীতে তৎকালীন পাকিস্তানের পার্লামেন্ট নির্বাচনে এনডিএফের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেতে শেখ মুজিবুর রহমান আমার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন। কাজী জাফর আহমদও তার লেখা বইয়ে একটি ঘটনার বিবরণ দিয়ে অভিমত প্রকাশ করেছেন, শেখ মুজিব ছিলেন মাথা থেকে নখ পর্যন্ত একজন খাঁটি রাজনীতিবিদ। অপর দিকে কোনো মন্ত্রী যদি সংসদে দাঁড়িয়ে দাঁত খিচিয়ে খিস্তি আউড়িয়ে কথা বলে তখন সৌহার্দ্য কি অবশিষ্ট থাকে? শিষ্টাচারের বড় অভাব আজ রাজনীতিতে।

মরহুম শামসুল ইসলাম স্বাধীন বাংলাদেশে দু’টি জিনিসের পরিবর্তনে খুবই উচ্ছ্বসিত ছিলেন। একটি হলো যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি, অপরটি হলো নারী শিক্ষার অগ্রগতি। বাংলাদেশের যাতায়াতব্যবস্থা আগের মতো দুর্গম নয়। বিগত শতকের ৩০ দশকের শেষের দিকে তার চাচার বিয়ের রাতের কথা উল্লেখ করে বলতেন, আমাদের বাড়ি থেকে রাত ৯টায় রওনা হয়ে কনের বাড়িতে পৌঁছতে রাত ৩টা বেজে গিয়েছিল। দূরত্বটি ছিল সর্ব সাকল্যে এক মাইল। এখন সেখানে সময় লাগে হেঁটে গেলে ১২ থেকে ১৫ মিনিট আর সাইকেলে পাঁচ থেকে ছয় মিনিট। ঢাকা থেকে মিরপুর যেতে নৌকায় সময় লাগত সারা রাত। মুন্সীগঞ্জের তখনকার আইসিএস মহকুমা প্রশাসক আশোক মিত্রকে একটি সাইকেলে করে যাতায়াত করতে দেখেছেন। তিনি উল্লেখ করতেন, তা হলে নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে কুসংস্কারের অনেক জঞ্জাল দূর হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন ছাত্রী ছিল তিনজন। আজ বিদ্যার্থিণীদের পদচারণায় গ্রামগঞ্জের স্কুল কলেজগুলোও মুখরিত। নারী শিক্ষার ফলে গার্হস্থ্যবিদ্যা, স্বাস্থ্যজ্ঞান, ধাত্রীবিদ্যা, শিশুর যতœ নেয়া, শস্য সংরক্ষণ, রন্ধন পদ্ধতি, হাঁস-মুরগি-গবাদি পশু পালন, বৃক্ষরোপণ, জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিষয়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। ভুবন খ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ভাষায়, বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। নারী শিক্ষার ফলে নতুন প্রাতের আভা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সমাজতন্ত্র সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী আর তেমন আগ্রহ নেই। এই মতাদর্শটি বিদায় নিয়ে ভালো হয়েছে। এমন মন্তব্যে ঢাকা শহরের একসময়ের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি, হাজী ওসমান গণির সন্তান শামসুল ইসলাম খুব খুশি হতে পারেননি। তিনি বলতেন, বিশ্বব্যাপী আজ যে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা, তা এই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনেরই ফসল। কার্ল মার্কসের সাম্যবাদ হয়তো কোথাও নেই। কিন্তু এই তত্ত্বের আবির্ভাবের ফলে পুঁজিবাদও একচেটিয়া শোষণ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে। হয়তো তাই ইউরোপে বলা হয়, ‘যৌবনে যার মস্তিষ্কে সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা কাজ করে না, বুঝতে হবে তার হৃদয় নেই আর পরিণত বয়সে যে রক্ষণশীল হয় না বুঝতে হবে তার মাথায় মগজ নেই।’

শামসুল ইসলাম গণতন্ত্রের প্রশ্নে বলতেন, গণতন্ত্র ছাড়া কোনো সরকারব্যবস্থা তার জনগণের কাছে এত বেশি দাবি করে না। তেমনি গণতন্ত্র ছাড়া অপর শাসনব্যবস্থা তার নাগরিককে অত বেশি দামও করে না। তার প্রধান চাওয়াই হলো শাসকগোষ্ঠীর জ্ঞান চর্চা। এটা যেমন গ্রিস দেশে প্লেটো অনুভব করছেন, তেমনি বাংলাদেশে আমরা তার অভাব প্রকটভাবে অনুভব করছি। গণতন্ত্রের দুর্বলতা হলো, গণতন্ত্র মানবিক। এ ব্যবস্থাকে যদি মানুষ তার আদর্শের গভীরে বিশ্বাস এবং প্রবল ইচ্ছা শক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তা হলে সাফল্য লাভ না করার কারণ নেই।

শামসুল ইসলাম বলতেন, লোকে আমাকে বিক্রমপুরের শামসুল ইসলাম বলে চেনে যদিও আমার জীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত হলো ঢাকা শহরে। শেকশপিয়র তার জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন লন্ডনে; কিন্তু তাকে ‘অ্যাডেন নদীর পাড়ের ছেলে’ বলে পরিচয় দেয়া হতো। জার্মান কবি গ্যাটে ফ্রাঙ্কফুর্ট ছেড়ে ভাইমারে চলে গিয়েছিলেন। তবুও এই বিশ্ববিখ্যাত কবিকে ফ্রাঙ্কফুর্টের গ্যাটে বলা হতো। একজন বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক গর্ব করে বলেছিলেন, সৃষ্টিকর্তা আমাকে কোনো বর্বর এলাকায় না পাঠিয়ে গ্রিস পাঠিয়েছিলেন এ জন্য তাকে ধন্যবাদ। তেমনি শামসুল ইসলাম বলতেন শত মনীষীর জন্মস্থান বিক্রমপুরের এক গ্রামে মহান আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছিলেন, এ জন্য আমিও ধন্য। বিক্রমপুরের সন্তান হিসেবে গর্ববোধ করি। এই বিক্রমপুরের একজন জগৎবিখ্যাত মনীষী সম্পর্কে বর্তমান বিশ্ব বলে থাকে, unsung hero of scince world.

নীরবে, নিভৃতে চলাফেরাকারী শামসুল ইসলাম সম্পর্কেও বলা চলে unsung hero of our present political culture. বিক্রমপুরের সুখবাসপুরে জন্মে ছিলেন শামসুল ইসলাম।

পার্শ্ববর্তী গ্রাম বজ্রযোগীনিতে জন্মে ছিলেন ঊুব ড়ভ অংরধ, সহস্রাব্দের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, স্নেহ, সংহতি, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা সৃষ্টিতে তিনি হয়তো অতীশকে অনুসরণ করে গেছেন। সদর্পে তিনি চলতেন না বা উচ্চ স্বরে কথা বলতেন না। অথচ সারা জীবন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এই জনপদের মানুষের কল্যাণে সামর্থ্য অনুযায়ী তার প্রয়াস আমৃত্যু অব্যাহত ছিল। তার বাসস্থানে রেখে গেছেন বিশাল লাইব্রেরি। অসংখ্য পুস্তকের সমাহার তার এই ব্যক্তিগত পাঠাগার অনেক মূল্যবান পুস্তকে ঠাসা। সংবাদপত্র জগতের অনেকের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। গুণীজনকে তিনি সমাদৃত করতেন। গত ২৬ এপ্রিল হারিয়ে গেছেন প্রচার ও প্রশংসাবিমুখ শামসুল ইসলাম। জগৎবিখ্যাত জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো তিনিও নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন তার গ্রামের বাড়িতে অসংখ্য বৃক্ষরাজির নৈসর্গিক শোভামণ্ডিত বিশাল বাগান। সেই বাগ-বাগিচার পাশে, সবুজ ঘাসের তলে, বেলে মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন শামসুল ইসলাম। তিনি বিক্রমপুরবাসীর মহান সন্তান হিসেবে চলার পথের প্রেরণার উৎস হয়ে বিরাজ করবেন আমাদের মধ্যে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিবিদ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.