অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় প্রসঙ্গে

ড. মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ

অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ের প্রথা আধুনিক বিশ্বে নতুন নয়। উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেও এর প্রসার লক্ষ করার মতো। বর্তমানে বাংলাদেশেও এর ব্যাপক প্রচার বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা লক্ষ করছি। কিন্তু অনলাইনের মাধ্যমে ব্যবসার প্রসারের সাথে সাথে তার ধর্মীয় বৈধতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কিছু শর্তসাপেক্ষে এভাবে অর্থাৎ অনলাইনের মাধ্যমে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় বৈধ। শর্তগুলো নিম্নরূপÑ
ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ যেন প্রতারিত না হয় : কারণ, রাসূল সা: মদিনার বাজারে আটার ঝুড়ির ভেতরে হাত দিয়ে যখন দেখতে পেলেন বাইরে শুকনো আটা থাকলেও ভেতরে ভেজা; তখন বলেছিলেন, যে আমাদের সাথে প্রতারণা করল সে আমার (উম্মতের) অন্তর্গত না। (বুখারি)
ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বাধীনতা থাকতে হবে : বিশেষ করে, ‘খিয়ারে রুইয়াত’ অর্থাৎ পণ্য দেখার পর কোনো দোষ-ত্রুটি ধরা পড়লে ক্রেতার কোনো ধরনের ক্ষতি হওয়া ব্যতীত সেই পণ্য ফেরত দেয়ার অধিকার নিশ্চিত থাকা।
পণ্যের বিবরণ ও বর্ণনা বিস্তারিত ও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা : পণ্যটির বিস্তারিত বর্ণনা কোথায় তৈরি, কী দিয়ে তৈরি, গুণগতমান, ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি আছে কিনা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ওজন কিংবা সাইজ কতটুকু তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের লুকোচুরি করলে তার পরিণাম ভয়াবহ। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হচ্ছেÑ মন্দ পরিণাম তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহাদিবসে। (সূরা মুতাফফিফিন, ১-৫)
পণ্য ও দামের মধ্যে কোনো ধরনের গরমিল না থাকা : যেমন : বলা যেতে পারে, পণ্য কোনো বস্তু কিংবা প্রাণী হোক; তার যে ছবি ও বিস্তারিত বর্ণনা অনলাইনে দেয়া থাকবে প্রকৃতপক্ষে তার সাথে মিল থাকা চাই। তার রঙ, সাইজ, গুণগতমান ইত্যাদি বর্ণনা মোতাবেক হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনÑ ‘মেপে দেয়ার সময় পূর্ণভাবে দেবে এবং ওজন করবে ঠিক দাড়িপাল্লায়, ইহাই উত্তম এবং পরিণাম উৎকৃষ্ট।’ (সূরা বনি ইসরাঈল ৩৫)
পণ্য হাতে পেয়ে দাম পরিশোধের ব্যবস্থা : সবচেয়ে ভালো হয় যদি, পণ্য হাতে পেয়ে দাম পরিশোধের ব্যবস্থা থাকে। কারণ, বিক্রেতার চেয়ে ক্রেতার এ ক্ষেত্রে প্রতারিত বা ঠকার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই, ক্রেতা পণ্য দেখার পরে দাম পরিশোধ করতে পারলে ঠকার সম্ভাবনা কম থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আগেই দাম পরিশোধ করে পণ্যে কোনো ত্রুটি থাকার কারণে ফেরত দিলেও পরিশোধিত টাকা পেতে সময় ও হয়রানি দুইয়েরই অভিজ্ঞতা রয়েছে অনেকের।
পরিশেষে, ব্যবসায়ে ইসলামের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলোÑ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা। সেখানে কেউ নিশ্চিত লাভবান হবেন আর কেউ ক্ষতির সম্মুখীন হবেন, এমন সব লেনদেন থেকে বিরত রেখে উভয়ের কল্যাণ সাধিত হয় এই উদ্দেশ্যে শরিয়ত বিভিন্ন শর্তারোপ করে থাকে। তাই, ইসলামের বিধি-বিধানগুলো সঠিকভাবে মেনে এ ধরনের ব্যবসায় কোনো দোষ নেই বরং ভালো।
ইসলামের দৃষ্টিতে সৎ ব্যবসায়ীদের মর্যাদা নবী, রাসূল ও শহীদদের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘সৎবাদী, আমানতদার ও বিশ্বাসী ব্যবসায়ী ব্যক্তি কিয়ামতের দিনে নবী, সিদ্দিক এবং শহীদদের দলে থাকবেন।’ (তিরমিযি, দারে কুতনি ও দারেমি)। সুতরাং, এই অপার সুযোগ থেকে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিই বঞ্চিত হতে চাইবে না। এটাই কি স্বাভাবিক নয়?
লেখক : শিক্ষাবিদ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.