যুগে যুগে রোজা
যুগে যুগে রোজা

যুগে যুগে রোজা

এম এ ওয়াহাব

রোজা শব্দটি একটি ফারসি পরিভাষা। এর আরবি প্রতিশব্দ হলো সওম। সওম শব্দটি ‘বাবে নাসারার’ ক্রিয়ামূল। এর অর্থ হলো ইমসাক (বিরত থাকা)। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য, পানীয় ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকাই সওম। 

সিয়াম হলো প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সক্ষম মুসলিম নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে পানাহার ও যৌন সম্ভোগ এবং অশ্লীল, গর্হিত প্রভৃতি কাজকর্ম, কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। (ফাতহুল বারি)

আল্লামা যুরকানি বলেন, ‘নিয়তের সাথে সুবহে সাদিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে দূরে থাকাকে রোজা বলে।’

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩) রোজা শুধু উম্মতে মুহাম্মাদীর ওপর ফরজ নয়, বরং পূর্ববর্তীদের ওপরও ফরজ ছিল। এর দ্বারা হজরত আদম (আ:) থেকে হজরত ঈসা (আ:) পর্যন্ত সব উম্মত ও শরিয়তকে বোঝানো হয়েছে। তবে রোজার সময়সীমা, সংখ্যা এবং কখন রোজা রাখতে হবে এসব ব্যাপারে পার্থক্য রয়েছে।

হজরত আদম (আ:) পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও নবী। তাঁর ওপরেও রোজার বিধান ছিল। তাঁর ওপর প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজা ফরজ ছিল। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদকে (রা:) আইয়ামে বিজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আদমকে (আ:) এক প্রকার ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি আদেশ অমান্য করে ফলটি খেয়ে ফেলেন। ফলে আদম (আ:) জান্নাত হতে বহিষ্কার হয়ে দুনিয়ায় প্রেরিত হতে বাধ্য হন। সে সময় তাঁর দেহের রঙ কালো বর্ণ ধারণ করে। আদমের (আ:) দুর্দশা দেখে ফেরেশতারা কেঁদে ফেলেন এবং আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আদম তোমার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, তুমি তাঁকে জান্নাতে স্থান দিয়েছিলে, আমাদের দ্বারা সিজদাও করিয়েছিলে, আর মাত্র একটি ভুলের কারণে তাঁর গায়ের রঙ কালো বর্ণ করে দিলে।

তাদের জবাবে আল্লাহ তায়ালা আদমের (আ:) কাছে ওহি পাঠালেন, ‘তুমি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজা পালন কর। এ জন্যই এ তিনটি দিনকে আইয়ামে বিয বা উজ্জ্বল দিন বলে।’ এ বর্ণনার পেছনে তেমন কোনো যুক্তি নেই। তবে রাসূল সা: বাড়িতে অবস্থানকালে বা সফরকালে অবশ্যই আইয়ামে বিজের রোজা রাখতেন।

আইয়ামে বিজের রোজা সম্পর্কে আবু জর (রা:) বলেন, ‘রাসূল (সা:) একদা আমাকে বললেন, হে আবু জর, তুমি যখন মাসের তিন দিন রোজা রাখবে তখন মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজা রাখবে।’ (তিরমিজি, নাসায়ি)

আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, ‘আমার বন্ধু নবী সা: আমাকে তিনটি বিষয়ের অসিয়ত করেছেন, প্রতি মাসে তিনটি রোজা রাখা, চাশতের ২ রাকাত নামাজ পড়া এবং আমি যেন নিদ্রা যাওয়ার আগে বেতের নামাজ আদায় করে নিই।’ (বুখারি শরিফ)
ইবন আব্বাস (রা:) বলেন, ‘নবীজি সা: সফরে ও বাড়িতে আইয়ামে বিজের রোজা রাখতেন।’ (নাসায়ি, মিশকাত-১৮০ পৃ:)

হজরত নূহ (আ:) আল্লাহ তায়ালার একজন দীর্ঘজীবী নবী ও প্রথম রাসূল। তাঁর সময়েও রোজার প্রচলন ছিল। ‘নূহ (আ:) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ছাড়া পুরো বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবন মাজাহ) হজরত মুয়াজ, ইবন মাসউদ, ইবন আব্বাস (রা:), আতা, কতাদাহ ও জাহহাক (র:) থেকে বর্ণিত যে, হজরত নূহের (আ:) যুগ থেকে শেষ নবী পর্যন্ত প্রতি মাসে তিনটি রোজার প্রচলন ছিল। পরে তা আল্লাহ তায়ালা রমজানের রোজা দিয়ে তা রহিত করে দেন।’
‘হজরত ইব্রাহিমের (আ:) সময়ে প্রতি মাসে তিনটি রোজার প্রচলন ছিল। কারণ তিনি ছিলেন নূহের (আ:) পরের নবী।’

হজরত মুসা (আ:) একজন নবী ও রাসূল। তাঁর সময়েও রোজার প্রচলন ছিল। ইবন আব্বাস (রা:) বলেন, ‘নবী সা: মদিনায় (হিজরত করে) এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটি কী ধরনের রোজা? তারা জবাব দিলো, এটি একটি পবিত্র দিন। এ দিন আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাইলকে দুশমন থেকে নাজাত দান করেন। তাই এ দিন মুসা (আ:) রোজা রেখেছেন। নবী সা: বললেন, তোমাদের চেয়ে মুসার বেশি হকদার আমিই। অতঃপর তিনিও রোজা রাখলেন এবং এ দিন রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত) মহররম বা আশুরার দিন দু’টি রোজা রাখতে হবে। ৯ ও ১০ মহররম বা ১০ ও ১১ মহররম। ৯ ও ১০ রাখা উত্তম।

তবে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থে এ মুক্তির দিনে রোজা পালনের উল্লেখ নেই, বরং সেখানে উল্লেখ রয়েছে উৎসব পালনের কথা; রোজার বিপরীতে পানাহারের কথা। ওল্ড টেস্টামেন্ট বা ‘পুরনো নিয়ম’ এর যাত্রা পুস্তকে এ দিনে ইহুদিদের করণীয় কর্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
ইহুদিদের মুক্তি দিবসের কর্তব্য সম্পর্কে সহিহ হাদিস ও ওল্ড টেস্টামেন্টের ভাষ্য পরস্পর বিপরীতমুখী বলে মনে হয়।

গভীরভাবে চিন্তা করলে উভয় তথ্যের মধ্যে কোনো মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয় না। মদিনার ইহুদিরা যে রোজা পালন করত তা ছিল উৎসবকে আরো উৎসবমুখর করে তোলার একটি সহায়ক প্রস্তুতি। রোজা বা উপবাস, ভোজনের উৎসবকে আরো আকর্ষণীয় ও বেগবান করে তোলে নিঃসন্দেহে। আনন্দ-উৎসব ও সাজসজ্জার মধ্য দিয়েই ইহুদিরা যে এ মুক্তি দিবস পালন করত, অন্য হাদিসে তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলে। আবু মুসা আশয়ারি (রা:) বলেন, খায়বারের ইহুদিরা আশুরাকে ঈদের দিনের মতো মনে করত। (বুখারি)

হজরত দাউদ (আ:) একজন নবী ও রাসূল। তাঁর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল (আল্লাহর কাছে তাঁর রোজা ছিল উত্তম রোজা)। হজরত রাসূল সা: বলেন, ‘তুমি (আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস) শ্রেষ্ঠ রোজা রাখবে। তাহলো দাউদের (আ:) রোজা। এক দিন রোজা রাখবে আর এক দিন রোজা রাখবে না।’ (সিহাহ সিত্তা, মিশকাত)

ওল্ড টেস্টামেন্টে দাউদের (আ:) যে জীবনবৃত্তান্ত পেশ করা হয়েছে তার পরতে পরতে রয়েছে, তাঁর রোজা পালনের ঘটনাবহুল প্রেক্ষাপট। ইসরাইল নেতা ‘শৌল’ এর মৃত্যুতে দাউদ (আ:) ও তার সঙ্গীরা তাঁর বিষয়ে শোক ও বিলাপ এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাস করলেন।
হজরত ঈসা (আ:) ছিলেন একজন নবী ও রাসূল। তাঁর সময়েও রোজার প্রচলন ছিল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আপনি (মারিয়াম) আহার করুন ও পান করুন এবং চক্ষু জুড়ান। অনন্তর আপনি লোকদের মধ্যে কাউকে দেখলে (ইশারায়) বলেন, আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোজা মানত করেছি। অতএব আজ আমি কার সাথে কথা বলব না।’ (মারিয়াম : ২৬)

(হে মারিয়াম) ঈসাকে দেখলে লোকে তোমার সতীত্বের প্রতি সন্দেহ করে বিভিন্ন প্রশ্ন করবে। তখন তুমি ইশারায় জানাও আমি রোজা মানত করেছি, আমার কথা বলা নিষিদ্ধ।

সব ফুকাহর মতে, উম্মতে মুহাম্মাদীর ওপর রোজা দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে ফরজ হয়েছে। রাসূলের সা: হিজরতের অষ্টাদশ মাসে কিবলা পরিবর্তনের সময় রোজা ফরজ হয়। উল্লেখ্য, রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। আবার হিজরতের পর আইয়ামে বিজের রোজা ফরজ করা হয়েছে। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর এগুলোর অপরিহার্যতা রহিত হয়ে গেছে। তবে এসবের সুন্নত বহাল রয়েছে। সব মুসলিম নর-নারীর ওপর রোজা ফরজ। তবে পাগলের ওপর রোজা ফরজ নয়। উল্লেখ্য, যদি ওই পাগল রোজা চলাকালে জ্ঞান ফিরে পায় তাহলে পরবর্তী রোজাগুলো তাকে আদায় করতে হবে। কারণ সে তখন আর পাগল নয়, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ব্যক্তি। এ ছাড়াও কাফির, মুসাফির, হায়েজওয়ালি, নেফাসওয়ালি, গর্ভবতী, দুধদানকারিণী, শিশু ও রোগীদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে রোজা ফরজ নয়।
লেখক : প্রবন্ধকার

 খোশ আমদেদ মাহে রমজান

মো: তৌহিদুল ইসলাম

আল্লাহ্ তায়ালার বরকত ও করুণাধারায় আমাদের জীবনগুলোকে সিক্ত করতে পবিত্র মাহে রমজান ফিরে এলো আরেকবার। রমজানের প্রতিটি দিনে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে অগণিত বান্দাহ প্রভুর আনুগত্য ও সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা এবং বৈধ আকাক্সক্ষা পরিত্যাগ করে সাক্ষ্য দেয় যে, শুধু আল্লাহ তায়ালাই তাদের প্রভু আর একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি।

এই মাসের প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে এত বেশি বরকত লুকিয়ে আছে যে, এই মাসে করা নফল কাজগুলো ফরজ কাজের মর্যাদা পায়, আর ফরজ কাজগুলো সত্তর গুণ অধিক মর্যাদা পায় (বায়হাকি)। রমজান মাস এলে আকাশের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, সৎ পথে চলার পথ সহজ হয়ে যায়, শয়তানকে শিকলে আবদ্ধ করা হয় (বোখারি ও মুসলিম)। অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে রোজা ঢালস্বরূপ। অতএব, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা একিন ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে রাখবে তার অতীত ও বর্তমানের সমস্ত গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হবে (বোখারি)। কদরের রাতে যে ব্যক্তি কিয়ামের মাধ্যমে রাত কাটিয়ে দেবে তাদেরও ক্ষমা করে দেয়া হবে শুধু এই শর্তে যে, আল্লাহ্ তায়ালার বাণী আর ওয়াদাকে তারা সত্য মনে করবে, বান্দাহ্ হিসেবে নিজের সব দায়িত্ব বিশ্বস্ততার সাথে পালন করবে (বোখারি)।

এই মাস নিঃসন্দেহে আত্মমর্যাদা ও বরকতের মাস। গতানুগতিকতার স্বাভাবিক প্রবাহে যারা এ মাসকে অতিবাহিত করবে, এর মর্যাদা ও বরকত তাদের জন্য নয়। উদাহরণস্বরূপ বৃষ্টির পানি সবার জন্যই রহমত। বৃষ্টিতে একটি গ্লাস রাখলে যে পরিমাণ পানি ধরবে তা কখনোই একটি পুকুরের সমান হবে না। আবার একটি বিস্তীর্ণ মরুভূমি বা অনুর্বর ভূমিতে পড়লেও ভূমি তা থেকে উপকৃত হতে পারে না। কিন্তু সেই পানি উর্বর ভূমিতে পড়লেই ফসল জীবন্ত হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনি রমজান থেকে কে কতটুকু ফায়দা হাসিল করবে তা নির্ভর করবে নিয়াত, সঠিক পরিকল্পনা, কর্ম প্রচেষ্টা আর আমলের ওপর। রাসূল সা: বলেন, কেউ তার দিকে এক হাত অগ্রসর হলে আল্লাহ্ তার দিকে দুই হাত অগ্রসর হন। তার দিকে যে হেঁটে যায়, আল্লাহ্ তার দিকে দৌড়িয়ে অগ্রসর হন (মুসলিম)। রোজা আসে রোজা যায় তবুও কারো কারো তহবিল শূন্যই থেকে যায়, এমন দুর্ভাগাদের কাতারে আল্লাহ যেন আমাদের না রাখেন। রাসূল সা: বলেন, অনেক রোজাদার আছেন যাদের ভাগ্যে ক্ষুধা পিপাসা ছাড়া আর কিছুই জোটে না, অনেকে সারারাত যাপন করেন; কিন্তু তা রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই হয় না (মুসলিম)।
এই মাস আত্মার পরিশুদ্ধি ও পরিতৃপ্তি অর্জনের মাস, ঈমানের সংস্কার করার মাস। আত্মিক ও চারিত্রিক শক্তি ফিরিয়ে আনার মাস, নফসের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার মাস, কুপ্রবৃত্তিকে দমন করার মাস, সর্বোপরি মানুষ হওয়ার মাস। মুসলমানরা এ মাসের অপেক্ষায় থাকেন অধীর আগ্রহে।

রমজানে অর্জিত হয় তাকওয়া, বাস্তবায়ন হয় আল্লাহর নির্দেশমালা। শাণিত হয় ইচ্ছা। অর্জিত হয় ঐক্য, মহব্বত ও ভ্রাতৃত্ব। অনুভব করে ক্ষুধার্তের ক্ষুধা। এটি ত্যাগ, বদান্যতা আর আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার মওসুম। যে ব্যক্তি রোজা রাখবে তার রূহ পবিত্র হবে। হৃদয় নরম হবে। অনুভূতিসমূহ শাণিত হবে, আচরণগুলো বিন¤্র হবে। এ মাসে মুসলমানেরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়ার অনুভূতি অর্জন করে। এ মাসে একজন মুসলিম প্রশিক্ষণ নেয় আত্মদানের।

মহান আল্লহ্ তায়ালা এ মাসে অসীম আগ্রহে মানবতাকে ধন্য করেছেন, মানব জাতিকে পথ প্রদর্শনের সম্পূর্ণ প্যাকেজ (কুরআনুল কারিম) দান করেছেন। কোনটি সঠিক আর কোনটি নয় তা পরখ করার জন্য ভ্রান্তি-বক্রতা-বিকৃতিমুক্ত এক কষ্টিপাথর আমাদেরকে দান করেছেন। রোজা রাখা কিংবা কুরআন তেলাওয়াত করার জন্য এ মাসের শ্রেষ্ঠত্ব¡ হয়নি বরং পবিত্র কুরআন নাজিল হওয়ার মহান ঘটনার কারণে এ মাসের মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব হয়েছে। তাই শুধু তেলাওয়াত নয় বরং কুরআনকে অর্থসহ বুঝে বুঝে অধ্যয়ন করা রমজানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। আল্লাহ্ বলেন, রমজান সেই মাস যে মাসে মানবজাতির পথ প্রদর্শনের নিদর্শনসমূহ ও ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী কুরআন নাজিল হয়েছে। অতএব, যে এই মাস পেল সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে (সূরা বাকারা : ১৮৫)।

নিঃসন্দেহে কুরআন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। আর যে নেয়ামত যত বেশি মূল্যবান, তার হক আদায় করার দায়িত্বও তত বেশি। জীবনের আসল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যপানে পৌঁছার জন্য যে কিতাব সঠিক পথ প্রদর্শন করে, আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে এবং সেই কিতাবের বাহক হিসেবে আমাদের দায়িত্বও অনেক বেশি ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ জন্য প্রতিনিধি হিসেবে ১. আমাদের নিজেদের এর প্রদর্শিত পথে চলা এবং নিজের মন, চিন্তা, কর্ম, চরিত্র ও তৎপরতাকে এর ছাঁচে ঢেলে সাজানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালানো এবং ২. এই হেদায়েত শুধু নিজের ব্যক্তি জীবনে নয় বরং তা সবার কাছে পৌঁছানো, এর প্রদর্শিত পথে চলার জন্য আহ্বান জানানো ও অন্ধকার পথসমূহকে আলোকিত করা জরুরি। দ্বিতীয় দায়ত্বটি প্রথম দায়িত্বের অনিবার্য দাবি। কারণ দ্বিতীয় দায়িত্ব পালন ছাড়া প্রথম দায়িত্ব পালন পূর্ণাঙ্গ হয় না। আল্লাহর ঘোষণা- তোমার প্রভুর শ্রেষ্ঠত্ব আর মহত্ব ঘোষণা কর এবং তাদের উপর তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব প্রতিষ্ঠা করো (সূরা মুদ্দাসসির : ২-৩)। মুসলিম উম্মতের সৃষ্টি মূলত এ কারণেই করা হয়েছে।

রোজা রাখার উদ্দেশ্য বা ফলাফল সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)। অর্থাৎ রোজা রাখার মাধ্যমে তাকওয়া বা খোদাভীতির সেই গুনই অর্জন করতে হবে যার ফলে কুরআন নির্দেশিত পথে চলা সহজ হয়ে যায় এবং কুরআনের হক আদায় করে যথাযথভাবে প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করা যায়। তাকওয়া এমন একটি জিনিস যার মাধ্যমে সব সমস্যা মোকাবেলা করার একটি পথ পাওয়া যায়। তাকওয়ার মাধ্যমে রিজিকের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়, দ্বীন ও দুনিয়ার কাজ সহজ হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। মুত্তাকিদের জন্য এমন সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, যার প্রশস্ততার মধ্যে সমস্ত পৃথিবী ঢুকে যাবে (সূরা আরাফ : ৯৬)। অন্তর, রূহ, জ্ঞান ও সচেতনতা, আগ্রহ ও ইচ্ছা, আমল ও কর্মতৎপরতার সেই শক্তি ও যোগ্যতার নাম তাকওয়া যার প্রভাবে ক্ষতিকর ও খারাপ কাজকে আমরা ঘৃণা করি আর ভালো কাজের ওপর দৃঢ় হয়ে যাই ও সঠিক মনে করে কর্মতৎপরতা চালাই।

রমজান মানুষকে তার রবের অধিকার বিষয়ে সচেতন করে। এই মহান মাসের আগমনে সবার জীবনে আসুক সুখ ও সমৃদ্ধি। যারা আনুগত্যশীল, এ মাসে তাদের উচিত নেক কাজ বাড়িয়ে দেয়া। পাপিদের কাছে এ মাস ফিরে আসার। তাই আত্মিক ও বস্তুগত সব রোজা ভঙ্গকারী বিষয়গুলো আমাদের জেনে নেয়া দরকার। হালাল রুজি ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। রমজান মানুষকে হারাম থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। রমজান থেকে মুসলিম উম্মাহ্ ঐকান্তিকভাবে শিক্ষা নেয়, বেহুদা কাজ থেকে বিরত থাকে, জিহ্বায় লাগাম টানে, হৃদয় পরিচ্ছন্ন রাখে, ব্যবহারকে সুন্দর করে, হিংসা-রেষারেষি থেকে মুক্তি লাভের শিক্ষা নেয়। ফলে বিচ্ছিন্ন হৃদয়গুলো অভিন্ন সুতোয় বেঁধে নেয়ার সুযোগ পায়। রমজান জীবনের মিশনকে আয়ত্ত করার এক বিরাট সুযোগ।

তাই আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমেই স্বাগত জানাতে হবে রমজানকে। সব পাপ ও গুনাহ থেকে তওবার মাধ্যমে স্বাগত জানাতে হবে মাহে রমজানকে। যাদের অধিকার হরণ করা হয়েছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমেই স্বাগত জানাতে হবে রমজানকে। ভালো কাজের মধ্যে দিন যাপনের মাধ্যমে স্বাগত জানাতে হবে মাহে রমজানকে। এ ধরনের আবেগ, অনুভূতি ও কর্ম মানুষকে তৃপ্ত করে, ব্যক্তি ও সমাজ তাদের সম্মান ফিরে পায়। তাই রমজান যেন কিছু অন্ধ অনুকরণ আর সীমিত কিছু আচার পালনের মাস না হয়। রমজানে পুণ্যের বদলে পাপ ও বক্রতা কোনো ব্যক্তির মধ্যে বেড়ে গেলে তা অবশ্যই আত্মিক পরাজয়, যার প্রভাব সমাজে পড়তে বাধ্য।

রমজান শাসক ও শাসিতের মাঝে যোগাযোগের একটি উপলক্ষ। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নীচুদের মাঝে সেতুবন্ধনের একটি বড় মাধ্যম। অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বারণ করার এক বিরাট সুযোগ। রমজান সামাজিক, চিন্তাগত অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকার একটি উপলক্ষ। মুসলমানদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের মোক্ষম সময় রমজান। তাই তাদের উচিত রমজান এলে বেশি বেশি আত্মসমালোচনায় মনোযোগী হওয়া।

তাকওয়া অর্জিত হলেই কেবল রোজা আমাদের পাপকে জ¦ালিয়ে দেবে। তাই শুধু তেলাওয়াত নয় বরং কুরআনকে অর্থ ব্যাখ্যাসহ পড়ে আমল করা জরুরি। এর মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারব আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী, জীবনের পারপাস কী, আমাদের দায়িত্ব কী আর পশুর ন্যায় দেহটি কিভাবে পরিণত হবে মানুষে। আরো বুঝতে পারব- রোজা আসে রোজা যায় তবুও সমাজ থেকে পাপাচার, অন্যায়, পশুত্ব, রাহাজানি কেন দূর হয় না। তাই এই রমজান হোক নিজেকে বদলে দেয়ার, পাপ কালিমাকে মুছে দেয়ার, আর আল্লাহর রহমত পাওয়ার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তোলার। আহলান সাহলান মাহে রমজান।
লেখক : ব্যাংকার

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.