উপকার

জোবায়ের রাজু

পড়ন্ত দুপুর। গোসল সেরে এসে দেখি আমার মোবাইলে সাতটা মিসডকল আর একটা মেসেজ। মিসডকল আর মেসেজ লিস্টে লিনার নাম। সাতটা মিসডকলের পরেই মেসেজটা এসেছে। মেসেজে লিনা লিখেছে, ‘ঘটনা কী? রিসিভ করছ না কেন? প্লিজ কল মি।’
লিনাকে কল করতে যাব, এমন সময়ে কলবেল বেজে উঠল। এ অসময়ে আবার কে!
দরজা খুলে দেখি রতন ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটি মোবাইলের প্যাকেট। নিশ্চয়ই এটা আমার জন্য এনেছেন। সিনিয়র হলেও এ মহল্লার রতন ভাইয়ের সাথে আমার জবর ভাব। বড় পছন্দ করেন আমায়। মাঝে মধ্যে এটাসেটা গিফট করেন। সেই সূত্রে এখন নিশ্চয়ই আমার জন্য মোবাইল নিয়ে এসেছেন। আমার মোবাইলটা ইদানীং হ্যাং হয়ে যায়। এটা রতন ভাইয়ের জানা।
Ñআসুন আসুন ভেতরে আসুন। হাতে এটা কিসের প্যাকেট?
Ñমোবাইলের প্যাকেট।
বলতে বলতে রতন ভাই আমার খাটে এসে বসলেন।
Ñরঞ্জু, একটা উপকার করবে?
Ñবলুন রতন ভাই।
Ñআমার হাতে যে মোবাইলের প্যাকেট দেখছো, এটা খালি প্যাকেট। ভেতরে মোবাইল নেই।
Ñমানে?
Ñহ্যাঁ। আজ জেবার জন্মদিন। জন্মদিনে জেবাকে এটা গিফট করব।
Ñখালি প্যাকেট?
Ñইয়েস। খালি প্যাকেট। আজ সেন্ট্রাল গার্ডেনে ওকে এটা গিফট করব। সে জানবে জন্মদিনে ওকে দামি মোবাইল গিফট করেছি। যখন সে খুশি হয়ে এটা হাতে নেবে, তখন পেছন থেকে তুমি ছিনতাইকারী সেজে উল্কার মতো দৌড়ে এসে জেবার হাত থেকে প্যাকেটটি নিয়ে দৌড়ে পালাবে। ব্যস, ঘটনা খালাস। জেবা জানবে আমার দামি গিফট তার হাত থেকে ছিনতাই হয়েছে।
Ñবুদ্ধি খারাপ না রতন ভাই। ঠিক আছে, আমার এই সাহায্যে যদি আপনার উপকার হয়, আমি রাজি।

২.
বিকেলে রতন ভাইয়ের সাথে সেন্ট্রাল পার্কে ঢুকে দূর থেকে দেখি জেবা আপু বসে আছেন। আমাকে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রেখে রতন ভাই জেবা আপুর কাছে গিয়ে বসলেন। আমি দূর থেকে তা প্রত্যক্ষ করছি। কিছুক্ষণ কথা বলে রতন ভাই জেবা আপুর হাতে মোবাইলের প্যাকেট দিতে যখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন আর আড়চোখে আমার আগমন অবলোকন করছেন, আমি প্রস্তুতি নিয়ে তাদের খানিকটা কাছে গেলাম।
Ñএই নাও জেবা। জন্মদিনে তোমার গিফট।
Ñওমা! মোবাইল! ওহ্, আমি ভাবতেই পারিনি।
জেবা আপুকে বেশি কিছু আর ভাবতে না দিয়ে আমি ঝড়ের বেগে দৌড়ে গিয়ে জেবা আপুর হাত থেকে মোবাইলের প্যাকেটটা থাবা নিয়ে দিলাম দৌড়। পেছন থেকে জেবা আপু ‘চোর চোর’ বলে চেঁচাতে লাগল আর আমার পিছু ছুটতে লাগল। সাথে রতন ভাইও।
‘এই চোর চোর। কে আছো হেল্প করো। আমার ফোন নিয়ে ভাগছে।’ জেবা আপুর চিৎকার সেন্ট্রাল পার্কের অন্যান্য আগন্তুকের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল। ব্যস্, শুরু হলো ধাওয়া। মুহূর্তেই গোটা ত্রিশেক ইয়ং পোলাপান জেবা আপুর সাথে যোগ দিয়ে আমাকে ধরতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে শুরু করল। সমবেত কণ্ঠে সকলে ‘চোর চোর’ বলে আমাকে ফলো করে দৌড়ে আসছে।
বাঁচার অনেক চেষ্টা করেও রক্ষা পেলাম না। সেন্ট্রাল পার্কের মেইন গেইট অতিক্রম করে মেইন রোডে উঠতেই ওরা আমাকে ধরে ফেলল।
পাবলিকের পিটুনির স্বাদ পেতে শুরু করলাম। কিল, ঘুষি, চড়, লাথি কত প্রকার ও কী কী, বুঝলাম হাড়ে হাড়ে। এতটাই ধোলাই খেয়েছি যে অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

৩.
আমি এখন হাসপাতালে। নার্স বলল কে যেন গতকাল অজ্ঞান আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যান্ডেজ করা। ডাক্তার-নার্সদের এই ঘটনা ব্যাখ্যা করলাম। তারা কেউ কেউ চাপা হাসি দিয়েছে। ডাক্তার সোহরাব বললেন, ‘উপকার করতে গিয়ে নিজের ক্ষতি হলো।’
প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখি আমার সাইলেন্ট করা মোবাইলটা গায়েব হয়নি। ঠিকঠাক পকেটে আছে। মোবাইলটা বের করে দেখি ১৫৮টা মিসডকল। আব্বা, বড় ভাই আর আপাদের সব কল। আহারে, আমার অনুপস্থিতি তাদের না জানি কতই না অস্থির করে তুলেছে! কিন্তু আশ্চর্য, লিনার একটা কলও নেই। যে মেয়ে দিনে দশবার করে হলেও আমার খবর নেয়, সে মেয়ে কি না এই এত ঘণ্টা পার হবার পরও আমার খোঁজ নেয়নি। ভাবা যায়!
বাড়িতে ফোন দেবার আগে ভাবলাম লিনাকে আগে কলটা দিই। প্রথম রিং হতেই রিসিভ হলো।
Ñএই চোর, আমাকে কল দিলে কেন?
Ñমানে কী লিনা?
Ñসেদিন সেন্ট্রাল পার্কের সামনে দিয়ে পার্লারে যাচ্ছিলাম। দেখলাম কতগুলো মানুষ তোমাকে কিলিয়ে আলু ভর্তা বানাচ্ছে। একজনের কাছে জানতে চাইলে সে বলল তুমি নাকি কোন্ এক মেয়ের মোবাইল...! ছিঃ, আমি একটা চোরকে ভালোবেসেছি? উফ!
আমাকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লিনা লাইন কেটে দিলো। হায় হায়, কী হবে এখন! করলাম রতন ভাইয়ের উপকার, আর সবার চোখে হলাম চোর। কোথায় রাখি এই দুঃখ!

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.