কেদার দ্য গ্রেট

মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

কেদার শব্দের উৎপত্তি কিভাবে তা বের করার জন্য বিস্তর গবেষণার দরকার। বাবা মা হয়তো আদর করে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নামে তার নাম রাখেন শাহজাহান। কিন্তু এই নামটি খাতা কলমেই রয়ে গেল বাকি কেদার নামটি তার সাথে এঁটে গেল সুপার গ্লুর মতো। কেদার নামটি শাহজাহানের যে তেমন বিপত্তি সৃষ্টি করে তা নয়, বরং অঘোষিত স্বাচ্ছন্দ্যই বোধ করে সে। কেদার প্রাইমারি স্কুল থেকেই আমার কাসমেট। এমনও হতে পারে যে, তার ব্যতিক্রমধর্মী চাল চলনের জন্য তার আসল নামটি বিলুপ্তি ঘটেছে আর সেখানে জন্ম নিয়েছে আরেকটি নতুন নাম কেদার।
তখন আমরা কাস টুতে পড়ি। ইংরেজির স্যার টেনসের ক্যাসিফিকেশন পড়া জিজ্ঞেস করলেন। অনেকের সাথে কেদারও পড়া শিখে আসেনি। স্যার প্রত্যেককে তিনটা করে বেত মারলেন। সবার শেষে কেদারের পালা। সম্ভবত সবার বেত মারা দেখে সে ভীষণ ভয় পেয়েছিল। তাকে বেত মারার সময় সে কই মাছের মতো অনবরত ডানে বামে সামনে পেছনে দুলতে লাগল। স্যার রাগে আরো বেগে বেত মারল। যার জন্য তার বেত মারার তীব্রতাটা একটু বেশিই ছিল। ইংরেজি স্যার চলে যাওয়ার পর বাংলা স্যার এসেই দেখেন; সবাই নাক ধরে উসখুস করছে। স্যার জানতে চাইলেন, ‘তোরা সবে নাক ধরে ক্যান?’
তিনি এদিক-সেদিক তাকিয়ে বললেন, ‘কাস রুমে পানিই বা এলো কোত্থেকে?’
কেউ কোনো কথা বলছে না। কেউ একজন চোখ টলমল করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, মনে হয় ছাগলে এসে প্রস্রাব করে গেছে।’
স্যারও চোখ টলমল করে বললেন, ‘তো ছাগলটা বড় ছিল না ছোট্ট?’
এবার কেউ কোনো কথা বলছে না। সবার চোখের গতিবিধির ওপর খেয়াল করে স্যার বুঝে গেছেন এটা কার কারবার। স্যার কেদারকে দাঁড়াতে বললেন
‘কী রে কেদার বেটা, এই ভরদুপুরে কাসরুমে এ কাজটা কে করল বল তো?’ কেদার চুপ।
‘তোর বেগ পেয়েছে তো স্যারকে বললেই পারতিস?’
কেদার গদগদ করে বলতে লাগল, ‘স্যারের বেদম মারে আমার জল বিয়োগ হয়ে গেলে আমি কী করব? আমি তো ইচ্ছে করে বিয়োগ করিনি।’
এবার ঘুমন্ত কাস জেগে উঠল। কাসে হাসির ঢেউ বয়ে গেল।
কাস সিক্স বা সেভেনে থাকাকালীন এই হাবাগোবা ছেলেটা হঠাৎ বাচাল প্রকৃতিতে রূপান্তরিত হলো। সব সময় কাসের ফার্স্টবয়ের সঙ্গে তার জোরপূর্বক বন্ধুত্ব লক্ষ করা যেত। উদ্দেশ্য পরীক্ষায় সহযোগিতা পাওয়া। পরীক্ষার দিন বেঞ্চ পাল্টে হলেও ফার্স্টবয়ের সঙ্গে তার বসা চায়। অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে ওঠার সময় রোল এক হলো মর্জিনার। আমরা বললাম, ‘কেদার, এখন কী হবে? এবার কি মর্জিনার সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে পরীক্ষা দিতে পারবি?’
‘কেন নয়? মর্জিনার সঙ্গে বসা একটা ব্যাপার হলো।’ বুক ফুলিয়ে জবাব দিলো কেদার।
আমরা সবাই চোখ বড় বড় করলাম, ‘ছেলেটা বলে কী? মর্জিনা তোকে তার সঙ্গে বসতে দেবে?’
‘দেবে না মানে? অবশ্যই দেবে। প্রয়োজনে মর্জিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলব। মর্জিনাকে কলা, আপেল, আঙুর খাওয়াবো।’
শুরু হয়ে গেল কেদারের মর্জিনাকে পটানোর পালা। তিন রাস্তার মোড়ে ফকির বাবার কাছ থেকে পানপড়া আনল। কিন্তু মর্জিনাকে পানপড়া খাওয়ানো গেল না। লবণপড়া আনল তাও খাওয়ানো গেল না। অনেক ঘোরাঘুরির পর যখন দেখলাম কেদার ব্যর্থ তখন তাকে ব্যর্থ প্রেমিক ডাকা শুরু করলাম। কেদার এতে ভীষণ ুব্ধ। সে পণ করেছে যে করেই হোক সে মর্জিনার সঙ্গে প্রেম করবেই। ‘কিভাবে?’ এই প্রশ্নের জবাবে সে বলল, ‘জাদু করে’।
‘জাদু করে!’
হ্যাঁ আমি এক জ্যোতিষী বাবার কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমার হাতের রেখা দেখে বলেছেন ‘মর্জিনা আর আমার প্রেমের সম্পর্ক পজিটিভ। জাদুটোনায় সফলতার জন্য সে অন্য এক মেয়েকে লাগাল মর্জিনার মাথার সম্মুখ ভাগের চুল সংগ্রহ করে দিতে। চুল দিয়ে জ্যোতীষী বাবা এমন বাণ মারবেন যে মর্জিনা পাগল হয়ে কেদারের কাছে চলে আসবে। একদিন স্কুল ছুটির পর ওই মেয়ে মর্জিনার মাথার চুল কেদারকে দিলো। কেদারের আনন্দ সেদিন দেখে কে! কিন্তু ওই পর্যন্তই। মর্জিনার সঙ্গে কেদারের প্রেম হয়নি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.