মাদকে ভাসছে দেশ, দায় কার?
মাদকে ভাসছে দেশ, দায় কার?

মাদকে ভাসছে দেশ, দায় কার?

মো: তোফাজ্জল বিন আমীন

জীবনবিনাশী মাদক আগামী দিনের কর্ণধার তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষকে এক ভয়াবহ ধ্বংস ও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গুম, খুন, অপহরণ, সড়ক দুর্ঘটনা ও ধর্ষণের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে মাদকের বাণিজ্য। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, উচ্চবিত্ত পরিবারের মহিলাসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। এখন হাত বাড়ালেই গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, সিসা, বাংলা মদ, হেরোইন সহজে পাওয়া যায়। মাদকের ভয়াবহতা কত নিষ্ঠুর, কত বেদনাদায়ক হতে পারে তা নিজ আত্মীয় স্বজনের মধ্যে কেউ নেশাগ্রস্ত থাকলে সহজে অনুধাবন করা যায়। সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: মোহিত কামালের কাছে এসে বলেন, ইয়াবা না খেলে তিনি স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না। অফিসের কাজ এলোমেলো হয়ে যায়। সভা-সেমিনারে বক্তব্য রাখতে পারেন না। এ অবস্থা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারেন সে জন্য ডাক্তারের কাছে পরামর্শ চেয়েছেন। ডা: মোহিত কামাল আরো বলেছেন, আমাদের কাছে ইয়াবা আসক্ত শতশত রোগী আসছেন। আমরা জরিপ করে দেখেছি, এমন কোনো পেশার লোক নেই, সেখানে ইয়াবা আসক্ত নেই। এটা বাংলাদেশের জন্য অশনিসঙ্কেত। সূত্র : ইত্তেফাক, ৩১জুলাই-২০১৭।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সামাজিক অবক্ষয় বেড়েই চলেছে। দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি লোক মাদকাসক্ত। সমাজের সর্বস্তরে জীবনবিনাশী মাদকের অভয়ারণ্য। মাদকের সয়লাবের ফলে চুরি, ছিনতাই, খুনসহ নানা ধরনের অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলছে। মাদকের সর্বনাশা নীল ছোবলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর অন্যতম চীন। অথচ মধ্যযুগে বিশাল চীনকে বশীভূত ও চরম দুর্বল করে রেখেছিল ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো। শুধু মাদকের ভয়াল আগ্রাসনের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশকে এমন পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে এখনই মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ নয়! এর ৯৫ শতাংশ মাদক আসে বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী দেশ থেকে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে প্রতিবছর শুধু নেশার পেছনে খরচ হবে ৬০ হাজার কোটি টাকা। দেশের ৩২ জেলা ও ১৩২টি উপজেলার সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশে ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপজেলার নাফ নদীর জাদিরমুরা পয়েন্ট থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার ইয়াবা পাচারের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত ক্রসিং পয়েন্ট। মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তে ৪৯টি ইয়াবার কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় তৈরি ইয়াবা দেশে পাচার করা হয়। পাচারকৃত ইয়াবার বেশির ভাগই নৌপথে নাফ নদ ও সমুদ্র উপকূলবর্তী কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চ্যানেল, টেকনাফ ও উখিয়া উপকূল, চট্টগ্রাম উপকূল, পটুয়াখালী উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে।

প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার রীতিমতো মাদকের আগ্রাসন চালালেও ক্ষমতাসীন শাসক বন্ধুত্বের অজুহাতে নীরব ভূমিকা পালন করছে। ভারত থেকে অবাধে আসছে ফেনসিডিল আর মিয়ানমার ইয়াবা নামের ট্যাবলেট পাচার করছে। দেশের সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদকের গডফাদার ও দাগি চোরাকারবারিরা হাজার কোটি টাকার মাদক দেশের ভেতরে নিয়ে আসছে। মাদকের দেশী-বিদেশী সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে, তাদের বিরুদ্ধে সাহস করে টুঁ শব্দ করার কেউ নেই। ভারত শুধু বাংলাদেশে পাচারের জন্যই সীমন্তজুড়ে গড়ে তুলেছে শত শত ফেনসিডিল কারখানা। এই যদি হয় বন্ধুরাষ্ট্রের নমুনা, তা হলে শত্রুরাষ্ট্রের সংজ্ঞা কী? দুঃখজনক হলেও সত্য, গরু নিয়ে ভারত থেকে আসার সময় বিএসএফের গুলিতে মানুষের প্রাণ চলে যায়। কিন্তু অবাধে ফেনসিডিল আনার সময় কেউ আহত বা নিহত হওয়ার সংবাদ শোনা যায়নি। কিন্তু কেন? সে বিষয়টিও সংশ্লিষ্টমহলের ভেবে দেখা দরকার। এ কথা বললে কি অমূলক হবে, বিএসএফের সহায়তাই এ দেশে সুপরিকল্পিতভাবে ফেনসিডিল পাচার করা হচ্ছে। আর মিয়ানমার টেকনাফ সীমান্তজুড়ে সাগর তীরবর্তী এলাকায় বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেছে ইয়াবা তৈরির কারখানা।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ নারায়ণগঞ্জে মাদকাসক্ত ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ নেশার টাকার জন্য গাজীপুরের শ্রীপুরে এক পাষণ্ড বাবা তার কলিজার টুকরা সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছিল। মাদকসেবী সন্তান তার প্রিয় মা-বাবাকে পর্যন্ত খুন করতে কণ্ঠাবোধ করছে না। একটি দৈনিক পত্রিকার নিজস্ব রিপোর্টে জানানো হয়, গত ১০ বছরে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে কমপক্ষে ২০০ বাবা-মা নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। মাদকসেবী স্বামীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন ২৫০ জনেরও বেশি নারী। নিকট অতীতে রাজধানীর বুকে মাদকাসক্ত কিশোরীর হাতে পুলিশ অফিসার বাবা, সেই সাথে মা-ও খুন হয়েছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, ইয়াবা বিক্রি করে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের আয় হচ্ছে বছরে তিন হাজার কোটি টাকা। যা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাজেটের প্রায় সমান। মাদকদ্রব্য নেশা প্রতিরোধ নিরোধ সংস্থার (মানস) ভাষ্যমতে, দেশে বর্তমানে মাদক সেবনের সাথে ৭০ লাখ মানুষ জড়িত। এর মধ্যে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। মাদক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী ২০২০ সালের ভেতরে দেশে অন্তত কোটি লোক নেশায় আসক্ত হবে। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশে এখন ৬৫ লাখ মাদকাসক্ত। এ ছাড়া মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। এ ছাড়া আরেক জরিপে বলা হয়েছে, মাদকাসক্ত শিশুদের ড্রাগ গ্রহণ ও বিক্রয়ের সাথে জড়িত ৪৪ শতাংশ পথশিশু, পিকেটিংয়ে ৩৫ শতাংশ, ছিনতাইয়ে ১২ শতাংশ, মানব পাচারের সহায়তার কাজে ১১ শতাংশ জড়িত। ঢাকা আহছানিয়া মিশনের এক জরিপ থেকে জানা যায়, তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ফেনসিডিল, গাঁজা ৩৮ শতাংশ, ইয়াবা ৪১ শতাংশ, হেরোইন সাত শতাংশ ও ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা গ্রহণ করে পাঁচ শতাংশ। এই জরিপ থেকে জানা যায়, দেশে আশঙ্কাজনকভাবে ইয়াবাসেবী বাড়ছে। একটি দেশ হুট করে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যায়নি। বরং ধাপে ধাপেই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। শুধু ফ্লাইওভার কিংবা বড় বড় দালানকোঠা নির্মাণ হলেই একটি দেশ উন্নয়নের রোলমডেল হয়ে যায় না। এটা বোধ করি নতুন করে কাউকে বুঝানোর প্রয়োজন নেই। একটি দেশ ও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে সেখানে সুশাসন এমনিতেই বজায় থাকে। কিন্তু মাদক নামের ভয়াবহ অভিশাপ যখন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তখন উন্নয়নের রোলমডেল বর্ষার বাদলে ডুবে যায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.