সড়ক এখন মৃত্যুফাঁদ

শওকত আলী রতন


প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই সবার আগে নজরে আসে সড়কে দুর্ঘটনার খবর। ভয়ঙ্কর সব দুর্ঘটনা। আর যার পরিণতি মৃত্যু, পঙ্গুত্ব, আর সব হারানোর কান্না। এর কি কোন প্রতিকার নেই? এসব নিয়ে লিখেছেন শওকত আলী রতন

আতঙ্কের নাম এখন সড়ক দুর্ঘটনা। মহামারী আকার ধারণ করেছে সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক মহাসড়কে প্রতিদিন যে হারে দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে তা নিয়ে আতঙ্কিত ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। প্রতিদিনই সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ আর পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। সড়কে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। সড়কে প্রাণহানির ঘটনায় ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় চলাচল করছে সাধারণ যাত্রীরা। ওঁৎ পেতে থাকা যন্ত্রদানবেরা সহজেই জীবনকে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্ন ভেঙে গিয়ে বিষাদে পরিণত হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত পরিবারগুলো। যাত্রীরা আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করছে রাস্তায়। আমাদের দেশে যানবাহনে ভীতি নিয়ে আর কতকাল চলবে এ প্রশ্নেরও জবার জানা নেই কারো। বাহন নামে যন্ত্রদানব একের পর এক কেড়ে নিচ্ছে নিরীহ মানুষের প্রাণ। গত ৩ এপ্রিল সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেন রাজধানীর কাওরান বাজারের সার্ক ফোয়ারার কাছে সজন পরিবহনের একটি বাস অপর একটি বিআরটিসির বাসকে চাপা দিলে সেই বাসে থাকা রাজীব হোসেনের ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশেষে ১৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ এপ্রিল চলে যান না ফেরার দেশে। রাজীব একা চলে যাননি পরিবার পরিজন আর হাজারো মানুষকে চাপা কান্নার মধ্যে ফেলে চলে যান। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর পল্টনে দ্ইু বাসে মুখোমুখি সংষর্ষে মিজান নামে এক বাসচালকের মৃত্যু হয়। এতে মিজানের পরিবারটি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়।
বাসচালক মিজানের মৃত্যুর ক্ষত মুছতে না মুছতেই ২০ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানের সৈনিক কাবের সামনে বিআরটিসির দোতলা বাস রোজিনাকে চাপা দিলে রোজিনার পায়ের ওপর দিয়ে উঠে যায় বাসটি। গৃহকর্মী রোজিনা পা হারানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ এপ্রিল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। রোজিনা বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য ঢাকা আসেন; কিন্তু নিমিষেই ধূলিস্যাৎ হয়ে যায় রোজিনার রঙিন সেসব স্বপ্ন। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে প্রাইভোট কার চালক রাসেল সরকারের ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে যাওয়ার সময় পায়ের ওপর দিয়ে বাস উঠে তার ডান পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং লেগুনা থেকে পড়ে ইডেন কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নুরসাত জাহান ঝুমার মৃত্যু হয়। রাজধানী ঢাকায় একের পর এক দুর্ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। নড়েচড়ে বসে সবশ্রেণী পেশার মানুষ। কেন এই অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু। এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন সুশীলসমাজের মানুষেরা। উঠে আসে সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন দিক। সড়ক ও যানবাহনের সংস্কারের কথা জানান সবাই। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, গত ১৮ মাসে সড়কে প্রাণ হারিয়েছে পাঁচ হাজার মানুষ আর চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে দুই হাজার মানুষ। নিরাপদ সড়ক চাই এর তথ্য বলছে ২০১৬ সালে দুই হাজার ৩৪৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে পাঁচ হাজার তিনজন। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে কতটা ভয়াবহ এ চিত্র। যারা সড়কে প্রাণ হারাচ্ছেন তাদের পরিবারের সদস্যদের অমানুষিক যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। আবার অনেকে পঙ্গত্ববরণ করে এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। এভাবে বেঁচে থাকা কতটা কষ্টসাধ্য তা একমাত্র ভুক্তভোগী জানেন।
বাস, ট্রাক, নছিমন, প্রাইভেট কার, সিএসটি অটোরিকশা, ইসিবাইক, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনে প্রতিনিয়ত ঘটছে অনাকাক্সিক্ষত এসব দুর্ঘটনা। কোনো মৃত্যুই কারো কাম্য নয় তার পরও ঝড়ে যাচ্ছে তাজা তাজা প্রাণ।
সড়ক দুর্ঘটনায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক-ছাত্র, সাংবাদিক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, চলচ্চিত্রকার, মডেল, খেলোয়াড়, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ অন্যান্য পেশাজীবীর মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিরাপদ সড়কের জন্য দীর্ঘ দিন ধরেই কথা বলছেন এ দেশের বিশিষ্টজনেরা। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি; বরং অতীতের চেয়ে অস্বাভাকিভাবে বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। তারা মনে করেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। অনেকের মতে, ৪০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চালকদের মাদক সেবন করে গাড়ি চালানোর কারণে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব, রাস্তায় যানবাহনগুলোর অসম প্রতিযোগিতা অর্থাৎ কে কার আগে যাবে, আইন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকা, রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি, বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো ও চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালানোকে দায়ী করছেন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে। এসব বিষয়ে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব নয় বলে মনে করেন। আইন থাকলেও বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয় না সরকারের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে থাকার জন্য।
মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বিশিষ্ট সাংবাদিক মিশুক মনির ও চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের মামলায় রায় দেন আদালত।
অভিযুক্তদের জেল জরিমানা করলেও পরের দিন সারা দেশে পরিবহন শ্রমিক মালিকেরা লাগাতার পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিলে অচল হয়ে যায় সারা দেশ। পরিবহন আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মদদের কথা শোনা যায় সরকারি দলের বেশ কয়েকজন এমপি-মন্ত্রীদের। সাজা কমিয়ে আনার আশ্বাস দিলে ধর্মঘট তুলে নেয়া হয়। বিভিন্ন দিবসে কিংবা ঈদের ছুটিতে পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আনন্দ ভাগাভাগি করার প্রত্যয় নিয়ে যাওয়ারপথে ঘটে দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই সব আনন্দ যেন নিরানন্দে পরিণত হয়। শ্রমে ঘামে যাদের জীবন গড়া সেসব মানুষ প্রাণ হারালে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় রাষ্ট্রও। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের এ ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় ও উৎসব শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে সড়ক মহাসড়কে ১৩ দিনের ব্যবধানে প্রাণ হারিয়েছে ২৫৪ জন যাত্রী।
আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬৯৬ জন। নৌপথের ১৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২৫ জন, ৬৫ জন আহত হয়েছেন। ১৩ দিনে গড়ে প্রাণ গেছে প্রায় ২১ জনের। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে সড়ক মহাসড়ক চিত্র। এ যেন সড়কে মৃত্যুর মিছিল। একই বছর ঈদুল ফিতরে ১৫০ জনের বেশির প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রাণহানির ঘটনা আশঙ্কাজনক।
ঈদের সময়ে দূরপাল্লার বাসগুলোতে সাধারণত বেশি দুর্ঘটনা হয়ে থাকে। এ সময় বাসগুলো যাত্রীদের নামিয়ে কতক্ষণে ফিরতে পারবে এ ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। এসব রোডের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিরাজগঞ্জ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মাওয়া ও উত্তরবঙ্গের সব মহাসড়কে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে। এ ছাড়া প্রতিদিন সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে শিশু বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। যাতায়াতে নিরাপদ সড়কের কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন সড়কে যাতায়াত করছে যাত্রীরা। প্রয়োজনের তাগিদে আমাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে যেতে হয়, আর এ জন্য কোনো না কোনো যানবাহনে উঠতে হয়; কিন্তু সড়কে চলাচলকারী যানবাহনে কোনো ধরনর নিরাপত্তা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় যাত্রীদের। বিশিষ্ট স্থপতি মোবাশে^র হোসেন মনে করেন, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক পুরনো একটি বিষয়।
আইন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে গাড়ি চালকেরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতেই থাকবে। এ জন্য প্রয়োজন যথাযথ আইনের শাসন। বর্তমানে আমাদের দেশে সড়ক মহাসড়কে এমনকি রাজধানীতে যে হারে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তা কারো কাম্য নয়। সড়কের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলে দুর্ঘটনা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। নিরাপদ সড়ক চাইÑ এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নিরাপদ সড়কের জন্য ২৪ বছর ধরে বলছি। সড়ক দুর্ঘটনার সব উপকরণই সড়কে বিদ্যামান রয়েছে। এগুলো বিদ্যমান রেখে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা কম হয়নি; কিন্তু বাস্তবতার ভিন্ন চিত্র। তা ছাড়া সরকারের একার পক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়, পাশাপাশি আমাদের সবাইকে সচেতন হবে হবে। তা হলেই বর্তমানে যে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক তা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। পুলিশ প্রশাসনও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.