আমাদের গল্প

চারাগল্প
জোবায়ের রাজু


যে দিন প্রথম জানলাম রতœা বুবু আমাদের আপন বোন নয়, সৎ বোন, সে দিন সারা রাত আমি চুপি চুপি কাঁদলাম। আমি, শিপু, রানা যাকে মা ডাকি, রতœা বুবুও তাকে মা ডাকে। অথচ আমাদের মা রতœা বুবুর মা নয়, সৎমা। জীবনের এই অদ্ভুত অঙ্ক আমাকে শোকে পাথর বানিয়ে দিলো। বাবার প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন। বাবার সেই সংসারের প্রথম মেয়ে রতœা বুবু।
শুনেছি আমাদের বড়মা অপূর্ব রূপসী ছিলেন। কিন্তু সে হারে রতœা বুবুর চেহারা বা গায়ের রঙ, কোনোটাই সুন্দর নয়। সুন্দর নয় বলেই প্রতিবার বরপক্ষরা পিছিয়ে যেতে যেতে রতœা বুবুর বয়স এখন আটাশে পড়েছে। গ্রামবাংলায় অধিক বয়সের কুমারী মেয়ে ঘরে থাকলে মা-বাবাকে নানান জনের কটু কথা শুনতে হয়। কিন্তু বাবা এসবকে পরোয়া না করে ভালো ঘরের সন্বন্ধের জন্য রতœা বুবুকে আপাতত বিয়ে দিচ্ছেন না।
মায়ের সাথে টুকটাক ঝামেলা হয় রতœা বুবুর। তাই সৎমায়ের ঘরে রতœা বুবুকে শতভাগ সুখী বলা যায় না। যাপিত জীবনের সাংসারিক ঝুট-ঝামেলায় মা কখনো কখনো রতœা বুবুকে ‘আইবুড়ি’ বলে মনের ক্ষোভ মেটালে রতœা বুবু নীরবে কাঁদতেন। তা ছাড়া দেখতে দেখতে শিপুরও বিয়ের বয়স হয়েছে। এ দিকে বড় মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না দেখে মা চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খেতেন। শিপুটা অবাক করা রূপ নিয়ে জন্মেছে। ফলে বিয়ের পরিপূর্ণ বয়স হবার আগেই তার জন্য ভালো ভালো সন্বন্ধ আসতে শুরু করে। কিন্তু বাবা সবাইকে জোর গলায় জানালেন বড় মেয়ের একটা গতি হওয়ার আগ পর্যন্ত ছোট মেয়ের জন্য তিনি কিছু করছেন না। কিন্তু শিপুর জন্য ভালো ভালো সন্বন্ধ মিস হয়ে যেত বলে মা অস্থির হয়ে পড়তেন। ফলে রতœা বুবুর কোনো ছুঁতো পেলেই মা তার সাথে একধরনের নীরব যুদ্ধে প্রতিবার জয়ী হতেন।
এক দিন সাত সকালে রানা রতœা বুবুর ঘরে একখানা চিঠি পেয়ে বাবাকে দেখায়। রতœা বুবু লিখেছে ‘তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলাম। কালো বলে আমার বিয়ের ফুল জীবনে আর না হয় ফুটবে না, কিন্তু আমার জন্য শিপুর বিয়ে কেন আটকে থাকবে! না, আমার পুতুলের মতো বোনের ভালো ঘরে বিয়ে হোক, এ আমি চাই। এ সংসারে আর থাকতে পারব না বলে অচেনা শহরে চলে গেলাম। জীবন কখনো থেমে থাকে না। শহরের কোনো গার্মেন্টে চাকরি নিয়ে জীবনের ঠিকানা খুঁজে নেবো।’
চিঠি পড়ে মা অঘোরে কাঁদলেন। এ ঘটনায় সত্যি সত্যি মা খুব কষ্ট পেয়েছেন। বড় মেয়ের শূন্যতা তাকে দারুণ কষ্ট দিতে থাকে। প্রতিবার নামাজের মুনাজাতে মা রতœা বুবুর জন্য দোয়া করতেন। শিপু মুখ বেজার করে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা কাতর চোখে রতœা বুবুর ঘর দেখেন। রানা ছোট মানুষ, সে কী বোঝে! কিন্তু কেউ জানে না এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি আমি।
২.
এ ঘটনার দশ বছর পর চাকরির কারণে আমি শহরে চলে আসি। এই দশ বছরে কত দিন যে অপেক্ষায় ছিলাম রতœা বুবুর। সেই যে চলে গেল আর ফিরে আসেনি। ন্যাশনাল গ্রুপ অব কোম্পানিতে আমার চাকরি। অফিস থেকে গাড়ি পেয়েছি। থাকার জন্য পরিপাটি একটি বাসাও দিয়েছে তারা। রোজ সকালে গাড়িতে করে অফিসে যাই, রাস্তার দুই পাশে কত গার্মেন্ট। তাকালেই বুকটা খাঁ খাঁ করে ওঠে। মনে হয়, আচ্ছা এ গার্মেন্টে কি আমার রতœা বুবু আছে! সেলাই মেশিনে চোখ রাখতে রাখতে তার চোখে ছানি পড়েনি তো! খুব ইচ্ছা হয় সব গার্মেন্ট তন্ন তন্ন করে রতœা বুবুকে খুঁজে বের করে তার গলা জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে এ শহরে চিৎকার করে কাঁদি। কিন্তু এ শহরের এত এত গার্মেন্ট, কোথায় আছে রতœা বুবু, কে জানে!
অফিস থেকে পাওয়া গাড়ি নিয়ে মাস শেষে গ্রামের বাড়ি যাই। উঠোনে গিয়ে হর্ন বাজাই, বাবা ছুটে আসেন। আমি গাড়ি থেকে নামলে বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে তার পর গাড়ির ভেতর ব্যথিত চোখে তাকিয়ে কী যেন খোঁজেন। হয়তো প্রতিবার মনে মনে ভাবেন এবার তার ছেলে শহর থেকে একা আসেনি, সাথে বড় মেয়ে রতœাও এসেছে।
৩.
কাল অফিসে জরুরি মিটিং আছে। ভোরেই যেতে হবে। তাই ঘুমিয়ে পড়লাম আগে ভাগে। ঘুমের ঘোরে রতœা বুবুকে স্বপ্নে দেখি। রতœা বুবু আমাকে বলছে ‘আমার ভাই, তুই যে রোজ অফিসে যাওয়ার সময় সব গার্মেন্টের দিকে তাকিয়ে আমাকে খুঁজিস, আমি সব দেখি। হা হা হা..., খুব অবাক লাগছে, না? কিভাবে দেখি, শুনবি? আমি এখন আকাশে বাস করি। আকাশ থেকে সব দেখি। তোদের ছেড়ে যেদিন চলে আসি, পথে অ্যাক্সিডেন্ট করে আমাদের বাস। আমিসহ মোট ছয়জন মারা গেছে। আমি এখন আকাশে থাকি ভাই। সত্যি।’
ঘুম ভাঙার পর স্বপ্নে দেখা রতœা বুবুর কথা ভেবে আমার ভারী কান্না পেল। ইচ্ছা হলো এই মধ্যরাতে বাবাকে ফোন করে স্বপ্নের কথাটি বলি। ভোরের শীতল হাওয়া গায়ে মেখে গাড়িতে করে অফিসে যাচ্ছি। আজ মিটিং। মিরপুর পল্লবীতে একটি গার্মেন্টে সাত সকালে কতগুলো মেয়ে ঢুকছে। বিশাল ভিড়। একে একে তারা ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি ডিঙিয়ে ওপরে উঠছে। আমার খুব ইচ্ছা হলো গাড়ি থেকে নেমে ওদের ভিড়ে রতœা বুবুকে খুঁজি। কোথায় আছে রতœা বুবু! ওই গার্মেন্টে, নাকি সত্যি সত্যি আকাশের ওপারে!
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.