দুদক
দুদক

কী হচ্ছে দুদকে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পদোন্নতির পদ্ধতি নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে চলছে নানা বিতর্ক ও ক্ষোভ। দুদকে প্রথমবারের মতো পরীার মাধ্যমে পদোন্নতির যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা আইন ও বিধিসম্মত হয়নি বলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করছেন। তারা বলছেন, যে বিধিতে কমিশন থেকে পরীা, মানবণ্টন ও পরীাপদ্ধতি অনুমোদিত হয়ে আদেশ জারি করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। এ কারণে দুদকের বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী ওই পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

দুদক সূত্র জানায়, দুদকের এক অফিস আদেশে কর্মচারী বিধিমালার বিধি ৬ (৩) অনুযায়ী পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী সিস্টেম অ্যানালিস্ট, সহকারী পরিচালক, উপসহকারী পরিচালক, কোর্ট পরিদর্শক, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী, সাঁটমুদ্রারিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, কোর্ট সহকারীসহ ১৭ পদের কর্মকর্তা-কর্মচারী পরীক্ষার সিলেবাস ও মানবণ্টন বিষয়ে বলা হয়েছে। সিলেবাসে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪, দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা ২০০৭, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, স্যা আইন ১৮৭২, দণ্ডবিধি, ১৮৬০সহ বিভিন্ন আইন ও বিধি সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ৪০, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন ৩০ এবং জ্যেষ্ঠতায় ৩০ শতাংশ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তিনবার পরীায় অংশগ্রহণ করেও উত্তীর্ণ হতে না পারলে তিনি আর পরীার জন্য যোগ্য হবেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৮ এপ্রিল দুদকের সচিব ড. মো: শামসুল আরেফিনের সই করা আদেশে দুদক কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ২০০৮-এর বিধি ৬(৩) অনুযায়ী পরীা পদ্ধতি ও সিলেবাসের বিষয়ে বলা হয়েছে।

সূত্র জানায়, চাকরি বিধিমালার ৬ এর উপধারা-৩ অনুসারে, ‘যদি কোনো ব্যক্তির চাকরির বৃত্তান্ত (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা বিশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদন) সন্তোষজনক না হয়, তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক সময় সময় আয়োজিত পরীায় উত্তীর্ণ না হন এবং চাকরিতে স্থায়ী না হন তা হলে তিনি কোনো পদে পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।’ অর্থাৎ, বিধিতে কোথাও পদোন্নতির জন্য পরীার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বরং সেখানে পদোন্নতি না পাওয়ার অযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। পদোন্নতির যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবিÑ তারা সবাই বিভাগীয় পরীায় উত্তীর্ণ ও চাকরির শুরুতেই স্থায়ী হয়েছেন। এ অবস্থায় চাকরির বৃত্তান্ত সন্তোষজনক না হওয়ার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক।

ওই অফিস আদেশের (২) ও (৩) এ বর্ণিত শর্তগুলোর বিষয়ে পদোন্নতিপ্রত্যাশীদের দাবি, চাকরি বিধিমালায় জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির বিধিসহ অন্যান্য বিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা চাকরি বিধির ১৬ ধারা অনুযায়ী কমিশন কর্তৃক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর পদোন্নতির উদ্দেশ্যে গৃহীত পরীার মাধ্যমে প্রতিবার নতুন মেধাতালিকার ভিত্তিতে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা ক্ষুণœ করে পুরো পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করতে পারে। তা ছাড়া পদোন্নতির জন্য এরকম পরীা গ্রহণ এবং জ্যেষ্ঠতার বাইরে পরীার ভিত্তিতে মেধাতালিকা তৈরি এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে পদোন্নতি দেওয়ার নজির দেশের অন্য কোনো সার্ভিসে নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পরীা বাতিলের জন্য ইতোমধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কমিশনের কাছে আবেদন করার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে সূত্র জানায়। তাদের দাবি, চাকরি বিধিমালায় ‘সময় সময় পরীায় উত্তীর্ণ না হওয়া’ বলতে কমিশন বিভিন্ন সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দতা বৃদ্ধির জন্য যেসব প্রশিণ ও ওয়ার্কশপের আয়োজন করে থাকে সেসব পরীায় উত্তীর্ণ না হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। উক্ত বিধিমালার ৬ বিধির কোথাও পদোন্নতির পূর্বশর্ত হিসেবে বাধ্যতামূলক কোনো পরীার বিষয় উল্লেখ নেই। অর্থাৎ সময় সময় আয়োজিত পরীার বিষয়টিকে ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে যে অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে তা বিধির অন্যান্য বিধিমালার সাথে সাংঘর্ষিক।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, কমিশন যে কর্মচারী বিধিতে পরীা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা যথাযথ হয়নি। কারণ, চাকরি বিধি ৬(৩) পদোন্নতি না পাওয়ার অযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। ওই ধারায় চাকরির বৃত্তান্ত সন্তোষজনক না হওয়া, পরীায় উত্তীর্ণ না হওয়া এবং চাকরিতে স্থায়ী না হওয়ার বিষয়টি বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোথাও পদোন্নতির জন্য পরীা নেয়ার কথা বলা হয়নি। কর্মকর্তা বলেন, এখানে যাদের পদোন্নতির জন্য পরীার কথা কমিশন বলছে তারা সবাই বিভাগীয় পরীায় উত্তীর্ণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেক আগেই স্থায়ী হয়েছেন। আর চাকরির বৃত্তান্ত সন্তোষজনক না হওয়ার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক।

এ দিকে দুদকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের নিয়েও ক্ষোভ বিরাজ করছে কর্মকর্তাদের মাঝে। প্রশ্ন উঠেছে পদোন্নতি না দিয়ে একতরফাভাবে প্রেষণের মাধ্যমে জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন দফতর থেকে কর্মকর্তা এনে কমিশনের উচ্চপদগুলো পূরণ করার বিষয়ে। এর ফলে সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, পরিচালক ও মহাপরিচালক পদে দুদকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ অনেকাংশে কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দুদকের কর্মকর্তারা।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, দুদকে প্রেষণে যারা আসেন তারা আমাদের অনেক জুনিয়র হয়েও বস হয়ে যান। এমনকি অনেকে এখানে উপপরিচালক হিসেবে যোগদান করে পরিচালক হয়ে আমাদের বস হয়ে গেছেন। তাদের তো পরীা দিয়ে পদোন্নতি পেতে হয়নি। তাদের মাদার প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক নিয়মে পদোন্নতি পেলেই কমিশন থেকে পদোন্নতি পেয়ে যান। তবে আমাদের জন্য ভিন্ন নিয়ম কেন? তা ছাড়া প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের দতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ দুদকের মতো একটি বিশেষায়িত অনুসন্ধান ও তদন্তনির্ভর প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মতো দতা সবার থাকে না।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.