আলোর বন্যা

শওকত নূর

আমি টের পাচ্ছিলাম আমার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। এও বুঝতে পারছিলাম যেন নরম কিছুতে উবু হয়ে শুয়ে আছি। নাক দিয়ে সম্ভবত বাতাস ঢুকতে পারছিল না। হাত-পা রীতিমতো অবশ হয়ে আছে। শরীর কিছুতেই নাড়াতে পারছি না। টের পাচ্ছি, এভাবে আর কিছুণ থাকলে নির্ঘাত মৃত্যু হবে। চার পাশে ভয়ানক কর্কশ শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সম্ভবত পাখির শব্দ। কানে ভীষণ ঝাঁঝাঁ করছে। থুতনিতে প্রচণ্ড শক্তি খাটিয়ে মাথা উঁচু করি। কারণ, আমি বাঁচতে চাই।
মাথা তুলে চার দিকে তাকিয়ে ঘাবড়ে যাই। এ কী দেখতে পাচ্ছি? যেখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছি, তা এক সীমাহীন বালুচর। আমি এখানে কেন? কখন, কিভাবে এলাম? আমার প্রিয় মা-বাবা, ভাইবোন কোথায়? কেউ তো নেই। চার পাশে যাদের দেখতে পাচ্ছি তারা আমার কেউ নয়। তারা হিংস্র যত পাখি। শকুন, অনেকের ভাষায় ভালচার। ওরা ওভাবে হিংস্র চোখে চেয়ে আছে কেন? নখর বাড়িয়ে আসছে কেন? কী চায় ওরা? আমি দুই হাতে মুখ ঢেকে তীব্র চিৎকার দিই।
আমি আবারো মাটিতে মুখ গুঁজেছি। কান খাড়া করে আছি ভয়ে, কিন্তু কানে কোনো শব্দ ঢুকছে না এখন। একেবারে পিনপতন নীরবতা। কয়েক সেকেন্ড ভয়ে ভয়ে পার হলো। মুখ তুলতে সাহস হলো না। আচমকা কার গুরুগম্ভীর কণ্ঠ কানে এলোÑ নাহিয়ান!
একি! এমন অচেনা অসম্ভব ধরনের কার কণ্ঠে নিজের নামটি শুনতে পাচ্ছি? কে ডাকছে আমাকে নাম ধরে? কোনো মানুষের কণ্ঠ তো এমন হয় না। তবে কে ডাকছে আমাকে? কেন ডাকছে? ভয়ে ভয়ে মুখ তুলি। এ কী দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি? চার পাশে সীমাহীন সাদা শুভ্র বালুচর। কোথাও সেসব পাখির চিহ্ন নেই। একটা গোল সোনালি প্রকাণ্ড চাঁদ ঝুলে আছে সম্মুখের আকাশে। আলোর বন্যায় ছেয়ে গেছে চার পাশ। অন্য একটা তীব্র আলোর ধারা নেমে এসেছে খাড়া আকাশ থেকে। তা থেকে আবারো ভেসে এলো শব্দÑ নাহিয়ান; ভাবছ তুমি কোথায়, কেন?
হ্যাঁ। তাই তো ভাবছি। ভয়ে ভয়ে বলি।
তুমি এখন তোমার প্রিয় পৃথিবীর বাইরে অবস্থান করছ।
কেন? কারা আমাকে এখানে এনেছে?
শকুনেরা। তুমি খানিক আগে দেখেছ তাদের।
কিন্তু কেন? আমার কী দোষ?
তোমাকে শকুনেরা পৃথিবী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে ‘কেন’ প্রশ্নের কোনো অবকাশ নেই, বাছা! কারণ, ওটা তাদের কাজ। তুমি শিশু। এতটা বোঝার বয়স উত্তীর্ণ হয়নি তোমার।
তুমি কে? আলোর আড়াল থেকেইবা কেন কথা বলছ?
আমিই আলো। আমিই কথা বলছি। আলোর আড়াল বলতে কিছু হয় না। আমার কোনো আকৃতি নেই যে, কেউ আমার আড়ালে থাকবে।
আচ্ছা, তোমার কাজ কী?
পরম করুণাময়ের বার্তা পৌঁছে দেয়া।
কী বার্তা?
এই ধরো পৃথিবী থেকে তোমাকে তাড়ানো হয়েছে, তুমি এখানেই থাকবে অনন্তকাল। এখানে অন্ধকার নেই। ওই যে আলোর বন্যা চার দিকে দেখতে পাচ্ছ, তার কোনো শেষ নেই Ñ এজাতীয় সব বার্তা। তা তোমার কি খারাপ লাগছে এখন?
না। তবে শকুনগুলো যদি আবারো আসে?
না। এখানে শকুনদের প্রবেশাধিকার নেই। তুমি যাদের দেখেছ, সেটা এখানকার আগের দৃশ্য। তুমি অবচেতনে ছিলে তখন।
কিন্তু আমি কি একা থাকব?
না। তোমার অসংখ্য সঙ্গী-সাথী থাকবে এখানে। তোমার মতো তারাও নিষ্পাপ, অথচ শকুনের তাড়ায় তোমারই মতো অকালে পৃথিবী থেকে বিতাড়িত। ওই যে দেখো চার দিক থেকে নানা রঙ-বেরঙের পতাকা হাতে আসছে তারা। তোমারও হাতে একটা পতাকা থাকবে। এই নাও তোমার পতাকা। পতাকা হাতে তোমরা যখন এই অসীম চত্বরের মাঝামাঝি মিলিত হবে, অনাবিল সুখে ভরে উঠবে তোমাদের মন। এ সুখ অনন্ত অসীম এবং তা তোমাদের প্রাপ্য পুরস্কার। কারণ, তোমরা একই রকম নিষ্পাপ। এবার যাও। ওই মাঝখানটায় গিয়ে অন্যদের সাথে একত্রিত হও।
পতাকা হাতে চত্বরের কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হতে থাকি আমি। চার দিক থেকে আমার মতো অসংখ্য শিশু এগিয়ে আসছে বিচিত্র সব পতাকা হাতে; একই দিকে। কিছুণের মধ্যে পরস্পরের সাথে মিলিত হই আমরা। শিগগিরই আমি অনুভব করলাম আলোর ওই ধারাটা; অর্থাৎ বার্তাবাহক শতভাগ সত্যি বলেছে আমাকে। শরীর-মনে কী এক অচেনা সুখ অনুভব করছি এখন। অন্যরাও হয়তো আমারই মতো অনুভব করছে। তাদের চোখেমুখে অনাবিল প্রশান্তির ছায়া। এবারে সবাই একত্রে দৃষ্টি দিই ওই আলোর ধারার দিকে। কিন্তু তৎণাৎ উধাও হয়ে গেল আলোটা। সাথে সাথে ‘প্রিয় বার্তাবাহক’ বলে চিৎকার করে উঠি আমরা সবাই। নিঃসীম চত্বর যেন প্রকম্পিত হলো তখন।

ঘুম থেকে আচমকা জেগে উঠেছি। এখনো চোখ বুজে আছি। অনুভব করছি স্বপ্নের ঘোরে চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙেছে। চোখ খুলে দেখি ঘরে আলো জ্বলছে। মুখের কাছে পড়ে আছে পত্রিকার পৃষ্ঠা। পৃষ্ঠার ওপর সেভাবেই আছে আমার চেয়ে বয়সে ছোট, বালুচরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা সেই মৃত শিশুর ছবি। নিচে সেই নাম : আয়লান কুর্দি।
রাতের পাঠ শেষে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ছবির দিকে তাকিয়ে বারবার চোখ মুছলাম আমি। এখন আবারো চোখ মুছে বাতি নিভিয়ে দিই। বাতি নিভলেও এখন আর অন্য দিনের মতো অনুভব করছি না। কারণ, মনে মনে সেই অনন্ত আলোর বন্যা দেখছি। মা ডাকলেন, নাহিয়ান। আলো নিভিয়ে দিলি যে বাবা? যদি অন্ধকারে ভয় পাস? বললামÑ ভয় নেই মা। অন্ধকারেই আলোর বন্যা। মা কিছু না বুঝে চলে যান।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.