পুতুল বিয়ে

মোহাম্মদ অংকন

অনেক দিন ধরেই পুতুলটা আলমারিতে পড়ে আছে। তাই টুনি ভাবল, ‘পুতুলটাকে এবার বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাব। কিন্তু কার পুতুলের সাথে বিয়ে দেবো? কেউ তো আর এখন পুতুল নিয়ে খেলে না।’ তারপর সে চিন্তা করল, স্কুলে তার বান্ধবীদের বিষয়টি বলবে। পরের দিন স্কুলে গিয়ে তার বান্ধবীদের বলল, ‘তোমাদের কারো পুতুল আছে নাকি?’ টুনির কথা শুনে সবাই ‘না’ বলল। আবার অনেকেই হাসল। অনেকেই বলতে লাগল, ‘এখনকার দিনে আবার পুতুল খেলা!’ এমন অবস্থায় টুনির মনটা সেদিন খারাপ হয়ে গেল। কেউ আর পুতুল নিয়ে খেলে না বলে সে মনে মনে দুঃখ প্রকাশ করল।
শ্রেণীতে বাংলা ম্যাডাম এসে দেখলেন, প্রথম বেঞ্চে বসা শিক্ষার্থী টুনি মন খারাপ করে আছে। তিনি বললেন, ‘কী ব্যাপার টুনি, তোমার কী হয়েছে? মন খারাপ কেন?’ ‘ম্যাডাম, কেউ আর পুতুল নিয়ে খেলা করে না কেন? সবাই কি পুতুল খেলা ভুলে গেছে?’ ম্যাডাম টুনির বিষয়টি বুঝতে পারলেন। ‘ও আচ্ছা, তুমি এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করছ? তোমার কি পুতুল আছে?’ ‘হ্যাঁ ম্যাডাম। আমার একটি পুতুল আছে। আব্বু মেলা থেকে এনে দিয়েছিলেন। জানেন ম্যাডাম, আমার পুতুলটা খুবই সুন্দর। শাড়ি পরালে আরো সুন্দর লাগে। ভাবলাম, পুতুলটাকে বিয়ে দেবো। কিন্তু...।’ ‘ও আচ্ছা, আমারও একটি পুতুল আছে। জানো তো, আমিও তোমাদের মতো ছোট থাকতে পুতুল নিয়ে খেলা করতাম। আমার পুতুলের সাথে অন্যদের পুতুলের বিয়ে দিতাম। সে সময় কতই না আয়োজন হতো, মজা হতো!’
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, পুতুল বিয়ে দেয়া নিয়ে তাহলে তোমাদের একটি ঘটনা বলি। আমার বয়স তখন সাত কিংবা আট বছর হবে। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়তাম। তখন আমার ছোট মামা তিশিখালী মেলা থেকে একটি পুতুল কিনে এনে দিয়েছিলেন। প্রথম প্রথম পুতুল দেখে আমি ভীষণ ভয় পেতাম। ছোট্ট ছোট্ট মানুষের মতো দেখতে। তাদের আবার জীবন নেই। ধীরে ধীরে আমি পুতুলপ্রেমী হয়ে যাই। তারপর থেকে আমার খেলনার প্রধান উপকরণ হয় পুতুল। সেইবার গ্রীষ্মের ছুটিতে আমার মামাতো বোন রিতু ঢাকা থেকে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলো; কিন্তু সে বেড়াতে এসে যেন ঘরে বন্দী হয়ে গেল। কেননা, তখন বৈশাখ মাসের কালবৈশাখী ঝড় উঠত। চার দিকে অন্ধকার নেমে আসত। বাইরে বের হওয়া যেত না। শুধু ঘরে বসে বসে গল্পগুজব করা লাগত। কিন্তু গল্প আর কতইবা করা যায়! সব গল্প ফুরিয়ে যেত।
রিতুকে আমি বললাম, ‘শোন রিতু, চল আজ আমরা পুতুল নিয়ে খেলা করি।’ রিতু তখন অবাক হয়ে বলল, ‘তোর পুতুল আছে নাকি?’ ‘হ্যাঁ, আমার অনেক পুতুল আছে।’ ‘ভালোই তো! জানিস তো, আমার খুব শখ পুতুলের সাথে পুতুলের বিয়ে দেয়া।’ ‘নে তাহলে তো ভালোই হলো, আমার এই ছেলেপুতুলটা তোকে একেবারে দিয়ে দিলাম। আদরে রাখিস কিন্তু।’ আমার কথায় রিতু খুব হেসেছিল। কেন হেসেছিল শুনবে? ও বলছিল, ‘তুই তো আমাকে দুটো পুতুল দিতে যাচ্ছিস।’ আমি কিছু না ভেবেই বললাম, ‘কিভাবে রে, বল তো আমায়?’ ‘আরে, বুঝলি না তো ব্যাপারটা। এই যে তুই আমায় একটি ছেলে পুতুল দিলি আর এই ছেলে পুতুলের সাথে তোর একটা মেয়ে পুতুল বিয়ে দিবি। তাহলে তো আমি দুটো পুতুল ঢাকা নিয়ে যাবো।’ ‘ও আচ্ছা, এই কথা। বিয়ে দিলে তো আমার পুতুলের শ্বশুরবাড়ি যেতেই হবে। তাই না?’
আমার আর রিতুর সেই পুতুল দুটোর খুব মজা করে বিয়ে হয়েছিল। প্রথমে আমরা ঘর সাজিয়েছিলাম। কাগজ কেটে কেটে ছোট ছোট নকশা বানিয়ে ঘর সাজিয়েছিলাম। কাগজ দিয়ে ফুলের মালা বানিয়েছিলাম। আমার কয়েকজন প্রিয় বন্ধুকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। আম্মুকে বলেছিলাম, ‘আম্মু আজ আমার পুতুলের সাথে রিতুর পুতুলের বিয়ে হবে। তুমি ভালো ভালো খাবার রান্না করে রেখো কিন্তু।’ আম্মু একগাল হেসে বলল, ‘বাহ, দারুণ! পুতুলের বিয়েতে এত আয়োজন!’ আম্মুর হাসি থামিয়ে বললাম, ‘আম্মু শুধু রান্না করে খাওয়ালে হবে না কিন্তু, পুতুলের বিয়েতে আমাদের দু’জনকে একটি করে শাড়ি উপহার দিতে হবে।’ সত্যিই আমার আম্মু আমাকে ও রিতুকে শাড়ি কিনে দিয়েছিল। বোধহয় সেইবার প্রথম আমরা শাড়ি পরেছিলাম। আমাদেরও পুতুলের মতোই লাগছিল।
জানো তো, যেদিন রিতু ঢাকা ফিরে যাওয়ার সময় পুতুল দুটো নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার কেমন যেন একটু খারাপ লাগছিল। কত দিনই না ওদের আলমারিতে সাজিয়ে রেখেছিলাম! আমার যখন মন খারাপ হতো, তখন ওদের সাথে কথা বলতাম। ওরা তো কথা বলতে পারত না। তাই ওদের কথা আমিই বলে দিতাম। রিতু সে সময় আমার মনের কথা বুঝতে পারে। তাই সে বলে, ‘তুই মন খারাপ করিস না, আপু। আমি মাঝে মাঝে ওদেরকে নিয়ে তোর বাড়িতে আসব নাইওর খাওয়াতে।’ সত্যিই, তার পর থেকে রিতু আমাদের বাড়িতে ঘনঘন আসত। এক কথায় এক সপ্তাহ ছুটি পেলেই গ্রামের দিকে ছুটে আসত। আগে আসত এক বছর পর পর। রিতুর পুতুলের সাথে আমার পুতুলের বিয়ে দেয়াতে ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব খুবই গাঢ় হয়। এখন বড় হয়েছি। যখন রিতুর সাথে মোবাইলে কথা বলি, তখন এই পুতুল নিয়ে খেলার দিনগুলোর কথা মনে করে আমরা হাসাহাসি করি।
বাংলা ম্যাডামের শৈশবে পুতুল নিয়ে খেলার স্মৃতিকথাগুলো শুনে শ্রেণীর সবাই মুগ্ধ হয়। অনেকেই বলে, ‘আমরাও এখন থেকে পুতুল নিয়ে খেলব, ম্যাডাম। পুতুল নিয়ে খেলায় যে এত মজা আমরা জানতাম না।’ ম্যাডাম তখন বলেন, ‘তোমরা টুনির মতো পুতুলপ্রিয় হও। একে অপরের পুতুলের সাথে পুতুল বিয়ে দাও। এতে তোমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হবে। সামাজিক যোগাযোগ বাড়বে। বড় কথা, তোমাদের পড়াশোনার একঘেয়েমি দূর হবে।’ ম্যাডামের কথার সাথে তাল মিলিয়ে টুনি বলে ওঠে, ‘বন্ধুরা, শোনো তাহলে, আমরা একদিন আমাদের শ্রেণীতে পুতুল বিয়ের আয়োজন করব। সেই বিয়েতে আমাদের সবার প্রিয় ম্যাডামকে দাওয়াত করব।’ টুনির এ কথা শুনে সবাই জোরে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.