সর্বোত্তম মানুষ

হেলাল বিশ্বাস

চরিত্র বলতে সাধারণত জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা, আচার ব্যবহার, লেনদেন, হাসিঠাট্টাসহ যাবতীয় বিষয়ের সমন্বয় বুঝায়। যদি একজন মানুষ এসব বিষয়ের সব ক্ষেত্রে উত্তম স্বাক্ষর রাখতে পারে তবে তাকে সার্বিকভাবে উত্তম চরিত্রের মানুষ বলা যেতে পারে। কিন্তু পারতপক্ষে এমনটি হয়ে ওঠে না। কারণ, মানুষ দোষে-গুণেই মিশ্রিত। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু নবী-রাসূলেরা।
প্রথম মানুষ হজরত আদম আ: থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ দুনিয়ায় এসেছেন ও আসবেন তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সা:-ই শ্রেষ্ঠ মানুষ, শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিশেষ সৃষ্টি। সৃষ্টিকুলের সেরা সৃষ্টি তিনি। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। একটু অনুসন্ধিৎসু মনে খোঁজ নিলেই পরিষ্কার হয় যেÑ পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত মানুষ এসেছেন, তাদের মধ্যে তার জীবনের সব খুঁটিনাটি বিষয় পর্যন্ত লিপিবদ্ধ আছে। অন্য কোনো ধর্ম নেতা, ধর্ম অবতার বা রাষ্ট্রনায়ক, সমাজসেবক, কবি-সাহিত্যিক কারো ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। কেউ যদি মহানবী সা:-কে জানতে চান, তা হলে তার জন্মের আগ থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত বা তার পরের ঘটনাও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে পারবে। এ মহান রাসূল সা: সম্পর্কে সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং ঘোষণা করেছেনÑ ‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সূরা কালাম : ৬৮ : ৫)
রাসূলুল্লাহ সা: সম্বন্ধে মহান রাব্বুল আলামিনের ওই সাক্ষ্য ও মূল্যায়ন তার অনুপম চরিত্রের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সনদ। হজরত আদম আ: থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন ও ভবিষ্যতে জন্মগ্রহণ করবে নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ সা: তাদের সবার মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। এ জন্যই মহান রাব্বুল আলামিন বলেছেন করেছেনÑ তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সূরা আহজাব : ২১)
হাফিজ আবু শায়খ ইসফাহানী রচিত তার ‘আখলাকুন নবী সা:’ গ্রন্থে আখলাক বা চরিত্র সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে লিখেছেন, ‘অভিধান প্রণেতারা লিখেছেন, ‘আখলাক’ শব্দটি ‘খুলুকুন’ এর বহুবচন। এর অর্থ মানুষের স্বভাব, চরিত্র, অভ্যাস ও শিষ্টতা। আল্লামা ইবনুল আছির জাযারি রহ: বলেন, ‘মানুষের বাহ্যিক আকৃতির ক্ষেত্রে যেমন ‘খলকুন’ শব্দ ব্যবহৃত হয় ঠিক তেমনি তার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও গুণাবলির জন্য ‘খুলুক’-শব্দটি প্রযুক্ত হয়ে থাকে। এই প্রকাশ্য ও অভ্যন্তরীণ গুণাবলি যেমন ভালো হয়, তেমনি মন্দও।’
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে চরিত্র অর্থ লিখেছে- ১. প্রকৃতি, স্বভাব। ২. আচরণ; চলাচল। ৩. রীতিনীতি; ব্যবহার বিধি; কায়দা-কানুন। ৪. সদগুণ, উন্নত আদর্শ, সদাচার। ৫. প্রকৃতি বা আদর্শের জোর, দৃঢ়তা, বলিষ্ঠতা ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ বলেনÑ হে নবী, আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদ ও সতর্ককারীরূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তার দিকে আহ্বানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।’ (সূরা আহজাব: ৪৫-৪৬)
রাসূলুল্লাহ সা:-এর চরিত্র কত মহান ছিল; তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নি¤েœাক্ত ঘোষণা থেকেও বুঝা যায়, যেখানে আল্লাহ বলেছেনÑ ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।’ (সূরা নিসা: ৮০)
এমনকি আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে, আল্লাহকে পেতে হলে, রাসূলুল্লাহ সা:-কে ভালোবেসে তাকে অনুসরণ করেই তা করতে হবে। অন্য কোনো পথে নয়। ইরশাদ হচ্ছেÑ হে নবী। আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস; তবে আমাকে অনুসরণ কর, তবে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান: ৩১)
আমরা জানি যারা চরিত্রবান, যারা মহান তারা সাধারণত; উদার ও কোমল হৃদয়ের মানুষ হয়ে থাকেন। দরদি মানুষ হয়ে থাকেন। মানুষের দুঃখে-কষ্টে তারা এগিয়ে আসেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আমরা মহানবী সা:-এর চরিত্রে উদারতা, কোমলতা ও দরদি হৃদয়ের মহাপ্রস্রবণ দেখতে পাই। আল্লাহ নিজেও রাসূল সা:-এর এ মহান চরিত্রের স্বীকৃতি দিয়ে ঘোষণা করেছেনÑ
‘আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছো; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)
আসলে মুহাম্মদ সা:-এর চরিত্র ছিল মহত্তম চরিত্র। সারা বিশ্বের সব যুগের মানুষের জন্য মহান রাব্বুল আলামিন তাকে রহমতের দরিয়া হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন। নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ সা:-কে আল্লাহ বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েই সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানবজাতির জন্য রহমত ছিলেন সে কথা আল্লাহ নিজেই বলেছেন-
‘আপনাকে কেবল সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)
রাসূলুল্লাহ সা:-এর চরিত্র এতটাই মহান ছিল যে, তিনি যেকোনো মানুষের দুঃখে তিনি দুঃখিত হতেন, কষ্টে কষ্ট পেতেন। উম্মতের জন্য তার পেরেশানির অন্ত ছিল না। ইরশাদ হচ্ছেÑ
আমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে এমন একজন রাসূল এসেছেন, আমাদেরকে যা বিপন্ন করে, তা তার জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, (মিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’ (সূরা তাওবা : ১২৮)
শুধু তার অনুসারীরাই নয় অন্যরাও তার সত্যবাদিতায় ও তার আচরণে মুগ্ধ ছিল। আরবের সেই জাহেলি যুগে ইসলাম প্রচারের সময়ে কাফেররা ইসলামের দাওয়াত কবুল না করলেও, দাওয়াতি কাজের বিরোধিতা করলেও তাকে কখনো চরিত্রহীন বলেনি, মিথ্যাবাদী বলেনি বরং তারা তাকে ‘আল-আমিন’, আস-সাদিক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল এবং সেই নামেই তাকে সম্বোধন করত। এরশাদ হচ্ছেÑ অবশ্য আমি জানি যে, তারা যা বলে তা আপনাকে নিশ্চিতই কষ্ট দেয়, কিন্তু তারা আপনাকে তো মিথ্যাবাদী বলে না; বরং সীমালঙ্ঘনকারীরা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে।’ (সূরা আনআম : ৩৩)
লেখক : সাংবাদিক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.