আলাউদ্দিন আল আজাদ
আলাউদ্দিন আল আজাদ

আলাউদ্দিন আল আজাদ স্মরণে

মাহমুদ শাহ কোরেশী

১৯৪৮ সালের মধ্যভাগে আমি ‘সওগাত’ পত্রিকার বার্ষিক গ্রাহক হই। তখন থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে আলাউদ্দিন আল আজাদ নামটি অবশ্যই আমার চোখে পড়েছে। চট্টগ্রাম কলেজে সন্দ্বীপ নিবাসী সহপাঠী নূরুল আলম আমাকে তার কোনো ফ্রেন্ড মিনু ভাই (মিল্লাত আলী) এবং তার বন্ধু আজাদ সম্পর্কে অনেক তথ্য দিলো। অসুস্থতা নিবন্ধন এক বছর পরে আমি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কিছুটা বিলম্বে গেলে আজাদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে আমার ব্যাপারে সুপারিশ করেন। তিনি সামান্য পরীক্ষা করে আমার ভর্তির কাগজে স্বাক্ষর দেন।

এরপর শহিদুল্লাহ মুসলিম হলের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী আজাদের পক্ষে অন্যদের সাথে আমিও প্রচারণায় অংশগ্রহণ করি। কয়েক মাসের মধ্যে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সম্বর্ধনায় আজাদকে খুব সুন্দর একটি মানপত্র পাঠ করতে শুনি। দু-তিন বছরের মধ্যে আমি একজন উদীয়মান অনুবাদক-সমালোচক-লেখকরূপে পরিচিত হলাম। আজাদ তার তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ‘অন্ধকার সিঁড়ি’ আমাকে রিভিউ করতে দিলেন। আমার কোনো মন্তব্য আজাদকে সন্তুষ্টি করতে পারেনি। তারপর দীর্ঘ দিন আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৬৭ সালে সাক্ষাৎ হলো লন্ডনে ‘সোয়াস’-এর লাউঞ্জে। সে সময়ের একটা স্মৃতি, তার লেখা একটি চিরকুটের মাধ্যমে এখনো স্মরণযোগ্য হয়ে রয়েছে। প্রতিলিপি এখানে উপস্থাপিত হলো।

মাহমুদ শাহ কোরায়সী
২৯.১২.৬৭
এসেছিলাম দেখা করতে, কিন্তু আপনাকে পাইনি। বেশকিছু আলাপ ছিল। আবু হেনার ওখানে রোববার সন্ধ্যায় যাওয়ার কথা, কিন্তু বিশেষ অসুবিধেবশত যেতে পারবো না। আপনি যদি সোমবারে সোয়াসে জুনিয়র রিফেক্টরীতে বেলা ১টার দিকে আসেন দেখা হতে পারে। আমি তখন আপনার জন্য অপেক্ষা করবো। সাক্ষাতে সব আলাপ হবে। প্রীতি ও শুভেচ্ছা
আপনাদের
আলাউদ্দিন আল আজাদ

(বি.দ্র. বিশেষ কারণে দেখা না হলে আপনার প্যারিসের ঠিকানা রেখে যাবেন জনাব আহমদ কেরায়শীর কাছে।)

১৯৬৮-এর আগস্টে প্যারিসের পাট চুকিয়ে আমি দেশে ফিরলাম। আজাদের সাথে কদাচিত দেখা হলো এবং প্রকাশিত গবেষণাসংক্রান্ত আলোচনা চলল। এর মধ্যে বিস্মৃত হয়েছি যে, ১৯৬৫ সালে আমি একটি সংক্ষিপ্ত সফরে দেশে ফিরেছিলাম এবং তখন চট্টগ্রাম কলেজে বাংলার বিভাগীয় প্রধান আলাউদ্দিন আল আজাদের সাথে আমার বেশ দীর্ঘ এবং আন্তরিক আলোচনা হয়। আমি তার গল্প-উপন্যাস সম্পর্কে জানতে চাই এবং তিনি তার কিছু রচনার বিদেশী অনুবাদের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আবার একটি সুদীর্ঘ গ্যাপ। মাঝে মধ্যে এখানে-সেখানে সামান্য সাক্ষাৎ।
১৯৯০ সালে আমি বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালকের পদে অধিষ্ঠিত হলে তার সাথে বারকয়েক দেখা হয় এবং আমি তাকে দিয়ে কিছু জীবনীগ্রন্থ রচনায় কাজে লাগানোয় সমর্থ হই। কিছু দিন পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর পদে তার নিয়োগের ব্যাপারে আমি যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা পালন করি। তিনি আমাদের আশা পূরণ করে ‘নজরুল অধ্যাপক’রূপে, সমালোচক-সাহিত্যের অগ্রণী প্রবক্তা হিসেবে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। একবার চাটগাঁ গেলে তিনি আমাকে তার রচিত ‘রশীদ চৌধুরী’ বইটি দেন। এখানে তার উপহার পত্রটি তুলে দেয়া হলো।
ফরাসী গল্প ও সৃজনশীলতার অন্যতম প্রতিনিধি
অনুজপ্রতিম অধ্যাপক মাহমুদ শাহ কোরেশী করকমলে প্রীতি ও শুভেচ্ছা

কর্মজীবনের প্রথম থেকে শেষ অবধি আজাদের বহু সময় কেটেছে শিক্ষকতায়। তার একজন স্বনামধন্য ছাত্র, মনসুর মুসার মতে, তিনি ছিলেন ‘বিশ্লেষণে সুগভীর’ এবং ‘সময়নিষ্ঠ’ মানুষ। আমার কাছে তিনি শিল্পকর্ম ও তাত্ত্বিক সমালোচনায় অতি উঁচু পর্যায়ের সাহিত্যকর্মীর পরিচয় দিয়েছেন বলে প্রতিভাত। পঞ্চাশের দশকে তার বিদ্রোহী মনোভাব ও সমাজসচেতনতা ছিল প্রভাবসঞ্চারী।


১৯৫৪ সালে বিখ্যাত ফরাসি সাময়িকী ‘ইউরোপে’ লুৎথ ক্লোদ্ মেৎর ‘বাংলার বিদ্রোহী কবিবৃন্দ’ শীর্ষক প্রবন্ধে আলউদ্দিন আল আজাদের তিনটি পঙক্তি উদ্ধৃত করেছেন :
Faites de moi un soldat.
Un soldat dela barricade
Contre lorage qui approche
(আমাকে সৈনিক করো, সমাগত ঝড়ের বিরুদ্ধে ব্যারিকেডের সৈনিক করো।)

তার প্রতি অকৃপণ শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় উত্তরসূরিদের সাহিত্যজীবন ঋদ্ধ হয়েছে। তার প্রতি আন্তরিক অনুরাগ প্রকাশ করে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। 

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.