রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঠাকুর পরিবারে মৃত্যুর মিছিল

আজাদ এহতেশাম

মৃত্যু বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপলব্ধি ‘মৃত্যুর ডাক আর কিছুই নহে, বাসা বদলের ডাক। জীবনকে কোনো মতেই সে কোনো সনাতন প্রাচীরের মধ্যে বন্ধ হইয়া থাকিতে দিবে না, জীবনকে সেই জীবনের পথে অগ্রসর করিবে বলিয়াই মৃত্যু। এ কারণে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে স্বীয় সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশই মনে করেছেন। মৃত্যু মানুষের জীবনেরই সহযাত্রী, অনতিদূর তার অবস্থান। মৃত্যুই বয়ে আনে জীবনের পূর্ণতা। পার্থিব দুঃখ-দুর্দশা ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের মহৌষধ মৃত্যুর বিকল্প আর কী হতে পারে? কিশোর কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী (১৮৮৪)’ কাব্যের ‘মরণ’ কবিতায় সে আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে :

‘মরণ রে, তুহু মম শ্যাম সমান।
তাপ বিমোচন করুণ কোর তব
মৃত্যু অমৃত কবে, দান।’


কলকাতার জোড়াসাঁকোর জমিদার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) ও সারদা দেবীর (১৮২৩-১৮৭৫) চতুর্দশ সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জমিদার পরিবারের আভিজাত্য আর শান-শওকতে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, এ কথা কে না জানে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, রবীন্দ্রনাথ মাতৃস্নেহ ভালোবাসা শিশুকালে খুব একটা পাননি। বাড়ির চাকরবাকরদের কাছেই মানুষ তিনি। ১৫ ভাইবোনের বড় সংসারে একান্ত আপন করে বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা তিনি পাননি। ১৮৭৫ সালে স্নেহময়ী জননীর মৃত্যু হয়, তখন কবির বয়স মাত্র ১৪ বছর। মায়ের মৃত্যুতে কিশোর কবি বিমর্ষ হয়ে পড়েন। ৮০ বছরের জীবনে একের পর এক নিকটাত্মীয় ও স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের মৃত্যুর পরম্পরা কবির জীবনকে বিষাদময় করে তোলে।


দেবেন্দ্রনাথ ও সারদা দেবীর ১৫ সন্তানের মধ্যে দু-চারজন ছাড়া বেশির ভাগ সন্তানই দীর্ঘজীবী ছিলেন না। প্রথম কন্যাসন্তানের জন্ম হয় ১৮৩৮ সালে। জন্মের পরপরই তার মৃত্যু হয়। তৃতীয় ছেলে হেমেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় ৪০ বছর বয়সে ১৮৮৪ সালে। তৃতীয় কন্যা সুকুমারী দেবীর মৃত্যু হয় মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৮৬৪ সালে। ষষ্ঠ ছেলে পুণ্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয় মাত্র সাত বছর বয়সে ১৮৫৭ সালে। চতুর্থ কন্যা শরৎকুমারীর মৃত্যু হয় ১৯২০ সালে ৬৬ বছর বয়সে। সপ্তম ছেলে সোমেন্দ্রনাথ মারা যান ১৯২২ সালে, ৬৩ বছর বয়সে। সর্বকনিষ্ঠ ছেলে বুধেন্দ্রনাথ মারা যায় ১৮৬৪ সালে মাত্র এক বছরে।


এ ছাড়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে দ্বিপেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় ১৯২২ সালে, ৬০ বছর বয়সে, মেজো ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে কবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় ১৮৭৯ সালে, মাত্র চার বছর বয়সে। তৃতীয় ভাই হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে প্রতিভা ঠাকুরের মৃত্যু হয় ১৯২২ সালে ৫৭ বছর বয়সে, চতুর্থ ভাই বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র ছেলে বলেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় ১৮৯৯ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে। সেজো বোন সৌদামিনীর কন্যা ইরাবতীর মৃত্যু হয় ১৯১৮ সালে, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। পঞ্চম ভগ্নি স্বর্ণকুমারীর দ্বিতীয় কন্যা ঊর্মিলার মৃত্যু হয় ১৮৭৯ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে।


প্রিয়জনের মৃত্যুই কষ্টের, যন্ত্রণার সন্দেহ নেই; কিন্তু কিছু প্রিয়জনের মৃত্যু বুকের গহ্বরে যে গভীর দগদগে ক্ষত সৃষ্টি করে, তা যুগের পর যুগ ধরে সে ক্ষতের দাগ বহন করে চলতে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো বৌদি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুতে কবির সে দশাই হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু কবিকে শোকাহত করেছিল মারাত্মকভাবে। ১৮৮৪ সালে কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করে মারা যান। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর। আর এই বৌদি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত কাছের আপনজন, খেলার সাথী, হৃদয়ের একান্ত সুহৃদ। বৌদির সাথে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র দুই বছরের। বৌদি ছিলেন তাঁর দুই বছরের বড়। স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর ১৭ বছরের বড়। কাজেই বোঝাপড়ার দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর মিল ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। বৌদি ছিলেন তাঁর সৃষ্টিশীল কর্মের প্রেরণা, নিখাদ ভালোবাসার একমাত্র আশ্রয়স্থল। তাঁর মৃত্যু ও শূন্যতা রবীন্দ্রনাথ ব্যথিতচিত্তে বয়ে বেড়িয়েছিলেন যুগ থেকে যুগান্তরে।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) মৃণালিনী দেবীর (১৮৭৩-১৯০২) সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর। মৃণালিনীর বাবা ছিলেন খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণ ডিহি জমিদারের সেরেস্তাদার বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা। মৃণালিনীর বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। আর রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ২২ বছর। রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনীর সংসার জীবন ছিল মাত্র ১৯ বছরের মতো। এই অল্প সময়ে মৃণালিনীর গর্ভে দুই পুত্র এবং তিন কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। বড় মেয়ে মাধুরীলতা (বেলা) (১৮৮৬-১৯১৮, রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬১), বেনুকা (রানী) (১৮৯০-১৯০৩) মীরা অতসী (১৮৯৪-১৯৬৯) শমীন্দ্রনাথ (১৮৯৬-১৯০৭) প্রমুখ।


দাম্পত্য জীবনে রবীন্দ্রনাথ কখনো সংসার বেঁধেছেন শান্তিনিকেতনে, কখনো কলকাতার জোড়াসাঁকোয় আবার কখনো শিলাইদহে। জমিদারি দেখভালের কারণে কোথাও স্থায়ীভাবে সংসার পাততে পারেননি তিনি। মৃণালিনী দেবীর অসুস্থতা ধরা পড়ে প্রথম শান্তিনিকেতনে ১৯০২ সালে। চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত কলকাতায় নেয়া হয়, কিন্তু ডাক্তারগণ কিছুতেই তাঁর রোগ নির্ণয় করতে পারেননি। দীর্ঘ দিন রোগযন্ত্রণা তিনি ভোগ করেননি। মাত্র তিন মাস রোগ ভোগের পর ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর মাত্র ২৯ বছর বয়সে মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু হয়। স্ত্রীর মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ একেবারেই ভেঙে পড়েন। নিঃসঙ্গ জীবনযন্ত্রণা এবং সন্তানদের লালনপালনের চিন্তা তাঁকে খুবই উদ্বিগ্ন করে তোলে। ‘আমি তাদের সব দিতে পারি, মাতৃস্নেহ তো দিতে পারি না’। স্ত্রীকে রবীন্দ্রনাথের স্নেহমায়া ও প্রগাঢ় ভালোবাসার দেয়া নাম ‘ভাই ছুটি’। এই ভাই ছুটি তাঁর জীবন থেকে চিরদিনের জন্য ছুটি নিয়ে চলে গেছে অনন্তলোকে। তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গানে প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য তাঁর বেদনাবিধুর চিত্তের পুঞ্জীভূত হাহাকার ফুটে উঠেছে ‘স্মরণ’ কাব্যের কবিতায় :
‘তোমার সংসার মাঝে হায় তোমাহীন
এখনো আসিবে কত সুদিন দুর্দিন
তখন এ শূন্য ঘরে চিরাভ্যাস টানে
তোমারে খুঁজিতে এসে চাব কার পানে?’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো কন্যা রেকুনা (১৮৯০-১৯০৩), ডাকনাম রানী। কবি এ মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। প্রায় দুই বছরের সংসার জীবনে তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। ছোটবোন মীরা দেবীর ‘স্মৃতিকথায়’ জানা যায়, মায়ের মৃত্যুতে রেনুকা ভীষণভাবে শোকাহত হয়েছিল; তারপর স্বামী বাপের টাকায় আমেরিকায় উচ্চতর ডিগ্রি আনতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসায় মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল সে। মনের ব্যথা পরিণত হয় বুকের ব্যথিতে। শেষতক রেনুকার যক্ষ্মা রোগ ধরা পড়ে। কোনো চিকিৎসাতেই রোগের উপশম হচ্ছিল না। দুই বছরের বৈবাহিক জীবনে মাত্র ১২ বছর সাত মাস বয়সে ১৯০৩ সালে রেনুকার মৃত্যু হয়। ‘রেনুকার জীবনে তাঁর বাবাই ছিলেন সব, তাই মৃত্যুর হাতে যখন আত্মসমর্পণ করতে হলো তখন তিনি বাবার হাত ধরেই দরজাটুকু পার হতে চেয়েছিলেন’
স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর নয় মাস পরে রানীর মৃত্যু হয়। পরপর দু’টি মৃত্যুর শোক কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে স্কুল গড়ার কাজে কেবলই মনোযোগী হয়েছেন, তখনই আরেকটি মৃত্যু কবির দিকে ক্রম অগ্রসরমান। হঠাৎ কলকাতা থেকে সংবাদ এলো মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ (১৮১৭-১৯০৫) ভীষণ অসুস্থ। কবি দ্রুত ছুটে গেলেন কলকাতায়। কোনো চিকিৎসাতেই তাঁর স্বাস্থের উন্নতি হলো না। অবশেষে তিনি অসুস্থ অবস্থায় ১৯০৫ সালে মারা যান। বরীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৪৪ বছর। কবি এ বয়সে বাবা মা দু’জনকেই হারান।

রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বেশি আদরের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ (১৮৯৬-১৯০৭)। কবি আদর করে তাকে ডাকতেন শমী ঠাকুর বলে। চেহারাটা দেখতে অবিকল বাবার মতো। উঁচু নাক, লম্বা মুখ। বাবার ইচ্ছে সে তাঁর মতোই একদিন মস্তবড় কবি হবে। কিন্তু বিধিবাম, সে ইচ্ছে পূরণ হলো না। কুঁড়িতেই একটি ফুল ঝরে গেল, ফুল হয়ে ফোটার সুযোগ আর হলো না। শমী বাবার বন্ধু শ্রীশচন্দ্রের ছেলে সরোজচন্দ্র ওরফে ভোলার সাথে মুঙ্গেরে তার মামার বাড়িতে বেড়াতে যান। ভোলা শমীরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেখানেই কলেরায় শমীর মৃত্যু হয়। ১৯০৭ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি মারা যান। শমীর মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ এতটাই দুঃখ পেয়েছিলেন যে, তাঁর গায়ের রঙ পর্যন্ত পাল্টে গিয়েছিল।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় মেয়ে এবং প্রথম সন্তান মাধুরীলতা (১৮৮৬-১৯১৮), কবি তাকে আদর করে বেলা বেলু এবং বেলবুড়ি বলে ডাকতেন। তিনি এ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন ভোরের পাখি খ্যাত কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর ছেলে শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে। জামাতা মজফফরপুরে ওকালতি করেন তবু কবির ইচ্ছে ব্যারিস্টারি পাস করলে কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করতে পারবে। উপার্জন ভালো হবে, জামাই-মেয়ে সুখেই থাকবে। সে কারণে জামাইকে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলেতে পাঠালেন। শরৎ বাবু ব্যারিস্টারি পাস করে জোড়াসাঁকো শ্বশুরালয়ে এসে ওঠেন। এ বাড়িতে ১৯০৯ থেকে ১৯১২ এই চার বছর সস্ত্রীক বাস করেন।


শ্বশুরালয়ে ভায়রা নগেন্দ্রনাথের (মীরার স্বামী) সাথে বনিবনা না হওয়ায় চরম অশান্তির মধ্যে শরৎ স্ত্রী মাধুরীলতাকে নিয়ে ডিহি শ্রীরামপুরে নিজের বাড়ি চলে যান। অপরিসীম দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বেলা পিতৃগৃহ বিচ্ছেদ যন্ত্রণা; অন্য দিকে স্বামীর সাথে দাম্পত্য কলহ তাঁকে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে যায়। তাঁরও যক্ষ্মা রোগ ধরা পড়ে। কবি শরতের অগোচরে মেয়েকে দেখতে যেতেন ঠিক দুপুরে। শরৎ এ সময় কোর্টে থাকতেন। কদাচ তাঁর সাথে দেখা হলে শ্বশুরকে অপমান করতে তার বুকে এতটুকু বাধেনি।


“অত আদরের মেয়ে বেলা তার মৃত্যুশয্যায়, সব অপমান চেপে তিনি দেখা করতে যেতেন। শরৎ তখন টেবিলের উপরে পা তুলে দিয়ে সিগারেট খেত। পা নামাত না পর্যন্ত এমনি করে অপমান করত। উনি সব বুকের মধ্যে চেপে মেয়ের পাশে বসতেন, মেয়ে মুখ ফিরিয়ে থাকত।”


একদিন দুপুরে তিনি বাড়ির কাছে পৌঁছতেই খবর পেলেন বেলার মৃত্যু হয়েছে। তিনি আর দোতলায় মৃত মেয়ের মুখ দর্শন করলেন না। দীর্ঘ বিষাদের যন্ত্রণা বুকে চেপে নিশ্চুপ ফিরে এলেন। ১৯১৮ সালের ১৬ মে মাধুরীলতা বেলার মৃত্যু হয়। দাম্পত্য জীবনে তিনি নিঃসন্তান ছিলেন।


একে একে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের হারিয়ে নিঃস্বপ্রাণ কবি রবীন্দ্রনাথ। শেষ ভরসা বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬১) এবং তৃতীয় কন্যা মীরা (১৮৯৪-১৯৬৯) ডাক নাম অতসী। রবীন্দ্রনাথ এই মেয়েকে বিয়ে দেন মাত্র ১৩ বছর বয়সে নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলির সাথে। কবি ছেলে রথীন্দ্রনাথের মতো জামাতা নগেন্দ্রনাথকেও আমেরিকা পাঠিয়েছিলেন কৃষি ও গো-পালনতত্ত্ব শিক্ষার জন্য। নগেন্দ্রনাথ গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে জোড়াসাঁকো বাড়িতে ওঠেন। কয়েক বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের এক পুত্র ও এক কন্যার জন্ম হয়। পুত্র নীতিন্দ্রনাথ (১৯১২-১৯৩২) আর কন্যা নন্দিতা (বুড়ি) (১৯১৬-১৯৬৭)। কিছু দিনের মধ্যে নগেন্দ্রনাথের মতিভ্রম ঘটে, তিনি খ্রিষ্টান হয়ে ঠাকুর বাড়ি ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যান। নানা রবীন্দ্রনাথ নাতি নীতিন্দ্রনাথকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং স্নেহ করতেন তাঁকে মুদ্রাযন্ত্র ও প্রকাশনা শিল্প শিক্ষার জন্য জার্মানিতে পাঠান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সে ইচ্ছে পূরণ হলো না। জার্মানিতে নীতিন্দ্র রাজ রোগে (যক্ষ্মা রোগে) আক্রান্ত হন। মাত্র ২০ বছর বয়সে ১৯৩২ সালে তার ইহলীলা সাঙ্গ হয়।


দৈবদুর্বিপাকে এবং নিয়তির ক্রুর পরিহাসে রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনীর দাম্পত্য জীবনে প্রিয় সন্তানদের অকালমৃত্যু দীর্ঘ সুখ ও প্রশান্তি কখনো ধরা দেয়নি; বরং একটি মৃত্যু শোক-যন্ত্রণা প্রশমিত হওয়ার অব্যবহিত পরই আরেকটি মৃত্যু দোরগোড়ায় উঁকি দিয়েছে বারবার। তবুও শোকসন্তপ্ত হৃদয়ে অসাধারণ মনোবল ও ধৈর্য নিয়ে মোকাবেলা করেছেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিষাদসিন্ধুময় প্রিয় সন্তানদের এক একটি মৃত্যু এক একটি চিরবিচ্ছেদ। জমিদারি পরিচালনায় ব্যর্থতা, ব্যবসায় লালবাতি ও পরিবারের প্রিয়জনদের এক এক করে মৃত্যুর মিছিল রবীন্দ্রনাথকে সাময়িক বিপর্যস্ত করলেও তিনি দৃঢ় মনোবলে তার সৃষ্টিকর্মের সাধনায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন ঠিকই। ছেলে রথীন্দ্রনাথের ভাষায় : ‘ভাগ্যের উত্থান-পতন, দুঃখ কিংবা ক্লেশ কোনো কিছুই অবশ্য বাবার চিত্তের প্রশান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারত না। মহর্ষির মতোই তিনিও সর্বাবস্থায় অবিচলিত থাকতেন। বেদনা যতই পীড়াদায়ক হোক না কেন, তা তাঁর ভিতরের শান্তিকে নষ্ট করতে পারত না। সবচেয়ে দুঃখের দুর্ভাগ্যকে সইবার মতো এক অতিমানবিক শক্তি ছিল তাঁর। তাঁর জীবনে নিয়তির নিষ্ঠুরতার যে উদ্ভাস তা অন্য কোনো ব্যক্তি, কবি-সাহিত্যিকদের জীবনে পরিদৃষ্ট হয় না। হ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.