পিচ ঢালা পথ

জোবায়ের রাজু

আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে সাপের মতো বয়ে চলা যে লম্বা পথটি একদা মেঠোপথ ছিল, তা এখন বেশ বিস্তীর্ণ হয়েছে। ইট বিছানো সে পথটি এখন পিচ ঢালা পথ। আশ্চর্য কথা হচ্ছে এই পিচ ডালা পথে এখন বিভিন্ন যানবাহনের পাশাপাশি বাসও চলাচল করে। দ্রুতগামী বাসগুলো বিকট হর্ন বাজিয়ে দূরের শহরের দিকে চলে যায়। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা মহল্লার ইয়াং পোলাপানগুলো সেসব চলন্ত বাস দেখি। মাঝে মধ্যে চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে যাত্রীদের মালামালের ব্যাগ ভুলবশত পড়ে গেলে আমরা পোলাপানগুলোর মধ্যে সেটা কুড়িয়ে আনার এক মহা প্রতিযোগিতা লেগে যায়। বাসের জানালা দিয়ে যে ব্যাগগুলো পড়ে যেত, সেগুলোতে বিভিন্ন খাবার, যেমন চকোলেট, বাদাম, চুইংগাম এসব পাওয়া গেলে আমরা সবাই ভাগ করে খেতাম। এক দিন চলন্ত এক বাসের জানালা দিয়ে বিশাল একটি ব্যাগ পড়ে গেছে অভাগা কোনো যাত্রীর, দৌড়ে গিয়ে সেটা সর্বপ্রথম কুড়িয়ে এনেছে এ মহল্লার শ্রাবণ। ব্যাগের ভেতর সুন্দর একটি টিশার্ট পাওয়া গেছে লাল কালারের। সে লাল টিশার্ট নিয়ে বিরাট গণ্ডগোল। বাপ্পির দাবি সে নেবে। অরূপ কড়া গলায় বলল, ‘আমি নেবো’।
কিন্তু শ্রাবণ সাফ জানিয়ে দেয়, ‘এটা আমি পেয়েছি, সো আমিই নেবো।’
নানা তর্কযুদ্ধ শেষে চন্দন বাবু বললেন, ‘ব্যাগটা যেহেতু শ্রাবণ পেয়েছে, এই টিশার্টের মালিক শ্রাবণই।’
বেচারা শ্রাবণ তো এ রায়ে আনন্দে আটখানা।
আরেক দিন চলন্ত বাস থেকে ছোট্ট একটি লাল বাক্স পড়ে গেছে দেখে সবাই যখন উল্কার বেগে সেটা কুড়িয়ে আনতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, শেষে প্রতিযোগিতায় উইনার হয়েছে মিঠুন। কী আছে লাল বাক্সে, এটি দেখার জন্য সবার উৎসুক চোখের দৃষ্টি যখন বাক্সটিতে, বাক্স খুলে দেখা গেল এক জোড়া রুপার নূপুর। আহারে, কোন বেচারি নূপুর জোড়া এভাবে হারিয়ে ফেলল। বাসায় গিয়ে সে যখন নূপুর জোড়া পাবে না, নিশ্চয়ই কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে চোখের কাজল লেপ্টে ফেলবে।
বাক্সে নূপুর পাওয়া গেছে, আমরা ছেলে মানুষ, যেহেতু নূপুর আমাদের কাজে আসবে না, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই নূপুর জোড়া বাপ্পির বোন প্রিয়াংকাকে দিয়ে দেয়া হবে।
নূপুর জোড়া পেয়ে প্রিয়াংকা আনন্দে এক চিৎকার মারল যে ওর গলা পর্যন্ত ফেটে গেছে। শেষে দিদার ফার্মেসি থেকে গলা ফাটার ব্যথানাশক ওষুধ কিনতে হয়েছে ৯০ টাকা দিয়ে।
২.
সে দিন পিচ ঢালা পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর আশিক। কখন বাসের জানালা দিয়ে যাত্রীদের ব্যাগ পড়ে যাবেÑ এই আমাদের অপেক্ষা। সময় থেকে সময় পার হয়, অথচ কোনো ব্যাগ পড়ে না। কত বাস আসে, কত বাস যায়।
আমাদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দ্রুতগামী এক বাসের জানালা দিয়ে বিশাল শপিং ব্যাগ এসে রাস্তায় পড়ল। সেটা কুড়াতে আমি আর আশিক উল্কার বেগে দৌড়ে গেলাম। অবশেষে জয় হলো আমার। ব্যাগটা আমিই আগে তুলেছি। আশিক বলল, ‘খোল তো দেখি, কী আছে এখানে!’
কিন্তু আমার মাথায় ততক্ষণে কুবুদ্ধি। কী আছে এই বিশাল ব্যাগে, এটি আশিককে দেখালে সেও ভাগিদার হবে। তাই দিলাম ভোঁ দৌড়। আশিকও আমার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে আর বলছে, ‘এই, ব্যাগ নিয়ে যাস কই! আমাকে দেখা।’
কে শোনে কার কথা! ব্যাগটা শক্ত করে বগলের তলায় রেখে দৌড়ে সোজা বাড়ি চলে এসে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আশিকও ততক্ষণে আমাদের বাড়িতে হাজির। ‘দরজা খোল দরজা খোল’ বলে বাইর থেকে চেঁচাতে লাগল। ওকে পরোয়া না করে আমি আমার রুমে এসে ব্যাগটা খুলতে বসলাম। আল্লাহ গো, এত বড় ব্যাগ, কী আছে এতে! নিশ্চয়ই জামাকাপড়, নয়তো খানাপিনা। আহারে কার এত বড় ব্যাগটি পড়ে গেল।
আগ্রহ নিয়ে ব্যাগটা খুললাম।
আরে, এগুলো কী? এত জঘন্য গন্ধ কেন! ওমা! এসব কী দেখছি। এটা তো শিশুর পরিত্যক্ত পেম্পার্স। ওয়াক থু! গন্ধে বমি আসার উপক্রম।
কোনো মা হয়তো তার বাচ্চার পেম্পার্স খুলে ব্যাগে ভরে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।
বাইর থেকে আশিক তখনো চেঁচাচ্ছে, ‘দরজা খোল বলছি। ব্যাগে কী আছে, আমাকে দেখা।’
ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজা খুলে আশিককে বললাম, ‘এ ব্যাগে সব আমেরিকান ডলার।’
আমার কথা শেষ না হতেই আশিক আমার হাত থেকে ব্যাগটি থাবা মেরে ঝড়ের বেগে দৌড়ে পালিয়ে যেতে যেতে উঁচু গলায় বলল, ‘এই ডলার সব আমার। প্রথমে একটি বাইক কিনব, তার পর জিন্সের প্যান্ট, জুতা, ব্লেজার, চশমা...’ আশিকের কাণ্ড দেখে আমি হো হো করে হাসছি আর বাথরুমে ঢুকছি নিজেকে ওয়াশ করতে।
বেচারা আশিক বাড়ি গিয়ে এই ব্যাগ খুলে ডলার তো পাবে না, পাবে... হা হা হা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.