আইসিডিডিআরবিতে চিকিৎসাধীন ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুকে শুশ্রƒষা করছেন মা
আইসিডিডিআরবিতে চিকিৎসাধীন ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুকে শুশ্রƒষা করছেন মা

দূষিত পানি পানে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ

আইসিডিডিআরবিতে দৈনিক আসছে ৬০০ থেকে ৭০০
হামিম উল কবির

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে রাজধানীতে আক্রান্তের সংখ্যাটা বেশি বলে বলছেন চিকিৎসকেরা। মহাখালীর আইসিডিআিরবিতে প্রতিদিনই ৬০০ থেকে ৭০০ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আসছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, মূলত দূষিত পানি পানের কারণে সমস্যাটা তীব্র হচ্ছে। নগরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে না পারলে এ গরমের মধ্যে ডায়রিয়া পরিস্থিতির তেমন উন্নয়ন হবে না। দেশের গরম মাত্র শুরু হয়েছে। সামনের দিনগুলোয় মাঝারি থেকে তীব্র গরম পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন পানি পানের মাত্রাও বেড়ে যাবে।


গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত আইসিডিডিআরবিতে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ৫৯১ জন। গত বুধবার একই সময় পর্যন্ত ভর্তি হয়েছিল ৬৩২ জন। রাত ১২টা পর্যন্ত এ সংখ্যা আরো ৫০ থেকে ১০০ বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন আইসিডিডিআরবির কর্মকর্তারা।


স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নির্ণয় শাখার পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত আইসিডিডিআরবিতে মোট চার হাজার ৫৮৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।


আইসিডিডিআরবির সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. আজহারুল ইসলাম গতকাল রাতে জানিয়েছেন, পানিদূষণের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। পানি সমস্যার সমাধান না হলে এর খুব বেশি উন্নয়ন হবে না। তিনি বলেন, গরমের এ সময়ে প্রতি বছরই অবশ্য বেড়ে যায় ডায়রিয়া। তবে এ বছর আক্রান্তের পরিমাণ বেশি। এ সময় ডায়রিয়ার জন্য দায়ী জীবাণুগুলো দ্রুত বংশ বিস্তার করে। এ ছাড়া এ সময় খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে পানি শুকিয়ে যায়। ফলে সেখানে কম পানিতে জীবাণুর ঘনত্ব বেড়ে যায়। এ পানিই খাবার পানির সাথে মিশে গেলে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে।


উল্লেখ্য, গত কয়েক মাস ধরে রাজধানীর যত্রতত্র পাইপ বসানোর নামে খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে। একবার এসব শুরু হলে তা সহজে কম সময়ে শেষ হতে চায় না। রাজধানীবাসীর অভিযোগÑ ঠিকাদারেরা ইচ্ছা করেই কাজ ঢিমেতালে করে, যাতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো যায়

। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণও বাড়ে।
চিকিৎসকেরা অনেকে অভিযোগ করেছেন, পরীক্ষায় দেখা গেছে রাজধানীর পানীয় জলেই রয়েছে জীবাণুর উপস্থিতি।


বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুদের বেশি ডায়রিয়া হওয়ার কারণ শিশুরা পানি পানে বড়দের মতো সতর্ক নয়। তা ছাড়া এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলক কম। ড. আজহারুল ইসলাম আরো বলেন, ‘প্রতি বছর গরমে দেশে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ে। এ সময় মানুষ পানি বেশি পান করে। দ্বিতীয়ত, পানিতে এ সময় জীবাণুর পরিমাণও বেড়ে যায়, জীবাণুর ঘনত্ব বাড়ে। এ সময় কম পানি পান করলেও ডায়রিয়া হয়ে যেতে পারে।’ তিনি বলেন, পেটে কমপক্ষে ১০ লাখের বেশি জীবাণু প্রবেশ করলে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। এ সংখ্যাটা যে সব সময় একই থাকে তা নয়। ডায়রিয়ার সাথে হাত না ধোয়ারও একটি সম্পর্ক থাকে। বিশেষ করে মল ত্যাগের পর ভালোভাবে হাত না ধুতে পারলে একই হাত দিয়ে খাবার খেলেও ডায়রিয়া হয়ে থাকে। সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুলে হাতে থাকা জীবাণু মারা যায়। এতে যে ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তা নয়, আরো কিছু রোগ-জীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।


চিকিৎসকেরা জানান, একটু কষ্ট করে পানি ফুটিয়ে পান করলে ডায়রিয়ার সমস্যাটি থাকে না। ফুটাতে না পারলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে পানি পান করা উচিত। ফিটকিরিও ব্যবহার করা যেতে পারে পানি বিশুদ্ধকরণে।


চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এই গরমের মধ্যে ঘন ঘন পানি পান করা উচিত। তাহলে যেমন ডায়রিয়ার আশঙ্কা কমে যাবে একই সাথে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কাও থাকবে না। তবে পানি অবশ্যই বিশুদ্ধ হতে হবে। বাসি-পচা খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে ফুটানো পানি দিয়ে গোসল করানো উচিত। শিশুরা গোসল করার সময় কিছু পানি গিলে ফেলতে পারে।


রাজধানীতে বেশি ডায়রিয়া আক্রান্ত হচ্ছে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ী এলাকার মানুষ। এসব এলাকা থেকে সারা বছরই ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে আসে। এ কারণে এসব এলাকার ওয়াসার পানি পরীক্ষা করে দেখা উচিত পাইপে স্যুয়ারেজের ময়লা পানি মিশে গেছে কি না। স্যুয়ারেজের পানি মিশে যাওয়া ছাড়াও ঝিলের নিচ দিয়ে অথবা ড্রেনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাইপ ফেটে গিয়ে ময়লা প্রবেশ করতে পারে ওয়াসার পাইপে।


চিকিৎসকেরা এই গরমে বাইরের খাবার পরিহার করতে বলেছেন। বাইরের খাবার গরমে খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া রাস্তায় তৈরি ঠাণ্ডা পানির শরবত, চটপটি-ফুসকা, সকাল বেলা রাস্তার পাশে নানা প্রকার ভেষজ দিয়ে শরবত খাওয়া বন্ধ করতে পারলে ডায়রিয়া আক্রান্তের হার কমে যাবে বলে ড. আজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.