অসমাপ্ত

সুলতানা আক্তার রত্না

দীপা একটা নিঃশ্বাস ফেলল। অন্ধকার ঘরে চুপচাপ শুয়ে থাকতে তার খারাপ লাগে না। কিন্তু এখন খুব খারাপ লাগছে। একটা মশা তার কানের কাছে শব্দ করে নাচতে শুরু করল। দীপা নড়ল না, স্থির হয়ে শুয়ে রইল! জীবন কি এত সস্তা? এতটাই? নিজেকে সে এত ভালোবাসতো! অথচ! কী যে হয়ে গেলো তখন! 

পারস্পরিক বংশের ধারা কি মানুষ পরিবর্তন করতে পারে না? সে তো নিজেই দেখেছিল তার মাকে। একটা জীবন তার চোখের সামনে গড়িয়ে গড়িয়ে পার হতে লাগল। সে জীবনের একমাত্র সাক্ষী হয়ে থাকল দীপা। কতটুকুনই বা তার বয়স ছিল! ছয়, সাত বা আট। বাবা ধমকিয়ে বলছে, তোর এত পোলামাইয়া হইলো তাও তোর খায়েশ মিটল না! তারপর তিনি ডাকেন লতাকে।
মা জড়িয়ে ধরেন বাবার পা।
আপনে কাউরে ডাকবেন না। আমি মাফ চাই। আর কখনো কিছু বলব না।
লতাও দৌড়ে আসে। আমি তখন লতাকে বড় মা ডাকতাম।
দেখলি! দেখলি! এত্তগুলো পোলামাইয়া হইলো তাও ওর খায়েশ মিটল না!
দীপা হঠাৎ করে ওর শরীর ছাড়িয়ে বড় হয়ে গেলো! খায়েশ! শব্দটা ওর চেনা হয়ে গেলো।
দীপা যেনো নিজেকে বসে বসে দেখতে লাগল। সেই ছোট্ট দীপা। ঘরের কোণে চুপটি করে বসে থাকত। বাবা, মা, সারা দিন কোলাহল.. চুপ করা সময় ছাড়া বাকি সময়টা শুধু পড়ত। এসএসসি পাস করা মা তার নিজের সবটুকু ঢেলে দিতে চাইতেন। সব অপূর্ণতা মা ওর মধ্যেই পেতে চাইতেন। ছোট্ট দীপা কলেজ পাস করল, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে একটা চাকরিও নিলো। তারপর হঠাৎ বংশধারা বজায় রেখে একটা কাজ করে ফেলল। টপটপ করে মাথার দু’পাশ বেয়ে জল পড়তে লাগল দীপার। দীপা কান্না থামানোর কোনো চেষ্টা করল না। কাঁদতে লাগল।
দীপার মা বলল, তুই এটা কী করলি? আমাকে দেখেও তোর শিক্ষা হলো না?
দীপা ধীরে ধীরে বলল, আম্মা,তারেক অন্য রকম।
মা গাল বেঁকিয়ে বলল, হুঁ, অন্যরকম। বছরখানেক যাক, তারপর বুঝবি!
দীপা মনে মনে বলল,আম্মা, বছরখানেক গেলে আপনিও বুঝবেন।
মাসখানেক দীপা হাওয়ায় ভেসে কাটাল, মেঘের মতো, ঘুড়ির মতো, হাওয়ায় হাওয়ায় .. জীবন কত্ত সুন্দর!
তারপর দু মাস পর তারেক তার দেশের বাড়িতে গেল। ফিরে এলো পাঁচ দিন পর। তারেকের সেন্ডো গেঞ্জিতে আবিষ্কার করল লম্বা চুল। দীপা তার মাথার পিচ্চি চুলের সাথে মেলাল।
লম্বা চুলটা নিয়ে দেখাল, এটা কোথা থেকে এলো।
তারেক হাসলো। প্রশান্তির হাসি। তোমার বড়পার বোধ হয়।
বড়পা? দীপার চোখের সামনে শাড়ি পরা কোনো রমণী সামনে এসে দাঁড়ায়। দীর্ঘ চুল। দীর্ঘ চুলের রমণী কি তখন ফেটে পড়েছিল? তোমার এত্ত বড় সাহস! তুমি এটা করতে পারলা! নাকি কাঁদছিল খুব? অন্ধকার সোফায় বসে ত্রিশোর্ধ্ব এক রমণী কাঁদছে! মিহি সুরের কান্নায় দীপারও কান্না পায়।
নাহ! কেউ কাঁদছে না।
বড়পা কে?
তোমার সতীন!
দীপা তখন ফেটে পড়ল।
তুমি না বললে, তোমার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই?
তোমরা একসাথে থাকো না। কখনো সখনো তোমাদের দেখা হয়। শুধু তোমাদের মেয়ের জন্য একটা কাবিননামা জীবিত হয়ে রইল?
তুমি মিথ্যা বললা?
আরে, কী বলো এসব? মিথ্যা কই বললাম? আমাদের ডিভোর্স হয় নাই তাতো বলেছি।
দীপা তখনকার মতো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।
ছোট্ট দীপা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ও মা, আপনি আর পড়ালেখা করলেন না কেন?
মা আদর করতে করতে বলেন, আমি পারিনি। কিন্তু তোকে আমি পড়াব। যত কষ্টই হোক তোকে আমি পড়াব। হ্যাঁ, মা পড়িয়েছে। বেশ কয়েকটা সার্টিফিকেট! তাও কি এমন হলো নতুন কিছু?
তারেক চিৎকার করে বলল, এভাবে মেনে নিতে পারলে থাকো। না পারলে চলে যাও।
কোথায় যাবো? এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য অপেক্ষা করে না সে। পাশ ফিরে নাক ডেকে ঘুমায়। দীপার শরীরও আর তাকে তেমন আকর্ষণ করে না।
গত কয়েক দিনের অনিদ্রায় চোখ বসে যায়। পেটের ভেতর থেকে জানান দেয় মানব শিশু, তার অস্তিত্ব। সকাল থেকেই থেমে থেমে বমি। খালি পেট উগরে দেয় শুধু তিতা পানি। মায়ের মুখে দুশ্চিন্তা। এখন তো বমি হওয়ার কথা নয়।
অরুচি শরীরে কিছুই মুখে তুলতে ইচ্ছে হয় না। অফিসের সময় পেরিয়ে যেতে থাকে। মা হাত বোলায় মাথায়। এসব তো মেনে নিতেই হবে রে এখন।
না। আমি পারছি না। এমন বাক্য ওর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু চিৎকার করার শক্তি পায় না।
তারেক দেশের বাড়িতে গেলে দীপাকে দিনে একবার দায়সারা ফোন করে। রাতের বেলাটা কেমন কাটে জানে না ও। অনিদ্রার চোখে দীপা ভাবে তারেকের দীর্ঘ শরীর। তার পাশে আর এক নারী। নারীর কোনো ঠিকঠাক ছবি ফুটে ওঠে না।
তলপেটে হাত রেখে অনুভব করে একটা অস্তিত্ব। এই অস্তিত্বও কখনো কখনো অসার হয়ে যায়। অল্প একটু কিছু খা মা। না খেলে তো শরীরে শক্তি পাবি না। অল্প একটু কিছু খা। আনবো?
দীপা মাথা নাড়ে।
মা বের হয়ে গেলে দীপা দরজার ছিটকিনি লাগায়। দ্রুত কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন করে। আমি এভাবে আর থাকব না তোমার সাথে।
খেঁকিয়ে ওঠে তারেক। তো কী করবে?
আমি চলে যাবো।
তোমার যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাও। শুধু একটা কথা মনে রাখবে, আমার জীবন যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে। এর কোনো রদবদল হবে না।
লাইনের ওপাশ থেকে দীর্ঘ নীরবতা। তারেক ফোন রেখে দিয়েছে। অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত তারেক,শুধু দীপার একটা ফোনের জন্য। আমার জীবনটা চলছে না দীপা,তুমি আমাকে বাঁচাও।
অসম্ভব! এভাবে চলতেই পারে না।
এই দীপা। দরজা লাগালি ক্যান? বন্ধ দরজা খুলে মেয়ের মুখ দেখে ফের স্বস্তি।
ঘরে তো কিছুই নাই রে। বাজার করতে হবে।
দীপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কয়েক মাস ধরে তারেক সংসারে বাজার করছে না। ওখানে অনেক খরচ। দীপার টাকায়ও টানাটানি। মাস শেষে ওর নিজের হাতও খালি।
একটা সন্তান মানেই নতুন একটা পেট! তাহলে কিভাবে চলবে? কেন এলো এই শিশু? কেন? আল্লাহ আমাকেই কেন সন্তান দিলো? দীপা একটু শিউরে উঠল। এসব কী ভাবছে ও! দু’দিকে মাথা নাড়ায়।
এ আমার সন্তান। আমার।
দুধের গ্লাসে টোস্ট চুবিয়ে মুখে তোলে।
আম্মা, আমি যদি আপনার সাথে যেতে চাই তাহলে আপনি নেবেন। মায়ের চোখে অপত্য স্নেহ। সাথে আছে দুশ্চিন্তা।
আমার সন্তানের জন্য এসব কিছুই নেই। আছে শুধু উপস্থিতি, সন্তানের উপস্থিতি। শিশুর গায়ের রং কেমন হবে? কেমন হবে তার চেহারা? ছেলে না মেয়ে? যদি মেয়ে হয় ঘুরে ফিরে বংশধারায় এমন অবস্থার পুনরাবৃত্তি হবে নাতো?
আম্মা, আপনার কি খুব বেশি অসুবিধে হবে?
আম্মা হ্যাঁ না উত্তর দিতে কষ্ট পান বোধ হয়।
তুই অফিস করবি কিভাবে?
আমার মনে পড়ে। এই শরীরে আমার তিন তিন ছয় ঘণ্টার জার্নি করা ঠিক হবে না। অফিসের পাশেই এই বাসা অনেক খুঁজে বের করেছিল তারেক। দীপা, তোমার জন্য আমি সব করতে পারব। সব। একবার শুধু বিশ্বাস করে দেখো।
নারীর ঘুমন্ত শরীর। নাহ্! কোথাও ভুল হচ্ছে। শরীরই সব নয়।
আম্মা, আমি বাসা আরেকটা নেবো। আপনি আমার সাথে এসে থাকবেন।
আম্মা খুব দ্রুত আচ্ছা বলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, আরো কয়েক দিন যাক। তোর শরীরের এ অবস্থা। কয় তারিখে ডেইট দিয়েছে?
এইতো, সেপ্টেম্বরের লাস্ট উইক।
তারেকের কখন আসার কথা?
আরো দুই তিন দিন থাকবে হয়তো।
তুই না হয় কয়েক দিন ছুটি নে। নিয়ে আমার সাথে চল। তোর আব্বু তোকে দেখলে খুব খুশি হবে।
দীপা জানে আব্বু ওকে দেখলে খুব খুশি হবে। কিন্তু আব্বু? তিনিও তো আম্মাকে কষ্ট দিয়েছিলেন। ছোট্ট দীপা কাঁদছে, আর মনে মনে বলছে দীপা বড় হয়ে একটা চাকরি নেবে। তারপর মাকে নিয়ে চলে যাবে।
দীপা কাঁদতে কাঁদতে ব্যাগ গোছায়। ছোট ছোট কাঁথা, কত্ত কত্ত জামা! খবরটা শোনার পর থেকেই তারেক শুধু জামাকাপড় কিনতো। এই তুমি মেয়ের জামা কিনলে কেন? যদি ছেলে হয়।
আচ্ছা, এইবার ছেলের জামা কিনবো। তার পর দিনই আরো কয়েক সেট।
যদি ছেলে না হয় .. তাহলে তো এইসব অপচয়।
অপচয় কেন হবে? ও কখনো আমাদের মেয়ে হবে, কখনো ছেলে হবে।
কাঁদতে কাঁদতে গোছাতে গোছাতে বেশ কয়েকটা ব্যাগ হয়ে যায়। কাল সকালেই দীপা চলে যাবে। আর থাকবে না এখানে। এখানে কেন থাকবে ও? দীপা কে? দ্বিতীয় স্ত্রী? নাকি রক্ষিতা? রক্ষিতা পোষার মতো অবস্থাও নেই তারেকের।
আম্মা, আপনি আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আমার মেয়ে না হয়।
আল্লাহ যা দেয় তাতে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
না। আমি সন্তুষ্ট থাকব না। মেয়ে হলে আমার মতো ভাগ্য হবে।
দীপার মা এবার ধমকে ওঠেন। চুপ! তোর নিজের ভাগ্য তুই নিজেই ঠিক করেছিস।
ভাগ্য! দীপা কি নিজেও ভেবেছিল এসব?
সময় হলেই সূর্য ঘুরে যায়। সূর্য ঘোরে না পৃথিবী ঘোরে এমন সিলি কোশ্চেনের আনসার নিয়ে সে চিন্তিত হয় না। এই যে রাত বাড়ল, সাথে সাথে হামাগুড়ি দিয়ে এগোয় লোমশ ভালুক। জ্বলজ্বলে চোখ জ্বলতে থাকে। হাহাহা, তুমি! কে তুমি? আমি দীপা! না, তুমি ফারজানা।
ফারজানা আমার মা।
একই তো হলো। দীপা, ফারজানা অথবা ফারজানা, দীপা .. এসবে কোনো পার্থক্য নেই। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে দীপা। চুপ! চুপ!
হাহাহা, অথবা তুমি রুহি। না, আমি রুহি নই। রুহি আমার সতীন। দীপা অথবা রুহি।
প্রশ্নই আসে না। এভাবে চলবে না। হয়তো এস্পার, নয়তো ওস্পার।
অন্ধকারের সাথে এগোতে থাকে লোমশ ভালুক। তারেক, তারেক ..আমার খুব খারাপ লাগছে। কাকে ডাকছ তুমি? সে কি এখানে? সে এখন ওখানে। নারীর স্বাদ পরিবর্তন করতে হয় মাঝে মাঝে। আহা.. কাঁদছ কেন? তুমি তো চলেই যাবে।
হ্যাঁ, আমি চলে যাবো। একদম চলে যাবো। পুরুষ ভাগাভাগিতে আমি কখনোই থাকব না।
শেষ রাতে হু হু করে বাতাস ঢোকে। দীপা কুঁকড়ে যায় একেবারে। একবার মনে হয় পায়ের নিচ থেকে কাঁথাটা টেনে নেয়ার দরকার। তারপর মনে হয়, ঠাণ্ডা লাগলে লাগুক। জ্বর আসুক। সর্দি আসুক। তারপর কঠিন কোনো অসুখ হোক। দীপা মরে যাক। দীপার পেটের ভেতরে যে আছে সেও মরে যাক। কী ভাগ্য হবে এই নতুন শিশুর? একসময় ওর মনে হয় ঠাণ্ডা বাতাস আর ঢুকছে না। ঠাণ্ডাও আর লাগছে না। তারেক ওকে জড়িয়ে আছে। আর ও অন্য সময়ের মতো ওর বুকে শিশুর মতো লেপ্টে আছে। মন খারাপ গলায় দীপা বলে, আমি চলে যাবো। একেবারে চলে যাবো। তোমাকে মুক্ত করে দিয়ে যাবো।
দীপার মনে হয় তারেক আরো জাপটে ধরে ওকে। অন্য কয়েক দিনের মতো দীপার ঘুম ভাঙে না। কয়েক দিনের ঘুম ও আজই পুষিয়ে নিচ্ছে।
ঘুম ভাঙলে প্রথমেই ওর চোখে আসে তারেকের বুক। ধরপড় করে ও উঠে যেতে চায়। কিন্তু তারেক ওকে নড়তে দেয় না। নড়ো না প্লিজ। এভাবেই থাকো।
দীপা নিজেকে ছাড়াতে চায়। এভাবে আর হয় না।
হবে না কেন? অবশ্যই হবে। দেখি তুমি চেষ্টা করো।
দীপা যুদ্ধ করে। তারপর কাঁদে। ছেড়ে দাও আমাকে। আমি আর পারছি না। কিছুতেই পারছি না।
আমিও যে পারি না। কিন্তু কী করব বলো! ক্লান্ত দীপার চুলে বিলি কাটতে কাটতে তারেক বলে, যদি আমার কোনো অতীত না থাকত! যদি অতীতের অবশিষ্টাংশও না থাকত তাহলে আমাদের জীবন হতো মসৃণ। কিন্তু মসৃণ কোনো জীবন হয় না দীপা।
দীপা কাঁদে আর কাঁদে..কিন্তু নতুন কোনো জীবনযুদ্ধে নামতে চায় না.. আম্মা হয়তো এমন ভেবেছিল .. হয়তো তার মতো আরো অনেক দুর্বল নারীরাও.. কিন্তু তার পেটে যে আছে তাকে তৈরি করতে হবে।
দীপা চুপ করে একটা পরিচিত আর নির্ভরতার ঘ্রাণ টেনে নেয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.