মহাসচিবকে ধরে রেখে গ্রেফতার এড়াতে পারলেন না ছাত্রদল উত্তরের সভাপতি রাজ
মহাসচিবকে ধরে রেখে গ্রেফতার এড়াতে পারলেন না ছাত্রদল উত্তরের সভাপতি রাজ

সভা-সমাবেশের অধিকার ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড

মো: মতিউর রহমান

২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই বর্তমান সরকারের মধ্যে একটা কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে, ২০১৪ সালের ভোটবিহীন নির্বাচনের পর থেকে সরকার শুধু কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণই করছে না, প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতি চরম বৈরী এবং নির্যাতনমূলক আচরণ করছে। সভা-সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে দলটি পাচ্ছে না। বিকল্প কর্মসূচি হিসেবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, অবস্থান, অনশন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা ও ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছে দলটি। কেউ কেউ নির্মম শিকার হয়ে মারাও গেছেন। ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেন এর সর্বশেষ নজির।

উল্লেখ্য, সভা-সমাবেশ করা নাগরিকদের অন্যতম প্রধান মৌলিক অধিকার। আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে- ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে’ (অনুচ্ছেদ-৩৭)। অথচ দেশবাসী অবাক বিস্ময়ে এবং অনেকটা ক্ষোভের সাথে লক্ষ করছে, সরকার সংবিধান প্রদত্ত এই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত তো করেইনি, বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করতেও বাধা দিচ্ছে। মানববন্ধন, মিছিল ইত্যাদি কর্মসূচির আয়োজন করা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন অজুহাতে তাদের কর্মসূচি ভণ্ডুল করে দিচ্ছে। পুলিশ কখনো কখনো মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে থাকে। নারীরাও তাদের নির্যাতন থেকে নিস্তার পাচ্ছে না। গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করতে গিয়ে বিএনপির কর্মসূচি পণ্ড করে দেয়া হচ্ছে। পুলিশ গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের তৎপরতা অন্য সময়ে না দেখিয়ে এ ধরনের গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকে কেন বেছে নিচ্ছে এবং ধরপাকড়ে অহেতুক বল প্রয়োগ করছে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। জনমনে ধারণা জন্মেছে, বিএনপির কর্মসূচি পণ্ড করাই এর গূঢ় উদ্দেশ্য।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভা করার জন্য চাওয়ামাত্র অনুমতি পাওয়া যায় বিধায় তাদের রাস্তায় বা রাস্তার পাশে সভা-সমাবেশ করার প্রয়োজন না পড়লেও তাদের কর্মসূচির কারণে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিতে হয়। ফলে তীব্র যানজট এবং জনভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ জাতীয় পার্টি এবং ওয়াকার্স পার্টিও চাওয়া মাত্র সভা করার অনুমতি পায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে দৃষ্টিকটু পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। তাদের দৃষ্টিতে, এ ক্ষেত্রে আর আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান নয়। নাশকতা কিংবা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার প্রশ্নই ওঠে না, শুধু বিরোধী দল বিএনপির ক্ষেত্রেই কথিত নাশকতা বা জনশৃঙ্খলার যত ‘আশঙ্কা’!

অনেকেরই ধারণা, প্রকৃত কারণ নাশকতা বা জনশৃঙ্খলা নয়, প্রকৃত কারণ হলো বিএনপির সমাবেশের সম্ভাব্য বিরাট আকার এবং জনমনে এর সম্ভাব্য প্রভাব, যা ক্ষমতাসীনদের জন্য খুবই অসুবিধাজনক হতে পারে। অন্য কথায়, বিএনপির জনপ্রিয়তার ভীতি এর প্রকৃত কারণ বলে অনুমিত হচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ কমিটিতেও বাংলাদেশে মতপ্রকাশের সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ার প্রসঙ্গ উঠেছে যা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বিএনপির জনপ্রিয়তার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পর্ক কী? এখানেই লুকিয়ে আছে রহস্য। কয়েক বছর আগের এক হিসেবে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরীর ৯৮ শতাংশ পুলিশ বিশেষ একটি জেলা গোপালগঞ্জের। বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশ সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী শ্রেণী বা গোষ্ঠী। অনেকের ধারণা, এ জন্যই একটি বিশেষ দলের প্রতি অনুগত প্রশাসন ও পুলিশ বর্তমান সরকারকে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় দেখতে রাখতে চায়। প্রশাসন ও পুলিশের এহেন মনোভঙ্গির কারণেই সরকারি দল নিশ্চিন্তে বলতে পারছে বিএনপিকে জনসভা করতে দেয়া না দেয়া প্রশাসনের বিষয়, সরকারের কিছু করার নেই।’

সরকার এবং পুলিশ এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই সুযোগে একতরফাভাবে আগাম নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে এবং ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ কিংবা ‘কেষ্টা বেটাই চোর’ প্রবচনের মতো বিএনপিই দেশের যত অনিষ্টের মূল বলে অব্যাহত বিষোদগার করে যাচ্ছে। তাও আবার বিরাট অঙ্কের সরকারি খরচে। অন্য দিকে, সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি অনেকটা হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আছে। উল্লেখ্য, ভারতের ইউনাইটেড প্রগ্র্রেসিভ অ্যালায়েসের (ইউপিএ) চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী সম্প্রতি মুম্বাইয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, গণতন্ত্র মানে বিক্ষোভ-বিতর্ক। গণতন্ত্র মানে একতরফা বলে যাওয়া নয়।’ একই অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, মানুষ এখন ভয়ের আবহে বেঁচে আছে। বিকল্প স্বর থামিয়ে দেয়া হচ্ছে (প্রথম আলো, ১০ মার্চ ২০১৮, পৃষ্ঠা-২০)। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এর থেকে ভিন্ন বা উন্নত কিছু নয়। মতবৈচিত্র্যই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও শক্তি। আর গণতন্ত্র হলো মানবিক সমাজের সঞ্জীবনী সুধা এবং উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

২.
আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহিষ্ণু আচরণে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তো নেই-ই, বরং এ যেন ফাঁকা মাঠে গোল দেয়া। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচনে আমাদের বিজয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র (প্রথম আলো, ১৭ মার্চ ২০১৮, পৃষ্ঠা-২)। বিএনপি নেত্রীকে কারাগারে রেখে এবং অসম প্রতিযোগিতার অবস্থা সৃষ্টি করে বিএনপিকে এ জন্যই বারবার নির্বাচনে আসার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। এ যেন দাওয়াত দিয়ে ঘরে এনে অপমান করার পূর্বাভাস। আর একটা বিষয় প্রণিধানযোগ্য। বিএনপি শেষমেশ নির্বাচনে এলেও সে ক্ষেত্রে দলীয় মনোভাবাপন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা হবে ‘বোকার স্বর্গে বাস করা’। আর এ কারণে আগামী নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োগ করার দাবি উঠেছে এবং তা অযৌক্তিক নয় মোটেও। সরকারি দল বরাবর এর বিরোধিতা করে আসছে। এতে বুঝা যাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য খুব মহৎ নয়। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ‘আইনানুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েন করা যেতে পারে’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার এহেন মন্তব্যের নেপথ্য কারণ খুবই বোধগম্য। এ প্রসঙ্গে আইনের বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০ ধারায় এ সংক্রান্ত বিধান আছে। ৩০ ধারায় বলা হয়েছে- সংশ্লিষ্ট জেলার সর্বোচ্চ ম্যাজিস্ট্রেট অর্থাৎ জেলা ম্যাজিস্ট্র্রেট (মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনার) আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী তলব করতে পারেন। এ সংক্রান্ত বিশদ নির্দেশনা ‘AID TO THE CIVIL POWER’-এ বিধৃত আছে। কিন্তু প্রশাসন ও পুলিশ যেখানে পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে দলীয় ক্যাডারের ন্যায় কথাবার্তা বলছে এবং আচার-আচরণ করছে, সেখানে তারা নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক চাইবে বলে ভাবা অলীক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। আর এ কারণেই তারা যে সামরিক বাহিনী ডাকবেন না, এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা যায়।

অবশ্য সামরিক বাহিনী নিয়োজিত না করার জন্য তাদের ওপর সরকারি চাপ বা নির্দেশ থাকবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আইনের মারপ্যাঁচ কিংবা কূটকৌশলের আশ্রয় না নিয়ে অতীতে জাতীয় নির্বাচনে যে বিধান বলে কেন্দ্রে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে, সেই বিধান বলে আগামী জাতীয় নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন করা যায়। তাদের ম্যাজিস্ট্র্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দরকার পড়ে না। যদি তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয় তো ভালো। আর না করলেও ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারা (প্রাইভেট পারসন কর্তৃক গ্রেফতার) অনুযায়ী, সেনাবাহিনী যেকোনো অপরাধীকে গ্রেফতার করতে পারে। সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে অতীতের ন্যায় নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা বলে, সামরিক বাহিনী নিয়োগ করতে সরকারকে বাধ্য করে তাদের নিজেদের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতার প্রমাণ রাখবে- এটাই গণতান্ত্রকামী মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.