সুফিয়া কামাল হলে সংঘটিত ঘটনার নেপথ্যে
সুফিয়া কামাল হলে সংঘটিত ঘটনার নেপথ্যে

সুফিয়া কামাল হলে সংঘটিত ঘটনার নেপথ্যে

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

ছাত্রলীগের আন্তঃকোন্দলের জন্য ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি সুফিয়া কামাল হলের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিতা রেজওয়ানা রহমান। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন ইঙ্গিত দেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

সাবিতা রেজওয়ানা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে সুফিয়া কামাল হলে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রীদের উত্তেজিত করতে গুজবই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
তবে কোনো ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনারা জানেন। পত্রপত্রিকায় এসেছে। একজন সহসভাপতি....।

উল্লেখ্য, হলের ঘটনায় পা কেটে যাওয়া এবং ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হওয়া মোর্শেদা বেগম ছিলেন শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি। এক সময় তিনি হলের সাবেক সভাপতি খালেদা হোসেন মুনের অনুসারী ছিলেন বলে হল ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়। এর আগে বিভিন্ন সময় হলের মুন ও তার অনুসারীদের সাথে হলের বর্তমান সভাপতি ইফফাত জাহান ইশার আন্তঃকোন্দলের ঘটনা পত্রপত্রিকায় আসে। গত বছরের ডিসেম্বরের কোন্দলের জেরেই মুনের অনুসারী হুমায়রা খাতুন হিমুকে হলছাড়া করেন ইশা। ধারণা করা হচ্ছে অসম্পূর্ণ বক্তব্যে মুনের অনুসারীদের সাথে এবং ইশার আন্তঃকোন্দলের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।
হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান এশার বিরুদ্ধে ছাত্রীদের নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলোও গুজব ও ভিত্তিহীন তথ্য। আমাদের কাছে কোনো ছাত্রী মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে এশার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি। তবে এ অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে কোনো তদন্ত করা হবে কিনা এ বিষয়ে বারবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
মধ্যরাতে ছাত্রীদের হল থেকে বের করা নিয়ে অধ্যাপক সাবিতা রেজওয়ানা বলেন, হলের বেশ কয়েকজন মেয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছিল এই বলে যে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৬ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আসলে বিশ্ববিদ্যালয় ইশার লাঞ্ছনার ঘটনায় কাউকে বহিষ্কার করেনি। তা ছাড়া ওই দিন দুপুরে হলের কিছু মেয়ে সন্দেহজনকভাবে করিডোরে ঘোরাঘুরি করছিল। তাই আমরা হল প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে অভিভাবকদের কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে এ সমস্যা নিরসন করতে চেয়েছিলাম।

হলের দুই হাজার মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে দেবো এমন একটি অডিও রেকডিং ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হলে সাবিতা রেজওয়ানা বলেন, যে অডিও রেকর্ডিং ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে সেখানে অসম্পূর্ণ তথ্য রয়েছে। কারণ শিার্থীরা আগে পরে অনেক কিছু বাদ দিয়ে মাঝখানের অংশটা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। ইশাকে লাঞ্ছনার বিষয়ে আমি হলের মেয়েদের বলেছিলাম যারা এ ঘটনায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু মেয়েরা বলছিলেন, আমরা সবাই ওই সময় উপস্থিত ছিলাম। সুতরাং আপনি নির্দিষ্ট কয়েকজনকে বহিষ্কার করতে পারেন না। বহিষ্কার করলে সবাইকে করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলন চলাকালীন ১০-১২ জন ছাত্র মুখে কালো কাপড় বেঁধে ফেস্টুন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কাব ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। ফেস্টুনে লেখা ছিল ‘গুজব ছড়াচ্ছে কে? বিচার চাই, সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রীরা’। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা মুখ খুলতে রাজি হননি। নিজেদের পরিচয়ও দেননি। পরে তাদের ছবি নিয়ে হলের শিার্থীদের দেখানো হলেও তারা এলেই সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রী কি না নিশ্চিত করতে পারেনি। এ বিষয়ে হল প্রাধ্যকে জিজ্ঞেস করা হলেও তিনি কিছুই জানেন না বলে মন্তব্য করেন।
এ দিকে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের প্যানেল নীল দলের আহ্বায়ক এবং সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিউটিটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা ও অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম খান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শিকদের অভিযোগ শিার্থীদের যৌক্তিক দাবি ও অনুভূতিকে পুঁজি করে স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন সময় নানা রকমের গুজব এবং আন্দোলনরত শিার্থীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করেছে। এরই অংশ হিসেবে তাণ্ডব চালানো হয়েছে ভিসির বাসায়।
সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীরা হামলাকারীদের পরিচয় সুস্পষ্টভাবে জানতে চাইলে অধ্যাপক সামাদ বলেন, হামলাকারীদের বিষয়ে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য নেই। কারণ ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। তদন্তের পর জানা যাবে আসলে কারা আসল হামলাকারী।

গত ১০ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল শাখা সভাপতি ইফফাত জাহান ইশা কর্তৃক কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রীদের নির্যাতন এবং একজনের পায়ের রগ কেটে দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় এ ঘটনায় ছাত্রীরা ইশার বিরুদ্ধে প্রতিবাগ গড়ে তোলে। পরে তাকে জুতার মালা পরিয়ে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৯ এপ্রিল রাতে ভয়-ভীথতি, হুমকি-ধমথকির মাধ্যমে বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে হল থেকে বের করে দেয় প্রশাসন। এ নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে প্রশ্নের মুখোমুখি হন প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিতা রেজওয়ানা রহমান।

ঢাবির সুফিয়া কামাল হল প্রাধ্যক্ষের অপসারণ দাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি সুফিয়া কামাল হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিতা রেজওয়ানা রহমান হলের ছাত্রীদের হয়রানি করেছেন উল্লেখ করে তার অপসারণ দাবি করেছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি করা হয়। এ সময় জোটের পক্ষ থেকে আরো ছয়টি দাবি উত্থাপন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি সুমন শেখ, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সহসভাপতি সাদেকুল ইসলাম সোহেল, ছাত্র-ঐক্য ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক সরকার আল ইমরান প্রমুখ।
জোটের পক্ষ থেকে তোলা দাবিগুলো হলো কবি সুফিয়া কামাল হলের নিপীড়ক প্রাধ্যকে অপসারণ করতে হবে।

কোটা ব্যবস্থা বাতিল নয়; বরং এর যৌক্তিক সংস্কার, কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলাকারী পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা, অবিলম্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সিনেট পূর্ণাঙ্গ করা, প্রয়োজন ও মেধার ভিত্তিতে হলে সিট বণ্টন করা, অবিলম্বে গেস্টরুম-গণরুম নির্যাতন, ভর্তি ও সিটবাণিজ্য, হলে-ক্যাম্পাসে র‌্যাগিং, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের নামে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.