শপথবাক্য পাঠ শেষে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : পিআইডি
শপথবাক্য পাঠ শেষে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : পিআইডি

দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন আবদুল হামিদ

আশরাফ আলী

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন মো: আবদুল হামিদ। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পৌনে ৮টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে তাকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধান বিচারপতি, অন্যান্য বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সিনিয়র রাজনীতিক, কূটনীতিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয়সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। শপথের আগে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন।
একজন সফল রাজনীতিক আবদুল হামিদ দীর্ঘ দিন সংসদ সদস্য থাকার পর ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার, বিরোধী দলের উপনেতার দায়িত্ব সামলে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথগ্রহণ করেন। এ ছাড়া ২০১৩ সলের ১৪ মার্চ রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমান সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি ২০১৩ সালের ২০ মার্চ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। তিনি টানা দুই মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পরে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মরহুম মো: তায়েব উদ্দিন ও মাতার নাম মরহুমা তমিজা খাতুন।
আবদুল হামিদের শিক্ষাজীবন শুরু কামালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন ভৈরব কেবি স্কুলে। পরে নিকলী জেসি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজ থেকে আইএ ও বিএ ডিগ্রি এবং ঢাকার সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। এর পর তিনি আইন পেশায় কিশোরগঞ্জ বারে যোগদান করেন। তিনি ১৯৯০-১৯৯৬ সময় পর্যন্ত পাঁচবার কিশোরগঞ্জ জেলা বার সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৯ সালে তৎকালীন ছাত্রলীগে যোগদানের মাধ্যমে আবদুল হামিদের রাজনৈতিক জীবন শুরু। ১৯৬১ সালে কলেজে পড়া অবস্থায় তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ফলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাকে কারারুদ্ধ করে। ১৯৬৩ সালে তিনি কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৫ সালে একই কলেজের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে কিশোরগঞ্জ সাব-ডিভিশনের ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ১৯৬৬-১৯৬৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
আবদুল হামিদ ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭০ সালে ময়মনসিংহ-১৮ সংসদীয় আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ভারতের মেঘালয় রিক্রুটিং ক্যাম্পের চেয়ারম্যান ও তৎকালীন সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (মুজিব বাহিনী) সাব-সেক্টর কমান্ডার পদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নির্বাচিত এবং ১৯৭৮ থেকে ২০০৯-এর ২৫ জানুয়ারি স্পিকার নির্বাচিত হবার পূর্ব পযন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৬-৭৮ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন।
১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আবদুল হামিদ সপ্তম জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে ১৩ জুলাই ১৯৯৬ থেকে ১০ জুলাই ২০০১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি স্পিকার নির্বাচিত হন এবং ১১ জুলাই ২০০১ থেকে ২৮ অক্টোবর ২০০১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অষ্টম জাতীয় সংসদে তিনি ২০০১ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২৭ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সর্বসম্মতিক্রমে দ্বিতীয়বারের মতো স্পিকার নির্বাচিত হন।
একজন সমাজসেবক ও শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে স্বনামখ্যাত আবদুল হামিদ তার নির্বাচনী এলাকায় একাধিক স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। জেলার সর্বত্র রয়েছে তার উন্নয়নমূলক অনেক কর্মকাণ্ড। এ ছাড়া তিনি কিশোরগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সম্মানিত সদস্য। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রাখায় সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতা পদক।
দীর্ঘায়িত হলো আবদুল হামিদের ‘বন্দিদশা’
নিজের জেলা কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ, নিজেকে হাওরের মানুষ পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে জাতীয় অঙ্গনে উঠে আসা মো: আবদুল হামিদের হাঁসফাঁস লাগে বঙ্গভবনের ছকবাঁধা জীবন; কিন্তু সেই জীবনেই আরো পাঁচ বছর বাঁধা পড়লেন তিনি। তার মতে, তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিকদের জন্য বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রিত জীবন ‘সব সময় আরামদায়ক’ নয়।
তার ভাষায়Ñখাঁচার পাখিরে যতই ভালো খাবার দেয়া হোক, সে তো আর বনের পাখি না। আমি একটা দায়িত্ব নিয়ে এখানে এসেছি। সংসদে মনের খোরাক পেতাম, বঙ্গভবনে পাই না। মনটা অনেক কিছু চায়। প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়ার পর এক অনুষ্ঠানে বঙ্গভবনের পরিবেশ নিয়ে রাষ্ট্রপতি হামিদ বলেছিলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে জেলে ছিলাম। এখনো জেলে আছি। পার্থক্য আগে স্যালুট দিতো না, এখন দেয়। আবদুল হামিদ ১৯৯৬ সালে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর স্বভাবজাত হাস্যরস দিয়ে সংসদ মাতিয়ে তুলে বেশ জনপ্রিয়তা পান। পরে স্পিকারের দায়িত্ব পালনের পর এক মেয়াদে সংসদ উপনেতাও ছিলেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর নিয়ম অনুসারে দলের সাথে তার সম্পর্কচ্ছেদ ঘটাতে হয়।
‘মিতব্যয়ী’ আবদুল হামিদ প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর চিকিৎসার জন্য বাইরে গিয়ে নিজের এবং সফরসঙ্গীদের খরচ কমিয়ে সংবাদের শিরোনামে আসেন। ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, বিদেশ সফরে হোটেলের ভাড়া কমিয়েছি। সিঙ্গাপুরে আমার হোটেলের ভাড়া ছিল ছয় হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার। তা কমিয়ে ৬০০ ডলারে এনেছি। স্পিকার থাকার সময় একা যেতাম। এখন তো আর সে উপায় নেই। সফরসঙ্গীদের হোটেল ভাড়াও অর্ধেক করেছি। ২০১৫ সালের অক্টোবরে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা দেশের জন্য ‘কলঙ্কজনক’।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.