সুন্দরবনের ক্ষতি

প্রতিরোধে সবাইকে এক হতে হবে

বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল রক্ষার ব্যাপারে সরকারের কোনো ধরনের আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না। উল্টো সরকার উন্নয়নের নামে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, যাতে করে অদূরভবিষ্যতে এই বনটির অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইউনেস্কোর শর্ত উপেক্ষা করে সরকার ভারতের সাথে যৌথ বিনিয়োগে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছে। প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে যেসব কাজ চলছে, তাতেই বনের বড় ধরনের ক্ষতি শুরু হয়েছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ভারতের সাথে এ ধরনের একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করায় বিষয়টি স্পর্শকাতর বিবেচনা করা হচ্ছে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে যতটা জোরালো প্রতিবাদ আসার কথা সেটা আসেনি। সম্প্রতি সুন্দরবনের পশুর চ্যানেলের হাড়বাড়িয়া পানিপথে ৭৭৫ টন কয়লাবোঝাই একটি কার্গো ডুবে গেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, গত ৩০ বছরে কমপক্ষে ১৬টি জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে সুন্দরবনে। এর মধ্যে গত তিন বছরে জাহাজডুবির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এই সময় ১০টি পণ্যবোঝাই লাইটার জাহাজ ডুবে গেছে।
এসব জাহাজে কয়লা, তেল, সিমেন্ট ও নানা ধরনের বিষাক্ত গ্যাস বহন করা হচ্ছিল। এগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। আরো আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, সুন্দরবন ও মঙ্গলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের মতো কোনো জলযান নেই। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্যসহ জাহাজগুলোর দূষণ বনের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ে। পশুপাখি ও বনজ গাছগাছালির যে খাদ্যশৃঙ্খলা রয়েছে, সেটি ভেঙে দিচ্ছে এসব জাহাজডুবি। লাইটারেজ জাহাজগুলোও উদ্ধার করা যাচ্ছে না। ফলে এসব জাহাজকে কেন্দ্র করে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। অনন্য বৈচিত্র্যের শ্বাসমূলীয় বন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অস্তিত্ব বিলীন হচ্ছে ছয় প্রকারের ডলফিন, কয়েক শ’ প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন। ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনের চার পাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে সুন্দরবন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকার জলাভূমির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা নষ্ট করা যাবে না। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে নৌপথসহ সব ধরনের কর্মকাণ্ড আইনত নিষিদ্ধ। তা ছাড়া, ২০১১ সালে সুন্দরবন ঘোষিত হয়েছে ডলফিনের অভয়াশ্রম হিসেবে। এসব আইনি বাধ্যবাধকতা প্রকৃতপক্ষে কেউ মানছে না কিংবা আইন ভঙ্গের কারণে কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে, তা-ও লক্ষণীয় নয়।
তদন্ত কমিটিগুলো বলছে, মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ এবং অদক্ষ চালক জাহাজডুবির প্রধান কারণ। যারা এই চ্যানেলে জাহাজ নিয়ে প্রবেশ করেন, তারা সঠিকভাবে পথটি চেনেন না। জোয়ার-ভাটায় নাব্যতা ব্যাপকভাবে কম-বেশি হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে জাহাজ চালাতে যে ধরনের দক্ষ চালক দরকার, তেমন চালক অনেক সময় থাকে না। নিয়ম মেনে সুন্দরবন চ্যানেলে জাহাজ চললে দুর্ঘটনা কমে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করলে ফিটনেসবিহীন জাহাজ এবং অদক্ষ চালক রোধ করা যায়। এ জন্য আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। অন্য দিকে ভারতের সাথে মিলে সরকার বিরাট প্রকল্প গ্রহণ করে সুন্দরবনের যে বিপুল ক্ষতি করতে যাচ্ছে, সেটি প্রতিরোধ করতে হবে। এ জন্য নাগরিক সমাজকে আরো সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিকল্প জায়গায় স্থাপন করা যাবে; কিন্তু আরেকটি বিকল্প সুন্দরবন আমরা তৈরি করতে পারব না।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.