গাজীপুর সিটি নির্বাচন : জামায়াতের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে উজ্জীবিত ২০ দল
গাজীপুর সিটি নির্বাচন : জামায়াতের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে উজ্জীবিত ২০ দল

গাজীপুর সিটি নির্বাচন : জামায়াতের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে উজ্জীবিত ২০ দল

মোহাম্মদ আলী ঝিলন, গাজীপুর

২০ দলীয় জোটের একক প্রার্থিতায় পাল্টে গেছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের চিত্র। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভোট ব্যাংক ও নিবেদিতপ্রাণ বিশাল কর্মী বাহিনী ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীর পক্ষে চলে আসায় মেয়র পদে হাসান উদ্দিন সরকারের নির্বাচনী লড়াই অনেকটাই এগিয়ে দেবে। অপর দিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের জন্য ঘটনাটি একটি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক মনে করেন। আবার বিষয়টি কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে অনেকের ধারণা। তাদের দাবী স্বাধীনাতর বিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতানায় বিশ্বাসী পক্ষের সঙ্গে কোনোভাবেই পেরে উঠবে না। এ দেশের জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।

গত রোববার বেলা ১১টার দিকে মহানগর জামায়াতের আমীর স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী অধ্যক্ষ এস এম সানাউল্লাহ বিএনপি ও ২০ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকারের বাসভবনে উপস্থিত হয়ে তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। এসময় আলহাজ হাসান উদ্দিন সরকার অধ্যক্ষ এস এম সানাউল্লাহকে বুকে আলিঙ্গন করে স্বাগত জানান।

তিনি বলেন, জামায়াতের সমর্থন পেয়ে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ এস এম সানাউল্লাহর এ ত্যাগের কথা আমি কোনদিন ভুলবো না। নির্বাচিত হলে তাকে সাথে নিয়েই আধুনিক গাজীপুর গড়ে তুলবো ইনশাআল্লাহ। তিনি মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলেন, ২০ দল যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছি আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। ২০ দলীয় জোটের প্রায় সকল নেতা কর্মী এমনটি মনে করেন। তাদের বিশ্বাস বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রয়েছে মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে সুদক্ষ, সুশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও সুবিশাল কর্মী বাহিনী। তারা নির্বাচনের মাঠে কাজ করলে ২০ দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনে ভালো ফলাফল নিয়ে আসা সম্ভব।

এদেকে একাধিক সুত্র জানায়, গাজীপুর মহানগরে জামায়াতে ইসলামীর প্রায় দেড় লাখ ভোটার রয়েছে। এই ভোট ব্যাংক মেয়র নির্বাচনে অবশ্যই একটি বড় প্রভাব ফেলবে বলে তাদের ধারণা।

প্রথমে এককভাবে মেয়র প্রার্থী ও পরে ২০ দলীয় জোটের পক্ষে সমর্থন বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারী ও দলের নির্বাচনী পরিচালক মু.খায়রুল হাসান জানান, কেন্দ্রীয়ভাবে আমাদের একক প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনের মাঠে কাজের নির্দেশ ছিল। আমরা নির্বাচনের মাঠে কাজ করেছি। এতে ব্যাপক সাড়াও পেয়েছি। আবার কেন্দ্রের নির্দেশেই আমরা মেয়র পদ থেকে আমাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছি। অতীতেও বিভিন্ন সময় জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধ ভাবে অংশ নেয়ায় ফলাফল জোটের পক্ষে এসেছে। তাই এবারো দেশ ও জোটের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে আমরা আমাদের প্রার্থিতা প্রত্যহার করেছি।

তিনি বলেন, গাজীপুর মহানগরের মেয়র পদে আমরা আমাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারকে সমর্থন দিয়েছি। ভবিষ্যতে আগামী জাতীয় সংসদ ও উপজেলা পরিষদে জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে ২০ দলের পক্ষ থেকে আমাদের প্রার্থিকে সমর্থন দেয়া হবে বলে আমরা আশা করি। এ ক্ষেত্রে আপনার কোনো কোনো আসন চাইতে পারেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের আশা গাজীপুর -৪( কাপাসিয়া আসন) ও গাজীপুর -৫ (কালীগঞ্জ আসন )। গাজীপুর - ৪ সংসদীয় আসনে আমাদের প্রার্থী হবেন মহানগর জামায়াতের আমীর, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য অধ্যক্ষ এস এম সানা উল্লাহ। কাপাসিয়ায় তার বিশাল পরিচিতি আছে । তিনি দীর্ঘদিন কাপাসিয়া উপজেলা জামায়াতের আমীর হিসেবে দ্বায়ীত্ব পালন করেছেন। সে জন্য তিনি এলাকাতেও ব্যাপক জনপ্রিয়। আর এখানে ভোটারদের মাঝে বড় একটা অংশ ধর্মপ্রাণ। তাছাড়া সানাউল্লাহর রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেতে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর - ৪ আসনে অধ্যক্ষ এস এম সানাউল্লাকে প্রার্থী করলে ২০ দলীয় জোটই উপকৃত হবে। আবার গাজীপুর - ৫ সংসদীয় আসন আমরা চেয়েছি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন কালীগঞ্জ এলাকায় অনেক পূর্ব থেকেই আমাদের দলের একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। এছাড়া বিগত উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে আমাদের দল থেকে প্রার্থী দেয়া হয়েছিল । সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জোরপূর্বক কেন্দ্র দখল করে নেয়। এ সময় তার প্রাপ্ত ভোট ছিল প্রায় ৬৪ হাজার। আর আমাদের প্রার্থীও প্রাপ্ত ভোট ছিল প্রায় ৩০ হাজার এবং ফলাফল গণনায় ১৭টি কেন্দ্রে আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম। জোর পূর্বক ছিনিয়ে না নিলে ফলাফল অন্য রকম হতে পারত। এছাড়া বিভিন্ন মামলাসহ নানা কারণে ওই সকল এলাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠন গুলো দূর্বল হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে ওইসকল আসনে ২০ দলের পক্ষ থেকে আমাদের প্রার্থীকে সমর্থন দিলে আমরা অবশ্যই ভালো ফলাফল নিয়ে আসতে পারবো।

মেয়র পদে ২০ দলীয় জোটের একক প্রার্থীতা ও জামায়াতের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনিপ’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. মাজাহারুল আলম জানান, আমাদের ২০ দলীয় জোটের নেত্রী ও বিএনপি নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন হিসেবে আমরা গাজীপুর সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আমরা ২০ দলীয় জোটের প্রত্যেকটি দলের ও তাদের সমর্থকদের কাছে কৃতজ্ঞ। সরকার কর্তৃক বিভিন্ন নির্যাতন, জোট ভাঙ্গার চেষ্টা বিফল করে দিয়ে এখনো আমাদের ঐক্য টিকে আছে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য, দেশের গণতন্ত্রের জন্য, আমাদের নেত্রীর মুক্তির জন্য ভবিষ্যতে ২০ দলীয় জোট আরো সক্রিয় ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলে , সে সময় জোটগত ভাবে যে সিদ্ধান্ত হবে আমরা মেনে নিব।

২০ দলীয় জোটের একক প্রার্থিতার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা ও সমর্থক জানান, জামায়াতের প্রার্থী একক নির্বাচন করলে আমাদের জন্য ভালো হতো। মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রিপন খান জানান, একক বা জোটবদ্ধ যে কোনভাবেই জামায়াত নির্বাচন করুক, তাদের ভোট কখনো আওয়ামী লীগের পক্ষে যাবে না। আর এতে ভোটের নির্বাচনে কোনো প্রভাব পরবে না। বিগত নির্বাচনগুলো থেকে এবারের গাজীপুর মহনগর নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য একটু ভিন্ন। বিগত সময়ে দলে বিভাজন ও গ্রুপিং ছিল এবার আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ বলে জানান ভাওয়াল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি রাহাত খান। তিনি আরো বলেন স্বাধীনাতর বিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতানায় বিশ্বাসী পক্ষের সঙ্গে কোনভাবেই পেরে উঠবে না। এ দেশের জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।

এদিকে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রাথী ও হাবের কেন্দ্রীয় অর্থসচিব মাওলানা ফজলুর রহমান জানান, তিনি সোমবার সকালে মহানগরের বোরদা ও বিকেলে কোনাবড়ি এলাকায় ঘরোয়া নির্বাচনী বৈঠকে অংশ নিয়েছি। আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। আমরা আশাবাদী।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী প্রিন্সিপাল নাসির উদ্দিন জানান, তিনি সোমবার মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা ও টঙ্গী এলাকায় ঘরোয়াভাবে গণসংযোগ করেছেন। তিনি বলেন, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের জন্য মহানগরের ভোটাররা আমাদের ভোট দিবে।

উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে ২৪ এপ্রিল এবং ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১৫ মে। গত ৩১ মার্চ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার পর হতে এটি হবে এ সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচন। এবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৫ জন। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মন্ডলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.