নির্বাচনী সমঝোতা অনিশ্চিত
নির্বাচনী সমঝোতা অনিশ্চিত

নির্বাচনী সমঝোতা অনিশ্চিত

শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনের সাফ কথা আ’লীগের, খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচন ভাবছে না বিএনপি
মঈন উদ্দিন খান ও জাকির হোসেন লিটন

সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে রেখেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চায় আওয়ামী লীগ। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন ক্ষমতাসীন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। আর কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির সুরাহা আদালতের বিষয় বলে মনে করেন তারা। অন্য দিকে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী রেখে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি নয় বিএনপি। দলটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এ দাবিতে আন্দোলনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। ফলে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহমূলক কিংবা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আরো বেড়েছে।


সরকারের সূত্রগুলো জানায়, এবারের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দলের বিভিন্ন ফোরামে সেই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। বিএনপি নির্বাচনে আসবে এবং সেই নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে বলে দলের বিতর্কিত মন্ত্রী-এমপিদেরও একাধিকবার সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে শেখ হাসিনাই থাকবেন নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান। আর এটা মেনে বিএনপি নির্বাচনে না এসে সহায়ক সরকারে অনড় থাকলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে না। সে ক্ষেত্রে ৫ জানুয়ারির মতো আবারো একতরফা নির্বাচনের দিকে যাবে তারা। অন্য দিকে দুই কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে থাকা বেগম খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়, সরকার বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে সুরাহা হবে বলে মনে করছে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইনি কোনো বাধা না থাকলে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেবেন আর বাধা থাকলে অংশ নিতে পারবেন না এমন অবস্থানে রয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। আর খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে বিএনপি যদি নির্বাচন বর্জন করে তবে তাদেরকে নির্বাচনে আনতে কোনো উদ্যোগ নেবে না সরকারপক্ষ। সে ক্ষেত্রে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের দিকেই হাঁটবে তারা।


আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যে বলেছেন, ‘সংবিধানসম্মতভাবেই আগামী নির্বাচন হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস হবে না। সংবিধানসম্মত মানে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন। এটা মেনেই সব দলকে নির্বাচনে আসতে হবে। আর বেগম খালেদা জিয়াকে সরকার কোনো শাস্তি দেয়নি। শাস্তি দিয়েছেন আদালত। আর আদালতই তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবে। ’


আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ নির্বাচনের কারণে সরকারকে দেশ-বিদেশে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রথম দিকে এ সরকারকে মেনে নিতে না চাইলেও শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে ধীরে ধীরে তা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়। তবুও বিরোধী জোটের অংশবিহীন ওই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে প্রশ্নবোধক হয়ে থাকবে। সম্প্রতি বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোও বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছে। সে জন্য এবার আর সেই ধরনের নির্বাচন চায় না আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি যদি আবারো নির্বাচন বর্জন করে তবে সরকারের কিছুই করার নেই।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুইজন নেতা বলেন, সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তরিক। সেই নির্বাচন হতে হবে শেখ হাসিনার অধীনেই। তবে বিএনপি এখনো পর্যন্ত সেটি না মানায় জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি কারাগারে থাকা খালেদা জিয়াও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেকটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কারণ, আইনি জটিলতার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে নির্বাচন হবে না বলে বিএনপি হুমকি দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচনে না এলে সরকার তো একতরফা নির্বাচনের দিকে যাবেই। সে জন্য সরকার চাইলেও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে কি না বলা যাচ্ছে না। দেখা যাক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, বিষয়টি ততই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নির্বাচনের আগে তারা যদি দাবি আদায়ে সরকারকে চাপে ফেলতে পারে তবে হয়তো নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হবে।


দলের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নেতা বলেন, এখনকার পরিবেশ আর নির্বাচনের আগমুহূর্তের পরিবেশ একরকম থাকবে না। বিএনপি এখন ঘরোয়াভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ওই সময় তারা আর বসে থাকবে না। বিএনপিকে বাদ দিয়ে আবারো নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করা হলে দেশে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতা শুরুর আশঙ্কা রয়েছে। আমরা কোনোভাবেই তা চাই না। তাই আপাতত দলের খুব শক্ত অবস্থান থাকলেও নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিএনপিকে কিছুটা ছাড় দেয়া হতে পারে। তবে কী ধরনের ছাড় দেয়া হবে তা স্পষ্ট করেননি এই নেতা।


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সংবিধান ইস্যুতে আওয়ামী লীগ কোনো ছাড় দেবে না। আর সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে নির্বাচনকালীন সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার পদে থাকবেন। বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হলে সংবিধান মেনেই আসতে হবে। না এলে সেটার দায় আমাদের নয়। আর দুর্নীতির দায়ে কারাগারে থাকা বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না সেটা সম্পূর্ণ আদালতের বিষয়। তাকে পুঁজি করে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও আমাদের কিছু করার নেই। ’


তিনি আরো বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি না এসে যে ভুল করেছে তার খেসারত এখনো দিচ্ছে। আশা করি এবার আর সেই ভুল তারা করবে না। বর্তমান সংবিধান মেনেই তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে।’


প্রধান দুই শর্ত বিএনপির : নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে বিএনপি এই মুহূর্তে তেমন একটা মাথা ঘামাচ্ছে না। দলটির এক নম্বর এজেন্ডা খালেদা জিয়ার মুক্তি। তাদের অভিযোগ, সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র করছে।

আর এ কারণেই তিনি ‘মিথ্যা’ একটি মামলায় কারা ভোগ করছেন। তার সহসা মুক্তির পথেও ক্ষমতাসীনেরা ‘আইনি বাধা’ তৈরি করে রেখেছে, এমন কথা বলছেন বিএনপির নেতারা। দলীয় প্রধানের মুক্তি ইস্যুতে দলটির মূল ফোকাস থাকায় তাকে ছাড়া বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্তভাবে কোনো কিছুই ভাবছে না দলটির হাইকমান্ড। নেতাদের আশা, দেরি হলেও দলের চেয়ারপারসন মুক্ত হয়ে আসবেন। তিনিই নির্বাচন ইস্যুতে দলের করণীয় ঠিক করবেন। তবে দলটি তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে অর্থাৎ শেখ হাসিনার অধীনে তারা নির্বাচনে যাবে না। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার এবং সংসদ ভেঙে দেয়াÑ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য দলটির প্রধান দুইটি শর্ত।


বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে তাদের আন্দোলন বহু দিন ধরেই চলে আসছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দী হওয়ার পর সেই আন্দোলনের সাথে তার মুক্তি আন্দোলন যোগ হয়েছে। দলীয় প্রধানের মুক্তিই তাদের প্রধান এজেন্ডা। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না, হতে পারে না। সরকার যতই নীলনকশা প্রণয়ন করুক না কেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি আর হবে না।


ড. মোশাররফ জানান, নেত্রীর মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ও সংসদ ভেঙে নির্বাচনের দাবিতে তাদের আন্দোলন চলবে।


প্রায় দুই মাস ধরে কারাবন্দী রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তার মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে বিএনপি। তবে চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে রাজপথের আন্দোলনেই সমাধান দেখছে দলটি। দলটির নীতিনির্ধারকেরা এ জন্য মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।


জানা গেছে, বিএনপি দলীয় প্রধানের কারামুক্তি দাবির পাশাপাশি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতেও সোচ্চার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি বিভাগীয় সমাবেশগুলো সেই সিদ্ধান্তেরই ফল। দলের সিনিয়র এক নেতা বলেন, মে মাসে রমজান শুরু হচ্ছে। এর আগ পর্যন্ত বিএনপি দলীয় প্রধানের মুক্তি দাবির পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবে। নির্বাচনের চার-পাঁচ মাস আগে যে ধরনের কর্মসূচি দিলে দাবি আদায় হয়, সে দিকেই তারা অগ্রসর হবেন।


বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আজকের বিএনপির কর্মসূচির যে ধরন, সব সময় তা এ রকমই থাকবে তা তো বলা যায় না। বিএনপি মাঠে আছে, যদি তারা এভাবে মাঠে থাকতে পারেন তাহলে পরিবর্তন আসবেই। জনগণ সেই পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.