এমপিরা সংসদবিমুখ

তোষামোদি-চাটুকারিতায়ই সময় পার
আশরাফ আলী

সরকার ও দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদের শেষ বেলায় এসে সংসদবিমুখ হয়ে পড়েছেন সংসদ সদস্যরা। বিদেশভ্রমণ, নির্বাচনী ব্যস্ততা, অসুস্থতা, মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়াসহ নানা অজুহাতে অনেকে প্রায়ই সংসদ অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকছেন। এই অনুপস্থিতির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার অধিবেশনে নিয়মিত উপস্থিতির জন্য একাধিকবার সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু তার পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। তা ছাড়া সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় সংসদ তার স্বাভাবিক চরিত্র অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। এখন জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনার চেয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলের সাথে পাল্লা দিয়ে তোষামোদি আর চাটুকারিতায়ই বেশি সময় ব্যয় করছেন। বিরোধী দলের এমন চাটুকারিতায় সংসদ এখন অনেকটাই একতরফা হয়ে পড়েছে। ফলে সংসদে সত্যিকারের বিরোধী দলের অস্তিত্বই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দল এখন একাকার। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যের ধরন একই হওয়ায় সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতি চিহ্নিত করাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সদস্যদের অনুপস্থিতির হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিরোধী দলের চরিত্র হারিয়ে ফেলার এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে সংসদ তার স্বাভাবিক চরিত্রই হারিয়ে ফেলবেÑ এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তারা বলেছেন, এর ফলে সংসদ হয়ে পড়েছে একতরফা। এমন অবস্থা কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের একই সুরে বক্তব্য দেয়া এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যৌক্তিক বিরোধিতা না করায় এর আগেও সংসদ নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সমালোচনা করেছে। তারা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বলেছেন, সংসদের বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। জাতীয় পার্টিকে টিআইবি সংসদে অকার্যকর বিরোধী দল হিসেবেও চিহ্নিত করে এ থেকে বেরিয়ে আসারও পরামর্শ দিয়েছে।
তবে টিআইবির এমন মন্তব্যের জাববে দলটির সদস্যরা বলেছেন, তারা সংসদে কাদা ছোড়াছুড়ি ও গালিগালাজের সংস্কৃৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছেন, যা অতীতে কখনো হয়নি। বাংলাদেশে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তারা। বিরোধী দলের সংজ্ঞাও তারা পাল্টে দিয়েছেন। এখন আর সংসদে পরস্পরকে নিয়ে খিস্তিখেউড় হয় না। সরকারি দলের পক্ষ থেকে কোনো গণবিরোধী বিল বা আইন সংসদে উত্থাপিত হলে বিরোধী দলের সদস্যরা তার প্রতিবাদ করছেন এবং বিলের সংশোধনী আনার প্রস্তাব দিচ্ছেনÑ যা অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি দল মেনে নিচ্ছে। এর ফলে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সংসদ হয়ে উঠেছে শান্তিপূর্ণ, প্রাণবন্ত।
যদিও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে খোদ দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ এবং কো-চেয়ারম্যান সংসদের বর্তমান বিরোধী দলের নেতা এরশাদপতœী বেগম রওশন এরশাদ কয়েক দফা উষ্মা প্রকাশ করেছেন। এরশাদ বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই সরকার থেকে তার দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগের কথা বলে আসছেন। শুরুতে এরশাদের এই বক্তব্যকে সমর্থন না করলেও মেয়াদের শেষের দিকে এসে একই সুরে কথা বলছেন রওশনও। তিনি নিজেই বলেছেন, জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলÑ এটা শুনলে মানুষ হাসে। জনগণের সামনে আমরা বিরোধী দল হিসেবে মুখ দেখাতে পারি না। সংসদে সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে মানুষের কাছে প্রমাণ করতে দলটির এই দুই শীর্ষ নেতা কয়েক দফায় সরকার থেকে তাদের মন্ত্রীদের বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিলেও তা কার্যকর হয়নি। বারবার তাদের এ ধরনের ঘোষণা জনমনে আরো হাসির খোরাক জুটিয়েছে মাত্র। এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এটা দলটির পক্ষ থেকে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার কৌশলমাত্র। কারণ দলটি আগারটাও খায়ে আবার গোড়ারটাও খায়েÑজনগণের কাছে এটাই প্রমাণিত হয়েছে। ফলে এই দলটির কাছে সংসদে সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা আশা করা যায় না।
জাতীয় সংসদের সদ্য সমাপ্ত ২০তম অধিবেশনে ৩৫ জন এমপি সংসদে যাননি। ৮ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ৫ কার্যদিবস চলা ওই অধিবেশনে গড়ে ২৭৯ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশন শুরুর দিন সর্বোচ্চ ২৫৪ জন সংসদে উপস্থিত ছিলেন। আর শেষের দিন সর্বনি¤œœ ১৯৬ জন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ৩৫ কার্যদিবসের দীর্ঘ ১৯তম অধিবেশনেও যেতে পারেননি ১১ জন সংসদ সদস্য।
সাধারণত সংসদের যেকোনো অধিবেশনের সমাপনী দিবসে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এ অধিবেশনেও তারা বক্তব্য রেখেছেন। অথচ সে দিন সংসদে উপস্থিতি ছিল সর্বনি¤œ। এ দিন সদস্যদের সর্বনি¤œ উপস্থিতিকে তাদের সংসদবিমুখতা বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সংসদে সদস্য লবিতে রাখা ডিজিটাল হাজিরা বই থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংসদের ২০তম অধিবেশনে আওয়ামী লীগের ২৮ জন সদস্য অনুপস্থিত ছিলেন। অনুপস্থিতির এ তালিকায় সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী (ফরিদপুর-২), শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু (ঝালকাঠি-২) ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (কিশোরগঞ্জ-১) রয়েছেন। আর খুনের মামলার আসামি হয়ে জেলে থাকায় সংসদে যেতে পারেননি আমানুর রহমান খান রানা (টাঙ্কাইল-৩)। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির ৫ জন এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যও অনুপস্থিত ছিলেন এ অধিবেশনে। তাদের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা এবং স্বতন্ত্র সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা পুরান ঢাকার সংসদ সদস্য হাজী সেলিমও রয়েছেন।
সংসদে সদস্যদের এ অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় সংসদ নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ অধিবেশনের শেষ দিন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এ অধিবেশনেও তারা বক্তব্য রেখেছেন। অথচ সেই দিন উপস্থিতির হার ছিল সর্বনি¤œ। এতেই প্রমাণিত হয় সংসদ সদস্যরা সংসদবিমুখ হয়ে পড়েছেন।
২০তম অধিবেশনে যাননি যারা
২০তম অধিবেশনে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছাড়াও আওয়ামী লীগের মো: দবিরুল ইসলাম (ঠাকুরগাঁও-২), হুইপ ইকবালুর রহিম, (দিনাজপুর-৩), আবুল হাসান মাহমুদ আলী (দিনাজপুর-৪), মো: শিবলী সাদিক (দিনাজপুর-৬), মো: ইসরাফিল (নওগাঁ-৬), আ: মজিদ মণ্ডল (সিরাজগঞ্জ-৫), ফরহাদ হোসেন (মেহেরপুর-১), শেখ হেলাল উদ্দীন (বাগেরহাট-১), মীর মোস্তফা আহমেদ রবি (সাতীরা-২), আলী আজম (ভোলা-২), নাজমুল হাসান (কিশোরগঞ্জ-২), সাবের হোসেন চৌধুরী (ঢাকা-৯), মো: জাহিদ আহসান রাসেল (গাজীপুর-২), সিমিন হোসেন রিমি (গাজীপুর-৪), নিজাম উদ্দিন হাজারী (ফেনী-২), মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী (নোয়াখালী-৪), দিদারুল আলম (চট্টগ্রাম-৪), এম আবদুল লতিফ (চট্টগ্রাম-১১), সাইফুজ্জামান চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৩), কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা (পার্বত্য খাগড়াছড়ি), বেগম মনোয়ারা বেগম (মহিলা আসন-১৭), ফিরোজা বেগম চিনু (মহিলা আসন-৩৩), আমিনা আহমেদ (মহিলা আসন-৩৪), বেগম রহিমা আখতার (মহিলা আসন-৩৬) অনুপস্থিত ছিলেন।
অন্য দিকে জাতীয় পার্টির প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা ছাড়াও এম এ হান্নান (ময়মনসিংহ-৭), লিয়াকত হোসেন খোকা (নারায়ণগঞ্জ-৩), এ কে এম সেলিম ওসমান (নারায়ণগঞ্জ-৫), সেলিম উদ্দিন (সিলেট-৫), বেগম রওশন আরা মান্নান (মহিলা-৪৭) এবং স্বতন্ত্র সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দীকি (ঝিনাইদহ-২) অনুপস্থিত ছিলেন।
১৯তম অধিবেশনে অনুপস্থিত ১১ সদস্য
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি শুরু হওয়া ১৯তম অধিবেশন চলে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ অধিবেশনে মোট কার্যদিবস ছিল ৩৫টি। বছরের দীর্ঘ এই অধিবেশনেও ১১ জন এমপি যেতে পারেননি। এ অধিবেশনে গড়ে ১৯৩ জন উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশন শুরুর দিন সর্বোচ্চ ২৫৫ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। আর ১১ জানুয়ারি সর্বনি¤œ ১৪১ জন উপস্থিত ছিলেন। এ অধিবেশনে আওয়ামী লীগের পাঁচজন, জাতীয় পার্টির চারজন ও স্বতন্ত্র একজন সদস্য অনুপস্থিত ছিলেন। ওই অধিবেশনে আওয়ামী লীগের (পররাষ্ট্র মন্ত্রী) আবুল হাসান মাহমুদ আলী (দিনাজপুর-৪), সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (কিশোরগঞ্জ-১), আবদুল মজিদ মণ্ডল (সিরাজগঞ্জ-৫), এস এম মোস্তফা রশিদী (খুলনা-৪), আমানুর রহমান খান রানা (টাঙ্গাইল-৩) ও স্বতন্ত্র সদস্য হাজী মো: সেলিম ( ঢাকা-৭) অনুপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টির এম এ হান্নান (ময়মনসিংহ-৭) যুদ্ধাপরাধ মামলায় কারাগারে অন্তরীণ, বেগম সালমা ইসলাম ( ঢাকা-১) লিয়াকত হোসেন খোকা (নারায়ণগঞ্জ-৩) এবং এ কে এম সেলিম ওসমান (নারায়ণগঞ্জ-৫) অনুপস্থিত ছিলেন। আর স্বতন্ত্র এমপি উষাতন তালুকদারও এ অধিবেশনে যাননি।
দশম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের ২৭৪ জন, জাতীয় পার্টির ৪১ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির সাতজন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ছয়জন, তরিকত ফেডারেশনের দুইজন, জেপির দুইজন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনএফ) একজন এবং ১৬ জন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। আর বর্তমানে বাগেরহাট-৩ সংসদীয় আসন শূন্য রয়েছে। ওই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার আবদুল খালেক সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় এ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.