বাবা আমি মরে গেলে তুমি কেঁদো না
বাবা আমি মরে গেলে তুমি কেঁদো না

বাবা আমি মরে গেলে তুমি কেঁদো না

এইচ এম হুমায়ুন কবির, পটুয়াখালী

বিরল হিমোল্যাক্রিয়া রোগে আক্রান্ত মেধাবী ছাত্রী জিনাত। তারা বাবা তার চিকিৎসায় ব্যায় করেছেন সর্বস্ব। তারপর জিনাত সুস্থ হয়নি। তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়া প্রয়োজন। জিনাতের বাবা তার মেয়ের চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ দেশবাসীর সহায়তা চায়

কিছুতেই থামছে না (heamolacria) বিরল রোগে আক্রান্ত মেধাবী শিক্ষার্থী জিনাতের রক্তক্ষরণ। বিরল এ রোগে আক্রান্ত একমাত্র কন্যা সন্তানকে বাঁচাতে মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্যের হাত বাড়িয়েও চিকিৎসার অর্থ না পেয়ে থামছে না বাবা মামুন হাচানের কান্না। বাবা আমি মরে গেলে যাবো, তুমি আর কেঁদো না। বাবাকে জিনাতের শান্ত্বনা। কিন্তু সন্তানকে বাঁচাতে মামুন হাচান প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের সবার সাহায্য চান।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের পাঁচজুনিয়া গ্রামের মামুন হাচানের একমাত্র মেয়ে সন্তান মোসা: ফাতিমা জিনাত (মিম)। রঙিন প্রজাপতির মতো উচ্ছল প্রাণচাঞ্চল হয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো নতুন স্বপ্নের বিভোর হয়ে উঠেছিল জিনাত। ছোট বেলায় নানা বাড়ি থাকার সুবাদে সেখানেই পড়াশুনা শুরু এবং পার্শ্ববর্তী উপজেলা গলাচিপা গার্লস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে। এরপর এ মেধাবী মেয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তির ধারবাহিকতা অব্যাহত রেখে গলাচিপা হাইস্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণীতে জিপিএ ৫ এবং ২০১৬ সালে একই বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে বর্তমানে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যায়নরত আছে। পড়াশুনা শেষ করে ভালো চাকরি পেয়ে ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ বাবার পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল জিনাতের। এরই মাঝে ২০১৬ সালের ৪ আগস্টে মেধাবী শিক্ষার্থীর প্রথম বারেরমতো হঠাৎ করে ডান চোখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। একমাত্র মেয়ের বার বার রক্তক্ষরণ শেষে প্রচণ্ড বমি করার পরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া দেখে দেশের খ্যাতনামা ডাক্তারদের শরণাপন্ন হন জিনাতের বাবা। চিকিৎসা করাতে থাকেন দেশের নামিদামী হাসপাতালে।

চিকিৎসায় উন্নতি না হয়ে বরং একইভাবে সাত মাস পর ডান নাক দিয়ে, এক মাসের ব্যবধানে ডান কান দিয়ে এবং মাত্র ২০ দিন পর মুখ ও গলা দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। জিনাতের চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থায় সর্বশেষ ২০১৮ সালের মার্চ মাসে নাভী দিয়েও একইভাবে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। বর্তমানে জিনাতের দুই চোখ, নাক, দুই কান এবং নাভী দিয়ে রক্তক্ষরণ অব্যাহত আছে। জিনাতের বাবা মামুন হাচান কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, জিনাত (যবধসড়ষধপৎরধ) নামের বিরল রোগে আক্রান্ত। মামুন হাচানের দেয়া তথ্যমতে, সাড়া বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মাত্র ১৩ জন। যার মধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। আর বাংলাদেশে বিরল এ রোগের একমাত্র ভিকটিম জিনাত। তিনি বলেন, আমার যতটুকু সামর্থ ছিল তা সব কিছু ব্যয় করে আমি ওর চিকিৎসা করিয়েছি। প্রায় সাত-আট লাখ টাকা ব্যয় করে আমি এখন আর আমার কলিজার টুকরার চিকিৎসা করাতে পারছি না। আমি প্রধানমন্ত্রীর সহায়তাসহ সবার সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করছি।

হিমোল্যাক্রিয়া রোগে আক্রান্ত মেধাবী শিক্ষার্থী জিনাত বলেন, ডাক্তার বলেছে- যত দ্রুত সম্ভব আমাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ নিয়ে যেতে। কারণ, এ দেশে এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। আমি বাঁচতে চাই, বেঁচে থেকে বিসিএস ক্যাডার হতে চাই। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য কামনা করছি।
ধানখালী ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়্যারমান মো: রিয়াজ তালুকদার জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এখন যখন জেনেছি যতটুকু সাম্ভব সাহায্য সহযোগিতা করা হবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: তানভীর রহমান জানান, শিক্ষার্থী জিনাতের বিষয়টি আমি জেনেছি। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চলছে।

জন্ম থেকে জ্বলছি

আমি আর রুবি। যখন আমাদের বয়স সাত কী আট, সেই বয়স থেকে আমরা সুখী সংসারের দুই ভাই বোন। বাবা চাকরি করতেন শহরের কোনো এক বড় অফিসে। প্রতি শুক্রবার নিয়ম করে বাবা শহর থেকে দুনিয়ার খানাপিনা নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। দাদী আমাদের মাকে বাবার সামনে ডেকে এনে বলতেন ‘বউ, সব তুমি খাবে। কিছুই তো খাও না।’ মা কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন। দাদীর এমন কর্মকাণ্ডে সেই বয়সেই আন্দোলিত হতাম সত্য, কিন্তু কিছুই করতে পারতাম না। শনিবার সকালে বাবা শহরে চলে গেলে আগের মতো শুরু হয়ে যেত আমাদের মায়ের ওপর দাদীর যত্তোসব অশালীন আচরণ। নানাজান আমাদের প্রচুর সম্পদ দেখে হয়তো ভেবেছেন মেয়েকে এই বড় ঘরে বিয়ে দিলে মেয়ে তার সুখে থাকবে, কিন্তু নানাজান জানতেন না তার সোনার মতো মেয়েকে তার দজ্জাল শাশুড়ি সারা জীবন অশান্তির আগুনে জ্বালাবেন। সবই ভাগ্য। এই ভাগ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুর্ভাগ্য। আমাদের সুন্দরী মা এই রাজকীয় সংসার করতে এসে শাশুড়ির নির্যাতনের মাঝ সাগরে প্রতিনিয়ত ডুবতে ডুবতে বেঁচে আছেন। তার সুখ নেই। নারী হয়ে জন্মালে আজকের পৃথিবীতে সুখ কুড়িয়ে পাওয়া অনেক প্রতীক্ষার।

২.
রুবির বিয়ে হয়ে গেছে চার মাস আগে। এই সংসারের বউ হয়ে আসা আমার মা একে একে জন্ম দিয়েছেন আমাকে আর রুবিকে। আবার এই সংসার থেকে অন্য এক অচেনা সংসারে পাঠানো হয়েছে রুবিকে। মেয়েদের শেষ আশ্রয় নাকি শ্বশুরবাড়ি!
সেই শ্বশুর বাড়িতে রুবির সুখ শান্তি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রুবির একমাত্র ননদ রুমা যখন তখন দোষ খোঁজে ভাবীর। রুমার গায়ের রং ম্যাচম্যাচে কালো বলে সুন্দরী ভাবীর প্রতি তার তীব্র হিংসা। বেলায়-অবেলায় রুবির খুঁত খোঁজে। শুনেছি রুমার নাকি মুখের ভাষা খুবই কুরুচিপূর্ণ। রুবি আমাদের বাড়ি এলে মায়ের কাছে সব ব্যাখ্যা করে চোখের জলে। মা কাঁদেন। রুবি কাঁদে। পাশের ঘর থেকে ওদের কান্না শুনলে আমার বুকটা খাঁ খাঁ করে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় রুবিকে ওই বাড়িতে আর পাঠাব না। কিন্তু মা কড়া গলায় বলেন ‘আজে বাজে কথা কইবি না। স্বামীর ঘরই মেয়েদের জন্যে জান্নাত।’ আমি মনে মনে বলি ‘তাহলে ওই জান্নাতে রুবির শান্তি নেই কেন? নাকি রুবির সর্বোপরি মেয়েদের জন্মই হয়েছে অশান্তির জন্যে?’

৩.
হাসি নামে হাসি হলেও তার মুখে কখনো হাসি নেই। তবু মুখটি বড়ই মায়াবী। হাসির সাথে আমার বিয়ের বয়স এখন দেড় মাস। হাসিকে ভাগ্যবতী বলা চলে। কারণ, আমার মায়ের কাছ থেকে সে যথাযোগ্য পুত্রবধূর মর্যাদা পাচ্ছে, যে মর্যাদা আমার মা তার শাশুড়ির কাছ থেকে কখনো পাননি।
বিয়ের পর প্রথম শ্বশুরবাড়ি গিয়ে জানলাম আমার শাশুড়ি হাসির সৎ মা। সেই সৎ মায়ের ঘরে খুব করুণভাবে বড় হয়েছে হাসি। মেয়েকে এত অত্যাচার করছে তার সৎ মা, অথচ আমার শ্বশুর নাকি কোনো দিন এর প্রতিবাদ করেননি।

দ্বিতীয়বার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তো বিশাল কেলেঙ্কারি। কী বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শাশুড়ি আমার সামনেই হাসিকে এলোপাতাড়ি মারতে লাগলেন। এ দৃশ্য আমার সহ্য হচ্ছিল না দেখে হাসিকে নিয়ে ওই বাড়ি থেকে চলে এলাম। মেঠো পথের রিকশায় আমি আর হাসি। হাসি কাঁদছে। খুব বিষাদ মাখানো কান্না। হাসিকে বললাম ‘আমরা আর কোনো দিন এ বাড়ি আসব না।’ হাসি বলল ‘জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মা কোনোদিন আমাকে বুকে টেনে একটু আদর করেনি।’ মনে মনে বলি ‘তুমি যে নারী, অনাদরে বড় হওয়ার জন্যে তোমাদের কারো কারো জন্ম।’

৪.
ওই পাড়ার বিউটি ভাবীকে আমার বড় আপন লাগে। রফিক ভাই খুব ভাগ্যবান এমন একজন বউ পেয়ে। অথচ দিনে দিনে জেনেছি তাদের সংসারে অশান্তি। অশান্তির সূত্রপাত রফিক ভাইয়ের দ্বিতীয় বিয়ে। এমন একজন সুন্দরী বউ থাকার পরও পরকীয়ায় জড়িয়ে রফিক ভাই নাসিমা নামের একজনকে বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন দূরের শহরে। বিশ্বাস করা স্বামীটার এমন অপকর্ম মানতে না পেরে এক সূর্যদয়ের আগে আগে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন বিউটি ভাবী। মৃত্যুর আগে নথি ডায়েরিতে বিউটি ভাবী লিখে গেছেন- তার লম্বা সংসারের অন্তরালে থাকা সমস্ত যন্ত্রণার নীল বর্ণনা।

নারীর জন্মই হয়তো কোনো না কোনো দুঃখ কষ্টের বোঝা বহন করতে। তা না হলে আমার মা, আমাদের রুবি, আমার স্ত্রী হাসি, কিংবা বিউটি ভাবীর জীবনের কোনো না কোনো অংশ জুড়ে কেবল এমন এত এত কষ্ট জড়িয়ে থাকবে কেন? তাদের কেউ কেউ জন্ম থেকে এভাবে জ্বলবে কেন?
জোবায়ের রাজু
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.