ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড
ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড

ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড

এনডিটিভি

১২ বছরের কম বয়সী শিশু ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি অধ্যাদেশ বা জরুরি নির্বাহী আদেশ সই করেছে ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই অধ্যাদেশ পাস হয়। শনিবার মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই বিধানের বিষয়টি প্রস্তাব করা হয়। 

এর আগে গেলো সপ্তাহে কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু উন্নয়নমন্ত্রী মানেকা গান্ধী ধর্ষকদের শাস্তির বিষয়ে বিদ্যমান আইন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে কাঠুয়া, উন্নাও এবং সুরাতসহ বিভিন্ন জায়গা ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উত্তাল ভারত। বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়ায় আট বছর শিশু আসিফা বানুকে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ভারতের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের মানুষরাও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

তবে এর আগেও এ ধরনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আগে তা প্রত্যেকবারই বাতিল হয়ে গিয়েছিল। কয়েক বছর আগে রাজধানী দিল্লিতে ২৩ বছর বয়সী এক নারী গণধর্ষণ ও হত্যার পর ধর্ষণ আইন বদলানোর দাবি ওঠে। তখন বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামতে উল্লেখ করেন, ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড দিলেও ‘সেটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব নাও ফেলতে পারে’।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মোদি সরকারও ধর্ষকদের কঠোর সাজার ব্যাপারে নিজেদের অনীহার কথা জানিয়েছিল। তখন কেন্দ্রীয় আইন কর্মকর্তা সুপ্রিম কোর্টকে বলেছিলেন, মৃত্যুদণ্ড সব সমস্যার সমাধান নয়।

তবে কাঠুয়া ও উত্তর প্রদেশের উন্নাও-এ ধর্ষকদের বাঁচাতে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের তৎপরতায় ভারতে বিক্ষোভ নতুন মাত্রা লাভ করে। এমনই পরিস্থিতি ভারত সরকার এই অধ্যাদেশে সই করলো।

ভারতে শিশু ধর্ষণ কেন কমছেই না?

মেয়েটির বয়স ৯ থেকে ১১ বছর হবে। সম্প্রতি গুজরাটের সুরাট শহরের একটি খেলার মাঠের কাছে ঝোপের ভেতর তার ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে ৮৬টি জখমের চিহ্ন ছিল।

যে চিকিৎসক ময়নাতদন্ত করেছেন, তার ধারণা এক সপ্তাহ ধরে হয়তো নির্যাতন করা হয়েছে মেয়েটিকে। পুলিশেরও ধারণা, শিশুটিকে আটকে রেখে এভাবে নৃশংসভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।

কিন্তু লাশ পাওয়ার ১০ দিন পরও তার পরিচয় বের করতে পারেনি পুলিশ। গুজরাটের আট হাজার নিখোঁজ শিশুর ফাইল ঘেঁটেও কোনো সুরাহা করতে পারেনি তারা।

দিল্লিতে বিবিসির সৌতিক বিশ্বাস বলছেন, ভারতে দুর্বলদের ওপর সবলদের কর্তৃত্ব ফলাতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। শ্রেণী-বৈষম্য এবং পুরুষ-শাসিত যে সমাজে হিংসা ছড়িয়ে ভোট পাওয়ার চেষ্টা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, সেখানে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের ঘটনাকে স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে দেখছেন অনেকেই।

মূলত মেয়ে ভ্রূণ হত্যার কারণে ভারতে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম। প্রতি ১০০ মেয়ে শিশুর জন্মের তুলনায় ১১২টি ছেলে শিশু জন্ম নেয়। এ কারণে, স্বাভাবিকের চেয়ে নারীর সংখ্যা ভারতে প্রায় ছয় কোটি ৩০ লাখ কম।

অনেকেই বিশ্বাস করেন, পুরুষের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেশি হওয়ার কারণে নারীর ওপর যৌন নির্যাতন বাড়ছে।

নারী ও পুরুষের সংখ্যার অনুপাতে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের চিত্র সবচেয়ে খারাপ। এবং এ রাজ্যে গণ ধর্ষণের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি।

এক জানুয়ারি মাসেই, ১০ বছরের একটি মেয়েকে ধর্ষণ করার দায়ে ৫০ বছরের এক পুরুষকে আটক করা হয়, সাড়ে তিন বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৫ বছরের একটি বালককে আটক করা হয়, ২০ বছরের এক বিবাহিতা নারীকে ধর্ষণ করে দুই পুরুষ; চাষের জমিতে পাওয়া যায় একটি মেয়ে শিশুর ক্ষত-বিক্ষত দেহ। এসব ঘটনা পুলিশের খাতায় উঠেছে। এমন অনেক ঘটনাই পুলিশের কাছেই আসে না।

ভারত শাসিত কাশ্মীরে একটি মুসলিম যাযাবর সম্প্রদায়ের আট বছরের একটি মেয়ে শিশুকে মন্দিরে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা পুরো ভারতকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। বলা হচ্ছে, মুসলিম ওই যাযাবররা যেন তাদের এলাকায় ছাগল চরাতে না আসে, সেটা নিশ্চিত করতে ওই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

অনেক মানুষ এই ঘটনা প্রকাশ্যে সমর্থনও করেছে। অভিযুক্তদের সমর্থনে একটি সমাবেশে যোগ দিয়েছেন রাজ্য সরকাররে বিজেপি'র দুই মন্ত্রী। সমালোচনার মুখে তারা অবশ্য পরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

কেরালা রাজ্যে একজন ব্যাংক ম্যানেজার ফেসবুকে কাশ্মীরে ওই ধর্ষণ ও হত্যার সমর্থনে পোস্টিং দেন - "এটা না হলে ওই মেয়েটি বড় হয়ে হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে মানব-বোমা হয়ে হাজির হতো।" তাকে অবশ্য বরখাস্ত করা হয়।

চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট করেন, "আমাদের কন্যারা বিচার পাবে।"

অনেকেই বলছেন তার এই আশ্বাস ফাঁকা বুলি।

অন্য দলের রাজনীতিকরাও ব্যতিক্রমী তেমন কিছু দেখাতে পারছেন না। ২০১৪ সালে একজন নারী সাংবাদিককে ধর্ষণ করার দায়ে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, উত্তর প্রদেশের বড় দল সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়াম সিং যাদবের মন্তব্য ছিল- "পুরুষরা ভুল করে। সেজন্য তাদের ফাঁসি দেয়া যায় না। আমরা ধর্ষণ বিরোধী আইন বদলাবো।"

ভারতের সামাজিক এই বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে হয় নারীদের। নিজেকে রক্ষা করতে চাইলে, ঠিকমতো পোশাক পরো, পুরুষ সঙ্গী ছাড়া বাইরে যেনা, অথবা ঘরের ভেতরে থাকো।

সবচেয়ে আশঙ্কা যেটা তা হলো, এখন অধিক সংখ্যায় শিশুরা টার্গেট হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানেই দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে শিশু ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে।

দেশে ধর্ষণের শিকার নারীদের ৪০ শতাংশই শিশু।

ধর্ষণ শুধু ভারতের সমস্যা নয়, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং নারী-পুরুষের অস্বাভাবিক অনুপাতের এখানকার পরিস্থিতি অন্যদের চেয়ে খারাপ।

পাশাপাশি রয়েছে মানুষের উদাসীনতা। নারীর অধিকার বা নিরাপত্তা ভারতে কখনই নির্বাচনী ইস্যু নয়।

তবে আশার কথা যে, ধর্ষণের ঘটনা বেশি বেশি করে সংবাদে আসছে। মামলা হচ্ছে বেশি।

কিন্তু হতাশার কথা, ভারতের বিচার ব্যবস্থা এখনও রাজনৈতিক চাপের কাছে পর্যূদুস্ত। অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষকরা মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।

এখনও ভারতে প্রতি চারটি ধর্ষণের মামলার মাত্র একটিতে অভিযুক্তরা দোষী সাব্যস্ত হয়।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.