পাখির প্রতি ভালোবাসা

মো: মাঈন উদ্দিন

কালবৈশাখী ঝড়ে সেদিন প্রকৃতি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সাথে শীলাবৃষ্টি হওয়ায় প্রাণিকুলও পড়েছিল অস্তিত্ব রক্ষার হুমকিতে। ঝড় থামল বটে কিন্তু তখনো টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। খুকি দৌড়ে বের হয়ে গেল আম কুড়াতে। কিছুদূর এগোতেই সে সামনে মৃত পাখি দেখতে পেল। একটা নয় দুইটা নয়, অনেক! নিষ্প্রাণ পাখির নিথর দেহ দেখে খুকুর মন ভারাক্রান্ত হলো। সে আম কুড়ানোর কথা একেবারেই ভুলে গেল। দুই পা সামনে এগোতেই তার চোখে পড়ল একটি টিয়া পাখির ফুটফুটে ছানা, মরা পাতার নিচে হামাগুড়ি দিয়ে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। থমকে দাঁড়াল খুকি। তার কৌতূহলী দৃষ্টি ওই টিয়া ছানার প্রতি। ছানাটি হয়তো তার মা-বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে। হয়তো তার মা-বাবা এই ঝড়ের তাণ্ডবে প্রাণ হারিয়েছে। খুকিকে দেখে ছোট্ট পাখি প্রাণের ভয়ে পত্র পল্লবে মুখ লুকাল। খুকির মনে পাখিটির প্রতি গভীর মমতা জন্মাল। সে দুই হাতে পাখিটিকে ঝাপটে ধরল। অজানা আতঙ্কে পাখি কিচির মিচির শব্দে চেঁচিয়ে উঠল। কিন্তু ডানা ঝাপটানোর শক্তি তার গায়ে ছিল না। খুকির আনন্দ যেন আর ধরে না। সে তার পরনের জামা দিয়ে পাখিছানার শরীর থেকে পানি মুছে দিলো। পাখিও যেন খুকির সোহাগ বুঝতে পারল। আদর পেয়ে কিচির মিচির বন্ধ করল।
খুকি বাসায় ফিরে তার মা-বাবাকে হাতের পাখিটি দেখাল। তার বাবা-মা খুব খুশি হলো। তাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘বাহ কী চমৎকার পাখি’। তার বাবা বললেন, ‘কিন্তু মা, পাখিটি ছেড়ে দাও। বনের পাখিকে বনেই সুন্দর দেখায়, ঘরে নয়।’ খুকির অভিমানী উত্তর, ‘কখনো না, এটি আমার পাখি। আমার পাখি অসুস্থ। তার সেবা দরকার। এখন ছেড়ে দিলে সে মরে যাবে।’ তার বাবা আর কোনো কথা বললেন না। পরদিন খুকির বাবা তাকে পাখির খাঁচা এনে দিলেন। খুকি প্রতিদিন ছানাকে খাবার দেয়, পানি দেয়, খুকির যতœ পেয়ে পাখিটি অল্প দিনের মধ্যেই নাদুস-নুদুস হয়ে উঠল। তার গায়ের চিকচিকে সবুজ রঙ সবার মন কাড়ে।
খুকি পাখিটিকে নাম দিলো টুকু। অপরিচিত কেউ ঘরে ঢুকলেই টুকু কিচির মিচির শুরু করে দেয়। সে যেন সতর্কবার্তা পাঠায় ঘরের মালিকের কাছে। খুকি জামা পরে ব্যাগ হাতে স্কুলে যাবে আর এমনি টুকুর দম ফাটা কিচির মিচির। খুকি দৌড়ে এসে টুকুর সামনে দাঁড়ায়Ñ স্কুলে যাবে টুকু? টুকু যেন বলতে চায়Ñ হ্যাঁ আমিও তোমার সাথে স্কুলে যেতে চাই। টুকু স্কুল থেকে ফেরার পর টুকুর আবার সেই চেঁচামেচি। খুকি টুকুর অভিমান বুঝতে পেরে বলেÑ ও রাগ করেছিস, তাই না? এক মিনিট অপেক্ষা কর, তোর খাবার নিয়ে আসছি। খুকি খাবার নিয়ে এলে টুকুর কিচির মিচির বন্ধ হয়। খুকি বাইরে থেকে খেলাধুলা করে ফিরলে টুকু খুকিকে দেখেই গগনবিদারী চেঁচামেচি শুরু করে দেয়।
খুকি খাঁচার সামনে এসে চোখ বড় বড় করে বলে, ‘ও, তোর হিংসা হচ্ছে বুঝি? তুই আমার সাথে বাইরে খেলতে যেতে চাস, তাই না? টুকুর নীরবতা যেন বলতে চায়Ñ হ্যাঁ আমি তোমার সাথে খেলতে যেতে চাই। খুকিকে টিয়া পাখির সাথে এমন অন্তরঙ্গ আলাপরত দেখে তার মা-বাবা চোখ টিপে হাসে।
খুকির গায়ে অসহ্য জ্বালাপোড়া নিয়ে জ্বর আসে। এক দিন পরই তার গায়ে গুটিবসন্ত দেখা দেয়। গুটিবসন্ত নিয়ে খুকির স্কুলে যাওয়া বন্ধ। আজ ১০ দিন হয়ে গেল খুকি বাসায় অঘোষিত বন্দী। বাবা-মা উভয়েই চাকরিজীবী হওয়ায় তারা সারা দিন বাইরে থাকেন। খুকির একমাত্র কথা বলার সঙ্গী টুকু। খুকি এ ক’দিনে বন্দিত্বের জ্বালা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছে। তার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খুকি চিন্তা করছেÑ অল্প ক’দিনে সে ঘরে থেকে হাঁফিয়ে উঠেছে অথচ টুকু দিনের পর দিন একা এই খাঁচায় বন্দী। কত কষ্টই না তার হচ্ছে। সে বিছানা ছেড়ে টুকুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দুই হাতে খাঁচা আলতু করে ধরে স্থির দৃষ্টিতে টুকুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘টুকু তোর খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না? তুই কিছু না বললেও আমি বুঝতে পাচ্ছি। আমি জানি তোর মা-বাবাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আজ তোর মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর কথা অথচ আমি তোকে জোর করে খাঁচায় বন্দী করে রেখেছি। আমার ভুল হয়ে গেছে রে টুকু।’
পরদিন সকাল বেলা মা-বাবা অফিসে যাওয়ার আগেই খুকি তাদের ডেকে বলল, ‘টুকুকে ছোট্ট খাঁচায় বন্দী করে রাখা আমাদের একদমই ঠিক হচ্ছে না। তাই টুকুকে আমি মুক্তি দিতে চাই। খুকির মা বললেন, ‘খুব ভালো কথা’। খুুকি টুকুর খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘টুকু, তোকে আজ মুক্ত করে দিলাম। তোর যেখানে খুশি উড়ে যা।’ খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে টুকু ফুরুত করে উড়ে বাইরে চলে গেল। খুকি, তার মা-বাবা উৎফুল্লচিত্তে টুকুর মুক্তভাবে ওড়ার দৃশ্য দেখছে। সবাইকে চমকে দিয়ে টুকু উঠোনের চার দিকে চক্কর দিয়ে আবার উড়ে এসে খুকির মাথায় বসল। কিচির মিচির করতে লাগল। সে যেন বলতে চাচ্ছে, ‘খুকি ওই ঝড়ের দিন আমার মা-বাবা মরে গেছে। এ পৃথিবীতে আপনজন বলতে আমার কেউ নেই। সে দিন তুমি আমাকে না বাঁচালে আমি হয়তো মরেই যেতাম। তাই তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তুমিই আমার আপনজন। আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না। খুকির প্রতি টুকুর ভালোবাসা দেখে খুকি বেজায় খুশি হলো। সে অট্টহাসি দিয়ে দৌড়ে তার রুমে চলে গেল। টুকুও উড়ে চলল খুকির পেছন পেছন। এই দৃশ্য দেখে খুুকির মা-বাবা তৃপ্তির হাসি হাসলেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.