জালিমের জন্য ধিক্কার, মজলুমের জন্য প্রার্থনা
জালিমের জন্য ধিক্কার, মজলুমের জন্য প্রার্থনা

জালিমের জন্য ধিক্কার, মজলুমের জন্য প্রার্থনা

আনিসুর রহমান এরশাদ

এক অকল্পনীয় নৃশংসতা চলছে বিশ্বজুড়ে! যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকার মানুষের স্বপ্নগুলো বিবর্ণ হচ্ছে বন্দি শিবিরে! দীর্ঘ লাশের মিছিল আর আহতদের করুণ আর্তনাদ এমন যেন মানবতার মৃত্যু হয়েছে। এক দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে পার করছে সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, মিয়ানমার, ইয়েমেনের ছোট ছোট শিশুরা। সেখানে দিনের আকাশে আজও সূর্য আলো ছড়ায়, রাতের আকাশ চাঁদের স্নিগ্ধ আলোতে উজ্জল হয়। কিন্তু সেই আলো ম্লান হয়ে যায়, ফুলের সৌন্দর্যও ফিকে হয়ে আসে বাগানের পাশে ছোট ছোট বাচ্চাদের ছিন্ন-ভিন্ন লাশের স্তুপ থাকায়।

একজন বাবা হিসেবে আমি খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করি, যে বয়সটাতে শিশুদের হাসি-আনন্দ-উচ্ছলতায় মেতে থাকার কথা; সে সময়ে রক্তাক্ত শরীরে নিথর পড়ে থাকা কিংবা হাত-পা-শরীর নিশ্চিহ্ন হয়ে থাকা কতটা অমানবিক। সন্তানহারা মা-বাবার কিংবা মা-বাবাহারা সন্তানের বুক-ফাটা আর্তনাদ কল্পনা করলেই যেখানে দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, সেখানে তাদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ একটু কল্পনা করুন! রক্তের ঝর্ণায় শিশুদের ভাসতে দেখে কী আর কোনো বাবা-মা আমোদ প্রমোদে মেতে থাকতে পারে! শিশুদের কোমল শরীরের রক্ত-মাংস নিয়ে জাগতিক স্বার্থের খেলার অধিকার কে কাকে দিলো! রক্তাক্ত ভাই-বোনের লাশের পাশে বসে কী কেউ ঘুমাতে পারে কিংবা স্বামীর কবরের পাশে বসে কী আর তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারে!

বিমান হামলায় হাত উড়ে যাওয়া শিশুর সেই চিৎকার যদি আমার মেয়ের হতো, চোখের সামনে যদি বোমার আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন নিজের কচি বাচ্চাটা ছটফট করে মারা যেতো- না আমি আর সেই শিশুদের জায়গায় আমার অস্তিত্ব কল্পনা করতে পারি না। যেটি আমি-আপনি কল্পনাও করতে পারছি না, সেটিই অনেক পরিবারের করুণ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই ভালোবাসা-আদর-বন্ধন আর কেউ ফিরিয়েও দিতে পারবে না; মজলুমের চিৎকার আর আহাজারিও থামবে না। শান্তনা হচ্ছে জালিমের কারাগার মজলুমের জন্য চিরমুক্তির সিঁড়ি। জালিমের প্রতিটি আঘাত মজলুমের জন্য জান্নাতের পুষ্পসৌরভ হয়ে ফিরে আসবে আর হত্যাকারীর জন্য মজলুমানের প্রতিটি আর্তচিৎকার বজ্রাঘাত হয়ে দেখা দেবে। মজলুমের কবর জালিমের জাহান্নাম!

আত্মায় মানবতার জন্য এক আউন্স পরিমাণ ভালোবাসা থাকলেও লাশের সারি কাউকে আনন্দ দিতে পারবে না, নির্মম হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ না তুলে থাকতে পারবে না। নারীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন হচ্ছে! তাদের কাউকে কাউকে নিজের ভাইয়ের সামনে, স্বামীর সামনে, আবার কাউকে বন্দি নারীদের দল থেকে আলাদা করে নিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে, ধর্ষণের পর বৈদ্যুতিক শক দেয়া হচ্ছে। শিশুরা ও পুরুষরাও যৌননিপীড়ন থেকে বাদ যাচ্ছে না। ধর্ষণের শিকার হওয়ার কারণে অন্তঃসত্ত্বা অনেক নারীর গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটেছে। স্ত্রীর শরীরে অন্য কোনো পুরুষের একাধিক নির্যাতনের চিহ্ন যেমন কোনো স্বামী স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন না, তেমনি অনেক নারীও ধর্ষণ পরবর্তী আত্মহত্যা করেছেন। কয়জন যুবক আছে যে নির্দ্বিধায় ধর্ষিতা কোনো তরুণীকেও হাসিমুখে বিয়ে করতে এগিয়ে আসবে! কয়জন স্বামী আছে যে ধর্ষিতা হলেও স্ত্রীকে আগের মতই ভালোবাসবেন!

আসলে জালিমের জন্য ধিক্কার! মজলুমের জন্য ভালোবাসা! মারধরের মাধ্যমে বন্দিকে স্বাগত জানানো কারাগারগুলোই জালিমদের কবরস্থান হোক! শক্তিমান হওয়ায় তুমি বাঁধতে পারো মানুষের চোখ, পিছমোড়া করে হাত, কেড়ে নিতে পার প্রশ্ন তোলার শক্তি-কাজের সুযোগ ও স্বাধীনতা; পারো না বিবেকের কারাগার থেকে মুক্তি পেতে, হৃদয়ে স্থান নিতে। ক্ষমতার উন্মাদনায় উল্টো ঝুলিয়ে পুরুষাঙ্গে কিংবা লৌহদণ্ড ঢুকিয়ে পায়ুপথে বৈদ্যুতিক শক দিতে পার, বাবা-ভাইয়ের সামনেও শিশু ও নারীদের ধর্ষণ করার উন্মাদনা দেখাতে পার; তবে তোমার ভয়ংকর রুপ ও নৃশংসতা কী সব প্রতিবাদী সত্তাকে মারতে পারে? পারে না।

কী ভয়াবহ নির্যাতন! সাধারণ মানুষের উপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানানোর অপরাধে সেনাদের চাকরিই শুধু যাচ্ছে না, প্রাণ পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হচ্ছে সিরিয়ায়। বিনা বিচারে বন্দিদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করে, ক্ষমার অযোগ্য যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করার চড়া মূল্য দিতে হবে এই জগতেই কিংবা অবশ্যই পরকালে। বাবা-ভাইয়ের সামনেও ধর্ষণ করতে যাদের বুক কাঁপে না, ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত-রোগাক্রান্ত মানুষের জন্য মন কাঁদে না, নিষ্ঠুর নির্যাতন ও পিটিয়ে হত্যা যারা হাসতে-খেলতে করতে পারে- তারা কিসের সেনা? কিসের মানুষ? শয়তান বললে লজ্জা পাবে শয়তান, পশু বললে লজ্জা পাবে পশু।

যেখানে কাজের সুযোগ নেই কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই; সেখানে সত্যিকারের মুক্তি অসম্ভব। অপরিসীম অত্যাচার চালিয়ে কী আর গদি ধরে রাখা যায় বেশি দিন? যে অমানবিক নির্যাতন করবে, ক্ষমতা চাইবে, মানুষ চাইবে না; তার পরিণতি কী ভালো হবে? মানবতার বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ জিততে পারে না। ক্ষমতাসীনদের ও তাদের অনুসারীদের বুক কী মানুষের বুক নয়! ওদের প্রাণ কী মানুষের প্রাণ নয়! নদীর স্রোতের মতো রক্তের ধারা বইতে দেখে যে হাসে সে পাপীষ্ট-দুরাত্মা, পশুর চেয়েও নিৎকৃষ্ট। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত মারধর চালিয়ে আনন্দ করা নমরুদ-ফেরাউনের প্রেতাত্মাদের পক্ষেই সম্ভব।

রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামায়ে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ করা যায়, প্রতিবাদীদের ক্ষোভ দমানো যায় না। বন্দিদের কারো চোখ উপড়ে ফেলা সহজ, কিন্তু বিভৎসতা ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে শান্তি আনা যায় না। কেমন শাসক এরা! যারা মানুষের পর্যাপ্ত খাবার দিতে পারে না, চিকিৎসক ও ওষুধের যোগান দিতে পারে না অথচ পারে হত্যার পর ক্রিমেটোরিয়াম ব্যবহার করে বন্দিদের লাশ পোড়াতে, মধ্যরাতে চোখ বেঁধে গণহারে ফাঁসিতে ঝোলায়ে দেহ নিথর করে দিতে, উচু থেকে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করতে। গোপনে-লুকিয়ে-মেরে পুড়িয়ে দেহের অস্তিত্ব বিলীন হয়; চেতনা নি:শেষ হয় না। তাই প্রতিটি মজলুমের কবর জালিমদের জন্য একেকটি জাহান্নাম হবে! বিচার বর্হিভূত হত্যাকে যারা সমর্থন দেয় তারা অসভ্য-বর্বর, মানুষ মেরে কখনো আদর্শ প্রচার হয় না। মানুষ মেরে সন্ত্রাস হয়, জবরদখল হয়, জুলুম হয়, নাৎসিদের কায়দাতে গণহত্যা হয়। কে বুঝাবে শান্তি প্রচেষ্টা ‘অকার্যকর’ হওয়া মানে আশার আলো নিভে যাওয়া, স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়া।

হাঁটু মুড়ে মাটিতে মুখ গুঁজে থাকা বন্দির দিকে বন্দুক তাক করে তুমি কী ভাবছো তুমি বীর পুরুষ! আরে না! তুমি ভীরু, কাপুরুষ! যেসব বন্দিদের পরনে জামা নেই, আতঙ্কে মুখে শুধু গোঙানির শব্দ, পিঠে গাঢ় লাল ক্ষত। তাদের বিরদ্ধে লড়াই করে তুমি তৃপ্ত! নর পিশাচ কোথাকার! তোমার একটু বিরোধীতা করেছে বলে তুমি যা ইচ্ছে তাই করছো, মহা পরাক্রমশালী স্রষ্টার বিরোধীতা পদে পদে করায় কী তোমার কিছুই হবে না! যখন গুলি মাথা ফুঁড়ে দেয়, পায়ের নীচে পড়ে থাকে লাশ, কুয়োয় লাশ ছুড়ে ফেলার শব্দ বাতাসে ভেসে আসে; তখন ভাববে সন্ত্রাসী মানুষ নয় হায়েনা, জালিম শাসক আর সন্ত্রাসীর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য এটুকুই একজনের সকল অপরাধ স্বীকৃতি ও বৈধতা পায়, আরেকজনের অপরাধ তা পায় না। ইরাকও গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে ভুল তথ্যের বলি হয়েছে ৩ লাখেরও বেশি ইরাকি, ঝড়েছে রক্ত অনেকের। ইরাকের ২০ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্য নিহত হয়েছে।

বিশ্ব নেতারা শুনুন প্লিজ! যেকোনো বীভৎস পন্থা অর্থহীন, বর্জন করুন যুদ্ধ, আলোচনার মাধ্যমে খুঁজুন সমাধান। খুনিদের সাথে কেন এত দহরম-মহরম, অকথ্য নির্যাতনের শিকার মানুষের অভিশাপেই ধ্বংস হবেন। একটু থামুন, আত্মসমালোচনা করুন, ভেবে-চিন্তে পদক্ষেপ নিন! নিরাপত্তা তল্লাশির নামে পুরুষ গার্ডরা নারী বন্দিদের ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি করবে তাও মেনে নিতে হবে! পাল্লা দিয়ে নারী ধর্ষণ লালসায় সেনারা ভয়ানক খেলায় মেতে উঠবে তা নিরবে সয়ে যেতে হবে! নিজের ঘর-বাড়ি-দোকান আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হবে তা দেখে যেতে হবে। তাহলে বেঁচে থেকে কী লাভ! অবস্থা এমন যে বাড়ির উঠোনে চোখের সামনে মা-বোন ধর্ষিত হবে তবু প্রতিবাদ করা যাবে না! ধর্ষক চলে গেলে অসহায় বাবা ও জওয়ান ভাইগুলো চিৎকার-আর্তনাদ ছাড়া কিছুই করতে পারবে না!

আপনি বুটের নিচে ফেলে বেধড়ক মার দিতে পেরে ভেবেছেন জিতে গেছেন! ক্ষোভ-লজ্জা-ঘেন্নায় অতিষ্ঠ মানুষগুলো চুপ থাকছে বলে ভেবেছেন আপনাকে সবাই সম্মান করছে! আসলে সাধারণ মানুষ মুক্তি চাইছে এই নরক যন্ত্রণা থেকে। ছেলেমেয়ের সামনে থেকে তাদের বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারছেন, আর খুশি মনে ভাবছেন মহৎ কাজ করছেন! সদ্যবিবাহিতার সামনে থেকে তার স্বামীকে বন্দুকের নল দিয়ে মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত করে নিস্তেজ শরীর টেনে গাড়িতে তুলছেন, আর বলছেন জাতিকে উদ্ধার করছেন! এভাবে স্বজন হারানো মানুষের অপেক্ষাও কোনোদিন শেষ হবে না, গণতন্ত্রও মুক্তি পাবে না। সেটা হোক রাখাইনে কিংবা গাজায় কিংবা গৌতায়!

শুধু রক্ত দেখলে, রক্তের নদী না দেখলে অজানাই থেকে যেত মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে! মানুষ হত্যা করা জালিমের কাছে মশা-মাছি হত্যা করার চেয়েও তুচ্ছ ব্যাপার। তাইতো মারার পর জীবিত কিনা- এটা নিশ্চিত হতে লাথি মেরে দেখে! এ যে মানবতার চূড়ান্ত অপমান! ক্ষমতার মোহে স্বর্গ ভেবে ভুল করে নরকেই পা বাড়িয়েছেন জালিম শাসকরা! সারাক্ষণই মৃত্যু ফাঁদ পেতে নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ানো যায়, অমানুষিক নির্যাতনে অশ্রু বাড়ে, যৌন হিংসায় উপর্যুপরি ধর্ষণে রক্ত ঝড়ে, যখন-তখন বসতবাড়িতে হানা ও মারধরে আতঙ্ক বাড়ে, রোমহর্ষক দিন আরো দীর্ঘায়িত হয় কিন্তু সুখ বাড়ে না! যেসব কারাগারে অত্যাচার কখনো বন্ধ হয় না, বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে অত্যাচার করা হয়, মাটিতে শুয়ে পড়া পর্যন্ত পিটুনি চলে; সেখানে মৃত্যুই বাস্তবতা।

ধর্ষণ উৎসব আর হত্যার উৎসব প্রিয়রা সামরিক ট্যাঙ্কের সামনে নগ্ন হয়ে নারীদের হাঁটাতে পারবে কিন্তু জখম শরীরে পরার জন্য কিছু দিতে পারবে না, দেহতল্লাশির নামে অন্তঃসত্ত্বার যৌনাঙ্গে জিনিস ঢুকিয়েও অত্যাচার চালাতে পারবে, মহিলাদের নগ্ন অবস্থায় পুরুষ অফিসারের সামনে মিছিলে হাঁটাতে পারবে, স্তনে বিদ্যুতের শক দিয়ে নির্যাতন করতে পারবে কিন্তু পারবে না ভালোবাসতে কিংবা মানুষ হতে। পাইপ, রড দিয়ে চালানো নির্যাতনের দৃশ্য দেখে ‘আনন্দ’ পায় যারা তারাইতো দাজ্জালের প্রেতাত্মা!

সিরিয়ার সরকারের অন্তত ২০টি আস্তানা নারী ও মেয়ে শিশুদের ধর্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, পুরুষ ও বালকদের ধর্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ১৫টি আস্তানা। সিরিয়ায় ত্রাণের বিনিময়ে নারীদের যৌন নির্যাতন যারা চালিয়েছে কে বলেছে তারা মানুষ ! হৃদয়বিদারক তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো অমানুষের কদর্যতা ও নোংরামির চরম বহি:প্রকাশ! ত্রাণ সহায়তা পেতে ‘খণ্ডকালীন মেয়াদে’ বিবাহিত হয়ে ‘যৌন সেবা’ পাওয়া ত্রাণ কর্মীদের রুচি দেখুন! দুর্দশার যেনো কোনো শেষ নেই! সিরিয়ায় কারাগারের পরিবেশ ভীষণ দূষিত, সেখানে খাদ্যের মান, পানি, পয়ঃরিষ্কাশন ব্যবস্থা অপ্রতুল৷ আর এ কারণে সহজেই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হন বন্দিরা৷

পায়ে ও পিঠে আঘাত করা, মুখে ঘুঁষি মারা, চুল টানা, অশ্লীল গাল দেয়া- এসব কিসের আলামত! হিজাবধারী নারীর হিজাব খুলে হিজাবের দ্বারা চোঁখ বেঁধে কারাগারে নিয়ে পেটানো, সবার সামনে ধর্ষণ করার চেয়েও গর্হিত কাজ আর কী আছে! সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের বেছে নিয়ে জোরপূর্বক নগ্ন করা কিংবা ধর্ষণ করায় কিংবা ধর্ষণে গর্ভবতী হলে শিশুটি জন্ম নেওয়ার পর মায়ের সামনে তাকে গুলি করে মেরে ফেলায় কোনো বাহাদুরি নেই। কে তোমাদের ক্ষমা করবে! পৃথিবীর নরককে কে স্বর্গ বানাবে!

বন্দি শিবিরে থাকা অবস্থায় সিরিয়ার পূর্ব গৌতায় জন্ম নেয়া নুর আল হুদা হিজাজীকে প্রতিদিন খাবার দেয়া হতো শক্ত ও ঠাণ্ডা আলু। কম্বল বিছিয়ে মেঝে ঘুমাতে হতো। স্যাঁতস্যাতে রুমে গাদাগাদি করে থাকায় কারো ঘুম হতো না। ২৪ ঘন্টায় তিনবারের বেশি টয়লেটে যাবার সুযোগ দেয়া হতো না। টয়লেটে প্রতিবারে ৬ মিনিটের বেশি থাকতে দেয়া হতো না। সেনারা ঘড়ি ধরে অপেক্ষা করতো। নির্ধারিত সময়ের বেশি সময় নিলেই সেনারা জোর করে দরজা খুলতো এবং ঘাড়ে ধাক্কা মেরে বাইরে বের করতো। নারীদেরকে পিরিয়ড শেষে একবার গোসলের সুযোগ দেয়া হতো, তাই মাসে সাধারণত ১বার গোসলের সুযোগ পেতেন নারীরা। নুর অর্থনীতিতে পড়াশুনা করেছেন। তার জীবন ছিল বিশ্বের অন্য দেশগুলোর তরুণীদের মতোই প্রাণোচ্ছল ও গতিশীল। কিন্তু সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তার আনন্দময় জীবন বিষাদপূর্ণ হয়ে ওঠে, প্রাণচাঞ্চল্য থেমে বিরক্তিতে ভরে যায়। তার সুন্দর জীবন গড়ার স্বপ্ন, উন্নত ক্যারিয়ারের আশা, সাফল্যের স্বর্নালী সিঁড়িতে আরোহণে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা শেষ করে দেয় যুদ্ধ; প্রতিষ্ঠা ও উন্নতির পথ ছেড়ে অস্তিত্বের লড়াইয়ে তার জীবন সংগ্রাম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

সিরিয়ার ভয়ঙ্কর সেসব লোমহর্ষী গল্প যেন নাটক-সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়। হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো ইতিহাসের যেকোনো নির্মমতাকে পেছনে ফেলে। কে জানে কত নারী সেনাদের কিংবা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের আনন্দ-উল্লাস-বিনোদন-ভোগের-ধর্ষণের শিকার হয়! কত নিরপরাধী পুরুষ একটি ছোট্ট কামরায় বছরের পর বছর বন্দি থেকে যুদ্ধের সমাপ্তির আশা নিয়ে মুক্তির জন্য অপেক্ষা করে! কত শিশুকে এতিম হতে হয় এবং নিরানন্দ ও ভয়-আতঙ্কের জীবন বেছে নিতে হয়! মজলুমরা ভাবে যুদ্ধ শেষ হবে কি? বিশ্ব কি আমাদের সাহায্য করবে? অনেকেই আশা করে, সবাই মুক্ত হবে, যুদ্ধ শেষ হবে এবং সব মুসলমানরা সাহায্য করবে।

যেখানে হাফেজ ও ইমাম তরুণ ও যুবকদেরকে প্রতিদিন সেলে এনে ইলেক্ট্রিক শক দেয়া হয়, নারী ও শিশুদেরকেও গরম পানিতে ঝলসে দেয়া হয়। তীব্র ব্যথায় আর্তনাদ-আহাজারি-চিৎকার শুনে শুধু আল্লার কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং কান্নাকাটি বন্ধ হবার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই অনেক জনপদের নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের। তারা ভাবে কেন এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটলো! সাজানো-গুছানো সবকিছু তছনছ হয়ে গেল! এত বেশি মানুষকে নির্মমভাবে কেন মরতে হলো! নেই কাজের সুযোগ কিংবা স্বাধীনতা! এখনো অনেকে এখনো আশা ছাড়েনি। মুক্ত স্বাধীন জীবনে ফিরতে নিয়মিত প্রার্থনা করে মজলুমরা। ধৈর্য ধরে এই ভেবে- মজলুমরা জান্নাতের ফুল হয়ে ফুটবে আর জালিমরা জাহান্নামের আগুন হয়ে জ্বলবে! তারপরও স্বাধীনতা হচ্ছে আশির্বাদ, যার প্রকৃত মূল্য কেউ জানে না।

তাই বন্ধ হোক যুদ্ধ, দেখতে চাই না নৃশংসতা।

 

লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.